তিনি শাকুর মজিদই – মাহজাবীন ফেরদৌস প্রভা

আমাদের সব লেখাই একটা ভ্রমণের খন্ড খণ্ড প্রকাশ – শাকুর মজিদ

সাক্ষাতকার নেয়ার জন্য যাকে বেছে নিয়েছি  তাঁর সম্পর্কে যতই জানার চেষ্টা করাই হোক না কেন তা কমই হয়ে যায়। যদিও ভ্রণকাহিনী লেখক এবং প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা শাকুর মজিদকে চিনি কিন্তু ভাবলাম তাও আগে একটু উনার সম্পর্কে জেনে যাই। যতই জানার চেষ্টা করলাম ততই মাথা ঘুরাতে থাকলো।

এতদিন বই পুস্তকে পড়েছি বিভিন্ন লেখক পরিচিতিতে – একাধারে গদ্যকার,পদ্যকার, ঔপন্যাসিক, জীবনী গ্রন্থের লেখক, প্রবন্ধকার, নাট্যকার এমন । কিন্তু তাঁর সম্পর্কে কিছু পড়ে মনে হলো আজ এমন একজনের সাথে সামনাসামনি দেখা হতে যাচ্ছে যিনি এমন সবের চেয়েও বেশি কিছু। বর্তমান সময়ে এমন ব্যক্তিত্ব এপার-ওপার দু বাংলাতেই খুঁজে পাওয়া দুস্কর।

সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রায় সকল ক্ষেত্রেই তাঁর স্বাচ্ছন্দ বিচরণ। শুরুটা ছিল স্কুলের দেয়ালপত্রিকায় কবিতা লেখা দিয়ে। ক্যাডেট কলেজে পড়ার সময় ক্লাস টেন থেকে কলেজের নানা রকমের সাহিত্যপত্রিকায় লেখা শুরু করেন। উচ্চমাধ্যমিকের পর বাবার নজর থেকে আড়ালে থাকার জন্য ‘শান্তনু আশকার’ ছদ্মনামে কিছুদিন লেখালেখি করেন।

প্রশ্ন করি, স্যার কেন শান্তনু আশকার?

উত্তরে বললেন, -শাকুর শব্দের আরবী বহুবচন হলো আশকার। অনেকগুলো শাকুর, এটা বুঝাতে। এটা বলেই হেসে উঠলেন।

শাকুর মজিদ  ১৯৮৩ সালে দ্বাদশ শ্রেণীতে থাকাকালীন ৫ দিনের শিক্ষা সফর নিয়ে তার প্রথম ভ্রমণ কাহিনী লিখেন ক্যাডেট কলেজের সাহিত্যপত্রিকা ‘প্রবাহ’তে। এর অনেক বছর পর, বুয়েটে পড়ার সময় তৃতীয় বর্ষের ছাত্র থাকাকালে কলকাতায় গিয়েছিলেন স্থাপত্যবিষয়ক এক কনফারেন্সে। এসে সেটা নিয়ে ‘পাক্ষিক অনন্যা’ একটা ভ্রমণকাহিনী লিখেন। সেটাই ছিলো তাঁর প্রথম কোন পত্রিকায় প্রকাশিত ভ্রমণ বিষয়ক লেখা । এর পর ১৯৯৯ সালে তাঁর ভ্রমণ অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেন ‘ট্র্যাভেলর্স ক্লিক্স’ নামের এক আলোকচিত্র প্রদর্শণীতে । ২০০৩ সালে বেরোয় প্রথম ভ্রমণগ্রন্থ ‘আমিরাতে তেরোরাত’ । এর পর থেকে আর থেমে থাকা নয় । এরপর উনার সকল ভ্রমনকাহিনী এবং চিন্তাধারা কোন না কোন মাধ্যমে তুলে এনেছে সাধারণের সামনে। কখনো বই, কখনো প্রামাণ্যচিত্র, কখনো নাটক, কখনওবা গীতিনাট্য রূপে মঞ্চে।

