দশে দশ (১০/১০) …

শাকুর মজিদের ৫০তম জন্মদিন উপলক্ষ্যে লেখা

  প্রশংসা পেলে অনেক মানুষই খুশী হয়। কিন্তু শাকুর মজিদের ক্ষেত্রে প্রশংসা পাবার এই ধরনটা প্রায় দাবী আদায়ের পর্যায়ে পড়ে! বন্ধু-মজলিশে নিজে কোন গুণপনার কাজ করা মাত্রই ও জিজ্ঞেস করে বসবে, “কেমন চমৎকার হলো…? দশে কত মার্ক পেলাম…?” নম্বর না দেয়া পর্যন্ত বন্ধুদের নিস্তার নেই।
শাকুরের ঘনিষ্ঠ এই বন্ধুদের তালিকায় একসময় যেমন ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ বা মিশুক মুনির এর মত স্বনামখ্যাত ব্যক্তিজন, তেমনি আছেন বিখ্যাত সব সাহিত্যিক, প্রকাশক, সাংবাদিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, নাটক ও নানা কলা-অঙ্গনের গুণীজন থেকে শুরু করে অতিসাধারন মানুষও!
প্রায়শই এমন হয়। আপন সৃষ্টি, হোক তা সে নাটক, গল্প বা ভ্রমণ কাহিনী। হোক তা খণ্ডিত অথবা সম্পূর্ণ। আমাকে কাছে পেলেই দেখিয়ে শুনিয়ে পড়িয়ে পরম আকুলতায় মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করবে, “ঠিক আছে ওস্তাদ…? কত দিবেন…?” অর্থাৎ এখন আমাকে নম্বর দিতে হবে! আপন কর্মের তাৎক্ষনিক স্বীকৃতি পাবার ওর এই ব্যাকুলতা ভীষণ মুগ্ধ করে আমাকে।
আপাতঃদৃষ্টিতে অগোছালো এই মানুষটি আসলে আমার দেখা পরিচিত জনদের ভিতর সবচেয়ে গুছিয়ে চলা সুশৃঙ্খল একজন মানুষ। নিজের জীবনের সকল অর্জন ও উৎযাপনের লেখা, ছবি কিম্বা নিদর্শন কত যে চমৎকারভাবে সংরক্ষণ করে রাখা যায় এবং রাখতে হয়, এমন দৃষ্টান্তের আদর্শ উদাহরন আমার কাছে শাকুর ছাড়া আর কেউ নেই।
যারা ওর ‘ক্লাস সেভেন ১৯৭৮’ বইটি পড়েছেন তাঁরা জেনে অবাক হবেন যে সে বইয়ের ঘটনা, চরিত্র এবং গ্রন্থে পরিবেশিত নির্ভুল তথ্যগুলো সবই সে সম্পূর্ণ স্ব-উদ্যোগে লিখে রেখেছিল ঐ ক্লাস সেভেনে পড়া বয়সেই! তিরিশ বছর ধরে সংরক্ষিত সেই ডায়রি অবলম্বন করেই ২০০৮ সালে সে লিখেছিল বইটি। আপন ভাণ্ডারে থরে থরে গুছিয়ে রাখা ওর নিজ জীবন ও কর্মের প্রামান্য সব উপকরণ যক্ষের ধনের মত এই যে আগলিয়ে রাখার অবিরাম প্রয়াস, এই উদ্যোগ বিরল। এর ফলাফল সুদূরপ্রসারী।
শখের বসে ডায়রি লেখা, ছবিতোলা বা লেখালেখির মত কাজ জীবনের নানা সময়ে সন্দেহ নেই আমরা প্রায় সবাই করেছি। যেন হারিয়ে ফেলার জন্যই আমাদের সেই করা। যেন আপন খেয়ালের আনন্দে ‘সকালে-ধরানো আমের মুকুল আমরা বিকেলে ঝরিয়েছি’। লক্ষ্যবিহীন স্রোতের ধারায় আমরা আমাদের প্রায় সব পাথেয়ই হারিয়ে ফেলেছি আজ (ভাবনার এই প্রকাশটুকু ৬৫ বছর বয়সে লেখা রবীন্দ্রনাথের পুজা পর্যায়ের “ছিন্ন পাতার সাজাই তরণী” সঙ্গীতাশ্রিত)।
কিন্ত শাকুর…, উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যতিক্রম। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কিম্বা কর্ম জীবনে কবে কোথায় কোন ছবি তুলেছে, কোন বিশিষ্ট ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিয়েছে অথবা ছবি তুলেছে, কিছু কি একটা লিখেছে বা বর্ণিল আলোকছটায় কখনো জীবনের কোন উপলক্ষ্যকে রাঙ্গিয়েছে, ঠিক ঠিক দিন-তারিখ-সন ধরে সে তার সবই অবাক নৈপুণ্যে আর্কাইভ করে রেখেছে। জীবনের প্রথম তোলা ছবি, পত্রিকায় প্রথম লেখা, প্রথম পুরস্কার ইত্যাদি থেকে শুরু করে আপন সন্তানদের শিশুকাল থেকে বেড়ে উঠার দৃশ্য ও গল্প সবই সে যথা সময়ে ধারন, লিখন এবং স্বযত্নে সংরক্ষণ করে চলছে! আত্মজীবনকর্ম সংরক্ষণের এমন স্ব-উদ্যোগী সত্ত্বা যে মৌলিক ভাবেই ‘গুণী’, অকপটেই আমি সেটা মেনে নিতে চাই।
