কালিকা – রাঙিয়ে দিয়ে যাও গো এবার যাবার আগে

১১ সেপ্টেম্বর ২০২০, কালিকার সুবর্ণজয়ন্তীতে

কালিকার পিতামহ বছর আশি আগে যদি না শিলচরে চলে যেতেন, তবে তিনি আমার নিকট প্রতিবেশী হিসাবেই বেড়ে উঠতেন । তাঁর ঠাকুরদা কালিজয় ভট্টাচার্য নামকরা কবিরাজ ছিলেন। গত শতকের তিরিশের দশকে শিলচরে ডাক পড়েছিলো এক দূরারোগ্য রোগীর চিকিতস্যার জন্য। তাঁর চিকিৎসায় রোগী ভালো হয়ে গেলে তাঁর নাম ডাক হয়ে যায়। তিনি আর ফেরত আসেন না ।

এর কয়েক বছর পর দেশ ভাগ হয়ে গেলে বেশ কিছু হিন্দু সিলেট ছেড়ে আসামে চলে যান। কালিজয় ভট্টাচার্য তাঁর আরো কিছু আত্মীয় স্বজনকেও নিয়ে যান। বসবাস করা শুরু হয় শিলচরে। আমাদের মাথিউরা গ্রাম থেকে গোলাপগঞ্জের ঢাকাদক্ষীন গ্রাম মাইল তিন-চার দূরে । এখনো তাঁর কিছু আত্মীয়-স্বজন রয়ে গেছেন এখানে । কালিকার বাপ-চাচার জন্ম হয় শিলচরে। কালিকার জন্ম ১৯৭০ সালে। বয়েসে আমার বছর পাঁচেকের ছোট। আমি তাকে প্রথমে কালিকা’দা বলেই ডাকতাম। পরে দূরত্ব কমে এলে আমি নাম ধরেই ডাকতাম, ‘তুমি’ করে সম্বোধন করতাম। আমাকে ডাকতো- ‘শাকুর ভাই’। এই পুরো ঘটনা ঘটে যায় গত ৯ বছর ধরে। আমাদের সম্পর্কের সূচনা ঘটিয়েছিলেন বাউল শাহ আবদুল করিম। আর শেষাবধি এসেছিলেন হাছন রাজা। কিন্তু সেটা আর হয়ে উঠলো না।

কালিকার আগে দোহারের নাম শুনি ২০০০ সালেই, তাঁদের প্রথম এলবাম ‘বন্ধুর দেশে’ যখন বেরোয় । হঠাত করে চিনতে পারিনি তাঁদের। শুনি, এটা কলকাতার দল, কিন্তু গাইছে সব সুরমা পাড়ের গান। এরপর তাঁদের নতুল এলবাম বেরোলে আমি কলকাতা থেকে আনাই, এক সময় ঢাকার বাজারেও তাঁদের সিডি পাওয়া শুরু হলো । খবর নিয়ে জানি, যে লোকগুলো এ দলে আছে, তারা ভারতের শিল্পচরের অরিজিন। এক সময় যারা সিলেটের সঙ্গেই ছিলো, ডানা ভেঙে এখন শিলচর মাড়িয়ে কলকাতায় উড়ে এসেছে। এই দলের নেতা কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য।

সেই দোহারের সঙ্গে আমার সাক্ষাত পরিচয় হয় ২০০৮ সালের ২৮ আগস্ট। কলকাতার গোর্কি সদনে আয়োজন করা হইয়েছিল শাহ আবদুল করিমকে নিয়ে আমার বানানো তথ্যচিত্র ‘ভাটির পুরম্নষ’ এর উদ্বোধনী প্রদর্শনী । প্রদর্শনী শেষ মঞ্চে শাহ আবদুল করিমের গান গাইতে এলো ‘দোহার’ । দোহার-এর দলকর্তা কালিকাপ্রসাদকে মাঝখানে রেখে দাঁড়িয়েছে আরো ৫ জন। তাঁরা বাজাবেন, গাইবেনও। শুরুতে চমৎকার একটা বক্তৃতা করেন কালিকাপ্রসাদ। মুর্শিদ ধন হে, কেমনে চিনিব তোমারে – মুর্শিদ বন্দনার এই গান দিয়ে শুরু হয় তাঁদের সঙ্গিতায়জন। একেকটা গান গাওয়া হলে, সেই গান নিয়ে কিছু কথা বলা, এবং পরে সেই গান গাওয়া।

