প্রতারক পৃথিবী ছেড়ে গেলেন তিমির স্যার

তিমির বরণপাল চৌধুরী স্মরণে

তিমির স্যার ও বাঙালীর হাসির গল্প

সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা ।
ক্লাস সিক্সে অংক পড়াতে আসতেন তিমির স্যার। হালকা ছিপছিপে এক তরুণ, খুব কমই শেভ করা থাকতো। তিন-চার দিনের খোঁচা খোঁচা দাড়ি থাকতো চিবুকের সাথে গজানো।
শীত- গ্রীষ্ম- হেমন্ত-বর্ষা, সব ঋতুতেই তাঁকে প্রায় সব সময়ই দেখতাম একই পোষাকে। রাবারের চপ্পলের সঙ্গে গোড়ালীর উপর ঝুলে থাকা ট্রাউজার, ফুলহাতা শার্ট (শীতকালে এর উপর বগলকাটা সোয়েটার, বেশী শীতে চাদর) হাতে একটা কাঠের হাতলওয়ালা ছাতা। তিনি আসতেন অনেক দূর থেকে, বিয়ানীবাজারের কাছে বাবুর বাড়ির নিকটে তাঁর বাড়ি। স্কুল থেকে মাইল তিনেক পথ দূর। এতো দূর থেকে কোনো স্যার আমাদের পড়াতে আসতেন না। উজানের দুই তিনজন শিক্ষক ছিলেন, তাঁরা গ্রামেই কারো না কারো বাড়িতে লজিং থাকতেন। লজিং মানে হচ্ছে বিনা বেতনে পড়ানো। অনেকের বাড়িতেই এমন লজিং মাস্টার থাকতেন। তাঁরা ঐ বাড়ির ছাত্র-ছাত্রী পড়াতেন, বিনিময়ে থাকা-খাওয়া ফ্রী। তিমির স্যার নিজের বাড়ি ছেড়ে কোথাও থাকবেন না বলে তাঁর লজিং থাকা হয় না। তিনি ধূলো-বালি-কাঁদা-রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে অতি ধীরে ধীরে হেঁটে প্রতিদিন একই সময় স্কুলে এসে হাজির হতেন এবং স্কুল ছুটির পর একই সময়ে চলে যেতেন। তাঁর হাঁটার গতি কখনো বাড়তো বা কমতো না। তিনি রাস্তার ডান পাশ, আইলের কাছাকাছি ধরে হেঁটে যেতেন। যে কথাটি তিনি বলতেন শুধু, তা হচ্ছে ‘আদাব’। ছাত্রদের ‘আদাব স্যার’ এ জবাবে বলা একটি মাত্র শব্দ।
ক্লাস সিক্সেই আমাদের তিনি পরিচয় করান স্কুল লাইব্রেরির সঙ্গে।যদিও তিনি ছিলেন অংকের শিক্ষক, আগ্রহ ছিলো সাহিত্যে বেশি। স্কুলের লাইব্রেরি ছিল তাঁর কাছে।

বামে মাথিউরা দ্বি-পাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয়ের গেইট। ডানে সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে এ স্কুলের কয়েকজন ছাত্র

হেড স্যারের রুমে একটা আলমারী আছে। এই আলমারীর শেল্ফের ২/৩ টা তাকের মধ্যে কতগুলো বই আছে। এটাই আমাদের লাইব্রেরি। আমাদের স্যার তিমির বরণপাল চৌধুরী এই লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান, আলমারীর চাবি তাঁর কাছে।
ক্লাস সিক্সের সাম্মাষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর আমি তিমির স্যারের নজরে আসি। তিনি আমাকে বলেন, দেড়টায় লাইব্রেরিতে যেতে, বই নিতে। গল্পের বই পড়া দরকার আমার।
আমি অফিস ঘরে যাই। তিমির স্যার আলমারি খুলে একটা রেজিষ্টারি খাতা বের করেন। তাক থেকে বের করে বলেন- বই পছন্দ করতে। আমি একটা বই নেই। কবিতার বই। নজরুল ইসলামের লেখা এক বই।
পরদিন ফেরত নিয়ে আসি, জমা দিতে।
তিমির স্যার বলেন, ফেরত দিচ্ছ কেনো? বই ভালো লাগেনি?
আমি বলি, স্যার কঠিন লেখা, বুঝি না।

