করিমকথা

শাহ আব্দুল করিমকে নিয়ে প্রথম লেখা ও শেষ লেখা

বরাম হাওরে আজ কেনো এতো জল?

(প্রথম আলো, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০০৯)

১৩ সেপ্টেম্বর ২০০৯। বেলা দেড়টার দিকে কতগুলো নৌকার বহর বেরিয়েছে ধলগ্রামের উদ্দেশ্যে। এদের একটি বেশ বড় নৌকা। তার ছাদের উপর অনেক ফুলের মালার আড়ত। নৌকাটিও সাজানো। ময়ূরপঙ্খী নাও যদি নয়, তারপরেও লতাপাতা ফুল, ময়ূরের পেখমের মতো নক্সী করা তার খোল। বাদবাকী নৌকাগুলোও সুন্দর। ছোট ছোট। ২০-২৫টা তো হবেই। বাকী সব নৌকার চোখ ঐ বড় নৌকাটির দিকে। ঐ নৌকায় আজ সোয়ারী হয়েছে শাহ আব্দুল করিম।

এ রকম আরেকটি ছোট নৌকায় করিম আমার সঙ্গী হয়েছিলেন আজ থেকে ৬ বছর আগে। এই বরাম হাওড়ের উপরই। সেদিনও আকাশ এমন মেঘলা ছিলো। কখনো, কখনো বা ফুড়–ত করে মেঘ ভেঙ্গে বেরিয়ে এসে সোনালী রোদ চুমুক দিয়েছিল করিমের গালে। দরাজ গলায় নায়ের গলুইয়ের উপর বসে তিনি একের পর এক গাইছেন ‘কোন মেস্তরী’, ‘আমি কুলহারা কলংকিনী’, ‘গাড়ি চলে না’, ‘ভব সাগরের নাইয়া’, ‘যে গুণে বন্ধুরে পাবো’, কিংবা ‘বসন্ত বাতাসে বন্ধু’র মতো গান।

ধল গ্রামের পাশের বরাম হাওর, ২৩ অক্টোবর ২০০৩

আমি ক্যামেরা নিয়ে ছইয়ের ভেতর বসা। করিম বসেছেন গলুইয়ের কাছে, পাটাতনে। ডানে বামে তার বাড়িতে থাকা ভাগনা, নাতি ছেলে বাবুল (নূর জালাল)। কেউ তবলা, কেউ হারমোনিয়াম, কেউ করতালে সুর দিচ্ছেন। গানের ফাঁকে ফাঁকে তাঁকে জানতে চাচ্ছিÑ ‘বন্ধু’টা কে? নৌকাটি কি? ছয়জন দারোয়ান কারা? নৌকার গলুইয়ে বাঁধা চাদ সূর্য কোথায়? শরিয়ত কি? মারিফত কাকে বলে? মুর্শিদ কে? নবী কে এসব প্রশ্ন।

করিম নির্বিকার। সাবলীল। তার চোখের চাহনী নরম, মুখে হাসি। সহজ সরল শিশুর মতো হাসি। যে হাসির মাঝখানে সাবল্য ছাড়া আর কোনো তৃতীয় মানের সন্ধান নাই।

সেই হাওরে আজ তার ময়ূরপঙ্খী নায়ের বহর ছুটে চলে গ্রামের মসজিদের দিকে, তাঁকে তৃতীয়বার নামাজে জানাযা পড়াবার জন্য। ধলগ্রামের ঐ মসজিদ এবং জানাযা এই দু’টোই তাঁর জীবদ্দশায় তার প্রতি সদয় ছিলো না। যে মসজিদে একবার ঈদের দিন জামাতে ‘মোল­াজি’র মতে তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়ে তাঁর জন্মভূমির গ্রামটিও ত্যাগ করতে হয়েছিল। আজ সেই মসজিদের ইমাম জোহরের নামাজ শেষ করে সেই মসজিদের সামনের উঠোনেই তাঁর নামাজে জানাযা পড়ালেন।

