মহাজনের নাও- শফিক হাসান

মহাজনের নাও : নাটকে চিত্রিত শিল্পীজীবন

শফিক হাসান

Mohajoner Naw
প্রকাশক- উৎস প্রকাশন, প্রচ্ছদ- মাসুম রহমান, প্রকাশ-২০১১-

বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিম আমাদের শিল্পসংস্কৃতি ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। করিমের গানে মুগ্ধ হয়নি, ভাবসাগরে ডুব মারেনি এমন মানুষ নেই বললেই চলে। করিম যেমন প্রতিভার ঝিলিক দেখিয়েছেন তেমনি সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণির মিডিয়াও কার্পণ্য করেনি তাঁর প্রতিভার যোগ্য স্বীকৃতি দিতে। এ সাধক কবিকে নিয়ে প্রচুর কাজ হয়েছে, নানাজন নানাভাবে তাঁর কাজের মূল্যায়ণ করেছেন। করিমের সৃষ্টিকে মানুষের আরো কাছাকাছি নিয়ে আসার কাজটি করেছে গণমাধ্যম। এ বাউল কবির মূল্যায়নে প্রতিভাবান লেখক-নাট্যকার শাকুর মজিদও পিছিয়ে থাকেননি। করিমকে নিয়ে তার উল্লেখযোগ্য কাজ দুইটি-ভাটির পুরুষ ও মহাজনের নাও। করিমের ওপর দীর্ঘ ৭ বছর গবেষণা করে শাকুর মজিদ বানিয়েছেন প্রামাণ্যচিত্র-ভাটির পুরুষ। প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মিত হয়েছিলো করিমের জীবদ্দশায়। তাঁর দেহাবসানের পর লিখেছেন গীতিনাট্য মহাজনের নাও।

জীবিত করিম এবং লোকান্তরিত করিম-দুইভাবে শাকুর মজিদ ‘বন্দি’ করেছেন তাঁকে। মহাজনের নাও প্রকৃতপক্ষে একটি মঞ্চনাটক। নাটকটি সুবচন নাট্যসংসদ’র ৩৩তম প্রযোজনা। নির্দেশক সুদীপ চক্রবর্তী। গীতল নাট্য মঞ্চায়ন খুব বেশি হয়নি বাংলাদেশে। তার কারণ কাজটা যেমন দুরূহ তেমনি ঝক্কিরও। এই দুরূহতম কাজটিই সহজে সম্পন্ন করেছেন নাট্যকার। শাহ আবদুল করিমের বালকবেলা থেকে শুরু করে মৃত্যু পরবর্তী জানাজা পর্যন্ত আলোকপাত করা হয়েছে নাটকটিতে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এটা করিমের জীবনীভিত্তিক নাটক। নাটকে উঠে এসেছে করিম-জীবনের অনেকটাই। বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য অংশ। নাটকটি বই আকারে রূপ দিয়ে প্রশংসনীয় কাজ করেছে শেকড়সন্ধানী প্রকাশনা সংস্থা উৎস প্রকাশন। সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলে জন্মগ্রহণকারী করিম হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান। মাত্র ৮ বছর বয়সে তিনি জীবনের তাগিদে রাখালের চাকরি নেন। ভোরে গরু-মোষ নিয়ে চলে যেতেন মাঠে। দিনভর গরু চরিয়ে সন্ধ্যায় মনিবের বাড়ি ফিরতেন। রাতের খাবার সেরে গিয়ে বসতেন নসিব উল্লাহ’র ঘরে। লেখকের বর্ণনায় করিমের আত্মকথন- বাবার চাচা নসিব উল্লাহ আল্লাহর ফকির রাইতের পর রাইত কাটাই দিত করিয়া জিকির। এক ঘরেতে ফকির সাধু হিন্দু-মুসলমান লাউ বাজাইয়া গাইত তারা ভক্তিমূলক গান। করিমকে পেয়ে বসে গানের নেশা। দাদা নসিব উল্লাহ’র ঘরে প্রতি রাতে তাঁর আসা চাই-ই চাই। দাদাও তাঁকে স্নেহ করতেন, আদর করে বসাতেন পাশে। কিশোর করিমের মনে নানা প্রশ্ন, বিস্তর জিজ্ঞাসা। দাদার কাছ থেকে দেহতত্ত্ব, ধর্মতত্ত্ব ইত্যাদি বিষয়ে তালিম নেন। করিমের গ্রামের ইমাম কমরউদ্দিনের কাছ থেকে করিম শেখেন শরিয়ত, মারফতের বিষয়াদি। যে সব জিজ্ঞাসা ভর করে তাঁর মনে, সে সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে থাকেন। প্রশ্ন এবং উত্তর আত্মস্থ করেন…।