১৯৯০ সালে কলকাতা দিয়ে শুরু হয়েছিলো প্রথম ভ্রমণ

কথা বলতে বলতে এক জায়গায় বলেন- আমরা যা প্রকাশ করি সবই আমাদের একটা ভ্রমণের ফল। আমাদের জীবনটাই একটা একমুখি যাত্রা। এই যাত্রাপথে আমরা ভ্রমণ করতে করতে যা দেখি ও শিখি তাই আমরা প্রকাশ করি নানা ভাবে। আমাদের সমস্থ প্রকাশই আসলে আমদের একটা ভ্রমণের খন্ড খন্ড প্রকাশ , সবই আমাদের কোনোনা কোনোভাবে লেখা ভ্রমণকাহিনীই। ঘর থেকে বেরিয়ে মানুষের সাথে মিশে , জীবন ও জগত দেখে যা যা আমরা শিখি, তা-ই কোন না কোন ভাবে আমরা লিখি। কখনো গদ্যে, কখনো পদ্যে, কখনো রেখায়, কখনো লেখায় আমরা সেগুলো প্রকাশ করি। আর যারাই এ প্রকাশটা গুছিয়ে করতে পারেন তাদেরটাই শিল্প হয়, সাহিত্য হয়।

জানতে চাইলাম-  কেন মনে হলো যে আপনি আপনার দেখা জায়গার বর্ণনা কিংবা অনুভূতি গুলো বই এ লিখবেন ?

স্যার একটু হেসে বললেন, -সব প্রাণীই নিজেকে প্রকাশ করতে চায়। ফড়িং বা প্রজাপতি যেমন ডানা ঝাপটে নিজের সৌন্দর্য্য সবার সামনে তুলে ধরে, গাছে বসে থাকা পাখী যেমন সুর তুলে গেয়ে উঠে, মানুষও তেমনি চায় আর  তেমনি আমিও আমার দেখা বা বোঝার অনুভূতি নানা ভাবেই তুলে ধরার চেষ্ঠা করি। কখনো লেখায়, কখনো স্থির বা সচল ছবিতে।

একে একে লিখেছেন প্রায় ৪০টি গ্রন্থ যার মধ্যে রয়েছে ২২ টি ভ্রমণকাহিনী। তার প্রথম ১৭টি ভ্রমণকাহিনী চারখণ্ডে নতুন করে চার রঙে ঝকঝকে প্রিন্টে তার ৫২তম জন্মদিনে প্রকাশ করেছে কথা প্রকাশ, ২০১৭ সালের ২২ নভেম্বর।

তার প্রথম ১৭টি ভ্রমণকাহিনী চারখণ্ডে নতুন করে চার রঙে ঝকঝকে প্রিন্টে তার ৫২তম জন্মদিনে প্রকাশ করেছে কথা প্রকাশ, ২০১৭ সালের ২২ নভেম্বর।

এক সময় নাবিক হবার স্বপ্ন দেখা এই বালকের স্থপতি হবার ঘটনাটাও চমকপ্র। মেডিকেলে চান্স পেয়েও তিনি বন্ধুকে সাহায্য করতে পরীক্ষা দিয়েছিলেন বুয়েটের স্থাপত্যকলা বিভাগে। বন্ধুর চান্স না হলেও চান্স পেয়ে যান তিনি। প্রশ্ন করি – স্থাপত্যকলা পড়ে কী আপনি শুধুই পর্যটক কিংবা নাট্য রচয়িতা?

তিনি বলেন, – না, আমি যখন যা করি তখন শুধু সেটাতেই সম্পূর্ণ মনোযোগ দেই। যদিও আমি ভীষনভাবে একজন মাল্টি-টাস্কার, কিন্তু একসাথে দুই কাজ করি না। যে কাজটা যখন করি তখন অন্য কাজ বা পরিচয়ের কথা ভুলে গিয়ে শুধু ঐ কাজটিই সর্বোচ্চ মনোযোগের সাথে করি। সবচেয়ে ভালো আউটপুট আনার চেষ্টা করি। নিজেকে ফাঁকি দেই না। আর আমার নিজেকে তুষ্ট করাও অনেক কঠিন। নিজেকে প্রথমে সন্তুষ্ট করে পরে তা প্রকাশে জন্য ছেড়ে দেই।

তাঁর কথাগুলো শুনতে শুনতে মনে হলো, যেখানে আমি উনার সবগুলো কর্মক্ষেত্র মনে রাখতেই হিমসিম খাচ্ছি সেখানে উনি যেটাতেই হাত দিয়েছেন সেখানেই গেড়েছেন সফলতার সোপান।

– স্যার ভ্রমণ করতে কেন ভালো লাগে?

