ঢাকার মঞ্চনাটক (ধারাবাহিক ছবির গল্প)

১৯৯৯ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত সময়ে বিচ্ছিন্নভাবে ঢাকার মঞ্চ নাটকের তোলা ছবি ও তার ধারাবাহিক গল্প

নাটকের ছবি তোলার গল্প

১৯৯৯ সালে এক বিকেলে গিয়েছিলাম দৃকে। আমার কিছু সাদাকাল ছবি প্রিন্ট করার জন্য মইন ভাইয়ের কাছে আগেও গিয়েছি। কিন্তু সেদিন তাঁকে পেলাম না। শুনি, ছাদের উপর একটা ফটোগ্রাফির ওয়ার্কশপ শুরু হয়েছে। একজন নরওয়ে থেকে এসেছেন স্টেজ ফটোগ্রাফির উপর ১৫ দিনের কোর্স করাবেন। আজ শুরু হলো। মইন ভাই ওখানে আছেন।
আমি চলে গেলাম। বাইরে দাঁড়িয়ে দেখি বেটে মতো ফর্সা চেহারার এক ভদ্রলোক কথা বলছেন। ১০-১২ জন শ্রোতা। একজন, নাম টুটুল, খুব ব্যস্ত। দৌড়াদৌড়ি করছেন এদিক সেদিক। আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি এসে বলেন- ভাই, আপনি কী চান? এখানে ক্লাস হচ্ছে।
আমি বলি, আমি ক্লাস করতে চাই। কী করতে হবে ?
আপনার কী রেজিস্ট্রেশন করা আছে ?
না । রেজিস্ট্রেশনের খবর আমি পাইনি।
আচ্ছা। – এই বলে তিনি সামনে থেকে চলে যান এবং সেল ফোনে কার সাথে যেন কথা বলেন।
খানিক পরে বলেন, আপনি কী আজই ক্লাস করবেন ? আজ প্রথম ক্লাস শুরু হলো।
আমি বলি, আমি আজই করবো।
ঠিক আছে, এই ফর্ম টা আপনি ফিলাপ করেন। এখন করতে হবে না, এখন ক্লাস করেন, ক্লাস শেষে এটা আমার কাছে দিয়ে দেবেন। আর কোর্স ফী ১৫০০ টাকা, এটা আপনি পরের ক্লাসে দিয়ে দিয়েন।
আমি ক্লাস শুরু করি।
ভদ্রলোকের নাম হ্যারি জোহানসন। বাড়ি নরওয়ে। কিন্তু সারা ইউরোপ জুড়ে উড়ে বেড়ান। সপ্তাহে ৫ দিন ৫ শহরে থাকেন। যেখানেই কোন স্টেজ শো হয়, তিনি তার ছবি তুলতে যান।
এই ফটোগ্রাফারকে আনা হয়েছে নরওয়ের দূতাবাসের মাধ্যমে। সকল ব্যবস্থা করেছেন কামাল উদ্দিন নীলু। তাঁর একটা এনজিও ভিত্তিক নাটকের প্রতিষ্ঠান আছে। সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার। সি এ টি। কিন্তু ক্যাট বলে তাকে ডাকা হয় না। সি এ টি, এ ভাবে ডাকতে হয়।
আমি দ্বিতীয় দিন থেকে খুব আরাম পেয়ে যাই। আরামের কারন হচ্ছে এপ্রিসিয়েশন। সি এ টির একটা প্রডাকশনের ছবি আমাদের প্রথম দিন তুলতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেটি যখন পরের ক্লাসে দেখানো হলো এবং এ ছবি নিয়ে আলোচনা শুরু হলো তখন আমি ১৫ জনের মধ্যে বিশেষ কেউ হয়ে উঠলাম।
ওয়ার্কশপের গল্প পরে আবার বলবো। মূল আলোচনায় চলে আসি।
হ্যারি চলে যায় ( সাদা চামড়ার শিক্ষকদের নাম ধরে ডাকা এবং ‘সে’ বলে সংবোধন করা ততোদিনে শিখে ফেলেছি) ১৫ দিন পরে। আমার নাটকের ছবি তোলার অভ্যাসটা রয়েই যায়। সন্ধ্যা হলে খালি বেইলী রোড আমাকে ডাকে।
আমার কোন এসাইনমেন্ট নাই, প্রজেক্ট সাবমিশন নাই। কিন্তু আমি ছবি তুলতে যাই। ছবি তুলি, ডেভেলাপ করে ফিল্মের ফ্লাপে দিন-তারিখ আর নাটকের নাম লিখে রাখি।
এই করে করে আমার ৪ বছর হয়ে যায়।
এর মধ্যে আরেকটি ঘটনা ঘটে।
সেটা বিস্তারিত বলা অনেক মজার, কিন্তু এখন আর বলছি না। পরে বলবো। একসময় কোলকাতায় ‘বাংলার মুখ’ নামে ১৪ দিনের একটা উতসব হয়। সেখানে বাংলাদেশের নাটকের ছবি নিয়ে আমি যাই, নাম রিদম অন দ্যা স্টেজ। আর কোলকাতার নাটকের ছবি নিয়ে আসেন নিমাই ঘোষ (সত্যজিতের চলচিত্রের স্থিরচিত্রগ্রাহক হিসাবে অধিক পরিচিত)। ২০০২ সালের এপ্রিল মাসে গগণেন্দ্র প্রদর্শণশালায় এ আয়োজন হয়। সেখানে একটা বড় দল নিয়ে ছিলো টোনাটুনি। তার কর্তা হোটেল পূর্বানীর মালিক মাহবুবুর রহমান জয়নাল আমার প্রদর্শনী দেখে বলেন, আপনার এই ছবিগুলোর একটা বই হওয়া দরকার। আমি আপনার বই ছেপে দেব।
যেই কথা সেই কাজ। ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ২০ তারিখে সত্যি সত্যি এই বইটির প্রকাশনা উতসব হয়ে গেলো। বই ছাপার জন্য তিনি আমার মনোনীত মুদ্রক আবিদ এ আজাদকে নগদ আড়াই লাখ টাকাও দিয়ে দিলেন। এই বই বেরুলো।২৫০ গ্রাম আর্ট পেপারে ১০ইঞ্চি বাই ১০ ইঞ্চি সাইজের ১২ ফর্মার ফটো এলবাম। বাহ ।
আমাকে ৫০ কপি উপহার দিলেন জয়নাল ভাই। বাকী বই তিনি অন্যকে উপহার দিয়েছেন। কেউ কিনেছে বলে শুনি নাই।
