ট্র্যাভেলার্স ক্লিক্স- মুহাম্মদ জুবায়ের

সিলেটে শাকুর মজিদের একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী সমাপ্ত

‘তার ছবিতে বাস্তবতার নিদর্শন ও সোনালি অতীত দেখে সত্যকে আরো বেশি জীবন্ত মনে হয়’

মুহাম্মদ জুবায়ের

“এখন পাহাড়, নদী সমুদ্র কিংবা অনন্ত নক্ষত্র কোনটাই আমাকে আকর্ষণ করেনা। সম্ভবত খুব বেশি জীবন্ত বলে। কিন্ত শাকুর মজিদের ছবিতে বাস্তবতার অনুপম নিদর্শন এবং সোনালী অতীত দেখে সত্যকে আরো বেশী জীবন্ত মনে হচ্ছে।” কথাগুলো লুবনা’র। রাজশাহীর মেয়ে লুবনা এই ব্যতিক্রমী মন্তব্য কথাগুলো ছুড়ে দিয়ে স্বয়ং শাকুর মজিদকে মুগ্ধ করেছেন। হ্যাঁ সিলেট শহরের শহীদ সোলেমান হলে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কারপ্রাপ্ত সৌখিন আলোকচিত্রী শাকুর মজিদের একক আলোকচিত্র এক পলক ঘুরে অনেকেই এমন মন্তব্য ছুড়েছেন। গত ১১ অক্টোবর সমাপ্ত হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত ও নেপালের স্থাপত্য সংস্কৃতি ও ভূমি রূপের তুলনামূলক তথ্যচিত্র দু’শ ছবি প্রদর্র্শনীতে স্থান পেয়েছিল। তিনদিনই আলোকচিত্র পিপাসুদের সমাগম ছিল লক্ষণীয়।

হাজারো শব্দের চেয়ে বাঙময় সত্যি, তার ছবি ‘হাজারো শব্দের চেয়ে বাঙময়’। না, শুধু বাঙময় নয়। অনেক টাকা ব্যয়। তার ‘ছবি গল্প শোনায়’। গল্প শোনাবার জন্য তিনি একাধিক ছবি নিয়ে একেকটি ফ্রেম বেঁধেছেন। প্রতিটি ফ্রেমেই একেকটি চমৎকার গল্প লুকিয়ে আছে। একটি ফ্রেম এখানে উদাহরণ হিসেবে দাঁড় করানো যায়, উপরের ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ভারতের সিমলায় অপরূপ সৌন্দর্যকে ধারণ করার জন্য এক পরিব্রাজিকা সে অঞ্চলের ঐতিহাসিক পোশাক পরে পেশাদার আলোকচিত্রীর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। নিচের ছবিতে এলাকার এক দিনমজুর মহিলা ও তার সন্তানের দৈন-দশা এবং নিচের ডান দিকে দিল­ীর কেল­ায় এক ভারতীয় মহিলা। এই তিনটি ছবি একটি ফ্রেমে বেঁধে শাকুর মজিদ ‘নারী ও নিঃসর্গ’ শীর্ষক একটি গল্পে বলেন।

আর এ কারণেই উদ্বোধনী দিনে শাকুর মজিদের ছবি দেখে তথ্য সচিব আকমল হোসেইন মেনে নিয়েছেন, একটি ছবি যে হাজারো শখের চেয়ে শক্তিশালী হতে পারে। সচিব বলেন ‘তার আলোকচিত্র বৈচিত্রের মধ্যে সাদৃশ্য খোঁজার এক অনন্য সুন্দর প্রয়াস। প্রদর্শনীতে আলাপ হলো বালাগঞ্জ কলেজের প্রভাষক লিয়াকত শাহ ফরিদীর সাথে। লেখক সাংবাদিক লিয়াকত শাহ ফরিদী বলেন ‘এমন আয়োজন    প্রসংশনীয়’ আলোকচিত্র শুধু দেখার নয়, এতে অনেক কিছু শেখারও আছে। শাকুর মজিদের ছবিতে মানুষের জীবন ধারা ও ঐতিহ্যের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে।