– অজানাকে জানার আগ্রহটাই চঞ্চল মনকে টেনে নিয়ে যায় একদেশ থেকে অন্য দেশে। আর নিজেকে ভালো করে জানার জন্য অপরকে চিনতে হয়। আরেক জনের ঘর দেখে এলে বোঝা যায় আমার ঘরটা মন। নিজের দেশকে বোঝার জন্য হলেও আমাদের অপর দেশকে জানতে হয়, আর দেশ ভ্রমণ ছাড়া এটা সম্ভব না।

১৯৯০ সালে প্রথম বিদেশ ভ্রমণ দিয়ে শুরু শাকুর মজিদের এই পথ পরিক্রমা। কখনো সঙ্গী হিসেবে ছিলেন বন্ধু বা পরিবার , কিন্তু উনার স্থায়ী ভ্রমণসঙ্গী হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ক্যামেরা। প্রথমজীবনে শুধু স্টিল ক্যামেরা থাকলেও খুব তাড়াতাড়ি উনার দ্বিতীয় সঙ্গী হিসেবে যুক্ত হয় একটি ভিডিও ক্যামেরা। স্কুলজীবনে বন্ধুর ক্যামেরা হাতে নিয়ে যার ফটোগ্রাফির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। বুয়েটে পড়াকালীন স্থাপত্যবিভাগের আনঅফিসিয়াল অফিসিয়াল ফটোগ্রাফার হিসাবে ছবি তোলা শুরু । এরপর ১৯৯৮ সালে উনি নিয়ে আসেন উনার প্রথম আলোকচিত্র প্রদর্শণী ‘বাংলার মুখ’ নামে। ১৯৯৯ সালে ভ্রমণচিত্র নিয়ে প্রদর্শনী করেন”Travelers Click” আর ২০০২ সালে কলকাতা ও ঢাকায় করেন, Rhythm on the Stage নামে ।  ছাত্রাবস্থায়ই দেশী বিদেশী অনেকগুলো পুরস্কার পান তিনি ফটোগ্রাফিতে।

শাকুর মজিদ বলেন, আমি বিদেশকে বেশিরভাগই দেখেছি ভিউ ফাইন্ডারের ভেতর। কারন আমার মনে হতো যে এই মুহূর্তে যে দৃশ্যটি আমি দেখলাম, এখানে আরেকবার এসে এটা আর দেখা যাবে না। সুতরাং এই দৃশ্যটাকে স্থায়ী করে স্থির করে রাখার আর এ দৃশ্য অপরকে দেখানোর উপায় হচ্ছে এর ছবি তুলে রাখা। একেবারে প্রথম বিদেশ সফরেই আমি দুটো স্টিল ক্যামেরা নিয়ে যেতাম। একটিতে থাকতো সাদা-কালো ফিল্ম, অপরটিতে রঙ্গিন। মূলত কিছু ভালো পোর্ট্রেটের খোঁজে সাদা-কালো ফিল্ম ব্যবহার করতাম। এটা চলে ২০০১ সাল পর্যন্ত। এ সময় প্রথম আমেরিকা ভ্রমনে গেলে একটা ভিডিও ক্যামেরা ভাড়া করে নেই ৫ সপ্তাহের জন্য। এই শুরু হয় আরেক দফার কাজ। স্টিল ক্যামেরা পাশে রেখে ভিডিওতে মানুষের চলাচল আর কথাবার্তা ধারন করি। ২৭ ঘন্টার রাশ নিয়ে এলাম  আমেরিকা থেকে। দেশে এসে প্রথমে একটা প্রামাণ্যচিত্র বানাই একটা এডিটিং হাউজে গিয়ে। পরে নিজেই এডিটিং শিখে ফেলি। ১৮ পর্বের ভ্রমণচিত্র বানিয়ে ফেলি, প্রতিটা ২০ মিনিটের পর্ব। সেই যে শুরু হয়েছিলো, এখনো চলছে।