১৯৭৪ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত এরকম অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীদের পড়িয়েছেন তিনি

তিমির স্যার লাইব্রেরি হাঁতড়ে আরেকটা বই বের করে আমার হাতে দেন। আমি বইটি বাড়ি নিয়ে যাই। রাতের বেলা বই পড়তে শুরু করি। অনেক মজার কাহিনী, হাসির গল্প। জসিম উদ্দিনের লেখা।
দুইদিন পর আবার বই নিয়ে হাজির হই। তিমির স্যার আবার বলেন, ফেরত দিচ্ছ কেনো? পড়া শেষ?
– জ্বী স্যার
– ভালো লাগেনি?
– ভালো লেগেছে স্যার। আমি সবগুলো গল্প আপনাকে বলতে পারবো।
তিমির স্যার এই বই ফেরত নিয়ে আরেকটা বই আমার হাতে ধরিয়ে দেন, বাঙালীর হাসির গল্প- দ্বিতীয় খন্ড, জসিম উদ্দিন।
এখনো কেউ কেউ আমাকে জিগ্যেস করে, পাঠবইয়ের বাইরে আমার পড়া প্রথম বইয়ের নাম কি? আমি তখন ‘বাঙালীর হাসির গল্প’র কথা বলি, আর তিমির স্যারকে স্মরণ করি।

অবসর নেয়ার পর থেকেই নানা অসুখ বিসুখে সময় কাটতো। প্রাক্তন ছাত্ররা দেখাশুনাও করেছেন অনেক।

ছেড়ে গেলেন প্রতারক পৃথিবী

এর মধ্যে কত কাল গত হয়ে গেছে। স্যার স্কুল থেকে অবসর নিয়েছেন। তাঁর দুই সন্তান, এক পুত্র এক কন্যা, তাঁরা দুজনও শিক্ষকতা পেশা হিসাবে নিয়েছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক তাঁরা। স্যার অসুখ বিসুখে সময় কাটান, এবং বিগত ২৪ জুলাই তারিখে স্যার অনন্তলোকে চলে যান।

তাঁর মৃত্যুসংবাদ ছাপা হয় স্থানীয় অনলাইন পোর্টালে এভাবে –

ম্যাপ টিভিঃ বিয়ানীবাজার উপজেলার মাথিউরা ইউনিয়নস্থ মাথিউরা দ্বিপাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক ও মুক্তিযোদ্ধা তিমির বরণ পাল চৌধুরী পরলোক গমণ করেছেন। আজ শুক্রবার দুপুর ১২টায় তিনি ভাড়া বাসায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন ধরে বহু জ্ঞানের অধিকারী, মানুষ গড়ার কারিগর এ শিক্ষাবিদ মস্তিষ্ক জনিত জঠিল রোগে ভুগছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে এতদঞ্চলের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তিমির বরন পাল চৌধুরী বিয়ানীবাজার সাংস্কৃতিক কামান্ডের নাট্যকর্মী ও খাসা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তন্ময় পাল চৌধুরী (তিলক) এর বাবা। উল্লেখ্য, তিমির বরন পাল চৌধুরী স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭৪ সালে গণিতের শিক্ষক হিসেবে মাথিউরা দ্বিপাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে তিনি এ বিদ্যালয় থেকে অবসরে যান।

তাঁর মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এম.পি। তিনি বলেন, তিমির কুমার পাল চৌধুরীর মৃত্যু সংবাদ শুনে খুবই মর্মাহত হয়েছি। এই মাত্র তার ছেলের সঙ্গে কথা বল্লাম। তিমির আমার ছোট ভাইয়ের মত। তার বড় ভাই অধ্যাপক মিহির কুমার পাল চৌধুরী আমার ক্লাস মেইট ছিলেন। ঘনিষ্ঠ বন্ধুও ছিলেন। তিমিরের মৃতুতে গভীর শোক প্রকাশ করছি। তার পরিবারের সকল সদস্যের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। তার আত্মার শান্তি কামনা করছি।