সে ও তার প্রভু…

‘সে ও তার প্রভু …শীর্ষক ছবিটি’র সামনে গিয়ে অনেকেই থমকে দাঁড়িয়েছেন। তাকিয়েছেন অবাক চোখে। লজ্জা এবং দুঃখ ভরা হৃদয় নিয়ে পরবর্তী ছবির দিকে এগিয়েছেন। কী ছিল সেই ছবিতে? আরব-আমিরাতের আল-আইনের ছবিতে ৮ হাজার টাকা বেতনধারী এক বাংলাদেশী শ্রমিককে দেখা যাচ্ছে। তার ঘর বড় নিম্নমানের। ঘরের সম্মুখে কাটা তারের বেড়ায় হাত দিয়ে সে আনমনে তাঁকিয়ে আছে। যেন কারাবাস। কাছেই তার ‘প্রভু’। কিন্তু প্রভু’র সান্নিধ্যে যাবার কোনো ক্ষমতা নেই তার। অথচ একবয়সী অপর এক আরব যুবককে দেখা যাচ্ছে তার ‘প্রভু’র সাথে মায়ামমতায় জড়াজড়ি করতে। সেই আরব যুবক তার প্রভুর কতই না নিকটে…। আসলে ছবিটি দেখার পর হৃদয়বান যে কারো মন কেঁদে উঠবে। এই ছবিটির ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে এমসি কলেজেরে ছাত্র রেদোয়ান বলেন, ছবিটি দেখে বার বার বিদেশে বাংলাদেশী প্রবাসীদের জীবন সংগ্রামের কথা মনে পড়ছে। ভীষণ কষ্ট পেলাম।

ফেলে আসা চিহ্নগুলো…

‘ফেলে আসা চিহ্নগুলো’ শীর্ষক ছবিতেও  অল্প আয়ের প্রবাসীদের জীবন গল্প ফুটে উঠেছে। এটিও আরব আমিরাতের ছবি বিশেষ ধরনের বাড়িতে ছিল আরবদের যাপিত জীবন। প্রবল তাপ থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য মাটির দেয়াল ও খেজুর গাছের ছাউনি দিয়ে বানানো ঘর। মাঝখানে উঠোন। এককোণে বানানো ছাদারা। কিন্তু আরবদের বাস এখন সুরম্য অট্টালিকায়। অতীত স্মৃতিবাহী নীড়গুলোতে, ফেলে আসা চিহ্নগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন ভিন দেশ থেকে আগতরা। আগুয়ান বিশ্বে এই দৃশ্য বড় করুণ, দারুণ বেদনাময়। এই সব দৃশ্য ধারণ করে শাকুর মজিদ দরিদ্র্রক্লীষ্টদের প্রতি তার হৃদ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। আঘাত করেছেন বিশ্ব মানবতার হৃদয়ে হৃদয়ে…।

কংক্রীটের দেয়াল যখন শিল্প…

প্রদর্শনীতে চার দেয়াল ঘুরে ঘুরে ছবি দেখেছেন শামসাদ হুসাম। ২য় দিনের সন্ধার সূচনায় এসেছিলেন তিনি। বলে­ন ‘কংক্রীটের দেয়াল ও যে শিল্পের মাধ্যম হতে পারে, শাকুরের ছবি সে কথাই প্রমাণ করেছে। শাকুর বিয়ানীবাজারের ছেলে। আমিও বিয়ানীবাজারের সন্তান এই মুহূর্তে এটাই আমার সবচেয়ে ভালোলাগা’। আসলে কংক্রীট শুধু শিল্প মাধ্যম নয়, ভালোবাসার প্রকাশও বটে। উদাহরণ তাজমহল। শাকুর মজিদের ক্যামেরায় সাড়ে ৩শ বছর পুরনো সেই ভালোবাসার নিদর্শন তাজমহল চমৎকারভাবে উঠে এসেছে। ভারতের আগ্রা থেকে খিলান উপ্যাখানও নিয়ে এসেছেন। মণিমুক্তা খচিত তোরণে খিলানগুলোর নির্মাণ শৈলীর দৃশ্য কেড়ে নেয়। ক্ষমতায়নের উচ্চতম চিহ্ন শীর্ষক কুতুব কমপ্লেক্স এবং ‘ভিক্টোরিয়ার ইচ্ছাঃ চাই আরেক তাজ’ শর্ষিক ছবি দুটোও অপূর্ব। ভারতের মানালি’র তুষার পর্বতের অপরূপ দৃশ্য, বেড়া চারিনী হামিদাবানু ও তার বেড়াগুলো, ‘লাল পাথরের ছন্দ’ শীর্ষক দিল­ী কেল­া, ‘লীলা ও শ্বেত মর্মের কাব্য’ শীর্ষক আগ্রা দুর্গ ‘মার্বেল পারের বিন্যাস’ শীর্ষক জয়পুরের সিটি প্যালেস সিমলা থেকে ‘তোলা পাতা ঝরা বৃক্ষেরা’ ও ‘তুষার এবং ‘ মৃত ঘাস’ শীর্ষক ছবিগুলো ভালো লেগেছে।

‘নিঃসঙ্গতায় বিলাস’ ও ‘নৈঃসর্গের সুধা’