শাকুর মজিদ একটু জিরিয়ে নিয়ে বলেন, এর মধ্যে ক্যামেরাগুলো তাদের চরিত্র বদল করেছে, আমিও তাদের সাথে তাল মিলিয়েছি। আমি যখন শুরু করি তখন বেটা ক্যামেরার যুগ, মিনি ডিভি নতুন এসেছে। আমি মিনি ডিভি তে শুরু করি। এর পর ক্যামেরা বদল করি আরো দুইটা। এলো হাই-ডেফিনেশন ক্যামেরা। আমি সেটা নিলাম। এলো ক্যাসেটহীন ডিস্ক। আমি ডিজিটালে ছবি তোলা শুরু করি। এক সময় ভারি ভারি লম্বা লম্বা ক্যামেরা ব্যবহার করতাম, এখন ডিএসএল আর ফেলে হাতে নিয়েছি অজমো প্লাস, অজমো পকেট, গো-প্রো, এসব ক্যামেরা। ২০০৬ সালে আরটিভিতে ‘পৃথিবীর পথে পথে’ দিয়ে শুরু হয়েছিলো আমার ভ্রমণচিত্র প্রকাশ, ২০১৮ পর্যন্ত প্রায় ৪০০ ভ্রমণচিত্র প্রচার হয়েছে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল থেকে। এগুলোর থেকে আমার যা আয় হয়েছে টা দিয়ে আমার সব খরচ উঠে আরো কিছু বাড়তিও থেকে গেছে পরের সফরের জন্য।

জিজ্ঞেস করি – ৩০ টির বেশি দেশ দেখে ফেলেছেন,  কোন কোনটাতে একাধিকবার গিয়েছেন। কোন মজার অনুভূতি কি আমাদের সাথে শেয়ার করতে চান?

-মজার অনুভূতি তো অনেক আছে, তবে একবার চিলিতে সান্তিয়াগী থেকে ভেলপারয়েসো গিয়ে বিপদে পড়লাম গাইডকে নিয়ে । মেয়েটি যখন জিজ্ঞেস করলো আমরা কই কই যেতে চাই তখন আমরা সবাই বললাম আজ একটা নৌকা করে প্যাসিফিক ওশানে ঘুরতে চাই। নৌকায় উঠে যখন সবাই বাংলা গানে মশগুল তখন সেই দোভাষীকে নিয়ে শুরু হলো এক মজার কীর্তি। প্রতিটা গান তাকে ইংরেজীতে ট্রান্সলেট করে দেয়া লাগে । আমাদের একজন গান গাইছে – আমায় এতো রাতে ক্যানে ডাক দিলি প্রাণ কোকিলারে…। এটা তাঁকে যখন অনুবাদ করে বোঝানো হলো সে কোন ভাবেই এবং সে কোন ভাবেই বুঝতে পারে না যে – রাতের বেলা পাখি ডাকলে মেয়েটার সমস্যা হবে কেন ?

সেই ১৯৯০ সাল থেকে ভ্রমনের যাত্রা শুরু। সঙ্গে ছিলো ক্যামেরা। প্রথম দিকে স্টিল ক্যামেরা, ২০০৩ সাল থেকে ভিডিও

তাকে যখন বলা হলো, এবার আমরা শহর দেখবো, সে বলে এই শহরে সে আজ প্রথম এসেছে । সে জীবনে কোনদিন নৌকা চড়েনি, প্যাসিফিক ওশেন দেখেনি, আমাদের সাথে আজ প্রথম এসেছে এবং সে সাতারও জানে না। মেয়েটির উপর যখন রাগ উঠবে তখন জানা গেলো, যে এই মেয়েটি আসল গাইডের ছোট বোন। আজ তার বোন অসুস্থ। সে বোনের চাকরী বাঁচাতে এখানে এসেছে গাইডের প্রক্সি দিতে। এই ঘটনা কোম্পানী জানলে বোনের চাকরি চলে যাবে।  আমরা আশ্বস্থ করলাম, না, এটা কাওকে জানাবো না।

– আর কোন মজার স্মৃতি ?

– মজার নাই। রাগের আছে। মনে পড়লেই রাগ লাগে ।

– কি সেটা ?

– ২০০৩ সালে ইউরোপে প্রথমবারের মতো গিয়ে প্রথম সকালেই ছবি তুলতে গিয়ে দল থেকে হারিয়ে গিয়েছিলাম। আমরা কোন হোটেলে ছিলাম না। এক আবাসিক এলাকার সার্ভিসড এপার্টমেন্টে ছিলাম। এর ঠিকানা সঙ্গে ছিল না । হারিয়ে যাওয়ার পর বিপদে পড়ে যাই। কোথাও ইংরেজি কিছু লেখা নাই, জার্মান ভাষা বুঝি না। প্রায় ৮ ঘন্টা পর রাত সাড়ে এগারোটায় ফিরে এসেছিলাম ।

-কিভাবে ?