অনেকদিন এই বই আর কোথাও দেখি না। আমার কাছেও নাই। বছর চারেক আগে একদিন জয়নালভাই আমাকে ফোন করে বলেন, তাঁর গুদাম পরিস্কার করতে গিয়ে তিনি এক বস্তা বই পেয়েছেন আমার। আমি যেনো নিয়ে আসি।
আমি প্রায় দৌড়ে পূর্বানী হোটেলে যাই। ৪০ কপি বই নিয়ে আসি।
আমার কাছে এখন গোটা পাঁচেক আছে। আর কারো কাছে নাই। দোকানে তো নাইই।
এই বইটা আমি কয়েকদিন আগে উল্টাতে শুরু করি।
চেয়ে চেয়ে দেখি, কুড়ি বছরের ব্যবধানে আমার এই বইয়ের বিষয়টি এখন আরো মূল্যবান হয়ে গেছে (অন্তত আমার কাছে)। ২০ বছর আগে যারা মঞ্চ কাঁপিয়ে অভিনয় করতেন তাঁদের অনেকে এখন নাই। কেউ দুনিয়াতেই নাই, কেউ মঞ্চে নাই। থিয়েটারের মঞ্চ ছেড়ে কেউ রাজনীতির মঞ্চে আছেন, কেউ মন্ত্রী হয়েছেন, কেউ এমপি আর কেউ কেউ এখনো এমপি হবার দৌড়ে আছেন। বিশ বছর আগে যে ছোকরা সাইড লাইনে কোরাসে ছিলো, আজ হয়তো সে সুপারস্টার টেলিভিশনতারকা। আবার বিশ বছর আগের নায়কের রোলকরা কেউ হয়তো এখন আর কোথাও জায়গা পান না।
মঞ্চের ইতিহাস কেবল তার ছবিতেই ধরানো যায়। প্রতিটি নাটকই প্রতিমঞ্চে প্রতিবারই নতুন নাটক হিসাবে আসে। একদিনের মঞ্চে যা হয়েছিলো তা শুধু সেদিনেরই। অন্য দিন একই নাটক আরেকভাবে হয়ে থাকে। এক সিনেমা বারবার দেখলে আমরা এক সিনেমাই দেখি। মঞ্চে এক নাটক দুইবার দেখলে আমরা দুই নাটকই দেখি। সুতরাং যেদিন যে নাটকটির ছবি আমি তুলেছিলাম, সেদিনই সেই নাটকের মতো একই রূপে এই নাটক আর কখনোই হয় নাই, হবেও না।
সেদিন কী হয়েছিলো, তার সাক্ষী আমি আর আমার ক্যামেরা।
ঠিক করলাম, এই বইটি নতুন করে ছাপানর বন্দবস্ত করি।
আমি ফোন দিলাম আমার বইটির মুদ্রককে ।
তিনি জানালেন, বইয়ের কোন ডামি বা প্লেট বা স্ক্যান করা ছবি তাঁর কাছে আর নাই।
আমি এক সময় একটা সিডিতে নিয়ে এসেছিলাম, সেই সিডিটাতে মরিচা ধরেছে। এটা কোন কম্পিউটার পড়তে পারে না।
আমার কাছে কয়েকটা ছবি আছে, ব্রোমাইডে। আমি সেগুলো স্ক্যান করি।
তাতে তিয়াস মেটে না। আগে বইয়ে জায়গা কমানোর জন্য কোন কোন নাটকের একটি বা দুইটি ছবি দিয়েছিলাম। তাতে আমার তোলা অনেক ছবিই দেখাতে পারি নাই। এবার দেখাবো।
আমার আছে একটা নিগেটিভ স্ক্যানার। আমি সেটা বের করি।
আমার কাছে থাকা ১৩০০ পুরনো নিগেটিভের বান্ডিল ক্যাটালগ করা আছে, সেখান থেকে নাটকের নাম ধরে ধরে বের করে আনি প্রায় ৭০ টি নিগেটিভের জ্যাকেট। সেখান থেকে বের করে একেকটা করে ফিল্ম স্ক্যান করতে থাকি আমি নিজে। দেখি কিছু নিগেটিভ এখনো তাজা আছে, কিছুর বাকল খসে (ইমালশান) পড়েছে। চার রঙের সব রঙ নাই, হলুদ আর হলুদ বা সবুজ আর সবুজ সব ছবি।
আমি ফটোশপ পারি। কিন্তু খুব কাজ হয় না। লাইটরুমের কাছে ধর্না দেই। কিছু কাজ হয়। এই করে করে একটা একটা করে ছবি রিটাচ করে আমি ৬৪ টি প্রযোজনার ছবি বেছে বের করি। প্রতি প্রযোজনার জন্য ২ পাতা বরাদ্দ রেখে, ১০” বাই ১০” , বর্গাকার প্লেট নিয়ে পাওয়ার পয়েন্ট-এ বসে যাই । এবার আর গ্রাফিক ডিজাইনারকে বিরক্ত করি না। ডিজিট্যাল দুনিয়ায় আমরা সবাই রাজা । এই রাজত্বে আমার পছন্দ মতো যা খুশি করতে পারি, কোন প্রকাশকের কাছে ধর্না না দিয়ে, কোন ডিজাইনারকে না জ্বালিয়ে নিজেই ই-বুক করে এটা বের করে দিচ্ছি, পরের প্রজন্মের জন্য, যাঁদের কারো না কারো কাজে এই ছবিগুলো লাগবেই।
মেকাপের কাজ শেষ এবার আপলোডের পালা।
এই একই পেইজ থেকে প্রতিদিন একটি করে নাটকের গল্প বলে, ছবি তোলার সাথে আমার কী ঘটনা ছিলো তা বলে এখানে প্রকাশ করবো। ৬৪ টি প্রযোজনা, দুই মাস লাগবে। আশা করি প্রতিদিন একটি নাটকের গল্প শোনাতে পারি।
আর হ্যা, আমি এই ক্রম নির্বাচন করেছি দুইটি তারিখ থেকে। প্রতি নাটকের ক্যাপশনে দুইটি তারিখ আছে। একটি এই নাটকের প্রথম মঞ্চায়নের তারিখ, আরেকটি যে তারিখে এই নাটকের ছবি তুলেছি তার তারিখ। আমি নিয়েছি প্রথম তারিখটি। যে নাটক সে সময় পর্যন্ত সবচেয়ে প্রাচীন তাঁর তালিকা আগে।
আমার তালিকার প্রথম নাটক- থিয়েটারের ‘সুবচন নির্বাসনে’। আর শেষ নাটক – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নাট্যতত্ত্ব বিভাগের –‘ওয়েটিং ফর গডো’।

