ক্যাডেট কলেজের এক স্বপ্নবাজ অধ্যক্ষের কথা

বীজ বোনার সূচনাপর্ব

২০১৪ সালের ২৩ জানুয়ারিতে একটা অনুষ্ঠানের জন্য গিয়েছিলাম আমার কৈশোর খোয়ানো আবাসিক বিদ্যাপিট ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে।  সন্ধ্যায় ছিলো ‘ফৌজিয়ান আইকন’ এর অনুষ্ঠান। দুই দফায় ক্যাডেটদের সাথে কথা বলা আর একসাথে বড় একটা সিরিমনিয়াল ডিনার খাওয়া- এই ছিলো আয়োজন। এ উপলক্ষে বিকেল বেলা পৌছে গিয়ে প্রথমেই দেখা করি প্রিন্সিপালের সাথে।তাঁর সাথে আমার ইমেইল চালাচালি হচ্ছে প্রায় দুইমাস ধরে, কিন্তু এই প্রথম দেখা।

ক্যাম্পাসে ঘুরতে ঘুরতে কলেজ অধ্যক্ষের স্বপ্নের কথা শোনা । ২৩ জানুয়ারি ২০১৪

প্রিন্সিপ্যালের নাম লেঃকর্নেল এম রেজাউল হাসান। এই প্রিন্সিপ্যালও এই কলেজের প্রাক্তন ক্যাডেট, প্রথম কোনো ক্যাডেট যে এই কলেজ থেকে পাশ করে এই কলেজের অধ্যক্ষ হলো। যে বছর (১৯৮৪ সালে) আমরা কলেজের পাঠ সেরে যাই, সে বছরই তার শুরু । আমাদের ৬ বছর পর খুব ভালো রেজাল্ট করেও সে যোগ দেয় সেনাবাহিনীতে। আমাদের সময় বোর্ড স্ট্যান্ড করা ছেলেরা খুব বেশী কেউ আর্মিতে যেতো না। এ প্রেক্ষিত বদলে যায় সেনাবাহিনীর লোকেরা যখন ক্ষমতায় এসে যায় এবং জনপ্রশাসনেও সেনাবাহিনীর অফিসারদের অধিকার দেয়া হয়। সে সময় থেকেই বেশী মেধাবীদেরকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশের পর বিএমএমুখী হতে দেখা যায়। রেজা তাদেরই একজন। দীর্ঘ ২৪ বছরে সামরিক বাহীনীর কার্যকলাপে যথেষ্ট পারঙ্গমতা দেখানোর কারনে তার নিজের কৈশোর কাটানো ক্যাডেট কলেজটিতেই তার নিয়োগ হয়, কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে। 

‘ফৌজিয়ান আইকন’ অনুষ্ঠানের পরদিন  অধ্যক্ষের  বাসভবনে আমার দাওয়াত পড়ে। এ বাসভবনটার দিকে তাকালে এখনো আমার বুকটা ধক করে উঠে, যেমন উঠে আমার গ্রামের স্কুলের হেডস্যারের রুমের দিকে তাকালে। আমি ৩০ বছর আগে ফেলে যাওয়া এ ভবনটিকে বাইরে থেকে দেখি। সেই ভোগেন ভিলা, সেই গাছ, সেই গেট, দারোয়ান, মালি, বাগান সেই একতালা ঘর । বাড়ির ভেতরটা আমাদের দেখা হয়নি ৩০ বছর আগে যখন এখানে ছিলাম। অথচ এখন গেট দিয়ে ঢুকে হুট করে ভেতরে ঢুকে যাই বুকের মধ্যে অসীম এক কৃত্রিম সাহস নিয়ে। আমার সাহসের কারন এই প্রিন্সিপ্যাল , সে আমার ৬ বছরের জুনিওর ক্যাডেট, আর আমি তার কাছে আজ অনেক বড়ো এক অতিথি। কোনো কারন ছাড়াই আমাকে আলগা অনেক খাতির করে সে, ডেকে এনে সম্মাননা দেয়। আমার সঙ্গী আছেন আমার স্ত্রী আর পুত্র। তাদেরকে বাসার ভেতর ঢুকিয়ে আমি তন্ময় হয়ে বাইরের পুরো চত্বরটা ঘুরে দেখি । আমার সঙ্গে সঙ্গে রেজাও।
রেজা আমাকে বাগান দেখায়, কবুতরের খাঁচা, রাজহাঁসের খোপ দেখায়।

একসময় আগের প্রিন্সিপ্যালরা কেউ কেউ হরিণ পালতেন, সেটাও শুনি। হাঁটতে হাঁটতে চলে আসি শেষ মাথায় । পাশেই সবজি ক্ষেত, একটু দূরের ধানক্ষেত আর পাহাড় ।

রেজা বলে, শাকুর ভাই, আমি ঐ পাহাড়ের তলায় একটা বোট ক্লাব বানাতে চাই, হাও ইজ দা আইডিয়া?

আমি বলি, কেমনে?

ও দিকে পাহাড় কয়েকটা আছে, আমরা এক সময় বেয়ে বেয়ে উপরে উঠতাম। ক্যাডেট কলেজের ৬ বছরের জীবনে ৪ বার এ পাহাড় ডিঙ্গিয়েছি। ক্লাস নাইন থেকে টুয়েলভ ক্লাস পর্যন্ত, বছরে একবার ক্রস কান্ট্রি রেসের সময়। জুনিওর ক্লাসে থাকার সময় এ পাহাড়টি আমাদের মাফ করে দেয়া হতো।
রেজা বলে, ওই পাহাড়ের উপর হবে কটেজ, আর নীচের জায়গাটা লেক, বোট ক্লাব রিসোর্ট। চলেন দেখাই আপনাকে জায়গাটা।

প্রিন্সিপ্যালের বাংলো থেকে বেরিয়ে হাজির হই আমাদের ক্রস কান্ট্রির সময় পার হওয়া সেই আউট অব বাউন্ড অঞ্চলে

আমাদের চা পান শেষ হয়ে যায় দ্রুত। আমার সঙ্গে আমার স্ত্রী, রেজার সঙ্গে তার ডাক্তার স্ত্রী আশা এবং স্ত্রীর ওপর ডাক্তার বান্ধবী। সবাই মিলে বেরিয়ে যাই প্রিন্সিপ্যালের বাংলো থেকে এবং হেঁটে হেঁটে গিয়ে হাজির হই আমাদের ক্রস কান্ট্রির সময় পার হওয়া সেই আউট অব বাউন্ডারি অঞ্চলে।

ক্রস-কান্ট্রি রেসের সময় কেবল এ জায়গা দিয়ে বছরে একবার দৌড়ে যেতামকতদিন পরে এলাম এখানে?

