আমি কি এই ঈদে বাড়ি যেতে পারি?

দৈনিক সমকাল - ঈদ উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন-, ২৪.৭.২০

এ পৃথিবী আগে কখনো দেখে নাই
বছর চারেক আগে আমার যখন পঞ্চাশ পূর্ণ হলো, আমার অনুভূতি প্রকাশের এক লেখায় লিখেছিলাম যে, আমি হচ্ছি পৃথিবীর সবচেয়ে সুবিধাভোগী প্রজন্মের এক প্রতিনিধি। পৃথিবীর বিশাল যে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হয়েছে তার রূপান্তরের সময়টুকু আমি দেখতে পেয়েছিলাম। আকবর বাদশাহর ভাগ্যে যা জোটে নাই, আমার তা জুটেছে, রবীন্দ্রনাথ যা করতে পেরেছেন, আমিও তা পেরেছি, আবার তিনি যা যা করতে পারেন নাই আমি তা তাও করতে পারছি। এই বিবেচনায় আমি রবীন্দ্রনাথের চেয়েও বেশি সুবিধাভোগী। আমি টাইপরাইটারে যেমন লিখতে পেরে নিজেকে প্রযুক্তিবিদ বলে ভেবেছিলাম, এখন ভয়েস মডুলেটর দিয়ে সিলেটি ভাষায় কথা বলি, সেটাও বাংলা হরফে আমার কম্পিউটার যখন লিখে দেয়- এটা দেখেও আমি তেমন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করি না। মাত্র কয়েক বছর আগে মানুষ তার দিয়ে যুক্ত হয়ে একজন আরেকজনের সাথে কথা বলতে পারতো, আর এখন আমরা ৫০০ জন মিলে সাত মহাদেশের মানুষ জুটিয়ে একসাথে আড্ডা দিতে পারি। সুতরাং আমি এ পর্যন্ত পৃথিবীতে জন্মানো সবচেয়ে ভাগ্যবান প্রজন্মের একজন, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নাই।
মানুষের বসবাস পৃথিবীতে কয়েক লক্ষ বছর ধরে, সে হিসাবে যাব না। অন্তত গত ১০ হাজার বছর ধরে আমাদের মতো সভ্য মানুষের বাস যে এই পৃথিবীতে হয়েছে তার হিসাব আমরা জানি। সক্রেটিস থেকে বিদ্যাসাগর পর্যন্ত যে সময়ের গল্প আমরা জানি, সেখানে খুব বড় পরিবর্তন ছিল না। পরিবর্তন শুরু হলো বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিস্কারের পর। তারপর থেকে এই দু’হাজার কুড়ি সালে এসে পৃথিবী দেখছে এক নতুন পৃথিবীকে, এ পৃথিবী আগে কখনো তা দেখে নাই। নিতান্ত ভাগ্যবান বলেই এই বিরল পৃথিবীর রূপ আমার দেখে যাবার সুযোগ হয়েছে।

করোনাময়ের কৃপা
সামান্য, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এক অণুজীবের ভয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণিকুল আজ গর্তজীবী হয়ে বসে আছে। পৃথিবী খুলে দেওয়া হয়েছে অন্য সব প্রাণীর উন্মুক্ত বিচরণের জন্য। আর আমরা, মানুষেরা অভ্যস্ত হচ্ছি এক নতুন জীবন ব্যবস্থায়। আমাদের বদলে যাচ্ছে যোগাযোগের ভাষা, বদলাচ্ছে আলিঙ্গন ও ভালোবাসা প্রকাশের চিহ্ন, আমরা ক্রক্রমশ পরস্পরের থেকে দূরে, আরও দূরে যাবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠছি।
