ক্যাম্পাসের আলো-ছায়া, ১৯৮৭

সেকেন্ড ইয়ারে পড়ার সময় থেকেই বুয়েটের আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টের আন-অফিসিয়েল ফটোগ্রাফার হিসেবে আমার একটা কদর হয়ে যায়। ঘটনাটা ঘটে বুয়েটের ‘রজত জয়ন্তি’ উৎসবের সময়, ১৯৮৮ সালে।
রজত জয়ন্তি উপলক্ষে যে স্মরণিকা বেরোবে, আমি তাঁর সম্পাদক। কিন্তু আমি পড়ি সেকেন্ড ইয়ারে, আমার মুরুব্বিরা সবাই ফিফথ ইয়ারের। তাঁরা যা যা বলে দেন, আমি তা তা করি। নামে আমি সম্পাদক, কামে আমি তাঁদের চাকর।
ম্যাগাজিনে অনেক ছবি যাবে।আমি বড়ভাইদের বলি- ছবি তুলবে কে?
কেনো- তুমি তুলবা।
খুব সরল জবাব। আমি নিউমার্কেটে যাই। সস্তার ফিল্ম কিনি।সবগুলো ক্লাসের গ্রুপ ছবি, সাব কমিটির, শিক্ষকদের, ক্লাস এক্টিভিটি, ডিপার্টমেন্টের পরিবেশ, এসবের ছবি তুলে তুলে আমি ২-৩ টা ফিল্ম শেষ করে ফেলি। ছাত্র সংসদের কোষাধ্যক্ষ খোকন ভাইকে বলি- টাকা দেন, ফিল্ম প্রসেস করবো, প্রিন্ট করবো।
–    কত লাগবে?
–    দ্যান, ৩-৪ শ’তো লাগবেই। বেশিও লাগতে পারে। আপনি ৫শ টাকাই দেন। যা লাগে লাগবে, বাকিটা ফেরত পাবেন।
খোকন ভাই আমাকে ১শ টাকা দেন। বলেন, নিউমার্কেট থেকে ফটোপেপার কিনে এনে ল্যাবে নিজে প্রিন্ট করতে। আমি নিউমার্কেট যাই। ৮০ টাকায় এক প্যাকেট ফটোপেপার পাওয়া যায়। এ-ফোর সাইজের ১০টি কাগজ থাকে সেখানে। আর্কিটেক্‌চার ডিপার্টমেন্টের নিচ তলায় ডার্করুম। এই ডার্করুমের চাবি আমার কাছে। আমার নিজের টাকায় কেনা হাইপো আছে, সলিউশন আছে। সুতরাং আর টাকার কী প্রয়োজন! আমার সাথে যোগ দেন ঝুমু ভাই আর জামি ভাই। উনারা থার্ড ইয়ারে। দু’জনে ছবি প্রসেস করতে পারেন। এখানেও আমি কামলা। ঝুমু ভাই ঘড়ি ধরে এক্সপোজার ঠিক করেন। আমার কাজ হাইপোর ভিতর ফটো পেপার চুবিয়ে খুব মোলায়েমভাবে কাগজে ঘষা, যাতে কেমিক্যালের সবটুকু ঠিকমতো কাগজে লাগে। ছবি ঠিক মতো এক্সপোজ হলে কলের পানিতে ধোয়া। ২০ মিনিটের মতো ধুইয়ে তারপর আংটা দিয়ে টাঙিয়ে দিতে হবে ঝুলনো রশির ওপর। এ করে আমি ছবি প্রিন্ট করা শিখে ফেলি। আমার খরচ একদম কমে এসেছে। ৭০ টাকার প্রিন্ট আমি ১০ টাকার কাগজে সারতে পারি।এখন সাবজেক্ট খুজি ছবির।ক্যাম্পাসই আমার সাবজেক্ট।
আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টের পশ্চিম পার্শে বুয়েট ক্যাম্পাসের সীমানা বরাবর বড়ো রাস্তার উপর কতোগুলো উচু গাছ। দুপুর বেলা এ গাছ থেকে ছায়া পড়ে পীচ ঢালা রাস্থার উপর। আমি প্রায়ই এ ছায়া দেখি।

১৯৮৭ সালে স্থাপত্য বিভাগের পেছন থেকে তোলা

বুয়েটের পাশেই পলাশী থেকে নীলক্ষেত বরাবর একটা বিশাল বস্তি। এ বস্তির পাশ দিয়ে মাঝে মাঝে সাইকেলে চলাচল করা যায়, রিকশা চলেনা। এ বস্তির কিছু শিশুর সঙ্গে আমার খাতির আছে। কারন তাঁদের ছবি তোলার জন্য আমি ওখানে যাই। অনেকেই আমাকে চেনে, কারন তারা আমাকে ক্যাম্পাসে দেখে।কয়েকদিন পরে তাঁরা ডিপার্টমেন্টে এসে আমাকে খোঁজে, তাঁদের ছবি নিয়ে যায়। এরা আমাদের ডিপার্টমেন্টে এসে বাথরুমের কল থেকে কলসী ভরে ভরে পানি নিয়ে যায়। ঘটনা প্রতিদিনের। কিন্তু একদিন আমি পেয়ে গেলাম। ভাইবোন এসেছে কলসী ভরে পানি নিতে, ফেরার সময় পেছন থেকে আমি তাঁদের দেখি। আমার সঙ্গে থাকে ক্যামেরা, আমি আর দু্যুটি হারাই না।
সাধারনত ‘টপ সান’-এর সময় আমি ছবি তুলিনা।এসময় ছায়া আসে , সাবজেক্ট হারিয়ে যায়। অথচ, ভর দুপুরের কড়া রোদে টপ সানের এ ছবিটা আমার স্মৃতি জাগানিয়া ক্যাম্পাসকে বার বার মনে করিয়ে দেয়।

Leave a Comment