পাঠ প্রতিক্রিয়া ‘হাম ভি কাঠাল খায়া’- শারমিন সুলতানা

শাকুর মজিদের রচনা থেকে পাঠোত্তর বিশ্লেষণ

শাকুর মজিদের রচনা থেকে পাঠোত্তর বিশ্লেষণ।
_______________________________________
বাংলাদেশের প্রথিতযশা নাট্যব্যক্তিত্ব,একজন লেখক, সমালোচক ও বর্তমান সময়ের মঞ্চনাটকের প্রাণপুরুষ শাকুর মজিদ। বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী এ সাহিত্যিক বাংলাদেশের শ্রেষ্ট বিদ্যাপিঠ বুয়েটের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্থাপত্য বিদ্যায় লেখাপড়া করেও তিনি সাহিত্যকে ভালোবেসে, বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনকে সমৃদ্ধ করে আসছেন।সম্প্রতি তাঁর একটি স্মৃতিচারণমূলক রচনা পড়ে আমি ভীষণ ভাবে অভিভূত হই।তাঁর জন্মস্থান সিলেটে হলেও বসবাস করছেন ঢাকাতেই।তারপরও তাঁর আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করে রচনাটিকে এক উচ্চমাত্রায় স্থান করে দিয়েছেন।ভীষণ এক নস্টালজিক আবহ এনে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন ভাষার ব্যবহার কতটা নান্দনিকতা আনতে পারে।হোক সেটা আঞ্চলিক কিম্বা প্রমিত মান ভাষা।তিনি শব্দের প্রয়োগে খুব সতর্কতা অবলম্বন করেন বলেই ব্যাঙ্গাত্বক শব্দটাও রসাত্বক হয়ে রচনায় প্রাণ পায়।তিনি বহুমুখী গুনের অধিকারী বলেই হয়তো আজকের বাংলাদেশের শাকুর মজিদ একটি প্রতিষ্ঠান।যে প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত হচ্ছে বহুমূল্যবান জনসম্পদ।আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর প্রত্যেকটা লেখারই ভক্ত।কি ভ্রমণ কাহিনি,কি রম্যরচনা।তিনি এমনভাবে ঘটনার বিশ্লেষণ করেন,মনে হবে এই তো আমার চোখের সামনেই ঘটছে ঘটনাটি। তাঁর প্রতিটা ফেইসবুক স্ট্যাটাস ও অন্যান্য লেখায় আমি দেখেছি, তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন। তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবিচল বলেই নির্দ্বিধায় অসঙ্গতিকে তুলে ধরেন নির্ভয়ে।কোন মহলের বিপক্ষে যাচ্ছে কিনা, কাউকে অখুশি করছেন কিনা এ তাঁর ভাবনায় আসেনা কখনও।এজন্যই তিনি অন্য যে কারো থেকেই ভিন্ন।