এবার তার বাড়ি ফেরার পালা। এই বাড়িতে ৬ বছর আগে প্রথমবার গিয়ে বেশ কিছু জিনিস দেখে অবাকই হয়েছিলাম। এ ঘরটি পার হয়ে তাঁর মূল বাড়িটির ভেতরে ঢুকে লালসালু টাঙানো একটা বেড়া দেয়া দু’চালা টিনের ঘর দেখিয়ে নূর জালাল জানিয়েছিলেন, এটা তার মা’র কবর। বাবা এই ঘরে প্রায়ই এসে ফুল দিয়ে যান। যে কোনো উৎসব পার্বনে বাজার থেকে কাগজের ফুল কিনে এনে পুরো ঘরটিকে সাজান। এর পাশে আরেকটি কবরের জায়গা আছে। ওখানে বাবার কবর হবে।

১৩ সেপ্টেম্বর ২০০৯, ধল গ্রামে আব্দুল করিমের বাড়িতে দাফনের আয়োজন

বাদশাহ জাহাঙ্গীরের অনেক দৌলত ছিলো বলে মমতাজ মহলের জন্য তিনি ইশা আফিন্দিকে ইতালী থেকে এনে সাদা মার্বেলে বানিয়েছিলেন তাজমহল। জাহাঙ্গীরের মতো ধন না থাকলেও তাঁর চেয়ে বড় মন আছে বলে করিম নিজ হাতে বানিয়েছেন এই ঘর। করিমের সরলা মহল। এই ঘরের সামনে বছর চারেক আগের এক বিকেলে বসেছিলেন করিম আমার ক্যামেরার সামনে। ঘরের ভেতর শুয়ে থাকা মানুষটির দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে তিনি বলেছিলেন, ঐ মানুষটি (তাঁর স্ত্রী সরলা) তার জীবনে না এলে তিনি করিম হতে পারতেন না। ২ দিনের কথা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছি ঘরে খাবার না রেখে, দুই মাস পরে যখন বাড়ি ফিরে এসেছি, আমার স্ত্রী কখনো আমাকে জানায়নি যে, অন্যবাড়িতে কাজ করে সে তাঁর পেট চালিয়েছে। বরং সে আমাকে বলেছে, আমি যদি আপনাকে আমার শাড়ীর আঁচল দিয়ে বেঁধে রাখি, আপনি বাইরে যাবেন কেমনে? আর আপনি যদি বাইরের মানুষের সাথে না মেশেন তবে জগৎ চিনবেন কেমনে আর গান বানাইবেন কেমনে? স্ত্রীর এই কথাগুলো মনে পড়ার পর করিম সেদিন কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলেন।

বৃটিশ রাস্ট্রদূত আনোয়ার চৌধুরী, সঙ্গীত শিল্পী রওশন আরা মণি মিলে ১০ লাখ টাকার ফান্ড সংগ্রহ করেন। এই অর্থ করিমপুত্র নূর জালালের কাছে দেয়া হয়

শেষ বয়সে প্রায়ই তিনি চোখ ভেজাতেন কারণে অকারণে। গত ৭ বছরে প্রায় ৮-৯ বার তার বাড়ি আমার যাওয়া হয়েছিল। গত মাসে শেষ এসেছিলাম বিলেত থেকে আসা একটা ফান্ড তার হাতে তুলে দেবার জন্য। সে সময় তাঁকে নিয়ে গত ৭ বছর ধরে কাজ করা ভিডিও ফুটেজ নিয়ে বানানো আমার তথ্যচিত্র ’ভাটির পুরুষ’  এর একটা ডিভিডি আমি তার হাতে তুলে দিই। তখনও তিনি প্রায় অর্ধচেতন। তার হাতে ডিভিডি দেয়ার পর তিনি একবার চাইলেন ওর দিকে। নিজের চেহারাটি ডিভিডির কভারে দেখেই আমার দিকে তাকালেন। আমি দেখি, তাঁর চোখ দিয়ে এবারও পানি পড়ছে।

বাউল করিমের ছেলে নূর জালাল আমাকে বলেছিলেন, যখন এটা বিটিভিতে দেখায় তখন তার চেহারা টিভি স্ক্রীনে আশা মাত্রই তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলেন। যতক্ষণ এই অনুষ্ঠান চলচিলো, ততক্ষণই তিনি কেঁদেছিলেন।

তাঁর কান্নার জলেই কি হাওড়ের পানিতে আজ এতো জল? কে জানে!

