পাবলো নেরুদার দেশে- খালেদ হোসাইন

‘পাবলো নেরুদার দেশে’ শাকুর মজিদ

খালেদ হোসাইন

Pablo Nerudar Deshe
প্রকাশক- অবসর, প্রচ্ছদ- শাকুর মজিদ, প্রথম প্রকাশ -২০০৯

ভ্রমণ যিনি করেন, অনেক আনন্দ তিনি পান, অনেক দুঃখ-কষ্টও তাঁকে সইতে হয়, অনেক ধকল, অনেক অনিশ্চয়তা। ভ্রমণকাহিনির পাঠক পান মূলত আনন্দটাই। এমন-কি দুঃখ-কষ্টের যে-বিবরণের মধ্য দিয়ে পাঠক যান, তা তাঁকে যথেষ্ট সহানুভূতিপ্রবণ করে তোলে হয়তো-বা, বেদনার্তও তিনি হন, কিন্তু ব্রাজিলের সাও পাওলো বিমান-বন্দরে শাকুর মজিদ ও তাঁর বন্ধুদের মনে আকস্মিক আশা ও নির্মম নিরাশা যে-দোলাচল সৃষ্টি করেছে, তার সমুদয় সংবেদনা কি হুবহু পাঠকচিত্তে সঞ্চারিত করা সম্ভব? ‘পাবলো নেরুদার দেশে’ না পড়লে আমি তা অসম্ভই ভাবতাম। কিন্তু শাকুর পেরেছেন। ‘সাওপাওলোর সেই রাত’ শিরোনামের ছোট্ট একটি অধ্যায় অদ্ভুত এক সামর্থ্যে বিচিত্র ও বিপরীতমুখি অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দেয় মনে, ছড়িয়ে পড়ে তা শরীরেও, কখনো মেরুদণ্ড দিয়ে হিম-শীতল একটা শিহরণ বয়ে যায়, কখনো রুদ্ধশ্বাসে দম বন্ধ হয়ে আসে। চারপাশকে সূ²াতিসূ²ভাবে দেখার ও তা রূপায়নের এই দক্ষতাই শাকুরকে বিশেষ করে তোলে। যে-কোনো পাঠক লক্ষ করবেন শাকুরের বর্ণনা প্রাণবন্ত ও চিত্রময়। বিভিন্ন শিল্প-মাধ্যমে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর পথটাকে প্রশস্ত করে তুলেছে। স্থিরচিত্রশিল্পী হিসেবে তিনি তাঁর ফোকাসিং পয়েন্টটকে চটজলদি ঠিক করে নিতে পারেন। ঘটনার নাটকীয়তা তাঁকে আকর্ষণ করে একজন নাট্যকার হিসেবে। আর চিত্রনাট্য-রচনার দক্ষতা তিনি প্রয়োগ করেন ডিটেল উপস্থাপনের ক্ষেত্রে।

