রোকশানা ঃ আমার টার্নিং গার্ল, ১৯৯০

কাওরান বাজার বস্তির রোকশানা আমার ফটোগ্রাফি জীবনটা পালটে দিয়েছিলো। ১৯৯০ সাল। পড়ি বুয়েটের থার্ড ইয়ার আর্কিটেকচারে, থাকি তিতুমীর হলের উত্তর ব্লকের ৪০৪ নম্বর রুমে। আমার টেবিলের সামনের দেয়ালে নিজের হাতে সাদা-কালোয় প্রিন্ট করা কতোগুলো ছবি গাম দিয়ে আটকানো।

একদিন নির্ঝর ভাই (স্থপতি এনামুল করিম নির্ঝর) এলেন আমাদের রুমে কী একটা কারনে। তিনি দেখি সব বাদ দিয়ে তিনি আমার তোলা ছবিগুলো দেখছেন। আমাকে বলেন- তুমিতো ভালোই ছবিতুলো, সামনে একটা ভালো কন্টেস্ট আছে, ইউনিসেফের। সাবজেক্ট- মেয়ে শিশু। ওখানে ছবি দিতে পারো।

আমি বলি, মেয়েশিশু নিয়েতো আমার কোনো ছবি নাই, ছেলেশিশু আছে।

তিনি বলেন, তুলে ফেলো। ৪-৫ দিন মাত্র সময় আছে, বিপিএস এ জমা দিয়ে দাও।

-কোথায়?

-বিপিএস। বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি। এলিফ্যান্ট রোডে অফিস। আজই গিয়ে ফর্ম নিয়ে আসো, ডিটেইলস জেনে আসো।

আমি পরদিন ক্যামেরা নিয়ে বেরোলাম। সঙ্গে আমার লাল রঙের হিরো সাইকেল। এখন মেয়েশিশু পাই কই?

প্রথমে গেলাম হলের পাশের পলাশী বস্তি। সুবিধাজনক মেয়েশিশু চোখে পড়েনা। আমি সাইকেল চালাতেই থাকি। নীলক্ষেত-হাতিরপুর মেরে হাজির হই কাওরান বাজার বস্তিতে। সুন্দরবন হোটেলের পেছন দিকে এখন যেখানে একটা কনভেনশন সেন্টার হয়েছে, সেখানি বস্তিটির অবস্থান। নেমে সাইকেলটা বাইরের মাঠের কোনায় শিকল দিয়ে বেঁধে আমি হাঁটতে থাকি বস্তির ভেতর দিয়ে আর মেয়েশিশু খুজি। দেখি ৭-৮ বছরের একটা মেয়ে ঘরের বেড়ার ভেতর থেকে আমাকে দেখছে। মেয়েটির চাহনীর ভেতর কী যে এক সুন্দর লুকানো ! মনে হলো, দরিদ্র ঘরে জন্ম না হলে এ মেয়েটি ্কী সুন্দর একটা ভবিষ্যতের দিকে যেতে পারতো। আমি তার দুটো ছবি তুলি। একটি খাড়া, আরেকটি আনুভূমিক।

সেদিন আরো অনেক ছবি তুলে ফিল্ম শেষ করে ফেলি এবং নিউমার্কেটে এসে আকসা স্টুডিওতে ফিল্ম প্রসেস করে এক প্যাকেট কাগজ কিনে চলে আসি বুয়েটে, সরাসরি ‘আমার’ ডার্ক রুমে। আর কোনো ছবি পছন্দ হলোনা। এ ছবিটা প্রিন্ট করে পরদিন বিপিএসে গিয়ে জমা দিয়ে দেই। ছবির শিরোনাম দেই, ‘আলোকে অন্ধকারময়’।

এ ছবিটা প্রিন্ট করে পরদিন বিপিএসে গিয়ে জমা দিয়ে দেই। ছবির শিরোনাম দেই, ‘আলোকে অন্ধকারময়’।

এর পরের ঘটনাগুলো অন্যরকম। মাস দুই পরে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ছাপা হলো একটা নিউজ। সেখানে মেয়েশিশু বিষয়ক প্রতিযোগিতার ফলাফল ছাপা হয়েছে এবং ৩য় পুরস্কারের পর আরো তিন জনের নাম আছে ‘অনারেবল মেনশন’-এ, প্রথম নামটা আমারই। প্রতিযোগিতার আয়োজক যেহেতু ইউনিসেফ, এরপর পুরষ্কার প্রদান, আলোচনা, সেমিনার সবগুলোতে আমাকে দাওয়াত পাঠানো হতে থাকে। বাংলাদেশ ফোটোগ্রাফিক সোসাইটিতে আমি সদস্য হয়ে যাই, আমাকে যথেষ্ট কদর করতে থাকেন সবাই। যে ৮শ ছবি জমা পড়েছিলো তার প্রায় সবগুলোই পেশাদার বা প্রায়-পেশাদার আলোকচিত্রীর, খুব সামান্যসংখক ছাত্র প্রতিযোগী ছিলো তার মধ্যে আমি একজন। বুয়েটের জনসংযোগ কর্মকর্তা ছিলেন মির্জা তারেকুল কাদের। তিনি এটা শুনে আমাকে বলেন, একটা পাসপোর্ট সাইজের ছবি দিতে। তার কয়েকদিন পর ইংরেজি দৈনিক ডেইলী স্টার-এর তিনের পাতায় সিঙ্গেল কলামে আমার ছবি দিয়ে একটা নিউজ ছাপা হয়- BUET Student Awarded in Photography. এটাই ছিলো কোনো পত্রিকায় আমাকে নিয়ে প্রকাশিত প্রথম কোনো সংবাদ।

একসময় দুটো প্রদর্শনী শেষে আমি বাঁধানো ছবিটা ফেরত পাই। ভাবলাম, যে মেয়েটার ছবি তুলে এতো নাম করলাম, তাঁকে ছবিটা দিয়ে দিলে সে খুশী হবে। তাঁকে টাকা দিলেই সে বেশী খুশী হতো, কিন্তু ১-২০০ টাকার বেশী দেবার ক্ষমতা আমার নাই। আমি সেই বাঁধানো ছবিটা নিয়ে আবার যাই কাওরান বাজার বস্তিতে। গিয়ে সেই ঘরের সামনে গিয়ে মেয়েটাকে খুজি। মেয়েটা খেলতে গেছে কোথাও, তার মা গেলেন ডেকে আনতে। একসময় সে এসে দাঁড়ায় আমার সামনে। নাম বলল- রোকশানা। কোনোদিন স্কুলে যায়নি। বাবা রিকশা চালান। তিনি দুপুরে খেতে এসেছিলেন ঘরে, তাঁকে বললাম ছবির কাহিনী।

রোকশানা এবং তার বাবা ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিতে হইলো

রোকশানা এবং তার বাবা ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিতে হইলো। মাঝে মাঝে মিটমিট করে হাসল। আমি বললাম, যাই !

তারা মাথা নাড়লো।

আমি জানিনা, বাধাই করা ছবিটা রোকশানা কি তার ঘরে রেখেছে? ওখান থেকে বস্তি উঠে গেছে বহু আগে। রোকশানার বয়স এখন ৩২-৩৩ হবে। আমার সঙ্গে কোথাও দেখা হলে তাঁকে চেনার কনো ক্ষমতা আমার নাই।

Leave a Comment