প্রথম প্রদর্শনী

আজ একটা মজার ঘটনা বলবো।

আসলে ঘটনা একটা না, দুইটা । একটা হচ্ছে প্রথম টেলিভিশন নাটকের শুটিং আর আরেকটাা হচ্ছে প্রথম ফটো এক্সিবিশন। দুইটার সাথে একটা জিনিস কমন আছে- প্রথম। আচ্ছা ধরে নেয়া যাক, এটাও আরেকটা প্রথমের গল্প।

১৯৯৬ সাল। দুই দুইটা টিভি নাটক লিখে বসে আছি। প্রডিউস করার লোক পাই না। যে-ই অফিসে আসে তাঁর সামনে স্ক্রিপট খুলে পড়া শুরু করি। প্রথমটা সিলেটের আঞ্চলিক ভাষার। আর শুটিং করতে হবে সিলেটে গিয়ে। সুতরাং এটার মার্কেট খুব খারাপ। দ্বিতীয়টা নাগরিক কাহিনী। এক ফটোগ্রাফারের গল্প। নাম শেষ দৃশ্য

গল্পটা এমন – একটা মেয়ে রোজ এক লোককে ফোন করে। লোকটি তাঁর পরিচয় গোপন করে কথা বলে। একদিন তাঁদের দেখা হবার ক্ষণ ঠিক হয়। মেয়েটিকে বলে- সে একটা ফটো একজিবিশনে যাবে সেখানে দেখা হবে তাদের।

এক্সজিবিশনে গিয়ে ফটোগ্রাফারের কাছে ক্রাশ খায় মেয়েটা। কিন্তু মনের মধ্যে অপেক্ষা সেই টেলিফোনের ছেলের। শেষ দৃশ্যে জানা যায় এই নামকরা তরুন ফটোগ্রাফারের সাথেই মেয়েটা এতোদিন গোপনে ফোনালাপ করেছিল।
এটা এনালোগ যুগের গল্প। কিন্তু গল্পটা পছন্দ করে ফেললো গাজী রাকায়েত। সে তখন ‘চারু নীড়ম’ নাম দিয়ে টাকা খরচ করে নাটক প্রযোজনা করে। এবারো টাকা লগ্নি করবে। আমাকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে স্ক্রিপ্ট নিয়ে গেলো। পরিচালক ও চিত্রগ্রাহক ঠিক করলো সালাহ উদ্দিন লাভলুকে। নায়িকা সুইটি। সুইটি এর আগে একটি নাটকে প্রধান চরিত্র করেছে, মূলত সে মডেল। আর গাজী রাকায়েত প্রথম বারের মতো নাটকে নায়কের চরিত্রে অভিনয় করবে, তাঁর নাকি স্ক্রিপটা খুব পছন্দ হয়েছে।

নাটকের শিডিউল হয়ে গেলে। ১০ দিন পরে নাটকের শুটিং হবে। প্রথম দিন শুটিং হবে একটা আর্ট গ্যালারিতে যেখানে একজন ফটোগ্রাফারের একজিবিশন চলবে, পোর্টেট একজিবিশন।

রাকায়েত আমাকে বলে দিল- এই শুটিং এর সাপোর্ট আমাকে দিতে হবে। একটা রিয়েল একজিবিশন হলে ভালো হয়, না পেলে কারো গোডাউন ভাড়া করে সেখানে আমার কিছি পোর্টেট ফ্রেম করে নিয়ে রাখলেই হবে।
চিন্তায় পড়ে যাই।
এখন এই একজিবিশন পাই কই ?

গেলাম দৃক। দৃকের সাথে আমার খাতির আছে। ১৯৯১ সালের ব্যাঙ্ক ইন্দসুয়েজের ক্যালেন্ডারের জন্য আমার দুইটা স্লাইড বিক্রি করে ৫ হাজার টাকা দিয়েছিল আমাকে। আর আলম ভাই আমাকে খুব খাতির করেন। ১৯৯০ সালে আমার জীবনের প্রথম আলোকচিত্রের পুরস্কার নেয়ার অনুষ্ঠানে স্টেজে ছিলেন তিনি।
গেলাম, যদি সেই খাতিরে একটা একজিবিশনের জন্য গ্যালারিটা পাওয়া যায়।
গিয়ে দেখি তিনি নাই। অফিসে যিনি আছেন তিনি বলে দিলেন নাটকের শুটিং এর জন্য ভাড়া হয় , দিনে ২ হাজার টাকা। আর একজিবিশনের ৩ দিনের জন্য ভাড়া ১০ হাজার টাকা কিন্তু আমার জন্য ৫ হাজারে হয়ে যাবে। আমি টাকা দিলে এই তারিখে বুকিং দেয়া যাবে।

আমার পকেটে রাকায়েতের দেয়া ১০ হাজার ক্যাশ। আমি ৫ হাজার টাকা দিয়ে বুকিং করে ফেলি। নাটকের শুটিং হবে। নায়কের নাম হাসান মাহমুদ। এই নামটা আমার প্রিয় বন্ধুর । ওর নাম নিলাম, আর দুইজন প্রিয় ফটোগ্রাফার হাসান সাইফুদ্দিন চন্দন আর চঞ্চল মাহমুদের নাম মিলিয়ে এই দুইজনের নাম এক করে রাখলাম হাসান মাহমুদ। শুটিং হবে – বাংলার মুখ নামে।

সিদ্ধান্ত হয়ে গেলো আমার কাছে খুচরা-খাচরা যে সকল পোর্ট্রেট আছে সেগুলো নিয়ে গ্যালারী ভরে দেব। একটা ব্রশিয়ার ছাপাবো, ব্যানার করবো, সবই দুই নামে হবে। আসলটা শাকুর মজিদ নামে, নকলটা হাসান মাহমুদের নামে।

বাংলার মুখ, প্রথম আলোকচিত্র প্রদর্শনী, ১৯৯৭

৩ দিনে আলোকচিত্র প্রদর্শণীর যাবতীয় ব্যবস্থা হয়ে গেলো। এবার একটু প্রেসের পাবলিসিটি দরকার। কারে আনা যায় ?

