পলাশকাহিনী ঃ সোনার দিনে রূপার কথা

স্থপতি ও শিল্পী মুস্তাফা খালিদ পলাশের সুবর্ণ জয়ন্তীতে লেখা , ২০১৩ সালে

১৯৮৭ সালের কথা। আমরা তখন সেকেন্ড ইয়ার (প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য অনুষদ)-এ। ‘ত্রিমাত্রা’ নামে একটা সংকলন বেরুবে স্থাপত্য বিভাগ ছাত্র সংসদেও একুশে প্রকাশনা । সংসদের সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক হিসাবে আমার নাম যাবে। এটুকুই শুধু আমার। বাকী কাজ সব সিনিয়াররা করেন, আমি তাদের ফুট ফরমায়েস খাটি। ছাত্র সংসদের লিডার তখন হাবিব ভাই, জগলুল ভাই। তারা যে যে আদেশ দেন সে আদেশ পালন করতে করতে আমার লেখা যোগাড় হয়, সেলোফেনের উপর পেস্টিং হয়। চার ফর্মার সেলোফেন নিয়ে আমি বাবু বাজারের হক প্রিন্টার্স আর ডিপার্টমেন্টে দৌড়াদৌড়ি করে ক্লান্ত। কিন্তু ক্লান্তি মুখে প্রকাশ করা যাবে না। একুশে ফেব্রæয়ারির ভোরে বাংলা একাডেমির মাঠে টেবিল নিয়ে গিয়ে ওখানে একুশে সংকলন সাজিয়ে আমাকে বসে থাকতে হবে। প্রায় সব কাজ শেষ, মূল কাজ বাকী। এর কভার কোথায় কিভাবে কখন ছাপা হবে আমি জানি না। জগলুল ভাই ঝাড়ি দিয়ে বলেন- ওটা আমরা দেখছি, তুমি ইনার ছাপাও।
একুশে ফেব্রæয়ারির দুই দিন বাকী, আমি কভারের কিছুই জানি না। এক বিকেলে জগলুল ভাই বলেন, তুমি পলাশের সঙ্গে যোগাযোগ কর- ও কভার রেডি করে ফেলেছে।
আমি ফিফথ্ ইয়ারের বারান্দায় দাঁড়িয়ে পলাশ ভাইকে খুঁজি। এক সময় ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে এলেন একজন। চিক চিকে কালো রং এর এক তরুণ, ঝাকড়া চুল, হাতে একটা স্কেচ বুক। স্কেচবুকের মধ্যে একটা পাতা বের করে আমাকে কী কী যেনো বলেন। সব কথা মনে নাই, যে ক’টি শব্দ মনে আছে তাহলো, রিভার্স, টাইপ, পজেটিভ, নেগেটিভ, ভিগনেট, স্ক্রীন… এসব আরো কতো কী যেনো। এ শব্দগলো বলে একটা ট্রেসিং পেপারে হাত পা বাঁধা, মুখে কুলুফ আটকানো একটা মানুষের স্কেচ আঁকা ছবি আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে তিনি যখন চলে যাবেন আমি বললাম, ভাই, আমি তো এগুলো কিছুই বুঝতে পারছি না। আমি এগুলো কিভাবে করবো?
তিনি বলেন, পল্টনে দোকান আছে। ওখানে এগুলো করে, চেনো তো?
জ্বী না।
পলাশ ভাই মাথা চুলকান। আমার হাত থেকে কাগজগুলো ফেরত নেন। বলেন, কাল দশটায় ডিপার্টমেন্টে আসো, আমি নিয়ে যাবো।