১। সুবচন নির্বাসনে

ঢাকার মঞ্চে ‘সুবচন নির্বাসনে’ দেখার আগে আমি আরো তিনবার এই নাটক দেখি।  একবার ছেলেরা মেয়ে সেজেছিল , আরেকবার কেন্দ্রীয় চরিত্রের নারীকে আনা হয়েছিলো শহর থেকে ।

প্রথম বারের ঘটনা ১৯৮০ সালে, আমি তখন ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে পড়ি। কলেজের বার্ষিক বাংলা নাটকে এটা ছিলো। আগের বছর ছিলো করর আর ওরা কদম আলী। সম্ভবত কোন নারী চরিত্র সেই নাটকে ছিলো না। সেগুলোর কথা খুব মনে নাই। এটার কথা মনে আছে।

নাটকের পরিচালক নাসির চৌধুরী স্যার। তাঁর আরেক পরিচয়, তিনি করীর চৌধুরী আর মুনীর চৌধুরীর ভাই। যদিও তিনি ছিলেন পৌরনীতির শিক্ষক, টেলস ফ্রম শেক্সপিয়ার পড়াতেন তিনি আমাদের ।

তো সেবার তিনি একটি চমকপ্রদ আয়োজন করলেন। সেটা ছিলো যে কোন গেট আপ, মেক আপ ছাড়াই কেবন বডি ল্যানগুয়েজ দিয়ে সবাইকে অভিনয় করতে হবে । সবার একই পোষাক থাকবে। খাকি পোষাক। এই পোষাক পরে কেউ মা হবে, কেউ মেয়ে হবে, কেউ পুলিশ হবে কেউ উকীল হবে। যে কোন চরিত্র করছেন তা বুঝাবে তাঁর বলন, চলনে, তাঁর পোষাকে না।

আমাদের কলেজে মঞ্জুর এলাহী ভাই নামে একজন ছিলেন, খুব মিস্টি গলা তাঁর। আবৃত্তি ও বিতর্কে তিনি দেশ সেরা। তিনি এই নাটকে প্রধান নারী চরিত্রে অভিনয় করেন।

এই নাটকের চটি বইটি আমাদের লাইব্রেরিতে ছিলো। আমি সেটি ইস্যু করে পরে নেই। আব্দুল্লাহ আল মামুন তাঁর বইয়ের প্রথম পাতায় লিখে রেখেছিলেন যে, দেশের যে কোন প্রান্তে যে কেউ এই নাটক মঞ্চস্থ করতে পারবে, এর জন্য কোন অনুমতির প্রয়োজন হবে না । তবে প্রতি প্রদর্শনীর জন্য লেখকের ঠিকানায় (সম্ভবত ১৫ বেইলী রোড) ২৫ টাকা মনিওর্ডার করতে হবে ।

দ্বিতীয়বার আমাকে এই নাটক দেখায় খালেদ। আমি তখন এসএসসির পর বাড়িতে । খালেদ তখন বিয়ানীবাজার কলেজের সাহিত্য সম্পাদক। তাঁদের সংসদের আয়োজনে নাটক মঞ্চায়নের ব্যবস্থা হয়েছে। নাটকের নাম ‘সুবচন নির্বাসনে’  । নাটক হবে রাতে। বাড়ি থেকে নাটক দেখতে যাবার ঘটনা জীবনে এই প্রথম। এই নাটকে সিলেট বেতারের নাট্যশিল্পী রাবেয়া খাতুন দুলু অভিনয় করতে আসেন। তাঁর নাম বাজারের মাইকে সারা দিন প্রচার হয় । এই দুলু আপা পরে আমার লেখা ও পরিচালনা করা দুইটি নাটক ও টেলিফিল্মে (লন্ডনী কইন্যা ও বৈরাতী) দুর্দান্ত অভিনয় করেন।