শাকুরের ভাষা স্বতোচ্ছল- থামতে চায় না, যেন সমুদ্রমোহনার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে আসা নদীÑ চারপাশকে সজল-সুন্দর-সফল করে সে এগিয়ে যায়। গন্তব্য তার স্থির, পথ তার অনির্ণিত। এই অনিশ্চয়তার বোধই পাঠকের স্নায়ুতন্ত্র টান টান করে রাখে। রহস্যোপন্যাসের মতোই ঘটনার শেষটুকু জানার ইচ্ছে পাঠকের মনে তীব্র হয়ে ওঠে। আরেকটি বিশেষত্ব শাকুরেরÑ নিজেকে তিনি যতটা সম্ভব অনুক্ত ও অদৃশ্য করে ফেলেন, অন্যের প্রাপ্য সম্মান যথোচিতভাবে দিতে চান। নিজের অসহায়ত্ব ও অজ্ঞতাকেও প্রকাশ করতে তাঁর দ্বিধা নেই। আর তাঁর রচনার প্রধান দিক, ইতিহাসের বিশালায়তন পটভূমি বা প্রকৃতির দিগন্তপ্রসারেও শাকুরের প্রধান বিবেচনা মানুষ, বিশেষভাবে সাধারণ মানুষ। তারাই তাঁর লক্ষ। মানবিক বিবেচনা ও মনুষ্যত্বের প্রতিই তাঁর পক্ষপাত। তাঁর ভ্রমণ-বৃত্তান্তে তাই উঠে আসে অনেক মুখ, মুখের মিছিল যেন। কিন্তু ভিড়ের মতো নির্বিশেষ নয়। ছোট্ট পরিসরে দেখা দিয়ে একেকটি মানুষ এককটি চরিত্র হয়ে ওঠে। ভোলা যায় না তাদের, যেমন স্মৃতিতে স্থায়ী জায়গা করে নয়ে সাওপাওলো বিমান বন্দরের ‘শুকনা-শাকনা বাচ্চা বয়সী এক্সিকিউটিভ’ ক্রিস্টোফার। বা, সান্তিয়াগোর সেই দোভাষী গাইড এঞ্জেলিকা, যে কুমারী মা তার বোনের চাকুরি বাঁচাতে একদিনের জন্যে নিজেক নিয়োজিত করেছে এ পেশায়। যেন সে মহাকাব্যিক কোনো উপন্যাসের নায়িকা। ছোট্ট পরিসরে, কয়েকটি রেখায় আঁকা হলেও, জীবনের জটিলতা ও মাধুর্য নিয়ে অবিস্মরণীয় হয়েই থাকে সে পাঠক-মনে। এ যে চিরন্তন, সার্বভৌম ও সর্বজনীন এক অনুভূতির ঘনীভূত রূপ। শাকুরের সহ-পর্যটকেরা এককটি চরিত্রে পরিণত।

‘প্লেন টু সান্তিয়াগো’ নামের পরের অধ্যায়ে শাদা চামড়ার এয়ার হোস্টেসদের আচরণের প্রতিবাদ আছে, অনেকটা নিঃশব্দ কিন্তু কার্যকর, যা প্যারাগুয়ের প্রায় প্রতিবছর বিশ্বসুন্দরীর খেতাব-নেয়া এয়ার হোস্টেসদের আচরণ আমূল পাল্টে দেয়। তখন তাদের হাসি আর পেশাগত বা মাংসপেশীগত মনে হয় না, মনে হয় আন্তরিক। শাকুর জানান, ‘কিন্তু তাতে কী? বিমানের এয়ার হোস্টেসদের স্বচ্ছন্দ ব্যবহারের মুগ্ধতাকে বহুগুণে অতিক্রম করে আমাদের আকৃষ্ট করে তার জানালা এবং তা থেকে দৃশ্যমান প্রকৃতির অপরূপ শোভা।’ এ বর্ণনায় মুগ্ধতার পরিচয় আছে, কিন্তু তার প্ররিপ্রেক্ষিত? পরের বাক্যে শাকুর জানান, ‘আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখি, প্রায় ১৩ কোটি বছর আগে ক্রিটিসিয়াস আমলে ভূমিকম্প এবং অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সৃষ্ট পৃথিবীর দীর্ঘতম পাহাড়ের সারি আন্দিজ পর্বতমালা।’ আরো অনেক দরকারি তথ্য আছে, কিন্তু মনটা ভরে যায় যখন তিনি জানান, ‘আন্দিজের পর্বতরেখা বরাবর তুষারের রূপকে হঠাৎ করে অর্গানিক ফর্মের কোনো শিল্পকর্ম বলে মনে হয়। প্রকৃতির নিজের নিয়মেই এখানে তৈরি হচ্ছে রং এবং ফর্মের নিজস্ব কাঠামো।’