৩০ বছরইতো হবে। কিন্তু সেসময় এ জায়গাটি দেখার মতো মুড থাকতো না। তিনটা পাহাড় মাড়ানোর পর দৌড়াতে দৌড়াতে হাপাতে হাপাতে তখন শুধু সামনের দিকে চাওয়াই ছিলো সার। পেছন থেকে কে এসে সামনে চলে যাচ্ছে, সেই চিন্তা। ইন্টার হাউজ কম্পিটিশন। আমার হাউজের রঙ লাল। লাল গেঞ্জি পরা কাউকে পেলে তার সাহায্য নিচ্ছি, কেউ আমাকে টানছে, আমি কাউকে। এই ছিলো অবস্থা।

এই পাহাড়্গুলোকে বড়ো যন্ত্রণার মনে হতো সে সময়। এটা সহ আরো দুইটা পাহাড় মাড়িয়ে ৫ কিলোমিটার (না মাইল?) দৌড় শেষ হতো আমাদের।

আজ আমার দৌড়া দৌড়ীর কারবার নাই। এসেছি এক স্বপ্নবাজ তরুনের স্বপ্নবীজ ফলানোর ক্ষেত্র দেখতে। মাত্র ৪ মাস হলো পোস্টিং হয়েছে কলেজে। এর মধ্যে আমাদের গ্রুপ মেইলে তার চিঠি দেখেছি একটা। কলেজের নানা রকম সংস্কার কাজ করাতে চায়। সে লিস্টে অবশ্য এ বোট ক্লাবটার কথা ছিলো না। আজ এটা তার কাছ থেকে আমার নতুন শোনা।
রেজা বলে- কলেজ কম্পাউন্ডের বাইরে, প্রিন্সিপ্যালের বাংলোর দক্ষীন পাশ দিয়ে একটা রাস্তা আছে, সেই রাস্তা দিয়ে এন্ট্রি হবে এখানে। বাইরে থেকে যারা ঢুকবে তারা কলেজের শৃঙ্খলার জন্য কোনো হুমকির কিছু হবে না। এই যে সামনে যে জায়গাটিতে ক্ষেত দেখছেন, এখানে ফসল ফলেনা তেমন। এখানে হবে একটা লেক, আর ওইযে রবীন্দ্র হাউজের পেছনের পাহাড়, ওর উপরে থাকবে ৩ টা কটেজ এবং রিসোর্টের জন্য যা যা লাগে তা। পাবলিকের এন্ট্রি হবে পেছন দিকে। এখানে সারাদিন ধরে সময় কাটানোর সব আয়োজন থাকবে, আর এই লেকটা হবে নিরিবিলি সময় কাটা্নোর সবচেয়ে বড়ো জায়গা। নানা রকমের নৌকা থাকবে এখানে। যে ৪-৫টা পাহাড় আছে, এগুলোর কিনার বরাবর নৌকা চলবে। আর এখানে মাটি ভরে উচূ করে দেব। মনে হবে আরেক পাহাড়ের অংশ এটা। কলেজ এখান থেকে আয় করবে, এই আয়ের টাকায় ছাত্রদের নানা রকমের সুযোগ সুবিধা বাড়ানো হবে। যে জঙ্গলটা পড়েই আছে, সেখানেই হবে একটা রিসোর্ট। এই রিসোর্টের সবচেয়ে বড়ো সুবিধাটা পাবে এই কলেজের প্রাক্তন ছাত্ররা। তাঁরা যেকোনো সময় এসে থাকতে পারবে তাঁদের স্মৃতিমাখা ক্যাম্পাসে, খুবই সাশ্রয়ী মূল্যে। হবে না? কি বলেন আপনি? আসেন, উপরে একবার উঠে দেখেন, উপর থেকে একসাথে ক্যাম্পাস আর লেকটা কেমন দেখাবে একটু দেখেন ।

এ জায়গাটি ঠিক করা হলো লেক বানানোর জন্য। ছবিটি ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারি তোলা

আমার মেরুদণ্ডে সমস্যা। পাহাড় চড়া আমার সখের বিষয় আর নয়। আমি পুত্র ইবনের হাতে ক্যামেরা দিয়ে বলি- বাপরে, ওই পাহাড়ের উপর থেকে একটা ছবি তুলে আমাকে এনে দে।

ইবন পাহাড়ে উঠে, তার সঙ্গে সঙ্গে জলী, আশা আর তার বান্ধবী। আমি পাহাড়ের তলায় একটা গাছে হেলান দিয়ে বসে পড়ি।