তৃতীয়বার এই নাটক আমি দেখি ঢাকার মঞ্চেই, আশি সালের মাঝমাঝি সময়ে, তখন কেন্রীয় নারী চরিত্র যাকে বাবা শিখিয়েছিলেন নানা নীতিকথা কিন্তু সংসারে গিয়ে তাঁর কোন নীতি কথা টেকে না, এমন সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যে বেড়ে ওঠা এই চরিত্রে অভিনয় করতেন ফেরদৌসি মজুমদার।

১৯৯৯ সালের নভেম্বর মাসে আমি যেদিন এ নাটকের ছবি তুলতে যাই, সেদিন সেই মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ফেরদৌসী কণ্যা ত্রপা মজুমদার। থিয়েটার তখন ভেঙ্গে তিন টুকরা। রামেন্দু-ফেরদৌসী-ত্রপা, এই তিন জনই এক পরিবারের। এই পরিবারের ঘনিষ্ঠতম বন্ধু আব্দুল্লাহ আল মামুন নাট্যকার ও পরিচালক। মূলত এই চার জন এই দলের প্রধান।

১৯৭৪ সালের ১৯ এপ্রিল ছিলো থিয়েটারের দ্বিতীয় প্রযোজনা এই সুবচন নির্বাসনে। ১৯৯৯ পর্যন্ত মাঝখানে মাঝে মাঝে বিরিতি দিয়ে এই নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছে। তবে এই নাটক যতোবার থিয়েটার মঞ্চস্থ করেছে তারচেয়ে বহুগুণ বেশি মঞ্চস্থ হয়েছে ঢাকার বাইরে। সত্তর এবং আশির দশকে গোটা পাঁচেক নাটকই ঘুরে ফিরে সারা দেশের নাট্যদলগুলো মঞ্চস্থ করতো, তার মধ্যে অন্যতম ছিলোএই ‘সুবচন নির্বাসনে ‘।

২। আমি গাধা বলছি

কৃষণ চন্দর ছিলেন ঊর্দূভাষী এক লেখক, তাঁর জন্ম আমাদের শাহ আব্দুল করিমের সময়ে। তিনি করিম থেকে দু বছরের বড়। কিন্তু মারা গেলেন অল্প বয়সে, ৬৩ বছর তাঁর বয়স তখন । এই লেখকের অনুবাদ করা ছোট ছোট বই আমাদের কলেজ লাইব্রেরিতে ছিলো। আমি কিছু পড়েছিলাম। একটির নাম ‘আমি গাধা বলছি’ ।

এটা এক শিক্ষিত গাধার গল্প। বিদ্রূপাত্মক উপন্যাস। সেই গাধা বই আর পত্রিকা পড়ে বড় হয়েছে।  সে প্রথমে এক ধোপার বাড়িতে কাজ করতো । দিল্পি মোম্বে ঘুরে এক সময় সে নেহেরুর বাড়ি যায়। তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁর ভাগ্য খুলে যায়। গাধার জীবনের পরতে পরতে ঘটতে থাকা নানা ঘটনায় উঠে এসেছে মাজারের নামে ভণ্ডামি; চোরাকারবারি, মাদক ব্যবসায়ী ও জুয়ারিদের নোংরা জীবনের প্রতিচ্ছবি; শিক্ষা-দীক্ষা-প্রতিভা, সচ্চরিত্রের বদলে অর্থ আর বংশ গৌরবের অহমিকায় প্রেমের মূল্য নির্ধারণের মতো ক্ষুদ্রতা; জাত-পাত-ধর্ম দিয়ে করা বিচারের নামে অবিচার; ধনী-গরিব বৈষম্য; অর্থ ও যশের কাছে দাসত্বের দাসখতনামা; নিজের স্বকিয়তা, মেধা, নীতি-নৈতিকতা, চরিত্র অর্থের কাছে বিকিয়ে দিয়ে আয়েশি জীবনের প্রতি মোহ, গাধাকে ঘোড়া বানাবার গল্প, ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির নোংরামির চিত্রসহ আরও অনেক নষ্টামির গল্প।

এই কাহিনী নিয়ে ঢাকা ড্রামা নাট্যদল ১৯৭৬ সালে নামিয়েছিলো তাঁদের ১০ম প্রযোজনা, ‘আমি গাধা বলছি’ । নাটকটি আমি মধ্যআশিতে একবার দেখেছিলাম মহিলা সমিতি মিলনায়তনে। বাংলাদেশ টেলিভিশনেও তার আগে এই নাটক প্রচার হয়েছিলো। সাদাকালো টেলিভিশনে এটা দেখেছিলাম। গাধার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন মজিবুর রহমান দিলু।

২০০৩ সালের আগস্ট মাসে এটি আবার মঞ্চস্থ হয়। এ সময় টোনাটুনির মাহবুবুর রহমান জয়নাল খুবই সক্রিয় নানা অনুষ্ঠান নিয়ে । তিনি দুইবাংলার বড়বড় শিল্পীদের নিয়ে নানা রকমের অনুষ্ঠান করতে থাকেন। জয়নাল ভাইয়ের ডান হাত তখন দিলু ভাই। দিলু ভাই চাকরী করেন হোটেল পূর্বানীতে। তিনি জি এম বা প্রধান জনসংযোগ কর্মকর্তা, এ রকম কিছু। জয়নাল ভাইয়ের সাথে দুই বাংলার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষদের তিনিই পরিচয় করিয়ে দেন । সে সময় এ নাটকটি আবার প্রদর্শিত হয়। মুনির আহমেদের অনুবাদ ও রূপান্তরে এই নাটকের গাধা চরিত্রে অভিনয় ছাড়াও নির্দেশনা, সেট ডিজাইন আর আলোক সম্পাতের কাজও করেছিলেন মজিবুর রহমান দিলু।