১৯৮৮ সালে ৫ম বর্ষের সতীর্থদের সাথে পলাশ ভাই

পরদিন দশটার আগেই ডিপার্টমেন্টে পৌঁছে আমি বসে বসে অপেক্ষা করি। পলাশ ভাই এক সময় এলেন। একটা রিকশা নিয়ে আমরা পল্টনে যাই। কিন্তু সেদিন শুক্রবার। পল্টনের যে দোকানেই তিনি আমাকে নিয়ে যান, সে দোকানেই তালা মারা। আমার হাতে সময় চব্বিশ ঘন্টার কম, কিন্তু কভার কী করে হবে আমি বুঝতে পারি না। ৪/৫ দোকান বন্ধ পাবার পর ফকিরাপুলের কোনো এক চিপার ভেতর ঢুকে দোতলায় উঠৈ একটা অতি নোংরা ঘরের মধ্যে তিনি আমাকে নিয়ে যান। আমার সামনেই তিনি ওসব কথা বলেন। লোকটি ডার্ক রুমের মতো একটা ঘরে গিয়ে মিনিট দশেক পরে ফেরত আসে। তার হাতে একটা ‘পজেটিভ’। আমরা বর্গইঞ্চির হিসাবে তার বিল পরিশোধ করি। ওখানকার পুরো কাজটি করতে সময় লাগে প্রায় আধাঘন্টা। এরপর আমার হাতে ওটা ধরিয়ে দিয়ে বলেন, প্রেসে দিয়ে দিলেই ওরা ছেপে দেবে। কাগজের মাপ দেখিয়ে বললেন, প্লেটে কিছু কাগজ বেঁচে যাবে, ওগুলো কোনো কাজে লাগবে না। বাকী অংশ এভাবে বসিয়ে দেবে, একটা পোস্টারও হয়ে যাবে।
এরপর আমার আর বেশী সময় লাগেনি। পরবর্তী ঘটনা সমূহ খুব দ্রুত ঘটে যায়। সারারাত প্রেসে বসে থেকে থেকে আমি দেখি কেমন করে প্লেট বানানো হয়, কেমন করে ছাপে, কাটা হয়, বাঁধাই হয়। একুশে ফেব্রæয়ারির বিকেলে আমরা বসে থাকি বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউজের সামনে একটা টেবিল নিয়ে। আমাদের ২/৩টা চেয়ারও ছিলো। ডিপার্টমেন্টের বড়ভাইরা ত্রিমাত্রার স্টলে এসে ভিড় করেন। তাদেরকে চেয়াওে বসতে দিয়ে আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ‘ত্রিমাত্রা’ বিক্রির চেষ্টা করি। চেনা পরিচিত লোক পেলে ডেকে এনে পাঁচটাকার বিনিময়ে বিক্রি করি এক একটি ‘ত্রিমাত্রা’। এক সময় পলাশ ভাইও আসেন স্টলের কাছে। একটা চেয়ার নিয়ে তিনিও বসে থাকেন ঘন্টার পর ঘন্টা। বন্ধু বান্ধব পেলে ডেকে এনে পত্রিকা গছান। পত্রিকা বিক্রির টাকা থেকে আমি তাদেও জন্য বাদাম কিনে আনি।
এই ছিলো মোস্তফা খালিদ পলাশের সঙ্গে আমার পরিচয়ের প্রথম ঘটনা। এরপর আরো প্রায় এক বছর আমরা তাঁকে পেয়েছিলাম ডিপার্টমেন্টে। তাঁকে আমার দ্বিতীয়বার দরকার হয়েছিল প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের রজত জয়ন্তী অনুষ্ঠানের সময়। ‘এই জানালায়’ নামে ‘রজত জয়ন্তী’র সে স্মরণিকা প্রকাশ হয়েছিল সেটিরও সম্পদনার দায়িত্ব ছিলো আমার উপর এবং তার প্রচ্ছদটির ডিজাইন করার জন্যও অবধারিতভাবে দায়িত্ব পড়ে পলাশ ভাইর। স্মরণিকা উপ-কমিটির সদস্য হিসেবে এর সম্পাদন কষ্কে আমাদের এক সঙ্গে বসতে হয় বেশ কয়েকবার। তিনি আমাকে দেখিয়ে দেন কোন পাতা কিভাবে মেকাপ দিতে হবে, এসব।

১৯৮৮ সালে বুয়েটের রজত জয়ন্তী অনুষ্ঠানের সাজসজ্জ্বা কমিটির আহবায়ক ছিলেন পলাশ ভাই। শুধু তাই নয়, রজত জয়ন্তী উপলক্ষ্যে যে গান লেখা হয়েছিলো তারও সুর করেছিলেন তিনি । সূচনার সময় সে গানটি গাওয়া হয়েছিলো।

এক সময় তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হয়ে আসে। ডিপার্টমেন্টের পোলাপাইনের মুখে শুনি পলাশ ভাইর থিসিস নাকি ‘ফাটাফাটি হইছে’। তার জুরী প্রেজেনটেশনের সময় উপচে পড়া ভিড় ছিলো লবিতে। ডিজাইনের ছাত্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবেনই তিনি ছাত্রদের মধ্যে তারকাখ্যাতি পেয়ে যান। শুধু ডিজাইনেই ভালো ছিলেন তিনি, থিয়োরীতে সে রকম নন। আমরা তাকে আর শিক্ষক হিসেবে পেলাম না। তিনি বেরিয়ে এসে কাজকাম করতে থাকেন। আর তাঁর কাছ থেকে পাওয়া সেই গ্রাফিক ডিজাইনের জ্ঞান নিয়ে পরবর্তীতে আমি বেশ কটি প্রকাশনার কাজ কওে আলগা কিছু উপার্জনের বন্দোবস্ত করি। বাকী জীবনে ছাপাছাপির কাজের জন্য আমার অন্য কোনো গুরুর প্রয়োজন হয়নি।

উপরে বামে স্মরণীকা কমিটি, ডানে সাজসজ্জ্বা কমিটি আর নীচে সাংস্কৃতিক আয়োজন কমিটি- রজত জয়ন্তীর তিন জায়গাতেই ছিলো তাঁর সদম্ভ বিচরণ । ১৯৮৮ সাল, বুয়েট।

২৫ বছর আগে, বুয়েটের রজত জয়ন্তী’র কারণে পরিচয়ের সূত্রপাত হয়েছিল তাঁর সঙ্গে। এখন সময় গিয়েছে আরো ২৫ বছর। এই ২৫ বছরে মোস্তাফা খালিদ পলাসের বাবরী কেশরে আরো অনেক পালক যুক্ত হয়েছে। তাঁর ৫০তম জন্মদিনে এই স্মরণিকা অনেকেই সেসব সাফল্যের কথা লিখবেন। আমি ওগুলো লিখে কলেবর বাড়াতে চাইনা। তাঁর এই সোনার জয়ন্তীতে আমি আমার সেই রূপার স্মৃতি নিয়েই থাকতে চাই। আচ্ছা, না হয় তার প্লাটটিনাম জুবিলিতে আরেকটা বড় লেখা দেবো নে!

২০১৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ দিন খুব বড় আয়োজন করে পলাশ ভাইর ৫০তম জন্মদিনের উৎসব করি আমরা । বামের ছবিটা প্রথম দিন, প্রথম প্রহরে। ডানের ছবি, আমার এক জন্মদিনে পলাশভাই যখন গান গাইছেন, ২০১৭ সালে।
মন্তব্য
Loading...