বোট-ক্লাবের জায়গাটা দেখা হয় গাছতলায় বসে

গাছের গুড়িতে হেলান দিয়ে বসে থাকা সম্ভবত সামরিক শিষ্ঠাচারের বাইরে। আমার জন্য চেয়ারের আদেশ দেয়া হয় এবং দেখি ২ জন খাকীপরা আর্দালি আমার জন্য ব্যস্ত হয়ে যান। আমি তাদেরকে ঠাণ্ডা করি। বলি, আমি এখানেই বসবো, তুমি বরং তোমার জন্য চেয়ার আনাও।
হাসে রেজা এবং আমাকে কিঞ্চিত অবাক করে দিয়ে ডানে বামে তাকিয়ে, লোকগুলোকে সরিয়ে সে নিয়েও গাছের প্রসারিত আরেকটি মূলের উপর বসে পড়ে।
আমাদের কথা হয় অনেক বিষয়ে। রেজা বলে, এখানে এসে এক মুহূর্তের জন্যও তার মনে হচ্ছেনা যে চাকরিতে এসেছে, মনে হচ্ছে নিজের বাড়িতে ফিরেছে বহু বছর পর। কলেজ ছেড়েছে সে ২৪ বছর আগে। এই দুই যুগ সময়ের কোনো রিইউনিওনে আমি তাঁকে দেখিনি। আসেওনি সে। যখন এলো, একেবারে কলেজের সর্বাধিনায়ক হয়ে। ৩০০ জন ক্যাডেটের জন্য ১৮৫ একর জমির উপর বানানো ক্যাম্পাসের ১৮২ জন স্টাফ, তাদের সর্বোময় কর্তা হচ্ছেন কলেজের অধ্যক্ষ। তার কথা একটাই, এখানকার উপরিকাঠামোগত অনেক পরিবর্তন দরকার। সেই ১৯৫৮তে যা হয়েছিলো তার আর বেশী পরিবর্তন হয়নি। সেসময় এখানে যা ছিলো তা সেকালের জন্য সর্বাধুনিক ছিলো। বাড়িতে কারো যা ছিলোনা, কলেজে সেগুলো পেয়ে খুশী হয়েছিলো। অথচ এখন সবার বাড়িতে অনেক সুবিধা বেড়েছে, কলেজ আগের মতই আছে, আসলে পিছিয়েই আছে। সে শুরু করেছে প্রথমে টয়লেটের প্যান বদল করে কমোড বসিয়ে, তারপর এসেছে কম্পিউটার, লাইব্রেরীতে নতুন বই সংগ্রহ, ক্লাস রুমগুলোতে মাল্টি মিডিয়া অডিও ভিজুয়াল সংযোগ, এরপর হাত দেবে কলেজে নতুন একটা গেট বানানোর কাজে, সুইমিং পুলটা সংস্কার করে, কলেজ অডিটরিয়ামটা পুরো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ করে নতুন করে সাজানো, মুক্তিযুদ্ধে নিহত প্রাক্তন ক্যাডেটদের স্মরনে একটা স্মৃতি সৌধ বানানো, এসব কাজ সে করতে চায়।
আমি বলি, এ তো ম্যালা টাকার ব্যাপার, এতো টাকা কোথায় পাবা?
সে হিসাব নিয়ে বসে। ২৯০০ জন ক্যাডেট পাশ করে গেছে এখান থেকে এবং সবাই প্রতিষ্ঠিত। সবাইকে প্রতিষ্ঠা করতে এ কলেজ অনেক কিছু দিয়েছে। যে বিছানায় ৬ বছর ঘুমালো, যে চেয়ারে বসলো, যে টেবিলে লিখলো , এ তিনটা জিনিস এ বাজারে কিনতে গেলে হাজার দশেক টাকা লাগবে। সবাই যদি তার টেবিল-চেয়ার-খাটের দামটা দিতে পারে, তাহলে আপনি হিসাব করেন, টুয়েন্টি নাইন হানন্ড্রেড টাইমস টেন থাউজেন্ড, কত হয় ?
আমি বলি- ম্যালা টাকা, প্রায় ৩ কোটি।
রেজা বলে, আমার আরো সোর্স আছে, যাদেরকে এ কলেজ ব্যবসায়ী বানিয়েছে, তাদেরকে বলবো স্পন্সর করতে। আমরা কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম দেবো না, ব্যাচের নাম দেবো। সে হিসাবে আমি সবার কাছে লিখবো, অলরেডি প্রাইমারি চিঠি আমি দিয়েও দিয়েছি,অলরেডি আই হ্যাভ স্টারটেড ভাই, রেসপন্সও পাচ্ছি। আমি নিশ্চিত- হয়ে যাবে। আমি এখনো বাজেট করি নাই। আমাকে বলা হচ্ছে, বাজেট জানাতে। ব্যাচ ওয়াইজ কন্ট্রিবিউশন শুরু হয়ে গেছে। দেখবেন হয়ে যাবে, আই হ্যাভ কনফিডেন্স। দেখবেন দুবছরের মধ্যে আমি এখানে বোটক্লাব করেই ছাড়ব। আরো অনেক কিছু দেখবেন । আপনি শুধু আপনার পরামর্শটা দেবেন, এটাই আমার কাজে দেবে। আমি অলরেডি একজনকে ডিজাইন করতে দিয়েছি। আমার আড়াই কোটি টাকা বাজেট লাগবে, সে্টাও হয়ে যাবে, দেইখেন।
আমি হু হা করে কিছুক্ষন গাছের ছায়ার মধ্যে বসে থেকে উঠে গেলাম। আর পরদিন ফিরে গেলাম ঢাকায়। আমার আর এটার কথা মনেই থাকলো না।

ফৌজদারহাটের বৃটিশ কানেকশন

সেই কলেজ সফরের ঘটনার পর রেজার সাথে আমার যোগাযোগ বেড়ে যায়। মাঝে মাঝেই সে আমাকে ফোন করে বসে। আমি কলেজে যাওয়ার সময় আমার প্রকাশিত প্রায় সব বইয়ের এক সেট আর লেজার ভিশন থেকে বের হওয়া ‘ওয়ার্কস অব শাকুর মজিদ’ ডিভিডি সেট দিয়ে এসেছিলাম। আমার ধারনা ছিলো রেজা এগুলো সব পড়ে ফেলেছে, সব দেখে ফেলেছে। আমি ফোন পেয়ে জিজ্ঞেস করি – এটা পড়েছো ? এটা দেখেছো ?

সে উ- আ করে, দ্রুত জবাব শেষ করে। যে জবাব যেকোন প্রশ্নের উত্তরে দেয়া যায় । তারপর তাঁর আসল কথা, ভাই- কলেজে এটা করতে চাই, এটা আগে কেউ করে নাই। হাও ইজ দ্যা আইডিয়া?