মঞ্চে গান গাইতে আসা কোন ব্যান্ড-দলকে আমি কখনো গানের এমন তর্জমা করতে শুনিনি । ধীরে ধীরে জানতে পারি, তিনি আসলে শুধু গায়কই নন, গানের গবেষকও। যথেষ্ঠ তৈরী হয়েই তিনি মঞ্চে এসে উঠেছেন।

একসময় আসর শেষ হয়। ধীরে ধীরে দর্শকেরা চলে যান। আমি যাই না। কেনো যেনো মনে হলো, কালিকাপ্রসাদকে সংযুক্ত না করলে আমার ‘ভাটির পুরুষ’ শেষ হবে না। দোহার গ্রিনরুমে গিয়ে বসলে পাকড়াও করি কালিকা কে।

কালিকা স্নাতক পাশ করেছিলেন শিলচরে, পরে কলকাতা এসে ভর্তি হন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে তুলনামূলক সাহিত্যে মাস্টার্স করে আবার  ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন অব্ আর্টসএর একটি ফেলোশিপ পেয়ে গবেষণা করেন  ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফোক সংগস অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়া  নিয়ে । আর সে জন্যই হয়তো বলেন, ‘যে ভাবে রুহী ঠাকুর বা রণেশ ঠাকুর বাউলের দিক্ষায় বড় হয়েছেন আমাদের বড় হওয়াটা ওইভাবে নয় । সুতরাং আমার আবদুল করিম পাঠের মধ্যে কোথাও রবীন্দ্রনাথ, কোথাও সায়েন্স , কোথাও মার্ক্স , কোথাও বা জীবনানন্দ ঢুকে যায়।‘

কালিকার বেড়ে ওঠা একেবারেই এক সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে, যেখানে একই সাথে শাস্থ্রীয় এবং লোকজ সঙ্গীতের সমান্তরাল প্রবাহ ছিলো । বাবা রামচন্দ্র ভট্টাচার্যের জন্ম শিলচরে।  তিনি ব্যবসায়ী, উত্সাহী ক্রীড়া সংগঠক ছিলেন । তারই তত্পরতায় শহরে গড়ে ওঠে ‘সংগীতচক্র’ ও ‘জয়দেব সংগীত সম্মেলন’।   মা গীতাঞ্জলিও গান গাইতেন । বাড়ির প্রায় সবাই গান বাজনা-নৃত্য নিয়ে মজে থাকতেন । কালিকার জ্যাঠা শ্যামাপদ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সাক্ষাত্ শিষ্য ছিলেন,  মেজ জ্যাঠা মুকুন্দমাধব লোকনৃত্যের স্বনামধন্য শিল্পী । লখনৌ-এর ভাতখণ্ড সংগীত মহাবিদ্যালয়ের লোকনৃত্য বিভাগ গড়ে ওঠে তার হাতে । কালিকার আরেক কাকা অনন্ত ভট্টাচার্য ছিলেন লোক গানের সমজদার ও শিক্ষক । তাঁর সঙ্গেই কালিকার সখ্য ছিল বেশি । তাঁর হাত ধতেই বালক কালিকা বরাকের এক মেলা থেকে আরেক মেলায়, পীর-ফকিরের দরগায়, উরস উৎসবে ঘুরে বেড়াতে। । অনন্ত লোকগান সংগ্রহ করতেন, আর বাড়িতে এসে এসব গানের সুরচর্চায় মগ্ন থাকতেন । তার কাছেই কালিকা লোকগান পরিবেশনের ‘টেকনিক’ শিখেছিলেন। এই কাকা অনন্ত ভট্টাচার্য চলে গেলেন ১৯৯৮ সালে। কালিকা তখন যাদব পুরে। কাকার স্বপ্নপূরনের জন্য কাকার গান গুলো কলকাতার মানুষকে শোনানোর জন্য সঙ্গি যোগাড় করেন। প্রথমে পেলেন রাজীব দাশ কে, যিনি গাইতেও পারেন। যোগেন দাশের সঙ্গে চুক্তি করলেন ঢাক বাজানোর জন্য, সুদর্শন নামক এক পানি-পুরী বিক্রেতাকে নিলেন দোতারা বাঁজাতে, সারিন্দা বাদক নিরঞ্জন হালদারকে আবিস্কার করেন এক রেল স্টেশনে। ব্যাস, তারপর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হয়ে গেলো অনুষ্ঠান। এক বন্ধু টি শার্টে ছবি একে দিলো, আরেক বন্ধু কার্ড ছাপিয়ে দিলো, অভিক মজুমদার নাম দিয়ে দিলেন- দোহার, সেই থেকে শুরু হয়ে গেলো দল।