এমন কথা বলা হয়ে থাকে যে আসলে সর্বোচ্চ ক্রান্তিকালেই মানুষ তার যথার্থ রূপে প্রকাশিত হয়। এই যদি সত্য হয়, তাহলে এই ক্রান্তিকাল আমাদের কী চোখে আঙুল দিয়ে এটুকুই বোঝায়নি যে, মানুষ আসলে তার নিজেই সব চেয়ে বেশি ভালোবাসে। অপর আত্মীয়কে ভালোবাসা প্রকাশের অনেকটুকু বা সবটুকুই আসলে স্বার্থের বা নিজের প্রয়োজনে? মানুষ কত সহজে, কত দ্রুত একজন অপরজন থেকে দূরে থাকাটাকে ন্যায্য বলে মনে করা শুরু করে দিলো, তার পেছনে কতশত যুক্তি দিয়েও।
এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবাণু আরও কত শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে নীরবে। একেবারে অসাম্প্রদায়িক এবং সাম্যবাদী এই জীবাণুর কাছে সকল মানুষ সমান। মানুষে মানুষে যে ভেদ নাই তার শিক্ষাটা এই জীবাণু যত সহজে দিতে পেরেছিল, আর কেউ সফল হয়েছে বলে মনে করতে পারি না।
আজ, (২২ জুলাই ২০২০) পাক্কা চার মাস পূর্তি হলো আমার ঘরবন্দি জীবনের। এই সময়ের মধ্যে, কেবলমাত্র আরও বেশি কিছুদিন বাঁচার আশায় মানুষ তার চিরকেলে অভ্যাস পাল্টে ফেলেছে। মানুষ অনেক কিছু ছাড়াই যে জীবনযাপন করা যায় তা শিখে ফেলেছে। আমার এই করোনাকাল আমাদের নতুন নতুন শিক্ষা দিচ্ছে। একেবারেই অপ্রত্যাশিত জীবনের শিক্ষা। এমন শিক্ষা এর আগে মানুষ পায়নি। এর আগে যে সকল প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সাথে মানুষ পরিচিত হয়েছিল, সেগুলো ছিল অল্প সময়ের জন্য। এত বৃহৎকাল ধরে মানুষ এমন গর্তবাসে চলে যাবে তা আগে ভাবে নাই।
মানুষের প্রয়োজনগুলোও সীমিত হয়ে এসেছে। সেই সফোক্লিসের আমলেও যেমন মানুষের বিশ্বাস ছিল রাজ্যজুড়ে মড়ক আসার পেছনে কোনো দৈবিক ইশারা আছে, এখন অনেক মানুষও মনে করে এটা সৃষ্টিকর্তা প্রেরিত নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর জন্য অভিশাপের ফল। এই বিপজ্জনক অণুজীব আসলে মানুষের মধ্যে ধার্মিকতা ছড়াচ্ছে, আবার মানুষকে অধার্মিকও করে দিচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি যে সুযোগটা মানুষের জন্য তৈরি করে দিচ্ছে- তা হলো, মানুষ তার নিজের সাথে একান্তে কথা বলার মতো অনেক সময় পেয়ে যাচ্ছে। এ সময়টা এই করোনাময়ের কৃপায় পাওয়া।

ছোটবেলার কোরবানি
ছোটবেলায় কোরবানির সময় আমি কখনও গরুর কাছে থাকতে পারতাম না। কয়জন মিলে জবরদস্তি করে একটা গরুকে কেটে ফেলছে আর গরুটি বাঁচার জন্য পা নাড়াচ্ছে- এটা দেখে খুব ভয় হতো। আমি সামনে থেকে সরে যেতাম। এটা জেনে আমার মা বলতেন, তুমি ডাক্তারি পড়বা কেমনে, ডাক্তারদের তো অনেক কাটাছেঁড়া করতে হয়। ডাক্তারি পড়লে তুমি ফেইল করবা।