আপন এই গুণপনা জীবনের নানা পর্যায়ে স্থপতি হিসেবে তাঁকে যেমন প্রতিষ্ঠিত করেছে, তেমনি এনে দিয়েছে সফল নাট্যকার, নাটক ও প্রামান্য চিত্র নির্মাতা, গবেষক, লেখক ও অনুসন্ধিৎসু একজন বিশ্ব পর্যটকের খ্যাতি। এনে দিয়েছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের অনন্য সব মুল্যবান পুরষ্কার আর স্বীকৃতি। ওর লেখা ‘মহাজনের নাও’ কাব্য-নাটকটি নাট্যকলার উচ্চতর শিক্ষায় অবশ্যপাঠ্য পাণ্ডুলিপি হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
“ভাটির পুরুষ” প্রামাণ্য চিত্রটি বানাবার আগে টানা প্রায় আট বছর ধরে সাধক ও বাউল শাহ আব্দুল করিমের বাসায় যাওয়া আসা করেছে সে। সুনামগঞ্জ থেকে নৌকায় হাওরের মধ্যে দিয়ে প্রায় ঘণ্টা খানেকের পথ। ‘উজান ঢল’ গ্রামে করিম সাহেবের সেই বাড়িতে ২০০৮ সালের জুন মাসে শাকুরে সাথে আমি নিজে একবার গিয়েছিলাম। সময় ও কষ্টসাধ্য সে যাত্রায় বুঝেছি, প্রচণ্ড উদ্দ্যম আর নিষ্ঠা না থাকলে শুধু একটা প্রামাণ্য চিত্র বানাবার পরিকল্পনা মাথায় নিয়ে বছরে তিনবার তাও আবার আট বছর ধরে এ পথে আসা যাওয়া করে এই কষ্টসাধ্য কাজ কিছুতেই করা সম্ভব না।
দীর্ঘ এই সময়ে প্রামান্য চিত্র ধারনের পাশাপাশি করিম সাহেবের জীবন, কর্ম, দর্শন এবং রচিত গান সমুহ নিয়ে যে গভীর গবেষণা কর্মটি সম্পন্ন করেছে তারই ফলশ্রুতিতে রচনা করেছে ইতোমধ্যে বিখ্যাত মঞ্চ নাটক ‘মহাজনের নাও’। পুরো নাটকটির সংলাপ রচিত হয়েছে গীত কবিতার ‘পয়ার’ ছন্দে। বাংলা নাটকের প্রাচীন ঐতিহ্য ও ছন্দকলার উপর শাকুরের দখল ও মুন্সিয়ানা এই নাটকের পরতে পরতে সুস্পষ্ট।
সুবচন নাট্য সংসদ ‘মাহাজনের নাও’ নাটকটি প্রথম মঞ্চে আনে ১৮ই জুন ২০১০ সালে। শিল্পকলার এক্সপেরিমেন্টাল হলে। ইতোমধ্যে দলটি বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রনালয়ের তত্ত্বাবধানে দক্ষিন কোরিয়ায় দুটি প্রদর্শনী ছাড়াও দেশের বাইরে ত্রিপুরা, জলপাইগুড়ি, আসাম, কলকাতা এবং ঢাকার বাইরে কুমিল্লা, চাদপুর, রাজশাহী, সিলেট, সাভার, বিয়ানীবাজার, বরিশাল নিয়ে ৭৫টি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে । কুড়িয়েছে দর্শকের অকুণ্ঠ প্রশংসা।
“বিধানের লালন” শিরনামের একটি জীবনালেখ্য নির্মাণের জন্য ২০০২ সাল থেকে আজ অবধি ‘বিধান’ নামে লালনের এক ভক্তকে ক্যামেরা নিয়ে ক্লান্তিহীন অনুসরণ করে চলছে শাকুর। সেই বছর কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ায় লালনের আখড়া দেখতে গিয়েছিল সে। ফেরার সময় নির্জন এক প্রান্তর অতিক্রম করছে। সেই মুহূর্তে দূর থেকে ভেসে আসা এক কিশোর কণ্ঠের গানে মন উদাস হলো। ক্যামেরার জুম দিয়ে সে গানের উৎস খুঁজতে গিয়ে দূরে গাছতলায় বসে আপন মনে গাইতে থাকা বিধানকে আবিষ্কার করে ফেলে সে!
