মোজাম্মেল বাবু যখন শিকারী ছিলেন

বুয়েটকালের স্মৃতিকথা ১৯৮৬

মুরগীধরার কাল
বুয়েট ক্যাম্পাসে পা রেখে প্রথম সপ্তাহেই বুঝে ফেলি, আমরা এক একজন রাজনীতি করা বড় বড় ভাইদের কাছে কতোটা কদরের। একেবারে উপরের দিকে যারা আছেন, তারা মাঝের সারির ভাইদের দায়িত্ব দিয়ে রেখেছেন, মুরগী ধরে আনার জন্য। এই মুরগীরা হচ্ছে, ক্যাম্পাসে নতুন আগমনকারীরা।

এমনিতে বুয়েটে যে ছাত্ররা সুযোগ পায়, তারা প্রধানত: মেধাবী। এই মেধাবী ছাত্ররা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত কোনো দলের মিছিল মিটিং-এ যেতো না। মিছিলকারী, মিটিংকারীরা সেরাদের সেরা হতে পারে না। সুতরাং ধরেই নেয়া হয় যে, এরা একদম ফ্রেস, কোনোভাবে মাথাটা একটু ঢুকিয়ে নিতে পারলেই শরীরটা নিয়ে নেয়া যাবে।
এই ক্ষেত্রে ক্যাডেট কলেজের ছাত্ররা আরেক ধাপ এগিয়ে। এদের ক্যাডেট জীবনে রাজনীতি করার কোনো সুযোগই ছিলো না। হরতাল, ধর্মঘট, অবরোধ, এসবের কথা তারা পত্রিকায় পড়ে মাত্র, তাদের ক্যাম্পাসে এসবের চল তারা দেখেনি। সুতরাং এইসব আনকোরা ছাত্ররা বড় ভাইদের খুব পছন্দের।
আমি নিজেও মাঝে মাঝে নিজেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে থাকি। বিভিন্ন হল থেকে বিভিন্ন ক্লাসের বড় ভাইরা আমার রুমে টোকা দেন। আমি বেরুতেই বলেন, আর্কিটেকচারের শাকুর মজিদ এই রুমে না?
বড় ভাই ছাই হাতে ধরেছেন আমাকে। তার হাত থেকে কষ্টে নিজের ছাড়াই। কিন্তু আমি যে আরো বেশি পিছলা, এটা তিনি বুঝতে পারেন না। পরদিন কেনো, পরের এক সপ্তাহেই সেন্ট্রাল ক্যাফেতে আমি যাই না। সাড়ে দশটার টিফিন ব্রেকে বড় জোর আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টর পেছনে টিচার্স ক্যান্টিনের সামনের পিচ ঢালা পথের বসে উপর আমরা চা সিঙ্গারা খাই। আর দূর থেকে মিছিলের শব্দ করলো।
একদিন এক স্টার লিডার আমাকে পাকড়াও করেন ডিপার্টমেন্টে এসে। নাম বলেন, মোজাম্মেল বাবু। এই নাম আমি ইতিমধ্যে শুনে ফেলেছি। তিনি কবিতা লেখেন। তাঁর কবিতার বই আছে এবং সাদা রং এর একটা প্রাইভেটকার তিনি চালান। তাঁর গাড়িতে সুন্দরী তরুণীও দেখেছি।
তিনি হন্ত দন্ত হয়ে বলেন, শাকুর মজিদ না তুমি?
জ্বী ভাই।
দুইদিন ধরে তোমাকে খুঁজতেছি। তোমার রুমেও গিয়েছি। তুমি নাই। আজ পেলাম। তোমাকে দরকার আমার।
জ্বী ভাই। বলেন প্লিজ।
আমি একটা পত্রিকা বের করি। এটা এখন থেকে তোমরা বের করবা।
আমি মহা আনন্দিত হয়ে পড়ি।
মোজাম্মেল বাবু আমাকে বলেন, আজ রাত দশটায় শহীদ স্মৃতি হলের অমুক রুমে আসো। রম্যর সাথে কথা হয়েছে, রম্যও আসবে। তোমাদের সাথে আরেক কবির পরিচয় করিয়ে দিব, ওর নাম আনিসুল হক। তোমরা তিনজন মিলে এটা বের করবা।
এবার আমি নিজেই ধরা দেই। রাতেরবেলা রম্যকে নিয়ে হাজির হয়ে যাই। আনিসুল হক আছেন, খাজা শাহান নামে আরেকজন আছেন, তিনি এর প্রকাশক। পত্রিকাটা দেখি। এটা চার পাতার একটা টেবলয়েড। কিছু কবিতা, কিছু জোকস, কিছু এরশাদ বিরোধী লেখা। নাম- শিকড়। পত্রিকার দাম- দুই টাকা।
বলা হলো, আগামী সংখ্যা থেকে তোমার আর রম্যর নাম ছাপা হবে সহকারী সম্পাদক হিসাবে। আর এই ৫০ কপি নিয়ে যাও। বিক্রি করে ১০০ টাকা এনে দিও। এই টাকা লাগবে পরের সপ্তাহের পত্রিকা বের করতে।
আমি পত্রিকা নিয়ে এসে বিক্রি করা শুরু করি। প্রথমেই পাশের রুমে যাই। তিনজন বড় ভাই আছেন। তিনজনের একজন আমাকে চিনেন। তিনি দুই টাকা দিয়ে একটা কিনেন। পাশের রুমের ভাইরা পত্রিকা হাতে নিয়েই বলেন- ও এটাতো মোজাম্মেল বাবুর? না, না, লাগবে না।
আমি বলি, ভাই টাকা লাগবে না। এমনি রাখেন এক কপি। আমি এই পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক। সামনের সংখ্যায় আমার নাম ছাপা হবে এখানে।
বড় ভাই বলেন, তুমি বরং এক কপির টাকা নিয়ে যাও। এই পত্রিকা আমরা রাখি না।
কী বেরাছেরার মধ্যে পড়লামরে ভাই!
আমি ২দিন পর মোজাম্মেল বাবুর হাতে ৪০ টাকা গুজে দিয়ে বলি এই গুলো বিক্রি হইছে। বাকীগুলো আমার কাছে আছে।
তিনি টাকা রেখে বলেন, বাকীগুলো ফ্রী দিয়ে দাও।
আমি বলি, জ্বী ভাই। দিয়ে দিবো।
আর শোন—।
জ্বী ভাই।
আজ রাত দশটায় আমরা মিছিল বের করবো। তুমি কি একটি বারের জন্য আসবা? একবার এলেই হবে। আর লাগবে না।
আমি বলি, ভাই দেখি।
রাত আমার টিউশনী থেকে ফিরতে ফিরতে এগারোটা বাজে। আমি আরো কিছু সময় রাস্তায় কাটিয়ে দেরীতে হলে ফিরি।
আর দূর থেকে বুয়েটের আন্দোলন করা দেখি।

বর্ণিত ঘটনার প্রায় দুই যুগ পর একাত্তর টিভিতে আব্দুন নূর তুষারের ডাকে এক অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখি সাবেক ওস্তাদ-সাগরেদ একসাথে। আমিও বসে পড়ি ছবি তোলার জন্য। ঘটনা ২০১২ সালের ২৭ জুলাই।

লেখাটি ‘বুয়েটকাল’ বই থেকে একটু ছোট করে নেয়া

মন্তব্য
Loading...