এভাবেই বেড়ে ওঠা উজানধল গ্রামের উজ্জ্বল কিশোর শাহ আবদুল করিমের। এক সময় নিজেই প্রবলভাবে ঝুঁকে পড়েন গানের দিকে। গানই হয়ে ওঠে তাঁর ধ্যানজ্ঞাননেশা। সদা গানে মশগুল তিনি। দিনে গান, রাতে গান; পৃথিবী গানময়। কিন্তু এই গান তাঁকে মানসিক শান্তি দিলেও সামাজিকভাবে স্বস্তি দেয় না।

ঈদের দিন নামাজ পড়তে গেলেন করিম। নামাজের জামাতে মোল্লা-মুরব্বিরা আপত্তি তুললেন করিমের ব্যাপারে। করিম ধর্মবিরোধী কাজ করে বেড়ায়। গানবাজনায় ব্যস্ত থাকে। তার কাজ বেশরা, বেদাতি। এ ধরনের শরিয়তবিরোধী কাজ আর করবে না বলে তওবা করলেই করিম জামাতে নামাজ পড়তে পারবে। সমবেত লোকের অনেকেই এবং ইমাম সাহেব স্বয়ং হেদায়েত দিতে থাকেন। কিন্তু করিমের এক কথা- আমি এখানে এসেছি নামাজ পড়িতে ইচ্ছা নয় মিছা কোনো কথা বলিতে ছাড়তে পারবো না আমি নিজে যখন জানি উপদেশ দিলে বলেন কেমনে তা মানি পরে করবো যাহা এখন বললাম, করবো না সভাতে এই মিথ্যা কথা আমি বলতে পারবো না। ফতোয়াবাজ মোল্লা এবং ‘ধার্মিক’ মুরব্বিদের হুমকিতে ভীত হয়ে করিম তাঁর বেড়ে ওঠার, ভালোবাসার উজানধল গ্রাম ছেড়ে রওনা দেন ভিন গাঁয়ের পথে। সঙ্গী একতারা, কণ্ঠে গান। গানচর্চা চলতে থাকে তাঁর। লেখা ও গাওয়া, গাওয়া ও লেখা। মাটির গন্ধমাখা সে গান ক্রমশ উঠে আসতে থাকে মানুষের মুখে মুখে। নাম-যশ উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে। কিন্তু দুঃসহ দারিদ্র্যতা কালো ছায়ার মতো লেপ্টে থাকে। এই পুরস্কার সেই পুরস্কার, স্বীকৃতি, সম্মাননায় ভরে যেতে থাকে ঘর। নিরন্ন সাধকের কাছে এসবের মূল্য আছে ঠিকই, কিন্তু কতটুকু? তবু করিম কণ্ঠে তুলে নেন গান। সচল থাকে গীত রচনা। তাঁর গানে একে একে উঠে আসে দেশের দুর্দশাচিত্র, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, বকধার্মিকদের আস্ফালন, সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি। এ গানযুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্তভাবে, একাত্মতা বোধ করে দেশের মানুষ। অনুরাগীরা তো আছেই। করিমের এই পথচলায় ধর্মের ধ্বজাধারী কাঠমোল্লারা পিছু লেপ্টে থাকে। পাশাপাশি সমাজের অজ্ঞ, সংকীর্ণমনা মানুষরা তো আছেই। করিমের দুই শিষ্য সুনন্দ গোসাই ও আকবর আলী।