আজ তিনিও আমাদের থেকে অতীত। তিনি নাই, নাটকটিও নাই। আছে তার এই ক’টি ছবি ।

৩। মুনতাসির

হুমায়ূন ফরিদীকে দেখার জন্য একবার নাটক দেখতে গিয়েছিলাম মহিলা সমিতিতে। শুনি আজ ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি’ আছে। এই নাটকে প্রায় একক অভিনয়ের মতো, সারা নাটক জুড়েই ফরিদী সবাইকে হাসান। এটা হাসির নাটক।

নাটক দেখেছিলাম সেদিন। কিন্তু দেখতে দেখতে বুঝেছিলাম, এটা আসলে হাসির নাটক না। চরম বিদ্রুপের নাটক। স্বাধীনতার পর কিছু মানুষ যখন হঠাত বড়লোক হয়ে গেলো এদের নিয়ে বিদ্রুপ করার এক নাটক। দেশ স্বাধীনের কিছুদিন পরেই লেখা। মঞ্চস্থ হয় ঢাকা থিয়েটারের হাত দিয়ে ১৯৭৬ সালে । তখন নাট্যকার সেলিম আল দীন জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রভাষক। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট হুমায়ূন ফরিদী কেবল নাটক করার জন্য সব কিছু বাদ দিলে, আর বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রযোজক নাসির উদ্দীন ইউসুফ ‘জন্ডিস ও বেলুন’ এর নাট্যকারকে পেয়ে গেলে এই ত্রয়ী মিলে থাকা থিয়েটার চমকদার এই মিউজিক্যাল ড্রামা এনেছিলো মঞ্চে। আমি প্রথম দেখি এর প্রথম মঞ্চায়নের অন্ততঃ দশ বছর পর। হুমায়ূন ফরিদি পেটের ভেতর একটা বস্তা লাগিয়ে ২০ মাসী পেটের মতো আকার নিয়ে সারা মঞ্চ দাপাদাপি করে বেড়াতেন। কারন, এই মুন্তাসির হচ্ছে সর্বভুক এক চরিত্র, যে যা পায় খালি খায়। খেতে খেতে তার এই অবস্থা।

একসময় তার পেটে অপারেশন করা হয়। মুন্তাসিরের পেট কাটার সার্জারী সফল হয় না। মারা যায় চরিত্র। কিন্তু দর্শক দেখেন, সার্জারী করে তার পেট থেকে বের করে আনা হয়েছে দেশের শিল্প, সমাজ, অর্থনীতি, মনুষ্যত্ব, যেগুলো তিনি গোগ্রাসে খেয়ে তার ভুড়ি ভরে রেখেছিলেন।

১৯৭৬ সালের ২১ মার্চ ঢাকা থিয়েটার এ নাটকটি প্রথম মঞ্চে এনেছিল, না ছিলো মুন্তাসীর ফ্যান্টাসি। তখন এর পরিচালক নাসির উদ্দীন ইউসুফ, সংগীত করেছিলেন শিমুল ইউসুফ, সেট ডিজাইন করেছিলেন আর্ট কলেজের ছাত্র, তরুন অভিনেতা আফজাল হোসেন, যিনি এই নাটকে অভিনয়ও করেছিলেন। ২০০২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর তারিখে আমি যখন এই নাটকের ছবি তুলতে যাই, তখন বদল হয়েছে অনেক কিছুর। প্রথমে নাম বদলেছে। নাটকের নাম থেকে ফ্যান্টাসি শব্দ খসে পড়েছে, নতুন করে সেট ডিজাইন করেছেন রেজাউল হায়দার। আর প্রধান চরিত্রে অভিনয় করা অভিনয় করা অভিনেতা হুমায়ূন ফরিদী তখন ব্যস্ত চলচ্চিত্রের ভিলেন চরিত্রে অভিনয়। মঞ্চ থেকে তাঁর স্বেচ্ছাত্যাগ হয়ে গেছে আরো কয়েক বছর আগে। এই চরিত্রে অভিনয় করছেন কামাল বায়েজিদ । সিনিয়ারদের মধ্যে পীযুষ বন্দোপাধ্যায় আর শিমুল ইউসুফ তখনও সে নাটকে দেখলাম। নতুন দেখলাম শহিদুজ্জামান সেলিম আর তাঁর স্ত্রী রোজিকেও ।

 

৪। দুই বোন

থিয়েটার, তো থিয়েটার। কিন্তু এই নামে আমাদের একটি বড় নাটকের দল আছে। আমাকে নাম রাখতে দিলে আমি শুধু ‘থিয়েটার’ শব্দ দিয়ে হয়তো এই নাটকদলের নাম রাখতাম না, কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই , ১৯৭৩ সালে গড়ে ওঠা এই নাটকের দলটি প্রায় এককভাবে মঞ্চদাপিয়ে রেখেছিল, অন্ততঃ তার প্রধান প্রাণপুরুষ আব্দুল্লাহ আল মামুন যতদিন পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন।

থিয়েটার দলে ভাঙ্গাভাঙ্গি অতি সাধারন ঘটনা। এবং এটাকে আমি খুবই পজিটিভ্লি দেখি। ছোট ছোট চারা একত্রে থাকে কিছুদিন, চারা বড় হয়ে গেলে তার জন্য যে স্পেস দরকার হয় তখন যে নিজেই আরেকটা বাগান তৈরি করার জন্য সরে যায়। আর থিয়েটারে মূলত দল ভাঙে রোল নিয়ে কাড়াকাড়ির কারনে। দলের কর্তা যদি পুরুষ হোন আর তার স্ত্রী বা বান্ধবী যদি অভিনেত্রী হোন এবং তিনি যদি মধ্যবয়সেরও হয়ে থাকেন, দলে যথেষ্ঠ যুবতী/তরুনী থাকলেও মূল চরিত্রে তাঁদের ঠাই হয় না। দলে যদি বড় নাট্যকার বা পরিচালক থাকেন, দলের আর কোন ছোট নাট্যকারের বা পরিচালকের মাঝারি নাট্যকার বা পরিচালক হবারও সুযোগ হয় না। এরা যখন নতুন দল করেন, তখন তাঁরা আলাদা আলাদা ভাবে নাট্যকার, পরিচালক এমনকি বড় চরিত্রের অভিনেতা অভিনেত্রী হিসাবেও আবিস্কার হোন। এমন ঘটনা থিয়েটারের দলগুলোতে হামেসাই হয়ে থাকে, থিয়েটারে হয়েছিলো সবার আগে।

