প্রাগের ঠাকুরোভা লবনপুরের মোজার্ট – মোশতাক আহমদ

মোজার্ট, সাউন্ড অব মিউজিক, বিশ্ব স্থাপত্য আর দেশের ঠাকুর

শাকুর মজিদের ভ্রমণ বিষয়ক লেখাগুলোর সাথে পরিচয় ছিল না; পরিচয় করিয়ে দিলেন স্বয়ং লেখক। তাঁর পঞ্চপাণ্ডবের ইউরোপ ভ্রমণের তৃতীয় কিস্তি চেক প্রজাতন্ত্রের প্রাগ আর অস্ট্রিয়ার সালজবুর্গ ভ্রমণ নিয়ে লেখা। ব

ইটি আদ্যোপান্ত পাঠ করে বুঝেছি –

১, সিরিজের অন্যান্য বই পড়া না থাকলেও রস আস্বাদনে সমস্যা হয় না ;

২, প্রাগ বা প্রাহা ভ্রমণের নেপথ্যে ছিল স্থপতি শাকুর মজিদের প্রাচীন ও আধুনিক বিশ্ব স্থাপত্য রীতির নিদর্শনগুলো চাক্ষুষ করার প্রেরণা, স্থাপত্যের ছাত্রদের জন্যেও আছে আনন্দপাঠ;

৩, অস্ট্রিয়ার নিসর্গের লীলাভূমি সালজবুর্গকে (লেখকের দেয়া নাম লবনপুর ) ভ্রমণ তালিকায় রাখার কারণ এ শহর একদিকে যেমন মোজার্টের জন্মভূমি তেমনি কালজয়ী হলিউডি চলচিত্র ‘সাউন্ড অব মিউজিক’ চিত্রায়িত হয়েছিল এই শহরেই এবং এই শহরেরই একটি পরিবারের গল্প নিয়ে লেখা উপন্যাস থেকে!

৪, প্রাগ ভ্রমণের বৃত্তান্ত থেকে জানা যায় কবিগুরুর স্মৃতি বিজড়িত এই শহর কবির স্মৃতিকে চিরজীবি রাখার জন্যে ‘ঠাকুরোভা’ নামে একটা জায়গা, কবির ভাস্কর্য সম্বলিত একটা উদ্যানও করে রেখেছে;

৫, আরও বুঝেছি ভ্রমণকাহিনি লিখতে গেলে শুধু ইউরো খরচ করে ছবি টবি তুলে ঘুরে বেড়ালেই হয় না- বেড়ানোর জন্য রীতিমত হোম ওয়ার্ক করতে হয়, আর ফিরে এসেও ঐতিহাসিক, সামাজিক, ভৌগলিক, সাহিত্য- সাংস্কৃতিক পটভূমিগুলোকে ফিরে দেখা চাই!

 

‘প্রাগের ঠাকুরোভা/ লবনপুরের মোজার্ট’ বইটি হাতে পেয়েই আমি ভীষণ কৌতূহলী হয়ে উঠেছিলাম পঞ্চপান্ডবকে নিয়ে; এই ভ্রমণে লেখক ছাড়াও আরও দু জন স্থপতি এবং তাঁদের আরও দু জন বন্ধু ছিলেন। তো এই পাঁচ জনের তিন জনই আমার স্কুলের তিন বছরের বড় ভাই।

প্রাগের ঠাকুরভায় লেখক ও পঞ্চপর্যটক

শাকুর ভাইয়ের কলমের দু একটা স্ট্রোকে দেখলাম রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী এনায়েত ভাই এখনও গান করেন ( ছোটবেলায় শোনা ‘আজি বর্ষা রাতের শেষে’ ছাড়াও তাঁর কণ্ঠে ‘প্রতিধ্বনি শুনি’ এমনকি ‘ আমার চার বছরের বড় দিদির আঁচলে’ আজও মনে মনে শুনতে পাই) ; তবে হয়তোবা সময় তাঁর চপলতা হরণ করেছে কিছুটা ।

কাজী আরিফ ভাইয়ের চাকুরীটাই ছিল আমাদের সকলের খাবার দাবারের গুণগত মান পরখ করে দেখা; তাঁকে এখানেও খাবার, থাকা – এসব বিষয়ে মনোযোগী হতে দেখি। সাইদ হাসান ভাই একজন ভাল এথলেট ছিলেন, একে তো পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স তাঁর ওপরে বিদেশ বিভূঁই – তাই হয়তোবা তাঁর কোনো প্রতিভার ছাপ এই পর্বে দেখতে পাওয়া যায় না!

সালজবুর্গের পুরাতন প্রাসাদে লেখক

লেখকের আশৈশব ছবি তোলার শখ এইসব ভ্রমণে পূর্ণতা পেয়ে গেছে, কাকতালীয়ভাবে (ফেসবুকীয়ভাবে) একজন অফিসিয়াল ফোটগ্রাফার পেয়ে যাবার পরেও! ৭ ফর্মার বইতে দুটি শহরের অনেক প্রামাণ্য ছবি আছে, আলাদাভাবে পুরো এক ফর্মা রঙিন ছবির এ্যালবামও আছে যা থেকে পাঠক অন্য ভুগোলে বসেও পঞ্চপান্ডবের সাথে ইউরোপ ভ্রমণের আমেজটা পাবেন। তবে লেখকের আত্মস্বীকৃত বয়ান অনুযায়ী, ভ্রমণে তাঁর চোখ থাকে ক্যমেরার লেন্সে , তাই মানুষের সাথে তেমন কথা বলা বা মেলামেশা করার সুযোগ থাকে না। তীব্র রসবোধসম্পন্ন একজন লেখক যদি নানা দেশের মানুষের সাথেকার কথোপকথনের টুকরো নাইবা ধরে রাখলেন, তাহলে পাঠক হিসেবে কিন্তু আমরা বঞ্চিত হয়েছি বললে ভুল হবে না। কেননা যখনই তিনি মানুষের সাথে কথা বলেছেন, তখনই এই ভ্রমণকাহিনীতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে; যার সবচেয়ে হৃদয়গ্রাহী নমুনা হচ্ছে শেষ পৃষ্ঠায় এক চিত্রশিল্পীর সাথে আলাপ। লেখকের ইউরোপ ভ্রমণের বাকি দু পর্ব আর অন্যান্য ভ্রমণ ( বিশেষ করে আন্দামান) পড়ার ইচ্ছে নিয়ে মলাট বন্ধ করলাম।

২৯ মার্চ ২০১৫

 

মন্তব্য
Loading...