প্রথম পোর্ট্রেট, ১৯৮৭

১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমাদের ক্লাস শুরু হয় বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগে। ক্লাস শুরু হবার মাস খানেকের মাথায় আমার ঠাঁই হয় তিতুমির হলের নীচ তলার ১০৬ নম্বর কামরায়। সিঁড়ির গায়ে লাগানো এই কামরায় কেউ থাকতে চাননা বলে নতুন আমদানিদের সীট পড়ে এখানে।  অন্য যারা তখনো এ রুমের বাসিন্দা ছিলেন, তাদের সঙ্গে আমার দেখা হতো গভীর রাতে। ঘুমাতে এসে তাঁরা গীটার নিয়ে গান বাজনা করতে বসে যেত। আমার তখন বিরক্তির চূড়ান্ত। মুখ ফোটে কিছু বলতেও পারিনা । সকালবেলা তাদেরকে বিছানায় ঘুমের মধ্যে রেখে আমি চলে যাই ক্লাসে। রাতে যখন ফিরি , আমার হাতে পত্র-পত্রিকা, কাঁধে অটোফোকাস ক্যামেরা। আমি তাদেরকে আমার লেখা, পত্রিকায় ছাপানো আমার তোলা ছবি দেখাই । তাঁদের একজন আমার ক্যামেরা নিয়ে হাসাহাসি শুরু করে দেন । আমাকে বলেন, এটা দিয়ে তুমি কী ছবি তুলবা ? এতে ফোকাস চেঞ্জ করা যায়না, ক্লোজ আপ ছবি হয়না। তোমার জন্য দরকার এসএলআর ।
আমি তাঁর মুখের দিকে তাকাই। তিনি তাঁর আলমারীর ভেতর থেকে ক্যামেরা বের করেন । বলেন, এটা হচ্ছে এসএলআর – সিঙ্গেল ল্যান্স রিফ্লেক্টিং ক্যামেরা। বলেই খপ করে ক্যামেরা থেকে ল্যান্স খুলে ফেলেন, আবার লাগান। বলেন, সেকেন্ড ইয়ারে ফটোগ্রাফি সেশনাল আছে , এস এল আর লাগবে।
    আমি বলি, আমাদেরকেও শেখাবে ফটোগ্রাফি?
    ভাই বলেন, এটা কম্পলসারি সেশনাল। শিখতেই হবে। ডিপার্টমেন্টের নীচতলায় ডার্করুম আছে, ওখানে নিজের হাতে ছবি প্রিন্ট করতে হবে।
আমি বলি, ওটা কে শেখায় ?
ব্যাপারনা , সময় মতো সব জেনে যাবা।
যদি এখন শিখতে চাই ?