মূল ‘থিয়েটার’ ভেঙে আরেক’ থিয়েটার’ হলো। এর ঠিকানা আরাম বাগে, তাই এর নাম ‘থিয়েটার’ , ব্র্যাকেটে ‘আরামবাগ’। আরেকটা রয়ে গেলো ‘থিয়েটার’, ব্র্যাকেটে ‘বেইলি রোড’। আরেকটার সাইনবোর্ড দেখি, ব্র্যাকেটে ‘তোপখানা’।

এই দলটির শেষ ভাঙন যখন দিলো তখন তারিক আনাম খান  কয়েকজনকে নিয়ে বেরিয়ে গিয়ে ‘নাট্যকেন্দ্র’ নামে নতুন দল করেন।

তো ‘দুই বোন’  নামে থিয়েটারের একটা নাটক ছিলো। রবীন্দ্রনাথের কাহিনীকে নাট্যরূপ দিয়েছিলেন মমতাজউদ্দীন আহমদ । ১৯৭৮ সালে এর প্রথম প্রদর্শণ। আশির মাঝামাঝি সময়ে পত্রিকায় এর বিজ্ঞাপন দেখতাম। নাটকটি ঘন ঘন মঞ্চস্থ হতো । ফেরদৌসি মজুমদার ছিলেন এর পরিচালক। তিনি নিজে বড় বোনের চরিত্রে অভিনয়ও করতেন। ছোট বোন ছিলেন আফরোজা বানু।

১৯৮৩ সালে বড় থিয়েটার ভেঙ্গে গেলে থিয়েটার (আরামবাগ) এই নাটকটি আবার মঞ্চে আনে। কিন্তু তাঁদের লিফলেটে নাটকের পরিচালকের কোন নাম ব্যবহার করে না। যেহেতু আগে এই নাটকে ছোটবোনের চরিত্রে অভিনয় করা আফরোজা বানু এখানে এসে বড় বোন করছেন আর ছোটবোন হিসাবে পাচ্ছেন তরুন অভিনেত্রী তারানা হালিমকে, তাই সবাই মিলেই, আগের ফর্মেটে নতুন করে এটাকে ঘসে মেজে দাঁড় করান, নতুন কোন পরিচালকের নাম না দিয়েই।

১৯৯৯ সালের নভেম্বর মাসে যখন গাইড হাউজের মঞ্চে এ নাটকটি অভিনীত হয়, সেদিনও তারানা হালিম ছিলেন। তাঁকে আমি অনেক্ষণ ধরে আমার ক্যামেরা দিয়ে অনুসরন করি। তার প্রধান কারন দুইটা – ফোকলা দাঁতে এই শিশু শিল্পী এক সিনেমার গানে খুব সুন্দর অভিনয় করেছিল। তারপর মাঝে মাঝে তাঁকে টেলিভিশনে দেখি বিশেষ দরদ দিয়ে। আমরা একই বছর এস এস সি আর এইচ এস সি পরীক্ষা দেই, ৮২ আর ৮৪ সালে। আমাদের সময় মানবিক বিভাগ থেকে তারানা হালিম স্ট্যান্ড করেছিল দুই পরীক্ষাতেই, তাঁর বাবামার সাথে ছবি উঠেছিল পত্রিকায়। আমাদের দেখা। সবাইকে বলতাম, তারানা আমাদের ব্যাচমেট, আমার স্ট্যান্ডমেটও ।

সেই তারানা পরবর্তি সময়ে মঞ্চ, টিভি, সিনেমা সব ছেড়ে দেন। তিনি রাজনীতিতে ঢুকে পড়েন। প্রথমে এম পি এবং পরে মন্ত্রীও হয়ে যান। মঞ্চের খোজ আর রাখেন কী না জানি না। আমার সেদিনের এই ছবিগুলো আছে। তাঁর সাথে আছেন আফরোজা বানু, নরশ ভূইয়া, রাজু, প্রমুখ।

৫। নূরলদীনের সারাজীবন

সৈয়দ শামসুল হক, আলী যাকের আর আসাদুজ্জামান নূর- এই ত্রয়ীর অবিস্মরণীয় একটি কাজ নূরলদীনের সারাজীবন ।  ১৯৮২ সালের ২৭ ডিসেম্বর নাটকটি যখন নাগরিকের মঞ্চে নামে আমি তখন ক্যাডেট কলেজে পড়ি। আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে আমি মঞ্চে প্রায় নিয়মিতই নাটক দেখি। সঠিক সন তারিখ বলতে পারবো না, তবে এই নাটকের ২৫তম প্রদর্শনী আমি দেখেছিলাম, এক সাথে নাট্যকারকে নিয়ে। নাট্যকার বসেছিলেন মহিলা সমিতির মিলনায়তনের প্রথম সারিতে ডান দিকের কোনার এক চেয়ারে। আমি ছিলাম, পেছন থেকে দ্বিতীয় সারিতে।