কালিকা বলেন, আমরা গানের শব্দ পাল্টাইনা, সুর পাল্টাইনা। রবীন্দ্রনাথের, লালনের বা শাহ আবদুল করিমের গান গাওয়া রিমেক নয়। লালনের সঙ্গে শাহ আবদুল করিমের ফারাকটা হচ্ছে এখানে। লালনের গানটা কুষ্টিয়া অঞ্চল থেকে একধরনের একটা সুর উঠে এসেছে। শাহ আবদুল করিম কিন্তু নিজে সুর বসিয়েছেন গানগুলোর মধ্যে। একজন কম্পোজারের গান নানার জায়গায় নানান মানুষ যখন গাইবে তার মধ্যে ভিন্নধর্মি কিছু জিনিস ঘটতেই থাকবে। রবীন্দ্রনাথের গান হেমন্ত বন্দোপাধ্যায়, দেবব্রত বিশ্বাস, কণিকা বন্দোপাধ্যায় অনেকে গেয়েছেন। সবার গান কিন্তু এক রকম নয়। স্বাধীনতা সব শিল্পীরই থাকবে। কিন্তু’ স্বাধীনতা আর স্বেচ্ছাচারিতা একজিনিস নয়।

দোহার নতুন গান লেখে না, তারা আমাদের শেকড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গানই খোজে খোজে নিয়ে এসে নাগরিকদের কাছে পরিবেশন করে। রবীন্দ্রনাথ, লালন থেকে শুরু করে শাহনূর, শিতালং, শেখ ভানু, রাধারমন, আরকুম শাহ, হাসন রাজা, রশীদ উদ্দিন, উকীল মুন্সি, দুরবীন শাহ, আব্দুল করিম পর্যন্ত সকলেরই গান করেন। শিলচর-করিমগঞ্জ বা সিলেটের ভাটির ভাজে ভাজে যেসকল মরমী কথা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সেসবের হাজার পাচেক গান তাঁদের ভান্ডারে আছে। এপর্যন্ত ১০টি এলবামে দেড় শতাধিক গান তাঁরা ছেড়েছেন বাজারে।

এসব কথা সবই আমি রেকর্ড করি । আমার মনে হলো, তাঁর এই কথাগুলো ছাড়া আমার এই প্রামাণ্যচিত্র অসম্পূর্ণই থেকে যেতো। পরে ঢাকায় এটি প্রচার করার আগে অন্য অংশ ৫ মিনিট ফেলে দিয়ে কালিকা’দার সাক্ষাতকার আর গান জুড়ে দিই।

এরপর ঠিক কোন ঘটনা আমাদেরকে কাছে টানে, আমি ঠিক মনে করতে পারছি না। হঠাৎ একদিন শুনি ‘দেশ টিভি’তে ‘লাইভ শো’তে কালিকা আমার কথা কী যেন বলেছেন। সম্ভবত; ‘ভাটির পুরুষ’ নিযে কিছু। আবার একজন বললেন, কালিকা ঢাকায় এসেছেন, আপনার নাম্বার নিয়েছেন। আমি তার কাছ থেকে কালিকার বাংলাদেশের নাম্বার নিয়ে ফোন করি। আমাদের দেখা হয়। কলকাতার নাম্বার রাখি। কলকাতা গেলে তাঁকে ফোন করি। তিনি হয়তো শো শেষ করে রাত এগারোটায় আমার হোটেলে চলে আসেন। আমাদের আড্ডা চলে মাঝরাত অবদি। আড্ডার বিষয় গান। গান মানে সব সিলেটের গান। করিম-হাছন আমাদের প্রধান বিষয়। আমরা কথা বলি সিলেটের খাস আঞ্চলিক ভাষায়। আলাপের এক পর্যায়ে আমাদের সম্পর্ক পাল্টে যায়। আমি তাকে ‘তুমি’ করে বলি, ‘দাদা’ কেটে শুধু ‘কালিকা’তে চলে আসি।

কালিকা আড্ডা প্রিয় ছিলো। ২০১৪ সালের ১২ মার্চ। আমি আছি কলকাতায় স্থপতি আরিফ ভাইর সঙ্গে।  । কলকাতার আমার স্থপতি বন্ধুরা ধরলো, কালিকার সঙ্গে আড্ডা দেবে। তাঁরা সবাই কালিকাকে দেখেছেন টেলিভিশনে। সামনা সামনি দেখেননি। আমি কালিকাকে ফোন দেই।