মৃত্যুর আগেই তাঁকে নিয়ে বানানো তথ্যচিত্র ;ভাটির পুরুষ’ তাঁর হাতে তুলে দেয়া হয়

আজ সেই বরাম হাওড় আর কানলী নদী এক হয়ে গেছে বর্ষার পানিতে। তাঁকে নিয়ে আসা নৌকাটি থেকে লাশ নামিয়ে এনে শুইয়ে দেয়া হয় স্ত্রীর কবরের পাশে তাঁর জন্য রাখা জায়গাটিতেই।

আজ এই বাড়িতে যেনো এক উৎসব। শত শত বাউল, গ্রামের আবাল বৃদ্ধ বনিতা, ঢাকা ও সিলেট থেকে আসা গোটা বিশেক ক্যামেরা ও ক্রু মিলে একাকার।

সাদা পাঞ্জাবী ও লুঙ্গী পরা, লম্বাচওড়া কোনো মানুষ কপালের কাছে দুই হাত উঠিয়ে সালাম দিয়ে আমাদের বিদায় দিল না। এ ছবিটি ২০০৫ সালে তোলা

মরা বাড়িতে আজ কাউকে তেমন গাল ভিজিয়ে কাঁদতে দেখা গেলো না। কিন্তু সবার চোখে মুখে এক ধরণের বিষাদের ছায়া। তবে কি সবগুলো কান্নার জল মেনর ভেতর দিয়ে গড়িয়ে গিয়ে জমা হয়েছে ঐ হাওড়ে? আস্তে আস্তে আমরা একে একে বিদায় নেই বাড়ি থেকে। কিন্তু আজকের আমার বিদায়টা অন্যরকম। নৌকায় উঠে খেয়াল হলো বাড়ির শেষ মাথায় এসে অতিথি বিদায় বেলা সাদা পাঞ্জাবী ও লুঙ্গী পরা, লম্বাচওড়া কোনো মানুষ কপালের কাছে দুই হাত উঠিয়ে সালাম দিয়ে আমাদের বিদায় দিল না।

লোকগানের শেষ সম্রাট

(৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ সালে প্রকাশিত)

২০০৩ সালে শাহ আব্দুল করিমের বাড়িতে

সেপ্টেম্বর মাসে বরাম হাওর সব সময়ই উতালপাথাল করে। সিলেট থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে দিরাই বাজারে নেমে ‘ঘুণ্টিওয়ালা’ নাইয়রি নৌকা ভাড়া করে এই বরাম হাওর পার হয়ে গিয়েছিলাম ধল গ্রামে। ২০০৩ সালে। তখন আমার কাছে কিংবদন্তির মতো ছিলেন শাহ আবদুল করিম। আমার সঙ্গে নতুন কেনা ভিডিও ক্যামেরা। হাওর পেরোতে পেরোতে দেখি ঝিলমিল ঝিলমিল করা ছোট ছোট ঢেউ, খানিক দূরে দূরে নানা রঙের পালতোলা নাও। ইঞ্জিনের নৌকার চল শুরু হলেও হাতে টানা বা পালতোলা নৌকার বাহারি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়নি তখনো।

মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা পুরস্কারে ভূষিত হলেন

পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে টানা হাওরি যাত্রা সেরে হাজির হয়েছিলাম কতগুলো ছোট ছোট দ্বীপের মতো সাজানো একটা গ্রামে। সেখানে শাহ আবদুল করিমের বাড়ি। সেই প্রথম আমার তাঁর কাছে যাওয়া।
বিকেলবেলা ডিঙির গলুইয়ে তাঁকে বসিয়ে পছন্দের গান শুনেছিলাম তাঁরই কণ্ঠে। আর এসব ধারণ করা হচ্ছিল আমার ক্যামেরায়। সন্ধ্যায় তাঁর বাড়ির উঠানে হারিকেন জ্বালিয়ে গানের আসর বসেছিল চাটাইয়ের ওপর। তারপর থেকে নেশা লেগে গিয়েছিল ‘ভাটির পুরুষ’-এর প্রতি। শীত, বসন্ত, বর্ষা—নানা ঋতুতে কালনীপাড়ের এই মানুষটির কাছে আমি গিয়েছি বারবার—২০০৯ সাল পর্যন্ত।