সেই থেকে শুরু। বিধান তখন ছিল লালনভক্ত নিছক এক বালক। এক যুগ পরে এসে সেদিনের সেই বিধান এখন হয়েছে পরিপূর্ণ এক বাউল। দেশে এবং বিদেশে অনেক ভক্ত- শিশ্য তাঁর। লালনকে আশ্রয় করে এক বালকের বাউল হয়ে উঠার দিনপুঞ্জি বছরের পর বছর ধরে ক্যামেরাবন্ধি করার মত এমন দুরহ একটি কাজ বাংলাদেশে আর কেউ করেছে বলে জানা নেই আমার! এই একাগ্রতা বিশ্ব মানদণ্ডের বিচারে অনিবার্যভাবে দশে দশ পাবার যোগ্য।
নিজ কাজের প্রতি এই অনুরক্তি এবং আপন বিভা প্রচার ও প্রকাশে শাকুরের আকুলতা, প্রজ্ঞা, পারঙ্গমতা, প্রত্যুৎপন্নমতিতা, কর্মচঞ্চলতা, সদাপ্রাঞ্জলতা এবং বৈচিত্রতা প্রায় ঐশ্বরিক। নিজের গুনাবলি দিয়ে তো বটেই, অন্যকে দিয়েও আপন জীবন বর্ণাঢ্য করে তুলবার বিরল নৈপুণ্য করায়ত্ত্ব করেছে সে!
আমরা সবাই জানি যে স্যার রিচার্ড এটেনবরো (Sir Richard Attenborough) তাঁর অস্কার জয়ী বিখ্যাত ‘গান্ধী’ ছবিটি বানিয়েছিলেন প্রায় ২০ বছরের শ্রম দিয়ে। ১৯৮২ সালে মুক্তি পাওয়া এই চলচ্চিত্রটি এটেনবরো যখন শুরু করেছিলেন, তখন তিনি প্রায় ৩৯ বছরের তরুণ। প্রচণ্ড অধ্যাবসায়ী এই ব্যক্তিটি সন্মন্ধে স্টিভেন স্পিলবার্গ (Steven Spielberg) বলেছিলেন, – “তিনি একাধারে তাঁর পরিবার, বন্ধু, দেশ ও আপন সৃষ্টিশীল কর্মের প্রতি দারুন ভাবে অনুরক্ত। ‘গান্ধী’ ছবির মাধ্যমে তিনি বিশ্বকে এক বিরল উপহার প্রদান করেছেন।“
আমি বিশ্বাস কতে চাই, এক যুগ আগে শুরু করা এবং সদ্য পঞ্চাশ বছরে পা’ দেয়া শাকুর তাঁর চলমান ‘বিধানের লালন’ নিয়ে যদি আরও দশ বছর কাজ করে, এই বিশ্ব আরও একটি বিরল উপহার পেয়ে ধন্য হবে!
আমাদের পঞ্চ-পর্যটক দলের কনিষ্ঠতম সদস্য হলো শাকুর। কিন্তু কর্মে, নির্মাণে আর ভ্রমণ উপস্থাপনে তাঁর ভুমিকা এবং শৈল্পিক দক্ষতা বলা যায় একক। ২০০১ সালে মায়ানমার দিয়ে শুরু। তারপর থেকে এ পর্যন্ত আমরা এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, উত্তর ও দক্ষিন আমেরিকার প্রায় ৩৭ টি দেশের ৬৭ টি শহর ভ্রমণ করেছি। এসব ভ্রমণ পরিকল্পনা ও আয়োজনে আমাদের শ্রমঘন্টার প্রায় সমপরিমান শ্রম ব্যয় করতে হয়েছে প্রতিবার যাত্রার প্রারম্ভে তাঁর অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করার পেছনে। আজ পাসপোর্ট দিতে ভুলে যায় তো কাল বাহানা শুরু করে এবার যেতে পারবে না, ঝামেলা চলছে। অথবা বলবে ‘আমার বাজেট সাকুল্যে ২০০ ডলার, প্লেন ভাড়া সহ। পোষালে আমাকে নেয়া হোক, না পোষালে নেই!’