– আমার ভিডিও ক্যামেরা আমাকে উদ্ধার করে।

– কিভাবে ?

– সকাল বেলা যে স্টেশনের ছবি তুলেছিলাম, তা এক জার্মানকে দেখালে সে ম্যাপে আমাকে সেই স্টেশনটি দেখায়। পরে চলে আসি। এসে দেখি সেই বাড়ির  দরজায় লাগানো একটা কাগজে লেখা “শাকুর যে স্টেশনের কাছে  আমরা আলাদা হয়েছি সেখানেই অপেক্ষা করছি।” আমি ফিরে গিয়ে দেখি সবাই সেখানে মলিন মুখে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। এটা লেখা আছে আমার ‘সক্রেটিসে বাড়ি’র শুরুতে ‘হারিয়ে যাওয়া এক বিকেলের গল্প’তে।

– আর কিছু স্যার ?

– সবচেয়ে খারাপ লেগেছিলো সেদিন যেদিন চিলি থেকে আমস্টারডাম যাওয়ার সময় ব্রাজিলে ১৪ ঘন্টার ট্রানজিটে নিয়মমাফিক সবাই হোটেল পেলেও শুধু বাংলাদেশি দেখে ৫ তারকা হোটেলের নরম বিছানা না পেয়ে আমাদের ভাগ্যে জোটে এয়ারপোর্ট কাস্টডির শক্ত মেঝে। এ সময় খুব অপমান লেগেছিলো। আমার ‘পাবলো নেরুদার দেশে’র শুরুই হয়েছিলো এই কাহিনী দিয়ে।

– এই যে এতো দেশ বিদেশ ঘুরেছেন অনেক বন্ধু হয়েছে আপনার তাদের যদি দেশ ঘুরিয়ে দেখাতে চান তবে কি দেখাবেন?

– বাংলাদেশের গ্রাম আর নদী।

– পর্যটনের একাল আর সেকাল কিভাবে দেখেন?

– এখন সব কিছু খুব সহজেই জেনে ফেলা যায়। কোথায় এই মুহূর্তে কেমন আবহাওয়া? গিয়ে কোথায় থাকবো? মানুষ গুলো কেমন হবে? এগুলা সব কিছুই এখন চাইলেই বের করে ফেলা দুই মিনিটের কাজ। অজানা জিনিসের প্রতি কৌতুহল কমে গেলে সেই এক্সাইটমেন্ট থাকেনা।

২০০১ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত প্রায় ৩০০ ভ্রমোনচিত্র বানিয়েছেন

ভ্রমণ করেছেন অথচ এ নিয়ে বই লিখেন নি, এমন কয়টা দেশ আছে আপনার ?

২০১৮ সালে জাপান গিয়েছিলাম ১০ দিনের জন্য একটা সেমিনারে। টকিওতে সেমিনার শেষ করে আমরা ওসাকা, হিরোসিমা, কিয়েতো, কোবে, এসব শহর ও লোকালয়ে ঘুরেছি। এ নিয়ে ছোট্ট একটা লেখা গত বছরের ঈদসংখায় প্রকাশ হয়েছ মাত্র। বাকি লেখা বাকি আছে।

-শুধু কি আপনার পঞ্চপর্যটককে নিয়েই ঘুরেন ?