আমিও তাঁর মতো করে জবাব দেই – এক্সেলেন্ট।

তারপর বলি, ঐ বইটা পড়েছো ?

সে ও জবাব দে, জ্বী ভাই, এক্সেলেন্ট লিখেছেন।

আর ঐ ডকু টা ?

সেটাও দুর্দান্ত ভাই।

আমাদের আলাপ এ রকম চলতেই থাকে।

একবার ফোন করে বলে সে ঢাকায় এসেছে।

আমি বলি- চলো, দেখা করি।

আমরা ক্যাডেট কলেজ ক্লাবে দেখা করি। আমাকে জানায়- সে গিয়েছিল বৃটিশ হাই কমিশনারের বাসায়। এডজুট্যান্ট জেনারেল মহোদয় নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁকে।

আমি শুনে একটু ভিরমি খেলাম। রেজা তো ঘাগু মাল! অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। এবার ডানা মেলছে বিলেত বরাবর !

এক সময় ক্যাডেট কলেজ বানানো হয়েছিলো বৃটিশ পাবলিক স্কুলের কারিমুলাম ঘেটে, সেই ১৮৬৮ সালের কারিকুলাম, শিস্টাচার । এবার কী তাঁদের সাথে কোন যোগসুত্র ঘটাচ্ছে? কোন এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম ?

রেজা বলে, আজ খুব সাধারন আলাপ হলো হাই কমিশনারের সাথে। আমি তাঁকে কলেজে দাওয়াত দিয়েছি। জানেন তো, কর্নেল ব্রাউন যখন প্রিন্সিপ্যাল ছিলেন, বৃটিশ হাই কমিশনাররা চট্টগ্রাম গেলে একবার ফৌজদারহাটে চা খেয়ে আসতেন। অনেক বছর কেউ যান না। দাওয়াত দিলাম, দেখি কিছু আগায় কী না ।

রেজা চলে যায় ফৌজদারহাটে। ২৪ জুন ২০১৪ তারিখে ফেইসবুকে দেখি ক্যাম্পাসে রেজা কতোগুলো সাদা চামড়ার লোকের সাথে। বুঝে ফেলি, ঘটনা কিছু একটা ঘটে গেছে। ফোন দেই রেজাকে।

২৪ জুন ২০১৪। বাংলাদেশ এ নিযুক্ত ব্রিটিশ হাই কমিশনার মিস্টার রবার্ট গিবসন, সিএমজি ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে পরিদর্শনে এসে সব কিছু দেখেন।

রেজা বলে – ভাই বৃটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন এসেছিলেন। সাথে উনার স্ত্রীও । আমি আর আশা ওঁদের ঘুরিয়ে দেখালাম। দে আর হাইলি কনভিন্সড । কিছু একটা হয়ে যাবে, দোয়া কইরেন।

কেনো যেনো মনে হচ্ছিলো কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। এমনিতে রেজা খুব সুন্দর ইংরেজি বলে, আর প্রেজেন্টেশনের সময় এমন সুন্দর করে কথা বলে, যে কোন জটিল কিছুও মনে হয় সহজ হয়ে গেছে। আমি কয়েক দিন পর তাঁকে ফোন দেই। জিজ্ঞেস করি – তোমার বৃটিশ ভেঞ্চারের খবর কী ?

রেজা বলে – ভাই, খবর খুবই ভালো। কয়েক দিন আগের ব্রিটিশ হাই কমিশনারের ভিজিট এর পর উনারা নীতিগত ভাবে রাজি হয়েছেন আমাদের সাথে এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম করার জন্য। তবে কি কি বিষয়ে এই প্রোগ্রাম হবে তার জন্য বিভিন্ন লেভেল এর প্রতিনিধি এসে যাচাই করে যাবে। প্রথমে আসবে তাদের মিলিটারি পাবলিক স্কুল এর গভর্নিং বডির প্রতিনিধি, তারনপর সংশ্লিষ্ট স্কুল এর প্রতিনিধি, সবশেষে স্কুল এর এক্সিকিউটিভ প্রিন্সিপাল। একটি ধাপ পেরোলেই পরের ধাপ হবে। অনেক লম্বা রাস্তা, তবে আমি আছি। কিছু একটা ভাল হবেই।  বৃটিশ টিম আসছে ১৯ জুলাই ২০১৪। আমি এখন এর জন্য তৈরি হচ্ছি ভাই, দোয়া কইরেন।

এর পরের ঘটনাগুলো সরল রেখায় ধাবিত । ২০১৪ সালের জুলাই, সেপ্টেম্বর আর পরের বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত এক এক করে ব্রিটিশ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ক্রিস ক্লেডন, তার পর ভাইস প্রিন্সিপাল কর্নেল স্টিফেন সনডারসন এবং শেষে প্রিন্সিপাল ক্রিস্টোফার জন রাসেল এসে ভিজিট করে গেল ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ ।

২৭ জানুয়ারি ২০১৫, রেজা তাঁর ফেইসবুকে লিখে – Feeling good to be a part of history…

২৭ জানুয়ারি ২০১৫। ডিউক অব ইয়র্কস – রয়্যাল মিলিটারি স্কুল, ইউকে এর প্রিন্সিপ্যাল মিস্টার ক্রিসটফার জন রাসেল ২ দিনের জন্য ফৌজদারহাট আসেন এবং অনেক প্রোগ্রামে যোগ দেন।

আমি জিজ্ঞেস করি – ঘটনা কী রেজা ?

রেজা বলে – অল ডান ভাই। একটা এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম হবে। ফৌজদারহাট দিয়ে শুরু, বাট সব ক্যাডেট কলেজ থেকেই প্রতিনিধি যাবে স্টেপ বাই স্টেপ।

আমি আরেকটু পরিস্কার হতে চাই।

রেজা বলে – ২০ বছর এর জন্য ডিউক অফ ইয়র্ক – রয়াল মিলিটারি স্কুল আর ফৌজদারহাট এর মধ্যে ছাত্র-শিক্ষক এক্সচেঞ্জ হবে, প্রথমে গুড উইল ভিজিট দিয়ে শুরু হবে ।

আসলেই কী ?

