প্রথম পোর্ট্রেট আর দরোজা-জানালার ছবি

ফটোগ্রাফির ক্লাস প্রজেক্টের ছবি

১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমার ক্লাস শুরু হয় বুয়েটে। প্রথম ঠাঁই হয় তিতুমীর হলের নিচ তলার ১০৬ নম্বর কামরায়। আমার যখন ছিলো অটোফোকাস ইয়াশিকা, দ্বিতীয় বর্ষের জামি ভাই’র একটা এসএলআর প্যানট্যাক্স কে-থাউজেন্ড। তিনি একদিন এটা নিয়ে এসেছিলেন, রুমে আমি তার ক্যামেরা আস্তে করে ধরি। তিনি কপাত করে বডি থেকে লেন্স খুলে আরেকটা লেন্স লাগান। আমি অবাক হয়েছিলাম দেখে। বলেছিলেন, এগুলো হচ্ছে এসএলআর ক্যামেরা। এগুলোর লেন্স বদলানো যায়।

পুরান ঢাকার ঠাঠারি বাজারের কাছে একটা দোকান আছে ‘হক সন্স’। সেখানে উনাদের ক্যামেরার লেন্স পরিস্কার করানো হয়। একবার আমিও তাঁর সঙ্গে যাই। ক্যামেরার যন্ত্রপাতি দেখি। তাদের তখন ফটোগ্রাফি ক্লাস চলছে।

আমি বলি, আমাদেরকেও শেখাবে ফটোগ্রাফি?

ভাই বলেন, সেকেন্ড ইয়ারে এটা কম্পলসারি সেশনাল। শিখতেই হবে।

সেকেন্ড ইয়ারে উঠে সত্যি সত্যি ফটোগ্রাফি কোর্সের সঙ্গে পরিচিত হয়ে যাই। ক্লাস নিতে আসেন ইফতেখার (মুদি) স্যার। প্রজেক্ট ব্যাকেটিং। পরপর তিনটা ছবি তুলতে হবে। একটায় কম এক্সপোজার, একটায় সঠিক এবং একটায় বেশি। জমা দিতে হবে নেগেটিভ।

আমি আমার ক্যামেরা দেখাই স্যারকে। বলি- স্যার, এটা দিয়ে কি হবে?

স্যার হাসেন। বলেন- এসএলআর লাগবে। তিনি এপার্চার সাটার স্পিড গল্প শোনান এবং পরের ক্লাসে নেগেটিভ জমা দেয়ার কথা বলে ক্লাস শেষ করেন।

ইফতেখার স্যার বেশিদিন পড়ান না। তিনি বিদেশ চলে যান। আমাদের ফটোগ্রাফি শেখাতে আসেন সদ্য পাশকরা, ছিপছিপে, আর্কিটেক্ট ইনান ভাই। আমরা যখন ফার্স্ট ইয়ারে তখন তিনি ফিফ্থ ইয়ারে ছিলেন। এখন আমরা সেকেন্ড ইয়ারে, তিনি নতুন পাশ করা আর্কিটেক্ট। প্রথম ক্লাসেই তিনি একটা প্রজেক্ট দেন। পোর্টেট। আমি ছবি তোলার জন্য অস্থির হয়ে যাই।

আমার রুমমেট শওকত। কুমিল্লা থেকে তার জন্য একটা এসএলআর ক্যামেরা এসেছে। প্যানট্যাক্স কে-থাউজ্যান্ড। আমি রাতে টিউশনী শেষ করে রুমে এসে দেখি শওকত প্যাকেটটা টেবিলে রেখে আমার জন্য অপেক্ষা করছে।

আমরা চারজন মিলে ক্যামেরা খুলি, ম্যানুয়েল পড়ি। শওকতের খুব আগ্রহ নাই। সে বলে, তুই পড়ে আমাকে দেখিয়ে দিস কোনটা কী।

আমি দেখতে থাকি। বলি, চল পোর্টেট তুলি, নেক্সট ক্লাসে জমা।

শওকত বলে, তুই বেশি করে কয়েকটা তুলে ফেল।

আমি ক্যামেরা নিয়ে নিউমার্কেট যাই। ওখানে এক স্টুডিওতে সস্তায়  ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট ফিল্ম পাওয়া যায়। এফডিসির রো ফিল্ম এখানে কৌটায় ভরে বিক্রি করে। ১০ বা ১৫ টাকায় ফিল্ম পাওয়া যায়। নতুন ফিল্মের দাম ৫০-৬০ টাকা। আমরা এফডিসির ফিল্ম কিনি এবং গেটের কাছে বসে থাকা এক বৃদ্ধ ভিখারিনীর ছবি তুলি।

এই ছবিটা ক্লাসে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেলো। আমি ক্লাসে কখনোই কোনো বিষয়ে হাইয়েস্ট মার্ক পাই না। মাঝামাঝি পর্যায়ে থাকি। কিন্তু এখানে হাইয়েস্ট!

