সক্রেটিসের বাড়ি -মারুফ রায়হান

বেড়ানোর ছলে স্থাপত্যকলা ও ইতিহাসপাঠ

মারুফ রায়হান

Socretes er bari
প্রকাশক- অন্যপ্রকাশ, প্রচ্ছদ- মাসুম রহমান, প্রথম প্রকাশ-২০০৯

বাঙালির ঘরকুনো বদনাম ঘুচে গেছে এবং তারা এখন ছড়িয়ে পড়ছে দেশে-দেশে। বলাবাহুল্যই যে বিগত দুই দশকে বহু বাঙালি দেশান্তরে গেছেন প্রধানত জীবিকার প্রয়োজনে, তবে তারা দেশান্তরী হননি। অনাবাসী এবং প্রবাসীÑ যে অভিধাতেই তাদের সম্বোধন করি না কেন তা সম্মানজনক হবে না তাদের জন্যে। বরং বলতে পারি তারা সকলে স্বদেশের বাইরে অবস্থানকারী। কেউ সাময়িক, কেউ বা দীর্ঘস্থায়ী পরবাস-যাপনকারী। তবে দেশের বাইরে অবস্থান করা আর ভ্রমণের জন্যে দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো পৃথক দুটি ব্যাপার। ওই দুই ধরনের ব্যক্তির কাহিনীকে কিছুতেই ভ্রমণকাহিনী টাইটেলে চিহ্নিত করা যাবে না। লেখক এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত নন এমন দুই শ্রেণীর ব্যক্তি ভ্রমণকাহিনীও লিখে চলেছেন। তবে সাহিত্যিকের কলমে লেখা ভ্রমণকাহিনী সাহিত্যগুণসম্পন্ন হয়ে ওঠে। এই বিচারবোধ থেকেই প্রচলিত হয়েছে ‘ভ্রমণসাহিত্য’ কথাটি। বলতেই পারি, সকল ভ্রমণসাহিত্যই ভ্রমণ কাহিনী, কিন্তু সকল ভ্রমণ কাহিনীই ভ্রমণসাহিত্য নয়। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মিলিত হতে বা নিছক বেড়াতে বহু পর্যটকই বিদেশে যান। তাদের অনেকেই সেইসব স্মৃতি শুধু ক্যামেরাবন্দি নয়, শব্দবন্দি করায় আগ্রহ দেখাচ্ছেন। ভ্রমণকাহিনী লেখার ধরাবাঁধা ছক বা নির্দিষ্ট কলাকৌশল নেই; যেমন আছে গল্প-কবিতার। ভ্রমণকাহিনী তখনই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে যখন লেখকের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকও নতুন নতুন সৌন্দর্য আবিষ্কার করেন, মুখোমুখি হন নতুন অভিজ্ঞতার। লেখক কোনো কিছুর সন্ধানে ভ্রমণ শুরু করলে তার অনাড়ষ্ট বিবরণ পাঠকের জন্যে রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে।
ভ্রমণকাহিনী হতে পারে নানা রকম। অনেকে কেবল দর্শনীয় স্থানসমূহে পর্যটনের খতিয়ান দেন, ভিসাপ্রাপ্তি, টিকেট কাটার কসরৎ, বিমানবন্দরের বিড়ম্বনা কোনোটাই বাদ থাকে না। আবার কারো লেখায় মেলে গবেষণালব্ধ তথ্য, বিবরণ, বিশ্লেষণ। বিশেষত মিউজিয়াম বা বিদেশে শিল্পপ্রদর্শনীর ওপর আলোকপাত। শেষোক্ত জাতের ভ্রমণকাহিনী বিনোদনমূলক নয়, তাই সকল শ্রেণীর পাঠক আগ্রহ বোধ করেন না। তা না করুন, অজানাকে জানার জন্যে এই গোত্রের ভ্রমণকাহিনী মূল্যবান।