২০০৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর। বরাম হাওরে ছিলো করিমের শেষযাত্রা

বরাম হাওর দিয়ে করিমের মরদেহ নিয়েও গিয়েছিলাম একবার, ২০০৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর। আবার সেই দিরাই থেকে নৌকার বহর নিয়ে ছিল আমার যাত্রা। সেই একই হাওর। অসংখ্য ইঞ্জিনের নৌকা। ডানে-বাঁয়ে তাকিয়ে পালতোলা নাও আর দেখি না। কদাচিৎ মাছ ধরার কিছু ছোট নাও। সেই হাওর, সেই হাওরের জল, উতালপাথাল করা ঢেউ, মাঝি, গাছগাছালি—সবই ছিল, শুধু শাহ আবদুল করিমের দেহে প্রাণ ছিল না। আগের দিন শেষ রাতে সিলেটের এক হাসপাতালে মারা গিয়েছিলেন তিনি।

২০০৫ সালে, শীতকালে উজানধল গ্রামে

১০ বছর হয়ে গেল। শাহ আবদুল করিম আমাদের মধ্যে সশরীর নেই। কিন্তু তিনি কি আসলে নেই?
আমার মাঝেমধ্যেই মনে হয়, লালন-হাসনের এই বাংলার সবচেয়ে ভাগ্যবান লোকগানের সাধক ছিলেন করিম। তাঁর জন্ম যদিও ১০০ বছর আগে, কিন্তু ৯৩ বছরের মোটামুটি দীর্ঘ জীবন লাভের কারণে বৈশ্বিক কারিগরি প্রযুক্তির সূচনাপর্বের স্বাদটুকু পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি। তাঁর আগের কারও তো বটেই, তাঁর সমসাময়িক কোনো বাউলকবি, লোককবিও এই সুযোগ পাননি।

মৃত্যুর কিছুদিন আগে তার রচনাসমগ্র প্রকাশ হয়। সে অনুষ্ঠানেও তিনি বসে বসে তাঁর উপর বানানো প্রামাণ্যচিত্র দেখেন

ভাটি অঞ্চলের প্রকৃতিটাই এমন যে এখানকার সাগরসমান হাওর, ঢেউয়ের কলকল তান, মাঝিমাল্লার আনাগোনা—এসব দেখে দেখে আর বাড়ির পাশের পানির কিনারে বসে বসে ধ্যান করতে করতে কিংবা লিলুয়া বাতাসে নৌকায় চড়তে চড়তে কতভাবেই না এ অঞ্চলের মানুষ দরাজ গলায় প্রকাশ করে গান। সে কারণেই হয়তো দেশের বারো আনা লোককবির জন্মই এই বিস্তীর্ণ ভাটিবাংলার জলজ অঞ্চলে। কিন্তু তাঁদের কজনকেই-বা তাঁদের কালের পরে মানুষ চিনতে পেরেছে, দেখতে পেরেছে, বা তাঁদের কণ্ঠের গান শুনতে পেরেছে? প্রযুক্তির কাছাকাছি থাকার সুযোগও তাঁদের হয়নি।
শাহ আবদুল করিম রেডিও পেয়েছিলেন। সিলেট বেতারে ‘আবদুল করিম ও তাঁর সঙ্গীরা’র গাওয়া ছয়-সাতটি গান ধারণ হয়েছিল। অশীতিপর করিম জীবনে কয়েকবার টেলিভিশন দেখেছিলেন বটে, কিন্তু তিনি নিজেও টেলিভিশনের ভেতর থেকে কথা বলে উঠবেন, এমনটি কখনো ভাবেননি। টেলিভিশন কী জিনিস, ভালো ধারণাও তাঁর ছিল না। শুধু তা-ই নয়, ৯৩ বছর বয়সে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে কোটি কোটি দর্শকের সঙ্গে তাঁর নিজেকেও ‘ভাটির পুরুষ’রূপে দেখার সুযোগ তিনি পেয়ে গিয়েছিলেন।