এবার বাড়ি গেলে ইচ্ছা হয় তাঁর স্বজনের সাথে দেখা করতে। স্বপনকে বলি, আমাকে নিয়ে তিমির স্যারের বাড়ি চল। অনেক আগে গিয়েছিলাম লাসাই তলার বাড়িতে। এক সময় যে অঞ্চলটি ছিলো প্রতাপশালী জমিদার প্রমথ নাথ দাসের, সেখানেই তাঁর বাড়ি ছিলো।

স্বপন বলে- ভাইয়া, স্যারকে তো এখান থেকে উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। উনারা খাসা গ্রামে এক বাসা ভাড়া করে ওখানে থাকেন এখন। তিনি মারাও গেছেন সেই বাড়িতে।

গতকাল ২৪ আগস্ট ছিলো তাঁর বাড়িতে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান। হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য ছিলো এই আয়োজন। আজ, ২৫ আগস্ট স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলের সামনে হবে মুসলমানদের জন্য আয়োজন। গতকাল তাঁর সেই ভাড়া বাড়িতে স্বপনের সাথে গিয়ে দেখি, তাঁর দেয়ালে শোভা পাচ্ছে ১৯৯৯ সালে তোলা আমার একটা পোর্ট্রেট।  তাঁর স্ত্রী এবং পুত্র-কন্যার মুখে শুনে অবাক হলাম যে স্যার আমার কথা তাঁদের কাছে প্রায়ই বলতেন এবং খুঁজে খুঁজে আমার বই এনে পড়তেন।

১৯৯৯ সালে এ ছবি তুলে উপহার দিয়েছিলাম । ছবিটা এখনো তাঁদের ঘরের দেয়ালে আছে।

আহমেদ ফয়সলের কাছ থেকে শুনি জীবনে প্রতারিত হবার একটি ঘটনা।

২৪ আগস্ট ২০২০। তিমির স্যারের ভারা বাড়িতে পরিবারের সাথে আমি। বায়ের ছবিতে বা দিকে তিমির স্যারের স্ত্রী -প্রতীমা পাল চৌধুরী, কন্যা দেবদ্যোতি তনু , আমি আর তন্ময় পাল চৌধুরী । তাঁর দুই সন্তানই শিক্ষক-শিক্ষিকা

তিমির পাল আর মিহির পাল, দুই ভাই। দুইজনই পেশায় দুই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। তাঁদের দুজনকে পরম মমতায় পালন করেন এ অঞ্চলের জমিদার বাবু প্রমথনাথ । মৃত্যুর আগে এই দুই ভাইকে বসতবাটির জন্য জমি দান করে যান। কিন্তু কাগজপত্র পাকা করা হয় নাই, নানা আলসেমির জন্য। তিমির পালের এক পুত্র, মিহির পালের তিন পুত্র। চার পুত্রই তিমির পালের স্নেহে একসাথে বড় হতে থাকে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দেখা গেলো পুত্রের সাথে যে ভ্রাতুষ্পত্রদেরকে এক থালে খাইয়ে বড় করেছিলেন তাঁদের একজন বাবা-কাকাকে দেয়া জমির মালিকানা থেকে কাকা তিমির বরণপাল চৌধুরী ও তাঁর উত্তরাধিকারিদের মালিকানা থেকে নাম কাটিয়ে নিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয়।

মৃত্যুর আগে তাঁর ছাত্রেরা এ জমি ফেরত পাবার জন্য পদক্ষেপ নিয়ে চেয়েছিলো। কিন্তু গভির অভিমানে তিনি তাদেরকে বারণ করেন। শেষ বয়সে ভাড়া বাড়িতে দিনযাপন করেন এবং মৃত্যুর পর তাঁদের পরিবারের জন্য নির্ধারিত অভিজাত শ্মশানে দাহ না করে অতি সাধারন  শ্মশানে দাহ করার কথাও বলে যান।

সারা জীবন সত্য ও সুন্দরের কথা শেখানো মানুষটি পরপার থেকেও কি দেখে যাবেন প্রতারক পৃথিবীকে ?

 

 

মন্তব্য
Loading...