সূচনাপর্ব, ১৯৮৪

ছবি তোলার নেশায় আমাকে কবে পেয়েছিলো ঠিক মনে করতে পারি না। তবে আমার যখন ১৪-১৫ বছর বয়স, সে সময় বাবার কাছ থেকে একটা ক্যামেরা পেয়েছিলাম। কোডাক এর ক্যামেরা । এর ভেতর ফিল্ম ঢোকানোর যে ব্যবস্থা ছিলো, আমার তা জানা ছিলো না। আমি জোর করে ক্যামেরা খুলতে গিয়ে প্রথম দিনই ক্যামেরাটা নষ্ট করে ফেলি। সিলেটের কতগুলো স্টুডিওতে ঘুরে ঘুরে কোনো মেকানিক পাইনি ক্যামেরা সারানোর জন্য।

ক্যামেরার প্রতি একটা খায়েস জন্মে আমি যখন দশম শ্রেণিতে। তখন ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে পড়ি। মাধ্যমিক পরীক্ষার সময়টুকুতে কলেজের নিয়মকানুন পরীক্ষার্থীদের মধ্যে শিথিল হয়ে যেতো। আমাদের হাউজের দুইজন দুটো ক্যামেরা নিয়ে আসে। তার একটি পিনহোল, টিপ দিলে ছবি ওঠে। আরেকটি ক্যামেরা বড় অদ্ভুদ ছিলো, ইয়াশিকা। ওটাতে ফোকাস করার বিষয় ছিলো। ভিউ ফাইন্ডারে তাকালে একটা গোলাকার চাকতি ভেসে আসতো, তাতে একটা বৃত্তের মধ্যে চারটা ভাগ। উপরে নিচের লাইন সোজা হলে ধরে নিতে হতো যে ফোকাস হয়েছে। এটা আমাকে প্রথম শেখায় এই ক্যামেরার মালিক আহমেদ। আমরা ছবি তুলি, এবং ফিল্মটি খুলে বাড়িতে নিয়ে যাই। আহমেদ তার ফিল্ম কাওকে ধরতে দেয় না। সে ফিল্ম পাঠাবে শারজাহ, তার ভাইয়ের কাছে। সেখান থেকে ছবি হয়ে আসবে। রঙিন ছবি প্রসেস করার মেশিন তখন চট্টগ্রামে আসেনি।
আমরা ৫ জন মিলে একবার একটা রঙিন ফিল্ম কিনি। আহমেদকে তোয়াজ করে তার ক্যামেরা নিয়ে তার কাছে ফিল্ম ভরতে শিখি, ফোকাস করা শিখি, এপারচার-শাটার স্পিড বুঝি না, শুধু বুঝি কড়া রোদে ছবি তুললে ১৬তে, কম রোদে হলে ৮ এ আর ছায়ার মধ্যে তুললে ৪ এ দিয়ে ছবি তুলতে হয়।
এই ফিল্ম  নিয়ে আমি ছুটিতে বাড়ি নিয়ে যাই এবং আমার বন্ধু ছানুর কাছে লোক মারফত পাঠিয়ে দেই দুবাই। মাস দুই পর কলেজের ঠিকানায় একটা প্যাকেট আসে। প্রতিটি ছবি দুই কপি করে প্রিন্ট করা। সবগুলো রঙিন ছবি। কেমন যেন ঝকঝক করে সব কিছু। লাল ফুল, সবুজ পাতা, নীল আকাশ এর আগে আমার নিজের কোনো ছবিতে দেখিনা। আমি মহা আপ্লুত হয়ে পড়ি আরো ছবি তোলার জন্য, কিন্তু ক্যামেরা পাবো কোথায়? কে দেবে আমাকে ছবি তুলে দেবার সুযোগ?
এরপর অবশ্য ছবি তোলার সুযোগ পাই বছর খানেক পর। ক্লাসের সবাই শিক্ষা সফরে যাবে, সঙ্গে যাবে কালেজের ক্যামেরাও। ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর জন্য যত ছেলের আগ্রহ, তার পেছনে থাকতে অনুৎসাহীদের সংখ্যা তার চেয়ে বেশি। এই সুযোগে আমি ক্যামেরা হাতাই। আমার গলার মধ্যে ক্যামেরার ফিতা ঝুলিয়ে রাখতেই আমার ভালো লাগে। আমি ক্যামেরায় ফোকাস করা জানি, আমার সমস্য নাই।
এক্সকারশন এর পর ক্যামেরা ফেরত দেয়ার পর আবার ক্যামেরা ছু’তে সময় লাগে আরো প্রায় দু’বছর। অনেক অনুনয় বিনয় করে মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী আমার এক চাচাতো ভাইকে দিয়ে আমি একটা ক্যামেরা আনাই। এটা ইয়াশিকা এমএফটু অটো ফোকাস। আমি ব্লাক-এন্ড হোয়াইট একটা ফিল্ম ভরে এটা দিয়ে গ্রামের মানুষের ছবি তুলি। বাড়ির পাশে খালের উপর হাঁসের চলাফেরা, পুকুরে ঝাপ দেয়া শিশু কিশোর, কিংবা গরুর পাল নিয়ে আসা রাখাল বালক।

এই ক্যামেরা নিয়ে আমি সিলেট যাই। কীন ব্রিজের ছবি তুলি

 

আমি ব্লাক-এন্ড হোয়াইট একটা ফিল্ম ভরে এটা দিয়ে গ্রামের মানুষের ছবি তুলি, ১৯৮৪
মন্তব্য
Loading...