কী যেন টানে

খালেদ হোসাইনের ৫০তম জন্মদিন উপলক্ষে লেখা

খালেদ হোসাইন নামক এক ছড়াকারের ছড়া পড়েছি ছোট বেলায়। ইত্তেফাকের কচিকাচার আসরে আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে। এই লোকটার সঙ্গেঁ আমার পরিচয় আরো পরে। তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, প্রাবন্ধিক আর কবি। আমি কবিতা বুঝিনা, কিন্তু কবিদের খুব পছন্দ করি। কবিদের মধ্যে যারা একটু সহজ সরল করে লেখেন, তাঁদের লেখা পড়ি। কিছু বুঝি, কিছু বুঝি না। খালেদ হোসেনের সুবিধা হচ্ছে, তিনি কবি এবং ছড়াকরও। তাঁর কিছু ছোট ছোট বাক্যবিন্যাস আমার মনে মাঝে মাঝে খুব নাড়া দেয়। বিশেষ করে অন্তমিলের খেলাটা তিনি খুব ভালো পারেন।

 

২০০৩ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে

খালেদ হোসাইনের জন্ম নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়। ছেলেবেলায় বড়বোনের হাত ধরে বেড়াতে যেতেন পরিদের বাড়ি। আকাশে পুঞ্জীভূত মেঘের শাদায় রবীন্দ্রনাথকে দেখে বিহ্বল হয়ে পড়তেন। কৈশোরেই বুকে বেদনার বীজ বুনে দিয়েছিলেন জীবনানন্দ দাশ। মা কবিতা লিখতেন, আর স্বপ্ন দেখতেন। একটা স্বপ্ন ছিল, এই ছেলে কবি হবে। খালেদ হোসাইনের কবিতায় জগৎটি ক্রামাগত রহস্যময় হয়ে উঠেছে। তিন দশক পরিব্যাপ্ত কাব্যসাধনার ফসল ইলা মিত্র ও অন্যান্য কবিতা (২০০০), শিকার-যাত্রার আয়োজন (২০০৫) ও জলছবির ক্যানভাস (২০০৬), পাতাদের সংসার (২০০৭), এক দুপুরের ঢেউ (২০০৮), পায়ের তলায় এসে দাঁড়িয়েছে পথ (২০০৯)। সংখ্যা খুব বেশী নয়, তবে বৈচিত্র-ভাস্বর। ব্যক্তিগত রোমান্টিকতা প্রসারিত হয়ে স্বদেশ-স্বকাল ছাপিয়ে সার্বজনীন ও সার্বভৌম হয়ে উঠেছে। কবিতার অন্তর্গত শিরা-উপশিরায় রক্তবদলই কেবল নয়, প্রাকরণিক নানা নিরীক্ষীয়ও তিনি কবিতাকে স্বতন্ত্র করে তুলেছেন। খালেদ হোসাইনের কবিতাকে চেনা যায়। লেখকের ধাতটা আলাদা, কবিতার জাতটাও আলাদা।

নানা ব্যক্তিগত অনুসঙ্গঁ তাঁকে আমার কাছে নিয়ে আসে প্রায় এক দশক ধরে। আমি মানুষটাকেও দেখি।
আমি মনে করি, কবিতা বোঝার আগে সেই কবিটাকে বুঝতে হয়। আমি কবিতা বোঝার জন্য নয়, সেই মানুষটাকে এমনি এমনিই বুঝতে চাই।
তাঁর যতো কাছেই গিয়েছি, ততোই মুগ্ধ হয়েছি। হেলা ফেলায় পড়ে থাকা গ্রন্থের মতোই তার সবগুলো পাতা খুব সহজেই খুয়ে যায়। ভেতর আর বাহিরকে খুব বেশী আড়াল তিনি রাখেন না। কথা বলেন কম, শোনেন বেশী। যেটুকু বলেন-মাপা, পরিমিত।

তাঁর বাড়িতে [বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্লাটে] বহুবার রান্নার আস্বাদন নিয়েছি। তাঁর ডাইনিং টেবিলটা খুব সমৃদ্ধ। যে কারনে এই পরিবারের সবগুলো মানুষই মাংশবহুল। কিন্তু আমার মনে হয়, খালেদ ভাইর শরীরের চামড়া কাটলে খুব বেশী মাংশ পাওয়া যাবে না, প্রায় সবটুকুই কলিজা। মানুষকে সহজ করে আপন করে নেবার এক জটিল কৌশল তাঁর জানা আছে, একবার যে এর ফাঁদে পড়েছে, তার রক্ষা নাই।
কয়েক বছর ধরে এই জালে আমি আটকে গেছি। ঢাকা আমার কাছে অসহ্য লাগে। ফুরসত পেলে গ্রামের বাড়ি চলে যাই। ২/৩ বার এই লোকটা আমার সঙ্গিঁ হয়েছে। আমরা মাঠের দিকে মুখ করে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থেকেছি, কেউ কারো সাথে কথা বলিনি।

বাড়ি যাওয়ার সুযোগ না পেলে, আমিই মাঝে মাঝে ফোন করি। বিকেলে কি ক্যাম্পাসে আছেন?
আমি সাড়া পেয়ে ছুটে যাই জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। মুখে বলি, আপনাদের খোলামেলা পরিবেশ, গাছ-গাছালি, পাখির ডাক, শিউলি ফোটা ভোর, আমার খুব পছন্দ। এ জন্য এলাম। কিন্তু খালেদ ভাই কী জানেন, আমি আসলে কেন যাই?
শুভ জন্মদিন খালেদ হোসাইন।

 

মন্তব্য
Loading...