আমি কনফিড্যান্ট ভাই। হয়ে যাবে ।

মনে মনে বলি, আমিও কনফিডেন্ট রেজা, হয়ে যাবে ।

তিন দফার পরিদর্শন ও মিটিং এর পর ২৯ জানুয়ারি ২০১৫ ডিউক অব ইয়র্কস – রয়্যাল মিলিটারি স্কুল, ইউকে এবং ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের মাঝে শিক্ষা সহায়ক সমঝতা চুক্তি সম্পন্ন হয় ।

শুরু হয় নির্মানের কাজ

কয়েকমাস পর হঠাত ফোন প্রিন্সিপালের ।

– ভাই কি কাল একটু আসতে পারবেন, আমি টিকিট পাঠিয়ে দিচ্ছি। বিকাল ২ টা ৫০ এ আপনার ফ্লাইট, ইউ এস বাংলায়, আসবেন ? একটু আড্ডা দিতাম আপনার সাথে ।

– আচ্ছা আসবো। কিন্তু কেন ?

–  ভাই , কাজ শুরু হয়ে গেছে আমার ।  সুইমিং পুল আর অডিটরিয়ামের জন্য টেন্ডার কল করেছিলাম। চট্টগ্রামের কয়েকটা কোম্পানী বিড করেছে। আমি আর আমার একাউন্টস অফিসার মিলে বসেছি, কিন্তু অনেক কিছু বুঝতে পারছি না, একটু যদি আসতেন ।

আমি হাজির হয়ে যাই।

আমার সামনে হাজির করা হয় দুইটা টেন্ডারের অনেকগুলো বিড ডকুমেন্ট । আমরা অনেক রাত পর্যন্ত এ নিয়ে কথা বলি।

রেজা জানায়, রি-ইউনিওনের আগে সে মেইন গেইট আর ভেতরের কিছু কাজ শেষ করে ফেলতে চায়। এর মধ্যে অনেকগুলো ব্যাচ কন্ট্রিবিউশন সে পেয়েছে। আমাকে নিয়ে গেলো লাইব্রেরিতে । আমাদের ব্যাচ এখানে ৩ লাখ টাকার বই দিয়েছে, সেগুলো হাউজ লাইব্রেরিতে দিয়ে দেয়া হয়েছে । আর নতুন বই থেকে প্রত্যেক ক্যাডেটকে একটা বই দেয়া হয়েছে বাড়ি যাবার সময়। এসে এই বই নিয়ে রিভিউ লিখবে । এটা সব ক্লাসের সবার জন্য কম্পালসারি করে দেয়া হয়েছে।

আমি খুশি হয়ে যাই লাইব্রেরি দেখে । আহ ! এই সেই লাইব্রেরী !

এখানে নতুন একটা কর্নার করা হয়েছে- ফৌজিয়ান কর্নার। এই কলেজের লেখকদের বই আছে এখানে ।

সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে এসেছে ফৌজিয়ান কর্নার – ২০১৪ সাল

সামনে বড় রি-ইউনিওন হবে । তার আগেই কলেজের প্রধান ফটকের কাজ শেষ হবে । আরো কিছু খুচরা কাজ আছে, সেগুলো সেরে ফেলা হবে। বড় কাজগুলোর জন্য বাজেট যেহেতু বেশি সেগুলো আগামী বছর করার পরিকল্পনা করে ফেলে।

কলেজে নতুন গেট নির্মান করা হয় ২০১৪ সালে
গ্র্যান্ড রি-ইউনিওন ২০১৪

২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসের ২৪ থেকে ২৬ তারিখ পর্যন্ত সময়ে কলেজ পেলো একটা রি-ইউনিওন। এই রি-ইউনিওনে গিয়ে আমাদের চক্ষু চড়কগাছ হবার মতো উপক্রম। কী করে এতো বিশাল আয়জন করার বাজেট জোগাড় করলো তা দেখে আমরা বিস্মিত হয়ে যাই। ক্যাডেট কলেজের ইতিহাসে এতো জমকালো আয়োজন কেউ দেখাতে পারে নাই। আমরা সবাই বিমোহিত হলাম তাঁর এই আয়োজন দেখে।

২০১৪ সালের ২৪ ডিসেম্বরের কিছু ছবি। ক্যাডেট কলেজের কোন রি-ইউনিওনের অনুষ্ঠান এতো আড়ম্বরের সাথে কেউ করে নাই।

লেক নির্মানের সূচনাপর্ব

২০১৫ সালের ৫ মার্চ  একটা জরুরী ফোন পেয়ে চলে যাই কলেজে।

কলেজ থেকে বেরুনোর পর যেকোন ছুতোয় কলেজে যেতে পারলে ছুটে যাই। এবারও চলে গেলাম। বিমান বন্দর থেকে কলেজের মাইক্রোবাস আমাকে নিয়ে কলেজ গেস্ট হাউজে থামে। কিন্তু আমি নামি না । আমি ড্রাইভারকে বলি, রি-ইউনিওনের সময় এতো মানুষ আর সাজ সজ্জার চাপে ক্যাম্পাসটা ভালো করে দেখা হয় নাই। আমি একটু দেখবো, কারন ছোটখাট হলেও কিছু পরিবর্তন আমার চোখে পড়েছে। সেটার ছবি তুলবো।

৫ মার্চ ২০১৫, বিকেল বেলা দেখা কলেজ চত্বর

হাউজ ঘুরে দেখা হলো, ছবি তোলা হলো । আগেই কথা হয়েছিল যে, রাতে আমরা বসবো কিছু ডিজাইন আর কোটেশন যাচাই করতে, কিন্তু এতোক্ষণ আমি কী করবো ? প্রিন্সিপালকে পাই কই ?