প্রকৃতির সৌন্দর্যকে দেখার চোখ যেমন আছে, তেমনই ইতিহাসের ধূসর আড়াল সরিয়ে সত্যের মুখচ্ছবিটা বের করে আনার যোগ্যতাও। তাই সান্তিয়াগোর পথে হাঁটতে হাঁটতে বিশাল পাহাড়ের ওপর দুর্গ দেখে ইতিহাসের বৃত্তান্ত শোনান। চিলির পরাজয় ও পরাক্রমের গল্প। ‘চতুর্দশ শতাব্দীর শেষ দিকে পর্তুগিজ নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাসের ‘সফল’ অভিযান দিয়ে শুরু হয়েছিল ইউরোপীয় লুটরা বণিকদের উত্তর আমেরিকা দখল’। এ থেকে পরবর্তী ইতিহাসের প্রায় সমুদয় বাঁক। কিন্তু তা তথ্য-ভরাক্রান্ত নয়। প্রাসঙ্গিক, জরুরি ও উপভোগ্য মনে হয়। যেমন, পাহাড়-চূড়ার দুর্গ দেখে তিনি জানান, ‘জংবাজ রাজসিকরা নিজেদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই উঁচু পাহাড়ের উপরে তাদের আস্তানা বানানোকে অনেক বেশি নিরাপদ মনে করতেন। পাহাড়ের নিচে বসিয়ে রাখতেন দারোয়ান। উপর থেকে শত্র“দের সহজে প্রতিহতও করা যায়। এসব বিবেচনায় পাহাড়ের উপরটুকু হত তাদের অধিকতর নিরাপদ আশ্রয়। জোর করে যারা অন্যের জায়গা দখল নিয়ে নিজেই ভোগ করতে থাকে, তারা তাদের নিরাপত্তার জন্য সবসময়ই উদ্বিগ্ন থাকে। আর এজন্যই তাদের প্রয়োজন হয় অনেক শক্তিশালী দুর্গের।’ সাধারণ মানুষের প্রতি এই মমত্ববোধই শাকুরের লেখার প্রাণ।

রসবোধ না থাকলে পাঠকের মনে জায়গা করে নেয় কঠিন। আমাদের জীবন-যাপনে দুঃখ যেমন থাকে, আনন্দও থাকে তেমনই। শুধু তাকে চিনে নিতে হয়। শাকুরের ভ্রমণকাহিনিতে দেখা মেলে এমন চিত্রশিল্পীর যিনি টেগোরের ‘জিতানজলি’ নামে বই পড়েছেন। ছবি তুলতে গেলই যে ক্যামেরা সামনে তুলি পোঁচ দেয়ার ভঙ্গি করেন, নিজের ছবি আঁকাতে গিয়ে নিজের সঙ্গে মোটেও মেলে না এমন ছবির জন্যে তুলে দিতে হয় দশ ডলার। এমন-সব ঘটনা, পেছনে হয়তো বেদনাও লুকিয়ে থাকে, পাঠককে স্বস্তি দেয়, ট্র্যাজিডিতে যেমন ড্রামাটিক রিলিফ থাকে দুর্বিষহ যন্ত্রণাকে লাঘব করে দিতে, এখানেও দেখি ইতিহাসের বা নিজস্ব পরিপার্শ্বের দুঃখকষ্টের পরে এমন একটি ঘটনা বা চরিত্র হাজির হয়, যা হাস্যরস সৃষ্টি করে পরিবেশকে হালকা করে তোলে। সান্তিয়াগো শহরের পথে পথে দেখা মেলে বিচিত্র মানুষের। কেউ কমেডিয়ান, কেউ-বা পরী, কেউ রোবট, কেউ যোদ্ধা বা বিশপ সেজে পথিক ও পর্যটকদের মনোরঞ্জনের চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাদের কাণ্ড-কারখানা দেখে লোকজন হাসে, কিন্তু শাকুর জানান, ‘এইসব বিনোদনের পেছনে নিজস্ব আয়রোজগারের ব্যাপারটিও আছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ তাদের দেখে পুলকিত হন। এই পুলকবোধের বিনিময়ে পকেটের খুচরো পয়সাগুলো পড়ে যায় তাদের সামনে রাখা ভিক্ষের বাটিতে।’ মজার এক ঘটনা ঘটেছে পাবলো নেরুদার বাড়ি লা সেবাসতিয়ান দেখার পরে প্রশান্ত মহাসাগরের মাছ দিয়ে দুপুরের খাবার সারার সময়। ‘আমাদের টেবিলে প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশ থেকে নানা রকম প্রাণী আর উদ্ভিদের মিশ্রণে তৈরি খাবার আসে। কিন্তু অনভ্যস্ত জিহŸা এসব দামি খাবারের স্বাদ নিতে পারে না। আমরা এ ওর মুখের দিকে তাকাই। আমাদের সাথে খেতে বসে এঞ্জেলিকা। তাকে দেখি গোগ্রাসে এই খাবার গিলছে আর রান্নার তারিফ করছে।’ এখানেই শেষ নয়, ‘ অবশ্য খুব যে সমস্যা হয়েছিল তা নয়। মূল খাবার আসার আগের অবসরটুকু কাটানোর জন্য আমাদের টেবিলে বেশকিছু ছোট ছোট বন টোস্ট আর বাটার দিয়েছিল। আমরা এক-আধটু খেয়েছিলাম। বেশি খাইনি চিলিয়ান অথেনটিক ফুড খাব বলে। কিন্তু এবার ক্ষুধা মেটানো জন্য সেই ফেলে রাখা ছোট ছোট বনরুটির ওপরই নির্ভর করতে হল।’ হাস্যরসাত্মক ঘটনার পেছনের মর্মান্তিক ঘটনাটি হল এর জন্যে বাংলাদেশি টাকায় এগারো হাজার টাকা বিল দিতে হয়েছে। এরকম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল পাবলো নেরুদার চাশকোনা নামের বাড়ির ভেতরের ছবি তোলার ক্ষেত্রে। ছবি তোলার ইচ্ছেকে জলাঞ্জলি দিতে হয়েছিল। নইলে যে এক ঘণ্টার জন্যে দিতে হত সাড়ে সাত হাজার মার্কিন ডলার। এখানেও হাসিকে ছাপিয়ে যায় ইচ্ছের মৃত্যু বা বঞ্চনার বেদনা।

