আজ আমার কুসুম ফোটার দিন।

আজ আমার কুসুম ফোটার দিন। *
আজ আমার ক্যাডেট জীবনে প্রবেশের প্রথম দিন। ১৯৭৮ সালের ২৫ জুন শুরু হয়েছিল এক নতুন জীবন। আমার বাকী জীবনটাই বদলে দিলো এই দিন।
এ দিনের কাহিনী নিয়ে বই লিখেছিলাম- ‘ক্লাস সেভেন ১৯৭৮’। সেই বই প্রকাশের পর বদলে গেলো আমার জীবন। মূল পেশার বাইরে আমি লেখক হিসাবে পরিচয় পাওয়া শুরু করলাম। হুমায়ূন আহমেদ আমার বই পড়ে পত্রিকায় আলোচনা লিখে ফেললেন ! কী একটা অবস্থা !
এবার আসি আসল কথায়।
কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজে আমার বেশ যাওয়া হয়। ক্যাম্পাসের নতুন মাস্টার প্ল্যানটা আমার করে দেয়া। এক সময় শুনি সামনের সপ্তাহে ইনটেক ডে। নতুন ক্যাডেট আসবে। শুরু হবে ৫০টি ক্যাডেটের নতুন জীবন।
আমি অধ্যক্ষ মহোদয়কে বলি- ভাই, এই দিনে একটা খুব সাধারন ঘরের ছেলে কীভাবে কলেজে তাঁর প্রথম দিন কাটাচ্ছে তা আমার দল নিয়ে ক্যামেরায় ধারন করবো, আর এ নিয়ে একটা মিনিট দশেকের ডকুমেন্টারি বানাই দিব। দেই ?
– দেন। খুব সরল উত্তর প্রিয়ভাজন অধ্যক্ষের।
এই অধ্যক্ষ ফৌজদার হাট ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন ক্যাডেট ও প্রাক্তন অধ্যক্ষ। ঘটনাক্রমে সেই কলেজে সে আমার ৫ বছরের জুনিওর ছিল। কলেজে তাঁকে দেখেছি বলে মনে নাই, মনে রাখার কথাও আমার ছিলো না। কিন্তু এখন সে আমার ঘনিষ্ঠজন। এ কারনে আমার অনেক আবদার সে হাসিমুখে সহ্য করে। এটাও করলো।
আমি খবর দিলাম বাবুকে। চলে আসো বিয়ানীবাজার থেকে। আমার অফিসের দুই আর্কিটেক্টকে বললাম, সাইট ভিজিট আর সার্ভে দেখা বন্ধ রাখো। লাইট ধরো, ক্যামেরা টাইপডে বসিয়ে আমার সাথে ঘুরো।
তারা লেগে গেলো কাজে। তাঁদের কাঁধে ভারি ট্রাইপড, হাত বুম আর ব্যাটারি সানগান।

এর কয়েকদিন পর এই ক্যাডেটদের প্রথম অনুষ্ঠান হবে তাঁদের কলেজে। ট্যালেন্ট শো। কলেজ মঞ্চে তারা প্রথম আবির্ভূত হবে পারফর্মার হিসাবে । অধ্যক্ষকে বলি- আমাই একটা স্ক্রিপট লিখেছি, এটা ক্লাস সেভেনের ঐ ছেলেকে দিয়ে পড়িয়ে আমাকে কি ওডিও ফাইলটা পাঠাতে পারো?
-অবশ্যই ভাই।

কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজে বাংলার এক শিক্ষক আছেন। খুব ভালো পড়ান। তিনি নিজে তদারকি করে খুব পলিশড উচ্চারনের এক চেহেলেকে দিয়ে পড়িয়ে পাঠালেন আমার কাছে।
আমি শুনে বলি- না এটা হবে না। এর মধ্যে সোদা মাটির ঘ্রাণটা নাই। যে ছেলের কাহিনী নিয়েছি সে আরো সহজ করে কথা বলতো। আমার সেই ছেলের ভয়েস লাগবে।
আমার নেয়া হলো ভয়েস। সেই ছেলেরই ভয়েস।
আমি শুনে বলি- আরো রো লাগবে।
সে বলে- হবে না ভাই। এক মাসে এই ছেলের উচ্চারন অনেক খানি বদলে গেছে।এটাই চালান।
আমি এটা দিয়ে রেডি করে ফেলি। আবার বলি- ট্যালেন্ট শো তে এটা দেখাই ?
– ভালো তো। কিন্তু আপনার আসতে হবে। আপনার কথাও বলবেন, আপনার সময়ের কাহিনি শুনাবেন আর এটা দেখাবেন।

আমি আগের দিন চলে গেলাম কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ। কাল সন্ধ্যায় দেখানো হবে ১০ মিনিটের প্রামাণ্যচিত্র – কুসুম ফোটার দিন।

*একটা কথা না বললে অন্যায় হবে। আমার ‘ক্লাস সেভেন ১৯৭৮’ বইটি পড়ে সাবেক সচিব ও ছড়াকার মোফাজ্জল করিম খুব প্রশংসা করে লিখেছিলেন – “শাকুর মজিদের ‘ক্লাস সেভেন ১৯৭৮’ পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল, ওটা কি শাকুরের ক্লাস সেভেন, না আমার ক্লাস সেভেন। বইটির পাতায় পাতায় যে কিশোরবেলার চিত্র ফুটে উঠেছে তা আমার বা অন্য যে কোন কারো কুসুমফোটার কাল হতে পারে। বইটির নাম যদি ক্লাস সেভেন ১৯৫২ হতো তা হলেও আমি আপত্তি করতাম না ;’ ৫২ সালে আমি ক্লাস সেভেনের ছাত্র ছিলাম।” তাঁর এই লেখাটা ছাপা হয় দৈনিক প্রথম আলোতে। শিরোনাম ছিলো – কুসুম ফোটার কাল । সেখান থেকে এই নামটা আমি দিয়েছি। অনেক বছর করিম ভাইর সাথে যোগাযোগ নাই। আশা করি তিনি ভালো আছেন।

** আরেকটা কথা। সেদিন ভোর রাতে খবর পাই আমার ছোট ছেলে কক্সবাজার থেকে ফিরতে বাস এক্সিডেন্ট করে সীতাকুন্ডুতে পড়ে আছে। আমি তাঁকে ঢাকা আনার ব্যবস্থা করে সকালেই কুমিল্লা ছেড়ে ফেরত আসি ঢাকা। এই প্রদর্শনীতে আমি আর ছিলাম না।
আমার খুব ইচ্ছা ছিলো ক্লাস সেভেনের ঐ ছেলেটার পেছনে কায়দা করে কোথাও বসবো আর দেখবো সে কেমন করে তাঁকে দেখে।
এই ঘটনা ৫ জুলাই ২০১৯)

মন্তব্য
Loading...