– আমাদের সর্বশেষ ট্রিপটা ছিলো একেবারেই ব্যতিক্রমী।

-সেটা একটু বলেন স্যার-

– ২০০১ সাল থেকে পঞ্চপর্যটকের যে দল নয়বারে আঠারোটার মতো দেশ দেখে ঘরে ফিরে । এবারই প্রথমবারের মতো আমরা বৌ নিয়ে বেরিয়েছিলাম আস্ত মহাদেশ দেখতে। পঞ্চাশোর্থ ৫ তরুনীকে নিয়ে মধ্যে পঞ্চাশের ৫ প্রৌঢ়র সফর ছিলো এই অস্ট্রেলিয়া-পিএনজি ঘোরা। অস্ট্রেলিয়া তো আর দেশ না, মহাদেশ। এক এক করে গোটা পঞ্চাশেক বাংলাদেশ যোগ করলে হয়তো একটা অস্ট্রেলিয়া পাওয়া যাবে। আর বাংলাদেশের চেয়ে মাত্র তিনগুণ বড় দ্বীপ রাজ্য পাপুয়া নিউ গিনি যেখানে প্রতি বর্গমাইলে যে লোকেরা বাস করে তা বাংলাদেশের প্রায় ষাট ভাগের একভাগ। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমরা এসেছি পৃথিবীর ৩য় নিকৃষ্ঠ শহর ঢাকা থেকে, দেখে এসেছি আরেক নিকৃস্ট শহর পোর্ট মর্সবি। পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ ৬ টা শহরের মধ্যে এ দুটো পড়ে , আবার পৃথিবীর সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরের প্রথম  ৬ টির মধ্যে চতুর্থটি সিডনি, দেখে এসেছি আর দ্বিতীয়টি এই মেলবোর্ণ। এবার দেখছি। মাত্র দুই –তিন যুগে কী শহর কী হয়ে গেলো এটা ভাবতে ভাবতে দিন কাটাই। এটা নিয়ে এখনো লেখা শুরু করিনি, করে ফেলবো।

পাপুয়া নিউগিনি

-পাপুয়া নিউগিনি কেমন মনে হলো ?

– আমরা যাঁর আতিথেয়তায় পি এন জি গিয়েছি, তিনি ডাক্তার মুনির। এখন জাতিসংঘের হয়ে পি এন জি তে স্বাস্থ রক্ষার কাজে আছেন। তিনি বড় কর্তা। তাঁর বিভাগ ম্যালেরিয়া অসুখ। জংগলবাসি এ মানুষগুলোকে হামেশা মশায় কামড়ায়, এঁদের মৃত্য হার অনেক বেশি। এইচ আই ভি আক্রান্তের সংখায় মাত্রাতিরিক্ত। খুব অল্প বয়স থেকেই ছেলেমেয়েরা মেলামেশা শুরু করে। এ নিয়ে তাঁদের খুব কঠিন সংস্কারও নাই। দেশের আইন শৃংখলা নিজেদের হাতে। এ দেশে কোন পুলিশ নাই, সেনা বাহিনী নাই। বড় বড় লোকেরা প্রাইভেট সিকিউরিটি ফোর্স পালেন। এ রকম প্রায় ৭০ টি এজেন্সি আছে , এরাই লাঠি হাতে, বন্দুক হাতে নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। সারা দেশের পাহাড় জংগল ঘিরেই তারা বাস করছে, কতোগুলো গোত্রে বিভক্ত তারা। সাড়ে আটশো গোত্রে আছে এবং প্রায় একই সঙ্খ্যার ভাষা। এমন সবই চলমান। কোন একটা দেশে পাড়ায় পাড়ায় মানুষের নিজস্ব ভাষা থাকার মতো ঘটনা এর আগে শুনিনি কোথাও। খোজ নিয়ে জেনেছি, এই দেশে কোন শিল্পকলা একাডেমি নাই, চলচ্চিত্র নির্মাতা নাই, বই মেলা নাই, বইয়ের প্রকাশনা নাই। আছে নিজেদের মতো নাচাগানা। এঁদের স্বাধীনতা দিবসে জঙ্গল থেকে ডেকে আনা হয় শিল্পী। এরা উদোম গায়ে সমদ্রপাড়ে নাচানাচি করে। গাছের লতাপাতা, শেকড়বাকড় দিয়ে শরীর ঢাকা থাকে। শরীরের কোন অংশ দেখানো নিয়ে তাঁদের কোন সংস্কার কাজ করে না । কেউ জিজ্ঞেস করলে বলে এসব তো প্রকৃতির দান। প্রকৃতি যখন দিয়েছে কেউ দেখলে সমস্যা কী ? নারী পুরুষ সবারইতো আছে ।