খবর নিয়ে জানলাম, বোট-ক্লাবের কাজ শুরু হয়ে গেছে । এক্সকাভেটার দিয়ে মাটি সরানোর কাজ চলছে, প্রিন্সিপাল সেখানেই।

আমি হাজির হয়ে যাই।

আমাকে দেখেই দৌড়ে আসে রেজা। দেখি তাঁর মুখে বিজয়ীর মতো স্মিত হাসি।

৫ মার্চ ২০১৫। শুরু হয়ে গেছে মাটি কাটার কাজ
কলেজ এডজুট্যান্টের কাছে স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন অধ্যক্ষ (৫ মার্চ ২০১৫)

কলেজ এডজুট্যানট মেজর মাহবুবকে নিয়ে আমাকে বুঝানো হয় কিভাবে এখানে একটা মাটির ব্যারিকেড দিয়ে পানি আটকে রাখা হবে আর কী কী উপকরন লেকের তলায় দিয়ে দেয়া হবে যাতে সারাবছর পানির উচ্চতা একই রকমের থাকে।

রাতে আমরা হিসাবনিকাশ নিয়ে বসি এবং আমার মতামত লিখে দিয়ে পরের দিন দুপুরের ফ্লাইটে আবার ঢাকা ফেরত আসি।

আর্ট গ্যালারি, মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি সৌধ

এবার কলেজ ছেড়ে আসার পর আমি আর কোন খোঁজ আমি নেই না, যতক্ষণ না প্রিন্সিপাল আমাকে আবার ফোন করে বলেন – ভাই, আপনি আর্ট কালচারের মানুষ, আমি কলেজে একটা নতুন আর্ট গ্যালারি করেছি আমাদের ভুঁইয়া স্যারের নামে। সেটা উদ্ভোধন করবেন মিসেস ভূঁইয়া। আমি আপনাকে আর সিজিবি চেয়ারম্যানকে দাওয়াত দিতে চাই, যদি আসেন।

আমি একপায়ে খাড়া হয়ে যাই।

২৮ মে ২০১৫ সালে কলেজে দুপুর বেলা পৌঁছে গিয়ে দেখি ভাঙ্গাভাঙ্গির কাজ শুরু হয়ে গেছে অডিটোরিয়ামে। ঠিকাদার কাজ শুরু করে দিয়েছেন । প্রিন্সিপাল গুরত্বপূর্ণ মিটিং করছেন প্রাক্তন অর্থ সচিব মহোদয়ের সাথে। আমি ক্যামেরা নিয়ে ঘুরাঘুরি করি। আমাদের সাধের অডিটরিয়ামটা আমাদের চোখের সামনে ভঙ্গে ছারখার হয়ে গেলো। নতুন কী না কী হয়, আল্লা মালুম। ডিজাইন ও কোটেশনে দেখেছি এটা ফুল এয়ার কন্ডিশন্ড হচ্ছে, তবে একুইস্টিক্যালি ট্রিটেড আপাতত হচ্ছে না, সেটা হয়তো পরে হবে ।

২৮ মে ২০১৫। কলেজ অডিটরিয়াম

আমি ডাক পাই টিচার্স রুমে। আমাদের সময় এটাই ছিলো মিস্টার ভুঁইয়ার আর্ট গ্যালারি । ছবি আঁকা আমরা এই ঘরেই শিখেছি। গিয়ে দেখি আমাদের ১৪তম ব্যাচের ফজলে কবীর ভাইকে নিয়ে বসেছেন কলেজের প্রিন্সিপাল আর ভাইস প্রিন্সিপাল। ফজলে কবীর ভাই এখন সোনালী ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান। সে নিজেই দাওয়াত দিয়ে নিয়ে এসেছে, যদি কোন আর্থিক সাহায্য পায়, এ আশায়। কথা বলছে নীচু স্বরে,  একটু দূরে সব শিক্ষকেরা। এইফজলে কবীর ভাই এখন অর্থ মন্ত্রনালয়ের সচিব। আমি বুঝে ফেলি, রেজা আসলে এই ভাইয়ের কাছ থেকে কিছু অর্থ আদায় করাতে চায় কলেজের উন্নয়নের জন্য। আর তাঁকে আলাপ আলোচনায় উৎসাহ দেয়ার জন্য চট্টগ্রামের ওল্ড-ফৌজিয়ান এসোসিয়েশনের কয়েকজন আসেন। সিনিয়ারদের মধ্যে ছিলেন ফোর্থ ব্যাচের নিজাম সেলিম ভাই। আর আছে মেজবাহ (২৭), দিদার (৩১), মীরাজ (৩১)।

আলাপ আলোচনা শেষে প্রিন্সিপাল অর্থ সচিবকে নিয়ে সুইমিং পুলের কাছে যায়। সেখান থেকে তাঁর স্বপ্নের বোট-ক্লাবে নিয়ে যায়। তাঁর জায়গাগুলো দেখায়। আর আমি দূরে থেকে দেখি।

২৮ মে ২০১৫।

আমাদের সময় যে দালানটিতে উড আর মেটাল অয়ার্কশপ এবং টেকনিক্যাল ড্রয়িং এর ক্লাস হতো সেই চত্বরেই এসেছে বেশ পরিবর্তন। এখানে বানানো হয়েছে নতুন ক্যাফেটেরিয়া।

আমাদের সময় কলেজ ক্যান্টিন ছিলো মসসজিদ আর সুইমিং পুলের পাশে । এখন এসেছে একটা কেন্দ্রিয় জায়গায়। এ অঞ্চলটার বেশ পরিবর্তনও হয়েছে দেখছি । এখানে আরেকটা বড় ওয়ার্কশপকে ইন্ডোর গেমসের জন্য তৈরি করা হয়ে গেছে ।

নতুন ক্যাফেটেরিয়া চত্বর

নতুন খেলাধুলার জায়গাও এখানে তৈরি হয়েছে। বিলিয়ার্ডের জন্য নতুন রুম হয়েছে। পুরনো জিমনেশিয়াম রিনোভেটেড হয়েছে।