আমি থাকি তখন শ্যামলীতে, অফিস লালমাটিয়া। সকাল বেলা অফিসে আসার পথে শ্যামলী ২ নং রোডে ঢুকে গেলাম।। কবি শামসুর রাহমানের বাড়ি এখানে। বাংলাবাজারে থাকার সময় তাঁর জন্মদিনের বিশেষ প্রতিবেদনে পোর্টেট তুলেছিলাম, তাঁর মার সাথে তাঁর ছবি ছাপা হয়েছিল। সেটা দেখে পত্রিকায় ফোন করে ধন্যবাদ দিয়েছিলে্ন ১৯৯২ সালে। সেই ফটোগ্রাফার এখন তরুন আর্কিটেক্ট আর অতি নবীন নাট্যকার। তাঁর নাটকের শুটিং এর জন্যএকজিবিশন হবে, শুনলে তিনি রাজী হয়েও যেতে পারেন।

গিয়ে দেখি বিষয়টা আরো সহজ। তিনি আমাকে চিনেই ফেললেন। নাটকের বিষয়টা চেপে গেলাম, শুধু ফটো একজিবিশন। তিনি প্রধান অতিথি হতে রাজি হয়ে গেলেন।

এবার একজন বিশেষ অতিথি দরকার।

স্থপতি হিসাবে টুকটাক কাজ করছি। পার্টনার তৌকীর। ঠিক করলাম, স্থপতি ইন্সটিটিউটের সভাপতি শামসুল ওয়ারেস স্যারকে বলে দেখতে পারি।

বলা মাত্র তিনিও রাজি হয়ে যান। এবং মজার ব্যাপার- ৬ দিনের মাথায় ১৯৯৭ সালের ১৬ অক্টোবর সকাল ১০টা থেকে ৩ টা পর্যন্ত শ্যুট করেন লাভলু ভাই হাসান মাহমুদের প্রদর্শনী ।

আমার জ্যাকেট রাকায়েতের গায়ে, , আমার ক্যামেরা রাকায়েতের হাতে, ক্যামেরা ব্যাগ রাকায়েতের কাধে ঝুলানো। আমি শুটিং দেখি, রাকায়েত এখন ফটোগ্রাফার। এই প্রদর্শণীর দর্শক হিসাবে অভিনয় করে আমার অফিসের পিয়ন, রিসেপসনিস্ট, এস্টিমেটার, ড্রাফটস্ম্যান, শুটিং দেখতে আগ্রহী আমার বন্ধু আর আমি নিজে। আর বিকাল ৪ টায় হাসান মাহমুদকে সরিয়ে শাকুর মজিদের প্রদর্শনী শুরু হয়ে যায়। গ্রাফিক্সের কাজে খাটাকাটনি করে দে আজাদ।

প্রেসে অনেক ভালো কাভারেজ পাই। প্রচুর লোক আমার ছবি দেখতে আসেন এবং এই ভাবে শাকুর মজিদের প্রথম একক আলোকচিত্র প্রদর্শনীর সুচনা হয়।

যারা ছবি দেখতে এসেছিল, তারা কেউ জানতেই পারলোনা যে আসলে একটি নাটকের শুটিং এর জন্য ছিলো এই আয়োজন

আরেকটা মজার ঘটনা ঃ প্রদর্শনীর দুই সপ্তাহ পর একটা ছবি নিয়ে আমি আর রানা ভাই চলে যাই সোনারগার পানাম নগর। আমার একজিবিশনে যে মহিলার ছবি পোস্টারে ব্যবহার করেছিলাম, তাঁর হাতে পৌছে দেই বাধাই করা সে ছবিটা। সে গল্প আরেকদিন বলব।

যে মহিলার ছবি দিয়ে পস্টার করেছিলাম প্রদর্শনী শেষে সোনারগাও এর পানাম নগরে গিয়ে এই ছবিটা দিয়ে আসি। সাথে ছিলেন নাট্যকার ফেরদৌস হাসান।

 

এই প্রদর্শনী উপলক্ষে একটা এল্বার বেরিয়েছিল। বাংলার মুখ। ১০টা সাদাকালো পোর্ট্রেটের পোস্টকার্ড একসাথে। এ ঘটনার ৭ বছর পর ২০০৪ সালে রানা ভাই (ফেরদৌস হাসান) ‘বাংলা’ নামক একটি নাটকে এটা নাটকীয় ভাবে আনেন।

 

আরেকটা একটা কথা । ১৯৯৮ সালে নাটকটি প্রচার হয় বিটিভি থেকে। ‘শেষ দৃশ্য’ নাটকটার প্রশংসা করে সে সময়ের জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ‘যায় যায় দিন’ এ আশিক তানভির আলোচনা লিখেছিলেন। এ ঘটনার ১০ বছর পরে জানি যে এই আশেক তানভির ছিল কবি মারুফ রায়হানের ছদ্মনাম।

(বাংলার মুখ- প্রদর্শনীর কিছু ছবি আর কমেন্ট খাতা আরেকটা এলবামে দিলাম । https://www.facebook.com/shakoor.majid/media_set…

মন্তব্য
Loading...