পোর্ট্রেট, জানালা ও দরোজার ছবি, ১৯৮৭ সাল

উৎসাহ বেড়ে যায়। পরের প্রজেক্ট ‘জানালা’ এবং ‘দরোজা’। বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি হয়ে গেছে এরশাদের আদেশে। আমি ক্যামেরা নিয়ে বাড়ি যাই। আমাদের ঘরের জানালার শিকের উপর চিকচিকে আলো পড়েছে। ওর মাঝে আমার ছোট ভাইকে দাঁড় করিয়ে দেই। তার হাতে আর মাথায় ব্যাক লাইট পড়ে চিকচিক করে। অন্ধকারের ভেতর কতোগুলো বড় আর একটা ছেলের মুখাবয়ব হই। জানালার আরেকটা ছবি তুলে খুব মজা পাই। আমাদের গ্রামে, আমার এক লেখক চাচা ছিলেন। আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম। তার লেখার টেবিলটা ছিলো জানালার পাশে। এই জানালা এবং লেখার টেবিল নিয়ে একটা ছবি তুলি (পরবর্তি সময়ে এই ছবির নামে বুয়েটের রজত জয়ন্তী স্মরণিকার নাম রাখি। এই জানালায়, এবং এই ছবিটি প্রথম পাতার পুরোটা জুড়ে ব্যবহার করি)। একটা প্রজেক্টে একটা ছবি জমা দেয়ার কথা। কিন্তু আমি দেই তিনটা।

দরোজার প্রজেক্টের জন্য ছবি তুলতে গেলাম লালবাগ কেল্লায়। কিন্তু ওখানে কোনো দরোজা দেখি না। দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের কোনোয় কোনো এক আমলে যেখানে দরোজার মতো কিছু ছিলো, তার তলায় বসে আর্ট কলেজের একটা মেয়ে ছবি আঁকে। ঐ পাল্লাহীন দরোজার ফ্রেমের ভেতর দিয়ে ফোরগ্রাউন্ডে ঐ মেয়েটার ছবি, আর ব্যাকগ্রাউন্ডে পরিবিবির মাজার আর গোসলখানাকে নিয়ে ছবি তুলি। ঢুকে পড়ি ফটোল্যাব-এ।

ডার্ক রুমের চাবি আছে অফিসে। আমি একদিন জামিভাই আর ঝুমুভাইকে দেখেছি কী করে ছবি প্রিন্ট করেন। সেখান থেকে নেয়া ধারণা থেকে সাদাকালো ব্রোমাইডের উপর ছবি প্রিন্ট করি। বেশ কয়েকটাই করতে হয় আমার। কোনোটা বেশি কালো হয়ে যায়, কোনোটা সাদা। আলটিমেটলি- প্রায় একবাক্স (১০ শিট) কাগজ অপচয় করে দুটো আট-বারো (ইঞ্চি) সাইজের ছবি জমা দেই এবং অবাক করে ইনান ভাই আমার ছবিতে নম্বর বসান ১০০। আমি প্রায় আৎকে উঠি। যখন তিনি জানেন যে, এটা আমি নিজেই প্রিন্ট করেছি, তখন ল্যাবের চাবিটা আমার কাছে দিয়ে দেন। পরবর্তি ফিল্ম প্রসেসিং ও প্রিন্টের কাজের সময় তিনি পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতেন। ক্লাসের সবাইকে আমি দেখিয়ে দিতাম, কী করে ছবি প্রিন্ট হয়।

সেকেন্ড ইয়ারের পর ফটোগ্রাফি কোর্স- আমাদের আর করতে হয় না। তখন নতুন সেকেন্ড ইয়ার এই ডার্করুম ব্যবহার করবে। কিন্তু কোনোএকভাবে এই ডার্করুমের একটা স্পেয়ার চাবি আমার কাছে রয়েই যায়। আমি রাতের বেলা আমার টু-ইন-ওয়ান আর বালিশ নিয়ে ডার্করুমে চলে আসি। পরদিন সকালবেলা এখান থেকে ক্লাসে যোগ দেই। আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টের ফটোল্যাব আর আমি ছাড়ি না। আমার একটা লাল রং এর হিরো সাইকেল আছে, গলায় ঝুলানো শওকতের ক্যামেরা। আমি সস্তায় কেনা ফিল্ম দিয়ে ছবি তুলি, নিউমার্কেট থেকে ৭০ টাকা দিয়ে ১ প্যাকেট কাগজ কিনি। বন্ধু বান্ধবদের ছবি তুলি, উপহার দেই। আমার অনেক আনন্দ।

মন্তব্য
Loading...