সুনন্দ হিন্দু, আকবর মুসলিম ধর্মাবলম্বী। সুনন্দ করিমের শিষ্যত্ব গ্রহণ করার পর থেকে করিমের বাড়িতেই থাকে, খায়, ঘুমায়। এক পর্যায়ে মারা যায় সুনন্দ। সুনন্দের আত্মীয়রা ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করতে নারাজ। তাদের মতে, যে ছেলে মুসলমানের ঘরে থেকে, খেয়ে জাত খুইয়েছে তার আবার কীসের শেষকৃত্য? শেষ পর্যন্ত করিম অনন্যোপায় হয়ে সুনন্দকে তুলসীতলায় কবর দেন। সুনন্দ’র মৃত্যুর কিছুদিন পরেই মারা যায় আকবর। আকবরের জানাজা পড়াতে যথারীতি ইমাম সাহেব নারাজ। গ্রামবাসীকে সাক্ষী করে ইমাম সাহেবের মন্তব্য- ধলবাসী আপনারা সকলে শোনেন এ বাড়িতে খালি হয় গানবাজনা আল্লাহর নাম কেউ মুখে আনে না নামাজ রোজায় আমি দেখি নাই তারে এখন জানাজা পড়াই কী করে? এই অবস্থা অবশ্য শেষ পর্যন্ত থাকেনি। করিম ভুবনমোহিনী গান দিয়ে জয় করেছেন প্রতিকূল পরিবেশ। এক সময় যারা তার সাথে রূঢ আচরণ করেছে, তারাও পরবর্তীকালে নমনীয় হতে বাধ্য হয়েছে। তাই তো দেখা যায়, করিমের মৃত্যুর পর নামাজে জানাজা পড়ানোর প্রাক্কালে ইমাম সাহেব বলেন- ভাইসব, বলি আপনাদের অপেক্ষা করতে হবে কিছু সময়ের বর্ষায় মাঠঘাট ভরে একাকার সবাইকে ধরবে না নামাজে কাতার একবারে উঠানেতে পড়া নয় সোজা দুইবারে হবে তার নামাজে জানাজা। এভাবে করিম নিজেকে উচ্চতর এক সম্মানের পদে আসীন করেছেন। যে গ্রামের মসজিদ থেকে একদা তিনি ‘বেদাতি’ কাজের জনক হিসেবে বিতাড়িত হয়েছিলেন সে গ্রামেই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাঁর সম্মান। যদিও তা জীবনের শেষ দিকে। আজীবন দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করা করিম ময়ূরপঙক্ষী নাওয়ে পাড়ি দিয়েছেন দূর অজানায়; তাঁর আরাধ্য দয়াল মুর্শিদের উদ্দেশ্যে। ‘ভাটির পুরুষ’কে নিয়ে লেখা এ নাটক রচনায় শাকুর মজিদ অসামান্য মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। পয়ার ছন্দে রচিত এই গীতল নাট্য বাংলা সাহিত্যে অভিনব এক সংযোজন। শুধু নতুনত্ব তথা ভিন্ন আঙ্গিকের জন্যই নয়, সহজ ছন্দে ঈর্ষণীয় ভঙ্গিতে অনেক কঠিন কথা, জটিল বিষয়কে সহজ ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন তিনি। তবে বইটিতে কিছু অসঙ্গতি রয়ে গেছে। ক্রেডিট লাইনে প্রচ্ছদশিল্পীর নাম ছাপা হয়েছে মাসুম রহমান কিন্তু শেষ প্রচ্ছদে শিল্পী হিসেবে দেখা যায় শাকুর মজিদকে। বইয়ের প্রথম ফ্ল্যাপে রয়েছে করিম সম্পর্কে পরিচিতমূলক কিছু কথা; এই একই লেখা সারসংক্ষেপ শিরোনামে ছাপা হয়েছে ১১ পৃষ্ঠায়। বইটির খারাপ লাগার মতো আরেকটি দিক, বানান ভুল-যা উৎস প্রকাশনের মতো প্রতিনিধিত্বশীল প্রকাশনার ক্ষেত্রে বেমানান। এসব অসঙ্গতি, ভুলভ্রান্তি বইটির মান ক্ষুণ্ন করেছে। তবে নাট্যজন মামুনুর রশীদের করিমনামার আধুনিক গীতল বর্ণাঢ্য প্রযোজনা শীর্ষক ভূমিকাটি প্রশংসার দাবিদার। লেখাটিতে এ বিদগ্ধ নাট্যব্যক্তিত্ব যুগপৎভাবে বাউল করিম ও লেখক-নির্মাতা শাকুরের প্রতিভার নির্মোহ মূল্যায়ন করেছেন।
২০১০

Leave a Comment