এর আগে বুয়েটে আমাদের তিতুমির হলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় একক অভিনয় অংশে নূরলদীনের সারাজীবন  থেকে একটা দীর্ঘ সংলাপ (যেখানে গরুর জায়গায় বাবা নিজে গোয়াল টানে) পাঠ ছিলো আমাদের প্রতিযোগিতার অংশ। আমি নাম লিখিয়েছিলাম, এবং মুখস্থ করে সেটা শুনিয়েও ছিলাম। তৃতীয় স্থান আমি দখল করি। এটা অবশ্য আমার অভিনয়গুণে না, আমার গেটআপের কারনে। আর সকল প্রতিযোগী প্যান্ট-শার্ট পরে অভিনয় করেছিলো, আমি ছিলাম লুঙ্গি-গেঞ্জি পরা। এ কারনে ৫ জনের মধ্যে আমি তৃতীয় হয়েছিলাম, না হলে নিতান্ত পঞ্চমই হয়তো আমার স্থান ছিলো।

এটা ছাড়াও আরেকটা কারন ছিলো আমার এই নাটক দেখার । একবার , ১৯৮৭-৮৮ সালের দিকে পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে কী একটা অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করছেন অনেকে।  সেখানে আলী যাকের কবিতা পড়তে এসে দেখি, এই নাটক থেকে সংলাপ পড়ছেন, একদম সূচনায় কথা- নীলক্ষা আকাশ নীল…

নূরলদীনের সারাজীবন  সৈয়দ হলের লেখা দ্বিতীয় কাব্যনাট্য। প্রথমটি পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। এটা করেছিলো থিয়েটার। কাব্যনাট্য আমাদের মঞ্চে সেরকম আর হয় নাই। গীতিনাট্য হয়েছে অনেক। সেটা আমাদের প্রাচীনতম নাটকের রূপ। সৈয়দ হক প্রথমে কবি, পরে নাট্যকার। সম্ভবত সে কারনে দুটোই মিলিয়েছিলেন এক জায়গায় এনে।

নাটকটি রংপুরের আঞ্চলিক ভাষায়। মাত্র ১৪ দৃশ্যের এ-নাটক কাব্য ও নাট্যগুণে অনন্য এক নাটক। নূরলদীন রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের সামন্তবাদ-সাম্রাজ্যবাদবিরোধী কৃষক নেতা। রাজা দেবীপ্রসাদ সিং ১৭৮১-৮৩ খ্রিষ্টাব্দে অবিভক্ত বাংলার রংপুর-দিনাজপুরের রাজস্ব আদায়ের স্বত্ব পান। ডিমলার জমিদার গৌরমোহন চৌধুরীকে সঙ্গে করে রাজস্ব আদায়ের নামে কৃষকদের ওপর শুরু করেন ভয়ংকর অমানবিক শোষণ-অত্যাচার। দরিদ্র প্রজাগণ গরু-বাছুর-সম্পত্তি এমনকি স্ত্রী-পুত্র বিক্রি করেও দেবী সিংয়ের নিষ্ঠুরতা থেকে রেহাই পান না। কৃষকদের জেলে পাঠানো হয়। সহায়-সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। ধরে এনে চাবুক মারা হয়। কুঁড়েঘর পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়। এমন নির্মম পরিস্থিতিতে নূরলদীনের নেতৃত্বে তারা ঐক্যবদ্ধ হন। এ-বিদ্রোহ টিকে ছিল মাত্র পাঁচ সপ্তাহ। নূরলদীনের বাহিনী মোগলহাটের ইংরেজ ঘাঁটিতে আক্রমণ চালায়। মোগলহাট ও পাটগ্রামের অসম লড়াইয়ে লেফটেন্যান্ট ম্যাকডোনাল্ডের নেতৃত্বাধীন কোম্পানি বাহিনীর হাতে ২১ ফেব্রম্নয়ারি শহিদ হন নূরলদীন। এই কাহিনী নিয়ে লেখা নাটকটি পরিচালনা করেন আলী যাকের, তিনি নাটকটিতে নূরলদীনের ভূমিকায় নিজেই অভিনয় করেন।তাঁর বাল্যবন্ধু আব্বাস মন্ডলের চরিত্রে অভিনয় করেন আসাদুজ্জামান নূর। নূর ভাই বিভিন্ন সময় এই নাটকের প্রারম্ভিকাটি আবৃত্তি করতেন, সর্বশেষ আমি শুনি ২০১৫ সালে চ্যানেল আইর স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে। সেখানে সৈয়দ হকের পাশে দাঁড়িয়ে এই কবিতা তিনি পড়েছিলেন

নূরলদীনের সারাজীবনের দুটি প্রদর্শনীর ছবি তুলি আমি। প্রথমবার ১৯৯৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর, মহিলা সমিতিতে। দ্বিতীয়বার ২০০২ সালের ২ অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের উঠানে, বিশেষ মঞ্চ স্থাপন করা হয়েছিল এই নাটকের প্রদর্শনীর জন্য।

২০০৩ সালের এপ্রিল মাসে যখন কলকাতার গগণেন্দ্র প্রদর্শনশালায় এই নাটকের ছবিগুলোর প্রদর্শনী হয়, তখন আলী যাকের তাঁর উঁচিয়ে থাকা আঙুলের ছবিটি দেখে আমাকে আমাকে বলেছিলেন, এ ছবিটা আমাকে দিবেন, আমি কিনে নিব। পরে বাঁধাই করে এই ছবিটি আমি তাঁর নওরতন কলোনীর অফিসে উপহার হিসেবে দিয়ে আসি।