খেলাধুলার নতুন উপকরন

একটা বড় হলঘরকে রূপান্তর করা হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, নাম দেয়া হয়েছে – আব্দুর রহমান ভুঁইয়া আর্ট গ্যালারি। আমরা বাইরে থেকে অপেক্ষা করি। ঠিক ১টায় এর উদ্ভোধন করবেন মিসেস ভূঁইয়া।

২৭ মে ২০১৫ উদ্ভোধন করা হয় আর্ট-গ্যালারি।

এ উপলক্ষে বার্ষিক চিত্রাংকন প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বের আয়োজন থাকছে এখানে । এ রকম আয়োজন আমাদের সময়ও ছিলো, কিন্তু এ তুলনায় খুবই ঘরোয়া। এবং দেখি যে আমাদের সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ভালো ভালো ছবি এখানে রাখা আছে। বেশিরভাগই ছবি এঁকেছে ক্যাম্পাসের ছবি। প্রত্যেক শিল্পী তার ছবির পাশে দাঁড়ানো। বিচারকরা শিল্পিকে নানা রকমের প্রশ্নও করছেন।

এই আয়োজনে বিচারক ছাড়াও আলোকচিত্র নিয়ে আমার উপস্থিতিও ছিলো

আমার উপস্থিতি ছিলো দুই কারনে । আমার তোলা সাদাকালো ১০টি আলোকচিত্র আমি কলেজ আর্ট গ্যালারিকে উপহার দিলাম, কথা বললাম আমাদের সময়ের (১৯৭৮-৮৪) চিত্রকলাচর্চা নিয়ে আর নাম্বার দিলাম ছাত্রদের । একবার মনে হয়েছিল সবাইকে ১০০ করে নাম্বার দিয়ে ফার্স্ট করে দেই। কিন্তু সেটা আর দেয়া গেলো না। একক ভাবে যাকে আমি সবচে বেশি নাম্বার দিলাম, দেখি অপর তিন বিচারক ( ডা আশা, ডা মীরাজ, কলেজ শিক্ষক )ও তাকেই বেশি নম্বর দিয়েছেন।

২৮ মে ২০১৫, উদ্ভোধন হলো আর্ট গ্যালারির

এই ছবিগুলোর মধ্যে একটা ছবি ছিলো কলেজের সেই বোটক্লাবের যে রূপ হতে পারে তার ছবি।

বামে কলেজ অধ্যক্ষ অর্থ সচিবকে অবহিত করছেন লেকের সম্ভাব্য রূপ আর ডানে কলেজের এক ছাত্রের আঁকা লেক।
কলেজ লেক, ২৮ মে ২০১৫

কলেজে নতুন কিছু স্থাপনা চোখে পড়ে আমাদের। তার একটি কলেজে বানানো নতুন মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ। এর আগে আমাদের শহীদ মিনারের নানা রূপ দেখেছি নানা রঙ্গে, কিন্তু আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কোন স্মৃতি সৌধ এখানে নেই। এখানে এমন কিছু বানানো হবে এমন পরিকল্পনার কথা সে ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে শুনিয়েছিলো। আজ দেখি সেখানে নতুন স্মৃতি সৌধ হয়েই গেছে এবং তারও ছবি আছে এই প্রদর্শনীতে । কথা প্রসঙ্গে এও জেনে নেই যে এই স্মৃতি সৌধের মূল ধারনাটা তাঁরই। সেটা কারিগরকে দিয়ে করিয়ে নিয়েছে। বসানো হয়েছে কলেজ গেস্ট হাউজের ঠিক উলটা দিকে, আমাদের এক নম্বর ফুটবল মাঠের এক প্রান্তে।

আমরা পরদিন কলেজ ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে আসি।

মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি সৌধ যখন ক্যাডেটের তুলিতে আর আমার আলোকচিত্রে । ২৮ মে ২০১৫

সে এক জোছনার রাত

২০১৫ সালের ৬ জুন । আবার ডাক এলো কলেজ থেকে ।

রাতের খাবারের পর রেজা আমাদের বলে, আসলে আমি আর বেশিদিন নাই কলেজে। আমার ট্যানুর শেষ। স্টাফ কলেজ করতে হবে । আপনাকে নিয়ে এসেছি আর জোস্তনা রাতে আমাদের এই লেক দেখাবো আপনাকে ।  চলেন আজ ভরা চাঁদটাকে আমরা লেকের পাশ থেকে দেখি। কতোগুলো চেয়ার দিতে বলেছি, দেয়া হয়ে গেছে । যাবেন নাকি ?

এই কথার জবাবে আমার কিছু বলার আগে বাকি সবাই লাফিয়ে উঠল। আশা পেছন থেকে বলে – আমিও যাবো, কিন্তু নৌকা চড়াতে হবে, পারবা ?

রেজা হাসে। বলে, আসো, দেখা যাক।

কলেজের পেছন দিকের তিনটা পাহাডের মাঝখানটা কেটে হ্রদ বানানোর কাজ শেষ হয়েছে মাত্র। নতুন পানিতে ভরা হয়েছে লেক। এই লেকের কিনারা বরাবর কতোগুলো ছোট ছোট সুপারীর খোলের মতো নৌকা  বাঁধা। আকাশে চাঁদ। আমাদের দলে আছে কলেজ প্রিনসিপাল রেজা,  আমাদের দুই ব্যাচের জুনিয়ার কিন্তু ঘনিষ্ঠ বন্ধু এখন, সেই ডাক্তার মেজবাহ আর   কলেজ প্রিনসিপালের দুই ব্যাচমেট-বন্ধু ডাক্তার মিরাজ আর ঘাড় ত্যাড়া মোটকু দিদার।