দু’টো ছবির মূল কথা প্রায় একই রকম। পৃথিবীর সব দেশের মানুষই যে নগরায়িত যান্ত্রিকতায় বিরক্ত হয়ে পড়ে, জনাকীর্ণ শহর ছেড়ে শান্তির অন্বেষায় অনেকটা পালিয়ে বেড়ায় তারই দুটো দৃশ্যপট নিয়ে এসেছেন শাকুর মজিদ। একটি ওমানে মাহধা ও অন্যটি ভারতের মানালি কলকাতা সড়ক থেকে। ওমানের ছবিতে দেখা যাচ্ছে আলী বিন সায়ীদ (৮০) জনাকীর্ণ শহরে তার নিজের বাড়ী ও সম্পদশালী পরিজনদের ছেড়ে বহুদূরে এসে বসবাস করছেন। যে প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে চলছে তার যাপিত জীবন। ভারতে ছবিটিতে এক বৃদ্ধ লোকালয় ছেড়ে ক্ষেতের পাশে ঘর বানিয়ে থাকছেন। এটাই তার….।

যেখানে শান্তির বসবাস …

শান্তির প্রতীক পায়রা উড়ার কয়েকটি দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করেছেন শাকুর মজিদ। তার বক্তব্য ‘শান্তির প্রতীকের আস্তানা হয় শান্তিপ্রিয় স্থাপনায়। তাই তিনি দিল­ীর জুমা মসজিদ, জয়পুরের জন্তর মন্তর, কাঠমন্ডুর বৌদ্ধ প্যাগোড়া ও কলকাতার হিন্দু মন্দির ভুবে নম্বর থেকে পায়রা উড়ার দৃশ্য ধারণ করেছেন।

কাঠমন্ডুর কারুকাজ…

শাকুর মজিদ নেপালের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো, বিশেষত কারুকার্য খচিত স্থাপনাগুলো তার ক্যামেরায় ধারণ করেছেন ‘কাঠমন্ডু কারুকার্য’ শীর্ষক ছবি তার উদাহরণ। এছাড়া ৪শ বছর আগে নেপালের নির্মিত রাজপ্রসাদ ও তাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা মন্দির ও প্যাগোড়াসমূহ, প্রাচীন লোকজ মোটিফ অনুসরণে সা¤প্রতিক সময়ে নির্মিত নেপালের পার্লামেন্ট ভবন ইত্যাদি ছবি প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে।

তিন দেশের স্থাপত্য শিল্প…

পেশায় স্থপতি, নেশায় আলোকচিত্রী শাকুর মজিদ তিন দেশেরই স্থাপত্য শৈলী তুলে এনেছেন বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে। অতীতের ফেলে আসা স্থাপত্যের নিদর্শন কিংবা আধুনিক স্থাপত্যের ছোঁয়ায় নির্মিত গগনচুম্বী অট্টালিকা কিছুই বাদ পড়েনি।

জৌলুসপূর্ণ নির্মাণ কাঠামো দিয়ে নির্মিত আবুধাবী মসজিদ কিংবা আল-আইনের সানাইয়া মসজিদের জুমার নামাযের দৃশ্যটিও তার ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। ‘বিদগ্ধ বৈভব’ কিংবা ‘কংক্রীট, কংক্রীট আর কংক্রীট শীর্ষক ছবিগুলো আধুনিক স্থাপত্যের নিদর্শন।

এক নজরে শাকুর মজিদ…

শাকুর মজিদ। বহুগুণের গুণী এক সাদামাটা মানুষ। আলোকচিত্রী হিসেবে বিপুল পুরস্কার ও সুনাম কুড়ালেও পেশায় তিনি স্থপতি। সিলেটের বিয়ানীবাজার থানার মাথিউরা গ্রামের সন্তান শাকুর ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন। মরহুম আব্দুল মজিদ ও ফরিদা খাতুনের বড় সন্তান শাকুর মজিদের লেখালেখিতেও শক্ত হাত রয়েছে। মাঝখানে বেশ কিছু দিন সাংবাদিকতা পেশায় ছিলেন। বেতারের দুটি এবং বিটিভিতে তার লেখা একটি নাটক প্রচারিত হয়েছে। সম্পূর্ণ সিলেটি ভাষায় রচিত ‘লন্ডনী কইন্যা’ শীর্ষক নাটকটিও প্রচারের পথে। ‘রিতা ও দুঃসময়ের গল্পগুলো’ শীর্ষক তার একটি গল্পগ্রন্থ রয়েছে। শাকুর মজিদের স্ত্রী হোসনে আরা জলি, ঢাকাস্থ তিতুমীর কলেজের প্রভাষক। একমাত্র সন্তান ইশমাম। শাকুর ’৯৭ সালে বাংলার মুখ শীর্ষক একটি একক আলোকচিত্র প্রদর্শন করেন ঢাকায়। একই শিরোনামে তার একটি ফটো এ্যালবামও প্রকাশিত হয়। তার ‘ট্রাভেলার্স ক্লিকস’ শীর্ষক ২য় আলোকচিত্র ঢাকায় আঁলিয়াস ফ্রসেজে (২০ আগস্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর ’৯৯ অনুষ্ঠিত) হয়।

প্রকাশ  : দৈনিক জালালাবাদ। ১৯৯৯

 

 

 

মন্তব্য
Loading...