  • দুই বাংলার ক’জন স্থপতি বন্ধু তোমার সঙ্গে আড্ডা দেবে, গান শুনবে, আসবা?
  • কোথায়? কখন।
  • বেঙ্গল ক্লাব, সন্ধ্যায়।
  • আটটায় আমার শো শেষ হবে, আমি আটটা তিরিশের মধ্যে পৌঁছাবো।

আটটা পঁচিশে দরোজায় বেল। কালিকা এসে গেছে। আমরা দশ বারো জন শ্রোতা। সবাই সাংঘাতিক সমীহ করলেন কালিকাকে। কালিকা দুই বাংলার ফোকের দু’রকমের ধারার গল্প শোনালো। বর্ধমান বা বাকুড়ার গানের তত্ত্বকথা বা সুর কেন করিম-হাছন বা লালনের থেকে আলাদা হলো, তার গল্প। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে দুই চার লাইনের গান। এলো দেশ বিভাগের গল্প।

কলকাতায় বসে যে বাঙালরি সঙ্গেই কথা হোক না কেন, কোনো না কোনভাবে দেশ বিভাগের কাহিনী এসে যায়। কালিকা শোনালেন তার পূর্ব পুরম্নষের কাহিনী। কথা হলো হেমাঙ্গ বিশ্বাস আর তার ছোট কাকাকে নিয়ে। যে-ই না হেমাঙ্গ বিশ্বাসের  –

হবিগঞ্জের জালালী কইতর সুনামগঞ্জের কুড়া
সুরমা নদীর গাংচিল আমি শূন্যে দিলাম উড়া
শূন্যে দিলাম উড়া রে ভাই যাইতে চান্দের চর
ডানা ভাইঙ্গা পড়লাম আমি কইলকাত্তার উপর,
তোমরা আমায় চিননি…

আমাদের আড্ডায় আছেন পশ্চিমবঙ্গ স্থপতি ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন ও বর্তমান প্রেসিডেন্টসহ আরো জনা দশেক স্থপতি। কিন্তু আড্ডার বিষয় স্থাপত্য নয়, দুই বাংলার লোক গান। একক বক্তা কালিকপ্রসাদ। আর বাকীরা সবাই শ্রোতা।

এর মধ্যে দু’বার আমদের কাছে বার্তা এলো। পাশের কামরা থেকে অনুরোধ এসেছে আমাদের ঘরের শব্দ তাদের ঘুম পাড়তে দিচ্ছে না। এবার থামতে হয়। রাত বারোটায় আমাদের দু’জনকে কামরায় ফেলে সবাই চলে যান। যাবার আগে, শেষ গান গাইলো কালিকা- একটা রবীন্দ্র সঙ্গীত

রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও যাও গো এবার যাবার আগে
তোমার আপন রাগে, তোমার গোপন রাগে
তোমার তরুণ হাসির অরুণ রাগে
অশ্রুজলের করুণ রাগে।।

লালন গীতির সঙ্গে এর আগে মিলিয়ে অনেকগুলো রবীন্দ্র সঙ্গীতও শুনিয়েছিল কালিকা। কিন’ এই গানের গায়কীটা যেনো অন্যরকম ঠেকলো। মর্মে মর্মে লেগে থাকা কথা।

২০১৪ সালে ১-৪ আগস্ট ‘সহজ পরব’ নামে চার দিনের একটা ইন্দো-বাংলা লোক উৎসবের (রুট মিউজিক ফেস্টিভ্যাল) আয়োজন করেন কালিকা। তার সঙ্গে আরেক গুণী শিল্পী লোপামুদ্রা মিত্র। এই দু’জন মানুষ মিলেই পুরো ভারতের গুণী তারকা পর্যায়ের লোকগানের শিল্পীদের সম্মেলন ঘটান। বাংলাদেশ থেকেও শফি মন্ডল আর চন্দনা মজুমদার গিয়েছিলেন। সমাপনী দিনে  ‘বাংলাদেশ সন্ধ্যা’য় আয়োজন ছিলো শাহ করিমকে নিয়ে আমার লেখা সুবচনের মঞ্চ নাটক ‘মহাজনের নাও’। কী সম্মানটাই না আমরা পেয়েছিলাম সে আসরে। বিদুষী গিরিজা দেবী উদ্বোধন করেন অনুষ্ঠান, স্বাগত বক্তব্য দেন বিভাস চক্রবর্তী, নাটক শেষে কথা বলেন গৌতম ঘোষ, প্রসেনজিৎ। কলকাতার রবীন্দ্র সদনে কালিকাই ভাসিয়েছিলো আমাদের মহাজনের নাও।