গিয়ে দেখি ৫ খানা খোল আকারের প্লাস্টিকের নৌকা ঘাটে বাঁধা আমাদের জন্য। আমরা খানিকক্ষণ পাড়ে বসে একে একে নৌকা আর বৈঠা নিয়ে নেমে যাই লেকে। এমন প্লাস্টিকের হালকা নৌকা আমার কখনো চড়া হয় নাই। এই প্রথম। বুঝতে পারি, এটার ভরকেন্দ্র যেকোনো সময় আমার ভরকে সামলাতে না পেরে নির্ঘাত বিগড়ে যাবেই । তাও অসীম সাহসের মাঝে আধো আলো, বাকিটা অন্ধকারের মধ্যে আমরা ৫ টা নৌকায় ৫ জন লেকের এ পাড় থেকে ঐ পাড়ে যাই এবং এক সময় ঠিকই এক পাহাডের কোনায় আমার নৌকাটি প্রায় হাঁটু পানিতে উন্টেও যায়।

নৌকা উলটে যাবার ফলে আমার দুইটা মারাত্মক অসুবিধা হয়। একটা হচ্ছে, আমার চোখ থেকে চশমা পড়ে যায় পানিতে , আর আরেকটা ছিলো- আমার এক পাটি স্যান্ডেল খুজে পাওয়া যাচ্ছিলো না।
দিঘীর জলে কিছু জোছনার আলো ছিলো, কিন্তু খানিক আগে চাঁদটা পাহাড়ের আড়াল হবার কারনে এই জায়গাটুকুতে যে ছায়া পড়েছে তাতে মোটামোটি অন্ধকারের মতোই একটা আলো। তেমন কিছুই দেখা যাচ্ছিলো না।
দিদার পাশের নৌকায়। সে বলে – ব্যাপার না, অন্ধকারের দিকে অনেক্ষণ তাকিয়ে থাকলে আলো বেরিয়ে আসে। আপনি উঠে বসুন, আমি দেখি।
এই বলে সে তাঁর ত্যাড়া ঘাড় নিয়ে সে নেমে গেলো পানিতে এবং খানিক পরে একে একে আমার এক পাটি স্যান্ডেল আর চশমাটা আমার হাতেই তুলে দিলো।

পুরা কাদা ভেজা শরীর নিয়ে আর নৌকায় বসতে ইচ্ছা হলো না। আর এমন মায়াবী চাঁদকে মাথার উপর রেখে আবার যে গেস্ট হাউজে গিয়ে ঘুমিয়ে রাতকে অপ্চয় করবো, তারও মানে খুজে পেলাম না।
আমরা দিঘীর পাড়ে চারটা চেয়ার নিয়ে বসে থাকি। নানা রকম খাবার দাবার আসতে থাকে । আমাদের রাত পার হয়ে যায়।

৬ জুন ২০১৫। লেকে পানি এসেছে , নাও বাঁধা হয়েছে। আমরা নৌকা চড়ি

সেই মায়াবী রাত একসময় কোমল মধুর ভোরে পরিণত হয়। কোন এক ফাকে চাঁদ আড়াল হয়ে যায় একেবারে,  আর- পূবের পাহাড় ফর্সা করে মহাপরাক্রমশালী বীরের মতো আস্তে আস্তে আভির্ভূত হতে থাকেন সূর্য্মামা।

সূর্য ওঠার অনেক পরে, পাহাড় মাড়িয়ে আমাদের দেখা দিলে আমরা তাঁর সোনালী আলোর চ্ছ্বটা গায়ে মাখার সুযোগ পাই। আমরা ৫ জন তখন গোল হয়ে বসে আছি একটা টেবিলকে ঘিরে । আমাদের চোখে কিন্বাতু ক্রলান্তি নেই। ভোরের এমন রূপ দেখে বার জীবনানন্দের ‘শিকার’ কবিতাটা আওড়াতে ইচ্ছা করে। কিন্তু কারোই মুখস্থ নাই। আমরা শুধু ‘ভোর’, ‘ভোর’ আর ‘হরিণ’, ‘চিতা বাঘিনী’ এসব শব্দ আওড়াতে  থাকি।

রাতভোর করে বোট-ক্লাবে জলকেলি করে সকালের মিঠা রোদ আমরা উপভোগ করি

বিদায় ফৌজদারহাট

এর কিছুদিন পর কর্নেল রেজা ফৌজদারহাট ক্যেডেট কলেজ ছেড়ে যান।

যাবার আগে নতুন অডিটরিয়াম আর সুইমিং পুলের রিনোভেশনের কাজ শেষ হয়।

বামে সংস্কারের আগে এবং দানে ২০১৫ সালে, সংস্কারের পরে সুইমিং পুল
উপরে ২০১৪ সালের কলেজ অডিটরিয়াম, নীচে রিনোভেশনের পর, ২০১৫ সালে কলেজ অডিটরিয়াম

আমার আর খুব একটা যাওয়া হয় না ক্যাডেট কলেজে । খবর পাই কলেজে নতুন সুইমিং পুল হয়েছে, অডিটরিয়াম রিনোভেট হয়েছে, আর লেক টা অনেক সুন্দর হয়েছে।

ফৌজদারহাটের লেক, জুলাই ২০২০

কর্নেল রেজা এখন কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজের অধ্যক্ষ। এখানেও শুরু হয়েছে বেশ কিছু পরিবর্তনের কাজ। এখানেও আছি আমি, কখনো ফটোগ্রাফির ক্লাসে, কখনো নাটক নিয়ে কখনো বা পুরো ক্যাম্পাসের আর্কিটেকচারাল মাস্টারপ্ল্যান ডিজাইন নিয়ে। সে গল্প অন্যদিন শুনাবো।

পুণশ্চঃ আমি একদিন জিজ্ঞেস করি- আচ্ছা তোমার ঐ বৃটিশ স্কুলের সাথে করা ক্যাডেটদের এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের কী অবস্থা ?

রেজা অবাক হয়ে বলে- ও আচ্ছা, আপনি জানেন না কিছু ! এটা ২০১৫ থেকেই শুরু হয়েছে এবং চলছে । আপনাকে কিছু নিউজ লিঙ্ক দিচ্ছি, দেখে নিয়েন।

পত্রিকায় প্রকাশিত বৃটিশদের সাথে ক্যাডেট বিনিময়ের খবর

 

 

মন্তব্য
Loading...