বামের ছবি ১৯৯৭ সালে হুমায়ূন আহমেদের সাথে, ডানের ছবি ২০০৪ সালে হুমাহূন আহমেদ যখন স্মৃতিচারণ করছেন শাহ করিমকে নিয়ে

মাঝেমধ্যেই আমার এমনটি মনে হয় যে শাহ আবদুল করিম আমাদের লোককবিদের শেষ প্রজন্ম। এরপর হয়তো আমরা আর লোকগান পাব না, লোককবিও না। কারণ, সময় বদলেছে, পরিবেশ বদলাচ্ছে। লেখাপড়া করা শিক্ষিত ‘ডিজিটাল প্রজন্ম’ এসে এখন ‘লোক আঙ্গিক’-এর গান ধরছে। করিমের বাড়িতে যাওয়ার জন্য নৌকা ছাড়া গতি ছিল না। এখন সেখানে রাস্তা হয়েছে। বর্ষাকালেও গাড়ি চালিয়ে যাওয়া যায় তাঁর বাড়ি।
আমাদের খাল-বিল শুকিয়ে যাচ্ছে। ইঞ্জিনের নৌকার কারণে ফুরিয়েছে মাঝিমাল্লাদের দরকার। বাঁশের সাঁকো, খেয়া পারাপারের দিন—সব শেষ। এখন ব্রিজ হয়ে গেছে, দীর্ঘ সেতু হয়ে যাচ্ছে বড় বড় নদীতে। লোক আঙ্গিকের গানের নতুন নতুন যেসব মেটাফর আমরা আগের আমলের লোককবিদের কাছে পেতাম, সেসব এখন আর পাব না। গ্রামীণ সমাজ থেকে নৌকা করে নাইয়র যাওয়ার জন্য গ্রাম্য বধূর কাতরতার কাহিনি হয়তো নতুন করে শুনব না আর। যা কিছু শুনব, যাঁদেরটা শুনব, তাঁদের মধ্যকার শেষ মানুষটি ছিলেন শাহ আবদুল করিম। তবে যাওয়ার আগে প্রায় শ পাঁচেক লোকগান রেখে গেছেন লোকগানের এই সম্রাট। আমরা এখন সেসব শুনছি নানা আঙ্গিকে।
শাহ আবদুল করিম নামের কালনীপাড়ের সাদাসিধে হতদরিদ্র বাউলকে সুরমার সীমানা পার করিয়ে প্রথমে বড় আকারে মানুষের সঙ্গে পরিচিত করান হাবিব ওয়াহিদ। টেমসের পাড়ে বসে সুরমাপাড়ের কিছু গানকে নতুন আঙ্গিকে প্রকাশ করেন তিনি। সেই গানগুলো প্রাণভরে উপভোগ করতে থাকে দেশ-বিদেশের তরুণ প্রজন্ম। নতুন করে করিম-কাহিনির শুরু এখান থেকেই। তারপর ঘটল নানা ঘটনা—প্রামাণ্যচিত্র, আজীবন পুরস্কার, সম্মাননা—এসব। বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান করিমকে সম্মাননা দিতে পেরে নিজেরাই সম্মানিত হতে থাকল।

২০১০ সালে শাহ আব্দুল ক্রিমের জীবন ও দর্শন নিয়ে মঞ্চস্থ হয় নাটক ‘মহাজনের নাও’