এই নাটকের আর এমন প্রদর্শনী কখনোই হবে না। এর মধ্যে মারা গেছেন নুরুলদীনরূপী আলী যাকের, নাটকের মঞ্চ ছেড়ে রাজনীতির মঞ্চে গিয়েছেন আব্বাস মন্ডল। মারা গেছেন খালেদ খান। লিসবেথরূপী সারা যাকের নানা ব্যস্ততায় ব্যস্ত। বৃটিশ সাহেব উডল্যান্ডরূপী আতাউর রহমান মাঝে মাঝে নিজের কিছু কাজ নিয়ে আসেন। এই নাটকে তিনি ইংরেজদের করা বাংলা বলতে ‘হামি, টুমি’ টাইপের সংলাপ দেন নাই, যেমনটি তিনি দিতেন ‘নীলদর্পন’ এর ইংরেজ সাহেবের চরিত্রে। নাট্যকারই হয়তো এই বদলটুকু করে দিয়েছেন। এমন সংলাপ লিসবেথের মুখেও একই ।

এর মধ্যে এই দল থেকে অন্তত দু দফায় দুই দলের কিছু বড় অভিনেতা-অভিনেত্রী নাগরিক ছেড়ে অন্য দল করে নাটক করছেন। কিন্তু নাগরিকের এই নাটকটি বাংলাদেশের নাটকের ইতিহাসে একটি বড় আকারের মাইলফলক হিসাবে থাকবে।

৬ । কঞ্জুস

কঞ্জুস নাটকটি পুরোনো হয় না। সেই যে শুরু হলো ১৯৮৭ সালের ৮ মে, এখন পর্যন্ত মঞ্চ মাতিয়ে রেখেছে নাটকটি। লোকনাট্য দলের অনবদ্য এই নাটকের ৭০০তম মঞ্চায়ন হয়েছিলো ২০১৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর  শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল মঞ্চে। বাংলাদেশের কোনো মঞ্চনাটকের এটাই প্রথম ৭০০তম প্রদর্শনী।

৩০ বছর ধরে নাটকটি মঞ্চায়ন করছে লোক নাট্যদল। অবশ্য কঞ্জুস নাটকের ইতিহাস আরও পুরোনো। ১৯৮২ সালে ভারতের ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা (এনএসডি) থেকে বেশ কজন নাট্যকর্মী পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফেরেন। দেশে ফিরে তাঁরা প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাট্যদল’ নামের একটি মঞ্চনাটকের দল। সঙ্গে আরও কয়েকজন। এর মধ্যে আছেন সৈয়দ জামিল আহমেদ, তারিক আনাম খান, ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, গোলাম সারোয়ার, লিয়াকত আলী লাকী, কামাল উদ্দিন নীলু প্রমুখ। তারিক আনাম খান ফরাসি নাট্যকার মলিয়েরের দ্য মাইজার অবলম্বনে অনুবাদ করলেন কঞ্জুস নাটকটি। ১৯৮৩ সালের প্রথম দিকে নাটকটি মঞ্চে আনা হলো। শুরু থেকেই নাটকটি নিয়ে দর্শকের সাড়া পাওয়া গেল। সেই থেকে কঞ্জুস নাটকটির নিয়মিত প্রদর্শনী চলছে।

কামাল উদ্দিন নীলু নির্দেশিত নাটকটি পুরোটাই বাংলাদেশি আমেজে। সংলাপ বলা হয় পুরান ঢাকার আঞ্চলিক ভাষায়। ১০টি প্রদর্শনী হওয়ার পর ১৯৮৭ সালে নাটকটি সম্প্রচারিত হয় বিটিভিতে। তারপর নাট্যদল আর নাটকটি মঞ্চস্থ করেনি। পরে নতুন আঙ্গিকে নাটকটি মঞ্চে আনে লোক নাট্যদল। নির্দেশনা দেন লিয়াকত আলী লাকী।

নাটকটির শততম প্রদর্শনী হয় ১৯৯৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। ৪০০তম প্রদর্শনী হয় ২০০১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর। ২০০৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর নাটকটির ৫০০তম প্রদর্শনী হয়। এর মধ্যে ১৯৮৮ (লোক নাট্যদল টিএসসি) ও ২০০৫ সালে (লোক নাট্যদল বনানী) লোক নাট্যদল বিভক্ত হয়। পরে লোক নাট্যদল টিএসসি আর সক্রিয় থাকেনি। লোক নাট্যদল, বনানী অন্য নাটকসহ কঞ্জুস নিয়ে তাদের চর্চা চালিয়ে যাচ্ছে।

শুধু জনপ্রিয়তা আর দর্শক নয়, দেশে ও বিদেশে বহুবার পুরস্কার অর্জন করেছে কঞ্জুস। ১৯৯৩ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক অলিম্পিকে অন্যতম সেরা প্রযোজনার পুরস্কার পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় একাধিক বিভাগে পুরস্কৃত হয়েছে। ইউরোপের মোনাকোয় অনুষ্ঠিত ‘বিশ্ব থিয়েটার উৎসব-২০১৩’তে অংশগ্রহণ করে প্রশংসিত হয়। যুক্তরাজ্যের ব্র্যাডি সেন্টারেও কঞ্জুস-এর উপস্থাপনা দর্শকনন্দিত হয়।

কঞ্জুস পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ জীবন ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে রূপান্তরিত, যাঁরা উর্দু ও বাংলা ভাষার মিশ্রণে এক বিশেষ ধারায় কথা বলেন। তাঁদের জীবনধারার আবহ তৈরি করার জন্য এই নাটকে পুরোনো দিনের জনপ্রিয় সব হিন্দি গান ব্যবহৃত হয়েছে।

প্রদর্শিত ছবিগুলো ২০০২ সালের ২৫ মে তারিখে তোলা।

তথ্য- মাসুম অপু/ প্রথম আলো

(পরের নাটক – হাত হদাই)

 

 

 

 

 

মন্তব্য
Loading...