অবশ্য পঞ্চ-পর্যটকের যে কারো এসব গড়িমসি সামলিয়ে নিমরাজি কাউকে রাজি করাবার জন্য বন্ধু আরিফের জানা আছে প্রায় জাদুকরী বিদ্যা। এতো টানাহেঁচড়ার পর যে যাত্রা, ভ্রমণ অন্তে সেই শাকুরই আবার এসব উপজীব্য করে নির্মাণ করেছে ৩০০ টির মত ভ্রমণচিত্র। ‘পৃথিবীর পথে পথে’ অথবা ‘ভুবন ভ্রমিয়া শেষে’ শিরোনামে সিরিজ আকারে সেসবের অধিকাংশ প্রচারিত হয়েছে সরকারী ও বিভিন্ন বেসরকারী টিভি চ্যানেলে। ভ্রমণ কাহিনী হিসেবে প্রকাশ করেছে আঁটটি বই। এর মধ্যে এক ‘অষ্ট ভ্রমণ’ গ্রন্থেই আছে আঁটটি কাহিনী। লিখেছে কিম্বা লিখছে অহর্নিশ; আর প্রায় প্রতি সপ্তাহে বা মাসে তা প্রকাশিতও হচ্ছে নানা পত্র পত্রিকায়।
আপন শিল্প বা সাহিত্য সমূহ প্রকাশের আগে একান্ত স্বজনদের কাছে নম্বর পাবার জন্য ও ব্যাকুল হয় ঠিকই। কিন্তু প্রকাশের পর সমস্ত নম্বর (প্রশংসা) আপনা থেকেই হৈ হৈ করে এসে ওকে নন্দিত করে!
১৯৪১ সালের ৬ই এপ্রিল বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির রজত জয়ন্তীতে কবি নজরুল তাঁর শেষ অভিভাষণে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “যেদিন আমি চলে যাব, সেদিন হয়ত বা বড় বড় সভা হবে। কত প্রশংসা কত কবিতা বেরুবে হয়ত আমার নামে…”। আমাদের শাকুরের নামে এখনি বড় বড় সভা হয়! ওর ৪৫তম জন্মদিন উৎযাপন হয়েছিল ওকে নিয়েই বিশিষ্ট জনদের লেখা ৩৪০ পৃষ্ঠার সংকলন ‘আলোকধনু’ বইয়ের প্রকাশনা দিয়ে। হুমায়ূন আহমেদ করেছিলেন সে বইয়ের মোড়ক উন্মোচন। ৫০তম জন্মদিন উৎযাপনের আমন্ত্রনপত্র ক’দিন আগে সে আপন ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে রেখেছে। নিজ গ্রাম বিয়ানীবাজারে দিন ব্যাপী শাকুরের বই ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনী এবং ‘মহাজনের নাও’ নাটকটি মঞ্চায়নের বিশাল আয়োজন। এ ছাড়াও এবার তাঁকে নিয়ে বিশিষ্ট জনদের লেখা ২য় বই ‘আলোকের ঝর্ণাধারা’ প্রকাশ হতে যাচ্ছে! জয়তু শাকুর মজিদ।
আজ রাত ১২.০১ মিনিটে, ২২শে নভেম্বরে পঞ্চাশে পা’ দিবে শাকুর। নানা আয়োজন হবে উৎসবের ঘনঘটায়। নিজের শত গুনের প্রশংসা চেয়ে আদায় করে ছাড়লেও আমি জানি একান্ত আপন এই দিনটির জন্য শুভেচ্ছা সে কখনই আমার কাছে দাবী করবে না। প্রিয় কিছু উপহার চাইবার আগেই দিয়ে চমকে দিতে ভালোলাগে। আজ তাই, একজন ‘শাকুর মজিদ’ হয়ে উঠার জন্য না চাইতেই তাঁকে দশের মধ্যে পুরো দশ নম্বরই দিয়ে রাখলাম।
শুভ জন্মদিন… প্রিয় শাকুর। আচমকা এই দশে দশ পেয়ে কেমন লাগছে তোর…? ভালো থাকিস প্রতিদিন।
তরিকুল লাভলু / নভেম্বর ২১, ২০১৪
মন্তব্য
Loading...