করিমের মৃত্যুর পরের বছর তাঁর জীবন ও দর্শন নিয়ে লেখা হলো মঞ্চনাটক। দীর্ঘ ৯ বছর ধরে মহাজনের নাও নামের নাটকটি যেভাবে দর্শকদের ভালোবাসায় সিক্ত হচ্ছে, তা তো কেবল শাহ আবদুল করিমের জন্যই। তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রও হয়েছে—রঙের দুনিয়া। জীবনের শেষ বছরে তাঁর লেখা সব গানের সংকলন প্রকাশিত হয়েছে এবং অসুস্থ শরীর নিয়ে মৃত্যুর কয়েক মাস আগে নিজে মঞ্চে বসে বইটির প্রকাশনা উৎসবও তিনি দেখেছেন।
এসব লিখতে লিখতেই মনে হলো কতটা বৈচিত্র্যময় তাঁর জীবন! আরও মনে হলো, শাহ আবদুল করিমের চেয়ে আমিও তো কম ভাগ্যবান নই। লালনকে দেখিনি, হাসনকে দেখিনি, রশিদউদ্দিন, জালাল খাঁ, উকিল মুন্সী, আবদুস সাত্তার, কামালউদ্দিন, দুর্বিন শাহ—এঁদের কাউকে আমি দেখিনি, কিন্তু শাহ আবদুল করিমকে আমি দেখতে পেয়েছিলাম, যিনি নিজের কণ্ঠে আমার সামনে গেয়েছেন, ‘বাউল আবদুল করিম বলে’—এটা কী কম ভাগ্যের ব্যাপার!

২০১৭ সালে শাহ আব্দুল করিমের বাড়িতে
২০১৭ সালে শাহ আব্দুল করিমের উজানধল গ্রামে

ভেতরে ও বাইরে আবদুল করিমেরধল গ্রামের সেই বাড়ির রূপ বদলে গেছে এখন। করিমের জীবদ্দশায় যেসব বাউল বা লোকগানের শিল্পী, অনুসারী, ভক্তকুলের সমাবেশ সেখানে হতো, এখন আর তা নেই। এর মধ্যে চলে গেছেন তাঁর সবচেয়ে বড় অনুরাগী শিষ্য রুহী ঠাকুর। পাশের বাড়ির ব্রাহ্মণ দুই সহোদরের মধ্যে বড় ছিলেন তিনি। তবে ওই গ্রামে এখনো আছেন রুহী ঠাকুরের ছোট ভাই রনেশ ঠাকুর। রুহী ঠাকুর নিজেও গান লিখতেন, সুর করতেন। আবদুল করিমের অনেক গান ছিল তাঁর সুর করা। ওস্তাদের প্রতি সম্মান দেখাতে গিয়ে নিজের গান খুব গাওয়া হতো না তাঁর। করিমের অন্য বড় শিষ্য ছিলেন বাউল আবদুর রহমান, যাঁর জীবনের ৩৫ বছর ছিল বাউল করিমের সঙ্গে। অসুখ-বিসুখ থেকে গানের আসর পর্যন্ত তিনিই ছিলেন তাঁর প্রধান সহকারী। কিন্তু তিনিও এখন আর ধলমুখী হন না। হবেন কেন? যাবেন কোথায়? কে তাঁকে সমাদরে গ্রহণ করবে?
২০১৭ সালে শাহ আব্দুল করিমের বাড়িতে , তাঁর কবরস্থান২০০৯ সালের পর ২০১৪ ও ২০১৭—আরও দুবার গিয়েছিলাম শাহ আবদুল করিমের বাড়িতে। তখন দারিদ্র্যের সঙ্গে অবহেলার সংযোগও দেখেছিলাম। শা’ করিম ও সরলার যুগল কবরের পাশে তাঁর নামফলকটিও পড়ে ছিল ভাঙাচোরা অবস্থায়। সম্প্রতি দুটি বেসরকারি সংস্থার বিনিয়োগে একটা ছোট স্মৃতি জাদুঘর হয়েছে করিমের বাড়িতে। সেখানে কিছুটা গুছিয়ে রাখা আছে করিম-স্মৃতির কিছু স্মারক।
আর সেই জাদুঘরের পাশের ‘শা’ করিম জাহানের সরলা মহল’-এ পাশাপাশি শুয়ে আছেন আমাদের লোকগানের শেষ সম্রাট শাহ আবদুল করিম।

মন্তব্য
Loading...