গেটের বাইরে এক ভিখারিনীকে দেখতে পাই, ১৯৮৭

তুমি ঝুমু আর জামীর সঙ্গে যোগাযোগ কর। ল্যাবের চাবি ওদের কাছে থাকে।
পরদিন থেকে আমি ঝুমু ভাই আর জামী ভাইকে খুঁজে বেরকরি এবং তাঁদের টাইমিংটা জেনে নেই। রাতের বেলা তাঁরা ডার্ক রুমে ঢুকবেন । তাঁদের মন জয় করার জন্য আমি বাড়তি খাটনি খাটি। তারা আমাকে রিকশা ভাড়া সহ হিসাব করে টাকা দেন। আমি নিউ মার্কেট যাই, আকসা স্টুডিও থেকে ৬০ টাকা দিয়ে এক প্যাকেট ব্রমাইড পেপার আনি। এক প্যাকেটে ১০ টা শীট থাকে। সঙ্গে হাইপো দানা কিনি, সলিউশন কিনি এবং রাত দশটা বাজার আগেই ডিপার্টমেন্টের নীচ তলায় গিয়ে অপেক্ষা করি। তারা এলে আমি ঢুকি। আমার কাজ হচ্ছে তাঁদের কাজ দেখা। আমি দেখি কেমন করে সবুজ বাতি জ্বালিয়ে নিগেটিভকে প্রসেস করা হয় আবার লাল বাতি জ্বালিয়ে নিগেটিভ থেকে ব্রমাইডের উপর আলো ফেলা হয় । আমি অবাক হয়ে দেখি- ব্রমাইডের উপর এক্সপোজ করা কাগজটি হাইপো মেশানো পানিতে দেয়ার পর কেমন করে ধীরে ধীরে বদলে যায়। প্রথমে চুল আসে, পরে চোখ, নাক, মুখ, কেমন যেন বিকশিত হয়। এটা নির্ভর করে এনলার্জার থেকে কত সময় ধরে আলো ফেলা হয়েছে তার উপর। এটা ঠিক না হলে বারবার করতে হয়। তাতে কাগজের অপচয় হয় বলে প্রথমে কাগজের ছোট ছোট টুকরার উপর স্যাম্পল প্রিন্ট করতে হয়। সে টাইমটা ঠিক মনে হলে তারপরই বড় কাগজের উপর আলো ফেলা, হাইপোতে চুবানো এবং সবশেষে পরিষ্কার প্রবহমান পানিতে তাকে অনেকক্ষণ ধোয়া।
এ কাজটা যথেষ্ট পরিশ্রমের। সবাই করতে চায় না। কিন্তু আমি কেনো যেনো মজা পেয়ে যাই। পরবর্তি্তে আমি তাঁদের কাছ থেকে চাবি নিয়ে একা একা ছবি প্রিন্ট করার কাজটি করতে শুরু করি। প্রথম যে ছবিটা প্রিন্ট করি, তা আমার নিজের ছবি। ঝুমু ভাই তাঁর ক্যামেরায় তুলে আমাকে নিগেটিভ দিয়ে দিলেন, আমি নীরিক্ষা করার জন্য নিজের ছবিটাই বেছে নিলাম। ৩ বার কাগজ নষ্ট করার পর মনে হলো, এ প্রিন্টটা কাওকে দেখানো যায়।
১৯৮৭ সালে সেকেন্ড ইয়ারে ফটোগ্রাফি কোর্সের ক্লাস নিতে আসেন ইফতেখার (মুদি) স্যার। প্রজেক্ট-এর নাম ব্যাকেটিং। পরপর তিনটা ছবি তুলতে হবে। একটায় কম এক্সপোজার, একটায় সঠিক এবং একটায় বেশি। প্রথম তিনটায় এপার্চার বদল এবং পরের তিনটায় সাটার স্পীড বদল করে এ কান্ড ঘটাতে হবে, জমা দিতে হবে নেগেটিভ।
    আমি আমার ক্যামেরা দেখাই স্যারকে। স্যার হাসেন। বলেন- এসএলআর লাগবে। তিনি এপার্চার-সাটার স্পিড গল্প শোনান এবং পরের ক্লাসে নেগেটিভ জমা দেয়ার কথা বলে ক্লাস শেষ করেন।
ইফতেখার স্যার বেশিদিন পড়ান না। তিনি বিদেশ চলে যান। আমাদের ফটোগ্রাফি শেখাতে আসেন সদ্য পাশ করা, ছিপছিপে এক ভাই, ইনান ভাই। তাঁকে আমরা গত বছর দেখেছি ফিফথ ইয়ারে ক্যামেরা নিয়ে ঘুরাঘুরি করতে । এবার তিনি আমাদের ফটোগ্রাফি ক্লাস নেবে। প্রথম ক্লাসেই তিনি একটা প্রজেক্ট দেন। সাবজেক্ট হচ্ছে – পোর্টেট। আমি ছবি তোলার জন্য অস্থির হয়ে যাই।

    আমি জামি ভাইয়ের ক্যামেরা নিয়ে নিউমার্কেট যাই। ওখান থেকে এফডিসির চোরাই ফিল্ম কিনি ১৫ টাকায় এবং গেটের বাইরে এক ভিখারিনীকে দেখতে পাই। তাঁর ছবি তুলি এবং নিজে প্রিন্ট করে ক্লাস প্রজেক্টে জমা দেই।  এই ছবিটা ক্লাসে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেলো। আমি ক্লাসে কখনোই কোনো বিষয়ে হাইয়েস্ট মার্ক পাই না। মাঝামাঝি পর্যায়ে থাকি। কিন্তু এখানে হাইয়েস্ট!পোর্ট্রেট তোলার প্রতি আমার আগ্রহ বেড়ে যায়। কিন্তু বাংলা একাডেমীর বই মেলায় নাসির আলী মামুন নামক এক ফটোগ্রাফারের তোলা কিছু পোর্ট্রেট দেখে আমি বুঝে যাই, আমারটা কিছুই হয়নি। আমার আবার নতুন ভাবে পোর্ট্রেট তোলা শুরু করি।

Leave a Comment