প্রসঙ্গত, শাকুর মজিদের চিলি যাওয়ার ঘটনাটি অনেকটা আকস্মিক, বিচিত্র জীবন-প্রণালী ও কাব্যচৈতন্যের মাধ্যমে পাবলো নেরুদাই তাঁকে টেনেছেন মূলত। এ জন্যে দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হয়েছে তাঁকে। তাই পাবলো নেরুদার জীবন ও কর্মের, মর্মের ও নর্মের পূর্ণ চিত্রই পাওয়া যায় এখানে খুব সহজ-সরল ভাষায়। একজন জাত-পর্যটকের সব বৈশিষ্ট্যই শাকুরের মধ্যে লক্ষ করা যায়। তিনি জানেন, ‘দূরের অচেনা লোকালয়, অদেখা জনপদ কিন্তু সৌন্দর্যের ভাষাটুকু বুঝে ওঠার জন্য বিশেষ কোনো ভূগোল-জ্ঞানের প্রয়োজন হয় না; তেমনি চেনা আর না চেনার মাঝামাঝি যে কোনো সৌন্দর্যকে আমরা ভোগ করার চেষ্টা করি।’ নেরুদা নেই, নেরুদার বাড়ি আইলা নেগরা, লা চাশকোনা, লা সেবাসতিয়ান আছে, তাঁর প্রিয় হোটেল-রেস্তেরাঁ আছে। প্রাণ ভরে তাদের সান্নিধ্যই তিনি নেন, পাঠককে সঙ্গে নিয়ে। সঙ্গে নিয়ে, নাকি একাত্ম করে? মনে হয়, একাত্ম করেই।

শাকুর একজন স্থপতি। তাঁর লেখায় সে চিহ্ন ছড়িয়ে থাকে, ‘আমরা হাঁটাহাঁটি করতে থাকি। তাদের মানুষ দেখি, আর স্থাপত্যের ছাত্র হিসেবে তাদের দালানকোঠা দেখি। স্থাপত্যের সেমিনারের চেয়ে সান্তিয়াগো শহরের স্থাপত্য আমাকে অনেক বেশি আকর্ষণ করে।’ চিলির স্থাপত্যনিদর্শনের আদি-অন্ত বৈশিষ্ট্য যেমন তুলে ধরেছেন, তেমনি আলোচনা করেছেন শিক্ষাব্যবস্থার সূচনা-বিকাশ-প্রবণতা। অর্থাৎ একটি দেশের মন-মেজাজ, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও বর্তমান বাস্তবতার ব্যঞ্জনাময় প্রকাশ আমরা লক্ষ করি ‘পাবলো নেরুদার দেশে’। গ্রন্থের আলোকচিত্র বক্তব্যের সহায়ক-শক্তি হিসেবে কাজ করে।

পাবলো নেরুদার দেশে : শাকুর মজিদ, অবসর, ঢাকা, ২০০৯, মূল্য : ১০০ টাকা।

২৯/০৯/২০০৯

Leave a Comment