বর্তমান প্রজন্মের ভ্রমণ-লেখকদের মধ্যে সক্রিয়তার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন এমন অন্তত তিনজনের নাম বললে এসে যাবেন শাকুর মজিদ। গত কয়েক বছর যাবত নিয়মিতভাবেই তাঁর এক বা একাধিক ভ্রমণবৃত্তান্ত বেরুচ্ছে। এবছর বেরিয়েছে চার-চারটি ভ্রমণগ্রন্থ। এখানে আমরা নির্বাচিত একটি বই নিয়ে আলোচনা করবো। বইয়ের নাম ‘সক্রেটিসের বাড়ি’ হলেও এ গ্রন্থে কেবল জগদ্বিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিসের স্বভূমি এথেন্স ভ্রমণের বিবরণ দেয়া হয়নি। লেখক ইউরোপের আরো দুটি গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক নগরী বার্লিন ও প্যারিস ভ্রমণের ইতিবৃত্তও উপস্থিত করেছেন। তাই এই বইটিকে বলতে পারি থ্রি ইন ওয়ান। এই পৃথক তিনটে রচনা হলো : ১. বার্লিন : ভাঙা দেয়ালের খোঁজে, ২. এথেন্স : সক্রেটিসের বাড়ি এবং ৩. নেপোলিয়ানের শহর। এইসব শিরোনাম থেকে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় ভ্রমণপ্রিয় লেখক শাকুর মজিদ তাঁর রচনায় কোন্ বিষয়টির ওপর অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। বা এভাবেও বলা চলে যে লেখক কিসের টানে ইউরোপের ওই তিনটে শহরে ছুটে গেছেন।
প্রথমেই বলে নেয়া ভালো যে, লেখক পেশায় একজন স্থপতি; আর নেশায় নাট্যকার, আলোকচিত্রী ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা। অধুনা নানা ধরনের লেখালেখিতেও সম্পৃক্ত। তাই তিনি লেখকও বটে। স্থপতি হওয়ার কারণেই বোধ করি স্থাপত্য বিষয়টি তাঁর কাছে যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। একজন স্থপতি একটি স্থাপনাকে অন্যভাবে অবলোকন ও বিশ্লেষণ করেন। এক্ষেত্রে নিজের মত প্রকাশেও তিনি দ্বিধাহীন। বহু মানুষের কাছে বিশেষ দর্শনীয় আইফেল টাওয়ার লেখকের দৃষ্টিতে নিতান্তই ‘ইস্পাতের সাদামাটা খাম্বার সমাহার’। তাঁর ভাষায়Ñ ‘হুড়মুড় করে এসে এটা দেখার কী আছে?’ অন্যদিকে লেখক নিজে ক্যামেরার পেছনে কাজ করেন বলে লেন্সের ভেতর দিয়ে খোঁজেন শিল্পের অস্তিত্ব। স্বাভাবিকভাবেই প্রকৃতির তারতম্য ও আলোছায়ার বৈশিষ্ট সম্পর্কে তিনি সতর্ক। এই বিষয়গুলো যখন একজন ভ্রমণকাহিনী লেখকের নেপথ্যে ক্রিয়াশীল থাকে তখন সহজেই অনুমান করা যায় যে তাঁর কথিত আলেখ্য একটু অন্যরকমই হবে। তবে মজা করে বলার গুণ একজন লেখককে আর দশজন থেকে আলাদা করে তোলে। আর সেই লেখায় যদি খানিকটা সাহিত্যরসের যোগান দেয়া সম্ভব হয় তাহলে তো সোনায় সোহাগা। বলতে দ্বিধা নেই শাকুর মজিদ সবদিক দিয়েই পাঠকের কাছে নিজেকে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছেন। তিনি কেমন ধরনের পর্যটক তার পরিচয় তিনি উপস্থিত করেন ভ্রমণকাহিনীর একেবারে সূচনাতেই। তিনি লিখছেন : ‘বিশাল বিশাল ভবন। আক্ষরিক অর্থেই চোখ ধাঁধানো। আমার ক্যামেরা চঞ্চল হয়ে যায়। হাঁটতে হাঁটতে আমি প্রায়ই সঙ্গীদের থেকে আলাদা হয়ে যাই। আমার বুকপকেটে নোটবুক, বাম কাঁধে স্টিল ক্যামেরা, ডান কাঁধে সাড়ে ছয় কেজি ওজনের ক্যানন এক্স-এল-এস মিনি ডিভি ক্যাম, পিঠের সাথে ঝোলানো ছোট একটা ট্রাইপয়েড। বিল্ডিংয়ের আয়নায় নিজের চেহারা দেখে নিজেই লজ্জা পাই। কিন্তু এরকম আয়োজন ছাড়া আমার পক্ষে কোথাও বেড়াতে যাওয়া কি সম্ভব?’