ফেইসবুকে তাঁর একটি লেখা চোখে পড়লো। লিখেছেন, ছোটবেলার কথা, আত্মীয়তার কথা, কাঠাল আনারস খাবার কথা। লেখাটির শিরোনাম -‘ইয়েস,  হাম ভি কাঠাল খায়া‘। এই লেখাটি পড়েই এমন কথা মনে হলো।
তাঁর রচনাটি বিশেষ কোন অঞ্চলের ভাষাকে ভিত্তি করে লেখা হলেও এমনই স্মৃতিমধুরতা বাংলাদেশের সমগ্র অঞ্চলের। আপাতদৃষ্টিতে কোন শব্দকে ব্যাঙ্গাত্বক মনে হলেও,তাঁর রসবোধের জন্য মনে হবে এই শব্দটা এখানেই প্রযোজ্য।তিনি আবহমান গ্রাম বাংলার এক শৈল্পিক রূপ তুলে এনেছেন তাঁর এ রচনায়।সাধারণের সুখ,দুঃখ, হাসি,কান্না সবকিছুই লুকানো যেন এ রসাত্মক জীবনবোধে।তিনি স্মৃতিকাতর হয়ে নিজেরই শৈশবকে তুলে এনেছেন শিল্পরূপ দিয়ে।বুঝা যায়,আধুনিক সুবিধাদি নিয়ে আয়েসি জীবনযাপন করলেও ভোলেননি তাঁর মধুময় শৈশবকে।গ্রামের সাধারণ মানুষগুলো কতটা আন্তরিক, কতটা অতিথি পরায়ন, এ বোধগুলো আমাদের চতুর্থ জেনারেশন হয়তো কল্পনাও করতে পারবেনা।অথচ, এটা কোন কল্পকাহিনি নয়।এটা সম্পূর্ণই লেখকের নিজের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা। আগামী প্রজন্ম তা পড়ে অভিভূত হবে বলে আমার বিশ্বাস।
তাঁর রচনার অংশবিশেষ-
-“ভাইগনা, আমরার আনারস টিল্লা দেখসো নি ?
-না।
আইও, তুমারে দেখাই।
-চলেন।
এবার মামার সাথে চলে যাই। বাড়ি থেকে নেমে কিছুদূর সমতল। এতা পার হয়ে অনেকটুকে হেঁটে একটা জঙ্গলের কাছে গিয়ে মামা দাঁড়ান। আমাকে বলেন- সাবদানে আইওবা, জুক-ফুক আছে।
বুঝে গেলাম- এখানে হবে না। জোঁক আছে এই টিলায়।”
এভাবেই তিনি হাস্যরসে রচনায় এনেছেন আবেগপ্রবণ স্মৃতিময় সংলাপ।মামা তার ভাগ্নেকে পেয়ে তাকে নিয়ে যায় প্রকৃতির খুব কাছাকাছি। আবর্তিত জীবনের সাথে ঘুরে সময়ের চাকা।লেখক হয়তো আজও স্মৃতিকাতর হয়ে যান, পাশাপাশি আবেগাপ্লুত হয়ে যান অকৃত্রিম ভালোবাসার কাছে।নিঃস্বার্থ ভালোবাসা খুঁজেনা লাভ লোকসান। সেখানে শুধুই বিলিয়ে দেয়ার আনন্দে ভরপুর থাকে সাধারণের জীবন।লেখকের মামা কেন্দ্রীয় ভূমিকায় থাকলেও, যেন আমাদেরই লোক।মামার আন্তরিকতা আর ভালোবাসা বিদ্যমান সাধারণের প্রায় প্রতিটা মামা।
লেখক এমনই বর্ণনায় এনেছেন-
“মামার লুঙ্গির সাথে কাচি লাগালো ছিলো। সেটা দিয়েই কচ কচ করে কেটে ফেলেন আনারস। এবার চার পিস করে আমার হাতে দিয়ে বলেন, ভাইগনা রাখো তুমার আতো, এখন খাইও না, উবাও।
আমি দুই হাতে চার পিস আনারস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। তিনি লুঙ্গির গিটের পাশ থেকে একটা কাগজের পুটলি বের করেন । বলেন- ভাইগনা, আবো সিজন আইসে না , বিত্তুং একটু টেংসি করবো বা, তুমা লাগি নুন লইয়া আইসি, নুন মাখাই খাও। বও অনো।”
এমনই করে লেখক পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধ করেছেন তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণে।তাঁর শব্দের আঞ্চলিকতার প্রয়োগ হলেও রচনায় কতটা নান্দনিকতা এনেছেন,তা আমরা বুঝতে পারি রচনার এ অংশটুকু পড়ে-
“ফিরে আসি বাড়ি। কিন্তু মামু আমার লগ ছাড়েন না, বলেন,- আও ভাইগনা, খাটল খাই।
আমি বলি- মামা, সকালেই তো ঘরে খেলাম নাস্তার সময় খই আর কাঁঠাল। এখন বাদ দেই, ঘরো তো আছেই, লাগলে খাবো ।
কিন্তু মামু আমার নাছোড়বান্দা।
বলেন- আয় বেটা। ই জাত কাটল খাইওসত না কুনো দিন। ভাটাবাগি বেটাইন তুমরা কাটল খাওয়া চিনো না।”
শাকুর মজিদ মানেই রসে টইটম্বুর এক মুগ্ধতার সম্মিলন। তাঁর রচনার যে কোন অংশ পড়লেই বুঝা যায় তিনি হাস্যরসের মাঝেই এনেছেন অতিবাস্তব জীবনের মুদ্রিত অংশ। যেখানে আছে সুখ আর হাসির অন্তরালে কোন কষ্টের নিহিত রূপ কিম্বা কান্না ও বেদনার মাঝেও আমাদের হাসতে হয়।হাসি আমরা প্রাণ খুলে। এ যেন আকাশ কালো করা মেঘের পরেও এক টুকরো রোদ্দুরের ঝিলিক।

 

লেখকের ফেইসবুক থেকে 

মন্তব্য
Loading...