জড়ায়ে আছে বাঁধা, ছড়ায়ে যেতে চাই- ১৯৯১

আমাদের কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতের নির্জন ভোর যে দেখে নাই, তার কক্সবাজার যাওয়া ঝিনুক কেনার জন্যই কেবল সার। আমি ১৯৮৩ সাল থেকে বহুবারই গিয়েছি ওই সৈকতে, এবং বলতে কষ্ট নেই, কেবল একবারই ভোরের সূর্যের আগে নিজেই পৌঁছেছিলাম সেই নির্জন সৈকতে ।চোখের সামনে দিয়ে আধার ফুড়ে এক সময় হালকা আলোতে ভরে গেলো সৈকত। কতোগুলো জেলে আর ঝিনুক কুড়ানী কশোর কিশরী ছাড়া আর কোনো পর্যটকও নাই সেখানে।

ঘটনা ১৯৯১ সালের অক্টোবর মাসের। আকাশ খানিকটা মেঘলাও। একটু মন খারাপ এজন্য যে, হিসেব মতো সূর্য তখন রোদ ফেলার কথা। সকালের মিঠে রোদে ছবি তুলবো বলে এসেছি, কিন্তু রোদেরও দেখা নাই।

বাংলাদেশ বিমানের বিজ্ঞাপনে দীর্ঘদিন এ ছবিটি ব্যবহার করে

আমার সঙ্গী ছিলেন খন্দকার তাজ উদ্দিন ভাই। তাঁকে আর দেখছিনা। শৈবালের কূল থেকে কলাতলী পর্যন্ত পেয়েছিলাম, এখন আর নাই। তিনি কি হেঁটে হেঁটে হিমছড়ির দিকে চলে গেলেন?

আমার সামনে কতগুলো জেলে। বাচ্চাবাচ্চা ছেলে-মেয়েগুলো ছোটো ছোটো জাল ঠেলছে। কাছে গিয়ে কথা বলি ।ওরা পোনা মাছ ধরবে। একজনের সঙ্গে একজন এসিস্ট্যান্ট। এসিস্ট্যান্ট-এর কাজ একটা পানির বালতির মধ্যে পোনা মাছ রাখা।

সকাল বেলার এ আলোয় রঙের কোনো বৈচিত্র্য আনে না। তার উপর ঘোলা পানির সাগরের ঢেউ। আমি মন খারাপ করে করে আরেক জেলের কাছে যাই।

এই জেলে একটা উড়াল জাল ফেলছেন সাগরের উপর। কোমর পানি পর্যন্ত নামা তার শরীর। একবার দেখি, জালটা পুরা যখন খুলে যায়, মনে হয়ে এটা একটা গোলক, অথবা আমাদের এই বিশ্ব ভ্রম্মান্ড। আমি অপেক্ষা করি তার পরবর্তি এটেম্পটির জন্য এবং জালটি যখন পুরা খুলে গেলো তখনই ক্লিক করে শাটার খুলে দিলাম।

১৯৯৭ সালে আমার প্রথম একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী হলে এ ছবিটা প্রদর্শনীতে দেই। এর সপ্তা দুই পরে আমাকে ফোন করা হয় ‘বলাকা’ থেকে। যিনি ফোন করেছেন তিনি বাংলাদেশ বিমানের জনসংযোগ উপ-পরিচালক। ফোনে খুব সংক্ষেপে তিনি বলেন যে, ওই জাল ফেলার ছবিটা নিয়ে যেনো আমি বিমান বন্দরের কাছে তার অফিসে যোগাযোগ করি।

আমি পরদিন গিয়ে হাজির । শেষ কথা ছিলো এমন যে, বাংলাদেশ বিমান নতুন একটি বিজ্ঞাপন তৈরি করছে। সেখানে এ ছবিটা ব্যাবহার হবে, নীচে লেখা থাকবে, ‘জড়ায়ে আছে বাঁধা, ছড়ায়ে যেতে চাই’।

কর্মকর্তা মহোদয় আমাকে বোঝালেন যে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাঙ্গালীদের আমরা একজালে আটকে রাখছি, এমন কিছু।

আমি তো মহা খুশী। আমাকে একটা চুক্তিপত্র দিয়ে সেখানে সই নিলেন, আর ১৫ দিন পর এসে একশো ডলারের সমমূল্যের বাংলাদেশী টাকা নিয়ে যেতে বলেন।

এরপর প্রায় ২ বছর ধরে এ ছবি দিয়ে বাংলাদেশ বিমানের বিজ্ঞাপনটা আমি বিভিন্ন জায়গায় দেখে পুলকিত হয়েছি।

Leave a Comment