চিলিতে স্থাপত্য বিষয়ক একটি সেমিনারে যোগদানের জন্যেই লেখকের পাঁচ বন্ধুর (তাঁর ভাষায় পঞ্চপর্যটক বা পিপি) ইউরোপযাত্রা। তবে লেখক তাতে শর্ত জুড়ে দেন যে, গ্রিসের এথেন্সে ‘সক্রেটিসের বাড়ি’ আর প্যারিসের লুভ যাদুঘরে রাখা মোনালিসার ছবি দেখানোর প্রতিশ্র“তি দিলেই তিনি তাঁদের সফরসঙ্গী হতে পারেন। বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে বার্লিনের দেয়ালের কাছে নতুন কিছু স্থাপনাই কেবল নয়, ব্রান্ডেনবার্গ গেট, রাইসটেগ এবং জুডিশ মিউজিয়াম সরেজমিন দর্শনের বিবরণ আছে। একেকটি স্থাপনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একেকটি ইতিহাস। সেসব ইতিহাসের মোদ্দা কথাগুলো প্রাসঙ্গিকভাবে বলে যান লেখক। এই বয়ান প্রাঞ্জল হওয়ায় পাঠকের মর্মমূলে প্রবেশ করতে সক্ষম সেই প্রাচীন কথামালা। শব্দ দিয়ে ছবি আঁকার কাজ করে থাকেন সকল লেখকই। শাকুর মজিদও সেটা করেন, আবার একইসঙ্গে প্রাসঙ্গিক আলোকচিত্রটিও, বিবরণের পাশে তুলে ধরেন। ফলে পাঠকের জন্যে এক আকর্ষণীয় শিক্ষণ হয়ে ওঠে প্রক্রিয়াটি। রচনায় অতীতের কথকতা এবং বর্তমানের রূপাখ্যানÑ এ দুটো বিষয়ের মেলবন্ধন ঘটান লেখক সচেতনভাবেই। সে কারণেই তাঁর ভ্রমণকাহিনী বিশেষত্বের দাবীদার।
‘গ্রিক অ্যাগোরার মানচিত্র আঁকা বড় কঠিন ছিল আমাদের পরীক্ষার খাতায়। অনেকগুলো এলিমেন্ট। সবগুলো আবার স্কেলে ঠিক হতো না। জায়গাটিও বড় অবিন্যস্ত। কিন্তু এই অ্যাগোরা এখন পায়ের তলায়!’ আড়াই হাজার বছর আগের সক্রেটিসের বক্তৃতাকেন্দ্র সম্পর্কে লেখা পরিচ্ছেদের শুরু হচ্ছে এভাবেই। ফলে সাধারণ পাঠকের পক্ষে বেশ সহজেই বর্ণিত বিষয়ের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হওয়ার অবকাশ তৈরি হয়েছে। একটি ব্যাপার বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে একটি নির্দিষ্ট স্থান কিংবা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে যখন আলোকপাত করা হচ্ছে তখন লেখক সচেতনভাবেই মূল বিষয়টির সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু সাধারণ জিজ্ঞাসার জবাব কথাচ্ছলে প্রকাশ করছেন। তথ্য পরিবেশিত হচ্ছে এমন সহজিয়া ভঙ্গিতে যে, পাঠকের পক্ষে সেই জ্ঞানার্জন শ্রমসাধ্য না হয়ে আনন্দপূর্ণ হয়ে উঠছে। একজন ভ্রমণলেখকের জন্যে এই গুণটি অত্যাবশ্যক।
আরেকটি বিষয়েরও উলে­খ করা দরকার। সেটি হলো উপশিরোনাম ব্যবহার করে অল্প কয়েক পৃষ্ঠায় ভ্রমণবৃত্তান্ত তুলে ধরা। এভাবে ছোট ছোট একটি অধ্যায় জোড়া লাগিয়ে মালা গাঁথলে তবেই মেলে পূর্ণ অবয়ব। এটির সফল প্রয়োগ আমরা দেখবো গ্রন্থের ‘এথেন্স : সক্রেটিসের বাড়ি’ শীর্ষক পর্বে। একটি ভ্রমণকাহিনীর জন্য যতটুকু সংগত ও জরুরি ঠিক ততখানিই ডিটেইলে গেছেন লেখক। এমনকি লেখক সংশ্লিষ্ট খ্যাতিমান ব্যক্তিদের প্রবচনতুল্য উক্তিও উৎকীর্ণ করেছেন বইয়ে। বুড়ি ছোঁয়ার মতো সময় বরাদ্দ ছিল তিন তিনটি মহানগরী পরিদর্শনের জন্য। অথচ সময়ের এই কড়াকড়ি সীমাবদ্ধতাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে উদ্যমী পাখির মতো সবটুকু ডানা মেলে দিয়ে উড়ে বেড়িয়েছেন লেখক শাকুর মজিদ। সেইসঙ্গে কেবল পাখির চোখে নয়, সৌন্দর্যপ্রেমী এক শিল্পীর দৃষ্টি দিয়ে অবলোকন করে গেছেন প্রধান-অপ্রধান অঞ্চলসমূহ। এথেন্সের এসেন্স (নির্যাস) যতটুকু পেরেছেন গ্রহণ করেছেন এবং পাঠকের সঙ্গে তার অর্জনটুকু ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। বাদ পড়েনি সমকালের গ্রীকবাসীর পরিচয়ও। যে-কারাগারে বসে সক্রেটিস হেমলক বিষ পান করে মৃত্যুকে বরণ করে নেন, সেই কারাগারটি চিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন যে-স্থানীয়জন তাঁর কাছে লেখক প্রশ্ন রাখেন যে, গ্রীক হিসেবে জন্ম গ্রহণ করে তাঁর অহঙ্কার হয় কিনা। উত্তরে সেই ব্যক্তি মিষ্টি হেসে যা বলেছিলেন তা যেন প্রতিটি নীতিবান সত্যিকারের মানুষেরই উপলব্ধি। তিনি বলেছিলেন, আমার অহঙ্কার করার তো কিছু নাই। আমি পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তেই জন্মাতে পারতাম। তবে এই দেশে জন্মেছি বলে আমি গ্রীক এটা সত্যি, কিন্তু আমি কতটা মানুষ হতে পেরেছি সেটা আমার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আসলে সক্রেটিসের বাড়ি বলে সুনির্দিষ্ট কিছু নেই। পাহাড়ের ওপর গড়ে ওঠা সুদৃশ্য নয়নাভিরাম স্থাপনার সমাহার অ্যাক্রোপলিসকেই অনেকে মহান দার্শনিকের বাসভূমি বলে মনে করে থাকেন। লেখক এই প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনাবলী সম্পর্কে বিশদ আলোকপাত করেছেন। সক্রেটিসের অন্তিম দিনগুলো যে গারদখানায় কেটেছে তার চেহারাও মূর্ত করে তুলেছেন।
বইয়ের তৃতীয় ও শেষ অধ্যায় ‘নেপোলিয়ানের শহর’ অংশটুকু অপেক্ষাকৃত স্বল্পদৈর্ঘের। আইফেল টাওয়ারের প্রসঙ্গ আগেই এসেছে আলোচনায়। এই পর্বে আরো আছে লুভ মিউজিয়াম ও নেপোলিয়ানের সমাধি পরিদর্শনের বৃত্তান্ত। যথারীতি স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের বিবরণ এবং ঐতিহাসিক চরিত্রের চিত্রণ ও ইতিহাস বর্ণনা স্থান পেয়েছে। এতে কোনো সংশয় নেই যে ভ্রমণ-আখ্যান রচনায় পারঙ্গমতার পরিচয় রেখেছেন লেখক। বেড়ানোর ছলে স্থাপত্য ও ইতিহাসপাঠের উপভোগ্য দৃষ্টান্ত হয়েছে এ ভ্রমণ-গ্রন্থ। সমালোচনার জায়গাটি হলো ছবি ব্যবহারে পরিমিতির বিষয়টি। অনেক ছবি দেখেই পাঠকের মনে হতে পারে এর কী প্রয়োজন ছিল? এতে পৃষ্ঠা বেড়েছে বটে তবে পৃষ্ঠা সংখ্যা না বাড়িয়ে ক্রয়মূল্য কমালেই পাঠকরা বেশি উপকৃত হতেন।

সক্রেটিসের বাড়ি \ শাকুর মজিদ \ প্রকাশক : অন্যপ্রকাশ \ প্রকাশ : ফেব্র“য়ারি ২০০৯ \ প্রচ্ছদ : মাসুম রহমান \ মূল্য ১৬০ টাকা

৫/১৫/২০০৯

কালি ও কলম-এ প্রকাশিত

Leave a Comment