এর কিছুদিন পর, ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে কলকাতার ১০ সদর স্ট্রিটের হোটেল প্লাজার এক কামরায় আরেক সন্ধ্যায় আমরা মিলিত হই। ‘ইন্দো-বাংলা সিলেট উৎসব’ – এর রেকি করতে আমাকে পাঠানো হয়েছিল কলকাতায়। গভীর রাত পর্যন্ত আমাদের আড্ডা চলে। সে আড্ডায় শরীক ছিলেন কলকাতার মাসিক আরম্ভ পত্রিকার সম্পাদক বাহারউদ্দিনও। এই আড্ডায় কালিকা আমাকে ভিন্ন রকমের একটা প্রস্তাব দেয়। বলে- ‘মহাজনের নাও’ এর মতো আরেকটা গীতল নাটক তাকে লিখে দিতে। বিষয়- হাছন রাজা। এই নাটক ভিন্নভাবে মঞ্চে উপস্থাপিত হবে। হাছন রাজার চরিত্রে অভিনয় করবে সে নিজে এবং মঞ্চে যতগুলো গান থাকবে, সে এবং তার দলের শিল্পীরা গাইবে। গানের মাঝে নাটকের যে সংলাপ থাকবে, সেটাকেও গীতে রূপানত্মর করে তারা দুই ঘন্টার একটা স্টেজ প্রোগ্রাম-এ প্রদর্শন করবে।

ঢাকা ফেরত এসে এই নাটক নিয়ে অনেক ভাবি।  হাছন রাজার উপর লেখা বই সংগ্রহ করে পড়তে পড়তে আমার বছর খানেক লেগে যায়। ২০১৫ সালের শেষ দিকে শেষ করি কাব্যনাট্য হাছনজানের রাজা

২০১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে বছরব্যাপী শাহ আব্দুল করিম জন্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠান শুরু হলে কালিকা তাঁর দল নিয়ে চলে আসেন সিলেট। ১৯ ফেব্রুয়ারি তাদের দলীয় পরিবেশনা দিয়ে শেষ হয় সিলেটের উৎসব। শুনেছি, প্রায় বীনে সম্মানীতে গান গেয়ে গেলেন।  সে আসরের শেষেও আমাদের সংক্ষিপ্ত আড্ডা হয় সিলেটে। সঙ্গে তাঁর স্ত্রীও ছিলেন।

এর কিছুদিন পর , ৭ মার্চ ২০১৬ আমার বনানীর অফিসে তার সঙ্গে আড্ডা হয়। সে আড্ডাও ছিলো খুব ছোট। তখন কালিকা ভূবন মাঝি র সঙ্গীত পরিচালনার কাজটা হাতে নিয়েছে। রাতে এখান থেকে গিয়ে  ছবির পরিচালিকের বাসায় খাবে। পরদিন ভোর বেলা তার ফ্লাইট। আমার কাছ থেকে হাছনজানের রাজার স্ক্রিপ্ট নেবে, মঞ্চায়নের জন্য বিভাস দা কে কি বলবে এটা নিয়ে আলোচনা । সঙ্গে  ভিন্ন রকমের একটা প্রস্তাব দেয় কালিকা। বলে, কলকাতায় একটা ‘করিম সন্ধ্যা’ করা হবে আমাকে নিয়ে। মঞ্চের একপাশে  আমি, অপর পাশে কালিকা। মাঝখানে এলসিডি পর্দা। আমার ধারন করা শাহ করিমের নিজের কণ্ঠে গাওয়া ৮টি গানের প্রথম অন্তরা পর্দায় দেখানো হবে। পরের অন্তরাগুলো কালিকা গাইবে তার দল নিয়ে। প্রতিটা গান শেষে এই গান নিয়ে করিমের চিন্তার বিষয়টা আমাকে বলতে হবে দর্শকদের।

বছর খানেক ধরে কলকাতার জি বাংলাসারেগামা নামক গানের রিয়েলিটি শো টা আমাকে টানতে শুরু করে, যখন দেখি সেখানে কালিকা যুক্ত হয়েছে আর আমাদেরই ভাটি অঞ্চলের গানগুলোর নতুন রকমের ব্যঞ্জনা পাচ্ছে কালিকার স্পর্শে। খাটি দেশজ যন্ত্র ব্যবহার করেও যে অতি উচ্চমাত্রার সঙ্গিতায়ন করা যায়, কালিকা সেটা দেখালেন আর মুগ্ধ করলেন দুই বাংলার লোকগানের শ্রোতাদের। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত বা একুশের গানও যখন বাংলাদেশের শ্রোতারা শুনেছিলো তখনো তাদের মুগ্ধতার কমতি ছিলো না।

গঙ্গার বুকে থেকে যে কালিকার প্রাণ জুড়ে বয়ে যেতো সুরমার জলধারা, সেই কালিকাকে কতখানি সম্মান দিতে পেরেছিল তার সেই প্রিয় জনপদের মানুষেরা ? ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে দক্ষিণ কলকাতা সিলেট এসোসিয়েশন আর ঢাকার জালালাবাদ এসোসিয়েশন মিলে কলকাতার যোধপুর স্কুল মাঠে ৩ দিনের ইন্দোবাংলা সিলেট উৎসব করলো। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, সে উৎসবে নাই বিভাস চক্রবর্তী বা কালিকাপ্রসাদও। এর মধ্যে দোহার ভেঙ্গে গেছে। তার দলের কয়েকজন নতুন দল করেছেন, ‘সুরমা দোহার’। তাঁদেরকে ডাকা হলো অনুষ্ঠানের সমাপনী আয়োজনে। সেদিন দুপুরবেলা অনেকটা লুকিয়ে কালিকা দেখা করতে এলো আমাদের সঙ্গে। যোধপুর পার্কের এক কোনায় ফুটপাতের বেঞ্চিতে বসে আমি আর সিলেটের আমিরুল ইসলাম বাবু চা খেলাম কালিকার সঙ্গে। লজ্জায় আমি তাঁকে ভেতরে যেতে বলিনি। বললো, আমাকে তো কোন দাওয়াত দেয়া হয় নি। কী করে যাই!

একই রকমের ঘটনা ঘটে এ বছর জালালাবাদ এসোসিয়েশন ঢাকা যখন দুই দুই চার দিনের ‘আন্তর্জাতিক সিলেট উৎসব ২০১৭’ করে ঢাকা ও সিলেটে। উৎসবের মাস দুই আগে আমি তার সম্মতি নিতে ফেসবুক চ্যাটে বিষয়টা জানাই। এই সময়ে সে আসতে পারবে কি না, জানতেও চাই। সে অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানায় ডাকলেই আসবো।

তাঁকে ডাকা হয় নি। ঢাকায় যেদিন এ সম্মেলনের সূচনা হবে তার দু’দিন আগে তার সঙ্গীত পরিচালনায় বানানো ‘ভূবন মাঝি’ ছবির প্রিমিয়ারে সে এসেছিল। তাকে উৎসবে রেখে দেয়ার কোনো চেষ্টাও হয়নি।

৭ মার্চ ২০১৭। সেই আন্তর্জাতিক সিলেট উৎসবের শেষ দিনের আয়োজন যখন চলছে সিলেটে, সেদিন দুপুরবেলা এলো এই খবর! সিলেটের কামরুল আহবাব টিপুকে কলকাতা থেকে জানিয়েছে ডানা। তখন বাংলাদেশ সময় বেলা এগারোটা চল্লিশ। আমি মুহূর্তের মধ্যেই বিহ্বল হয়ে পড়ি। এভাবে হুট করে চলে যেতে হয় ?

ফেসবুক স্মরণ করিয়ে দেয়,  ঠিক এক বছর আগে এই সন্ধায়ই তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। সেটাই তবে শেষ দেখা ছিল? খুবই কাকতালীয়ভাবে, সে সন্ধ্যাতেই সিলেটে প্রথম মঞ্চস্থ’ হলো গীতি-কাব্য নাট্য ‘হাছনজানের রাজা’র নৃত্য-নাট্য রূপ। নাটকের শেষে আমরা কেবল কালিকাকে এই প্রদশনীটিই উৎসর্গ করেছিলাম।

কালিকা প্রিয় বন্ধু আমার, চলে গেছো। যাবার আগেই তোমার তরুণ হাসির অরুণ রাগে আমাদের রাঙিয়ে দিয়ে গেলে। আজ সুরমা আর গঙ্গা দুই নদীর জলধারায় অশ্রুজলের করুণ রাগ।

(লেখাটি ২০১৯ সালের মার্চ মাসে কালিকার মৃত্যুর পরেই প্রথম আলোতে ছাপা হয়। )
মন্তব্য
Loading...