পাপুয়া নিউগিনির প্রধান বিমানবন্দরে দেখা মিললো আদিবাস্যার সাথে

মাত্র তিন দিন থেকে টের পেলাম, এঁদের গ্রামীন মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ঠ আমাদের প্রাচীন গ্রামাঞ্চলএর জীবনযাপন ও রীতিনীতির খুব মিল আছে। আরো মজার খবর হচ্ছে, এই শহরের প্রথম ১০ বড় লোকের ৫ জনই নাকি বাংলাদেশি। রাজধানীর সবচেয়ে বড় ডিপার্ট্মেন্টাল স্টোর এর মালিক ঢাকা থেকে গিয়েছিলেন ১৯৯০ সালে। অনেকগুলো দীপ নিয়ে এই দেশ, কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা  নাই। ৫ হাজার কিলোমিটারের উপকূলীয় পথ যাঁদের আছে সেখানে দীর্ঘতম সড়কটির দৈর্ঘ ১৮৫ কিলোমিটার মাত্র। এর প্রায় অর্ধেকই কাঁচা রাস্থা। সুতরাং পাহাড় পাহাড় মাড়িয়ে পায়ে হেঁটে আর নৌকা বা ইঞ্জিন নৌকা ছাড়া এঁদের চলাচলের কোন পথ নাই। মজার ব্যাপার, এই দেশে ৫৫০ টি বিমানবন্দর আছে এবং সেই সব সুবিধাভোগিদের প্রত্যেকের   একাধিক নিজস্ব বিমান আছে। এটা দিয়েই তারা চলাচল করে।

শাকুর মজিদের পুরস্কারের ঝাপি ভরে আছে। ২০১৭ সালে পেয়েছেন ভ্রমণসাহিত্যে বাংলা একাডেমি, ২০১৬ সালে আই এফ আই সি ব্যাংক, এর আগে পেয়েছেন সমরেশ বসু , রাগিব-রাবেয়া সাহিত্য পুরস্কার। টেলিভিশনে নাটক-টেলিফিল্ম লিখে ও পরিচালনা করে প্রেষ্ঠ নাট্যকার বা নির্মাতা হিসাবে পেয়েছেন প্রায় দেড়-ডজন পুরস্কার, , উপহার দিয়েছেন দেশ কাপানো টেলিভিশন নাটক ‘লন্ডনি কইন্যা’, ‘নাইওরী’ চেরাগ, করিমুন্নেসা, বৈরাতীসহ আর অনেক নাটক। কিছুটা অভিমান করেই টিভি নাটকের জগত থেকে সরে আসা। তবে মঞ্চে লিখছেন নিয়মিত। শাহ আবদুল করিমকে নিয়ে লেখা ‘মহাজনের নাও’ মঞ্চস্থ হয়েছে ১৩০ বার, এটা এ ঢাকা, সিলেট, রাজশাহী এবং আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসির পাচটি দল মঞ্চস্থ করেছে। ২০১৮ সালে মঞ্চে আসে হাছন রাজাকে নিয়ে লেখা তাঁর অপর নাটক হাছনজানের রাজা। এটাও দর্শকনন্দিত । আমি ভাবি এই লোকটা এতো কাজ কী করে করেন ? জিজ্ঞেস করি-

স্ত্রী ও দুই পুত্রসহ শাকুর মজিদ

-পরিবার আপনাকে কতটুকু সাপোর্ট করে?

– পুরোপুরিভাবে। আসলে আমাকে বাধা দিয়ে লাভ নেই তা সবাই বোঝেন তাই আর চেষ্টাও করেন না।

– দুই ছেলের জনক কি কখনও চেয়েছেন ছেলেদের নিজের মত বানাতে?

– চেয়েছিলাম, কিন্তু ওদের নিজেদের ইচ্ছাটাই আসলে মুখ্য। আমি নিজে আসলে যা মনে চেয়েছে করেছি তাই ওদের বাধা দেয়াটাও সমীচীন মনে হয়নি।

শাকুর মজিদ ২০০৩ সাল থেকে লালন আখড়ার এক ত্যাগী বাউল বিধানকে অনুসরণ করছেন তাঁর ক্যামেরা নিয়ে। ‘লালনকথা’ নামে একটা প্রামাণ্যচিত্র বানাচ্ছেন। এটার কাজ শেষ হয়নি এখনো। উপন্যাস লিখছেন হাছন রাজাকে নিয়ে ‘পিয়ারী’, দীর্ঘ ৭ বছর শাহ্‌ আবদুল করিমকে ক্যামেরা নিয়ে অসুসরন করে বানিয়েছিলেন ‘ভাটির পুরুষ’ প্রামাণ্যচিত্র।

তাঁকে জিজ্ঞেস করি – নিজের কি কোনদিন সংসারত্যাগী হতে ইচ্ছে হয় ?

এমন প্রশ্ন করলে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেন – হয় । তবে পায়ের শেকল পরা আছেতো তাই আবার ঘরে ফিরে আসতেই হয়।

 

মন্তব্য
Loading...