যাক, ডাক্তার আমার হওয়া লাগে নাই। কিন্তু কোরবানির ঈদ আমার ছোটবেলা থেকে অনেক পছন্দের। অনেক বেশি বেশি গরুর গোশত খাওয়া যায়। এই পুরা গোশতটাই মনে হয় মাগনা পাওয়া। এটা যে কেউ টাকা দিয়ে কিনেছে এটা মনে হতো না। ধাপে ধাপে রান্না বসতো সকাল থেকেই। প্রথমে কলিজা ও মগজ, যেগুলো খুব দ্রুত সিদ্ধ হয়ে যায়। তারপর গরম ভাতে কলিজা ভুনা, সাথে সিরকায় চুবানো কাঁচা পিঁয়াজ।
আমরা বছরে দুইবার ঈদ পাই। এটা হচ্ছে বাংলাদেশের ঢাকাকেন্দ্রিক নাগরিক মানুষের সবচেয়ে বড় বিনোদন। দেশ স্বাধীনের পর থেকে আমাদের ঢাকাকেন্দ্রিক নাগরিক জীবনের সূচনা। সেই হিসাবে মাত্র দুই প্রজন্মের নাগরিক জীবনের কালচার আমাদের গড়ে উঠেছে। আমরা যারা প্রথম প্রজন্মের শহুরে আমাদের পুরো শেকড় এখনও গ্রামে। আমাদের মধ্যে যারা দ্বিতীয় প্রজন্মের বা দেশ স্বাধীনের আগে যারা ঢাকায় এসেছেন তাদের হিসাব একটু ভিন্ন। তাদের অনেকে এই শহরেই বিস্তার ঘটিয়েছেন পরিবারের। সুতরাং গ্রামে তাদের নাড়ি তেমন পোঁতা নাই, যেমন নাই আমার সন্তানদের।
আমার নাড়ির টান পুরোই রয়ে গেছে আমার গ্রামে। আমি এই নাগরিক অরণ্যে নির্বাসিত হয়েছি গেল শতকের আশির দশকের মাঝামাঝিতে। ঠিক যখন থেকে আমাদের নগরায়ণ শুরু হয় তার কাছাকাছি সময় থেকে। আমার যেহেতু গ্রাম আছে তাই আমার যেতে হয় গ্রামে, এবং তা দুই ঈদে।
রোজার ঈদ গেল, আমি বাড়ি যাইনি। সামনে কোরবানির ঈদ। এই ঈদে কি আমি বাড়ি যাবো?
আমার নাড়ি থেকে নাগরিক দূরত্ব খুব বাড়ে নাই, বেড়েছে হয়তো আমার সন্তানদের। তাদের জন্ম এই শহরে, তারা এই শহরের প্রথম প্রজন্ম, তাদের কাছে গ্রাম আর দশটা হলিডে ডেস্টিনেশনের একটি। কিন্তু আমার কাছে অন্য। আমি গ্রামে যাই আমার শৈশব খুঁজতে। পথে হাঁটতে হাঁটতে পুরোনো বরই গাছ দেখে ঢিল দিয়ে দুটো বরই ফেলে দিতে ইচ্ছে করে। কখনও দেওয়ার মতো ঢিল খুঁজে পাই না, আবার কখনও কখনও সেই আধমরা গাছের শুকনা ডালে বরই তো নাই, তার পাতাটুকুও চোখে পড়ে না। কিন্তু গাছটার দিকে তাকালে আমি কিন্তু আমার শৈশব ফিরে পাই, গাছটিও হয়তো পায়, হয়তো সেও বলে কিছু। আমি তার কথা শুনতে পাই না।
গ্রামে আছে খালেদ, নুরুল, খস্‌রুল, রাইবালী, জিয়াবুর- আমার শৈশবের সতীর্থ। এদের কেউ মাস্টার, কেউ চাষি। আমি বাড়ি এলে সেই পুরোনো ফুটবল খেলার গল্প শুরু করে দেয়। জিয়াবুর শোনায় মাছ শিকারের গল্প। অমাবস্যার ঝড়ের রাতে বাইন মাছ মনে করে সাপ ধরে খলুইয়ে ভরার গল্প শোনায় জিয়াবুর। দূরে বসে থাকে স্বপন।ক্যামেরা তাক করে রাখে বাবু। জোড়ায় জোড়ায় মোটরসাইকেল মেরে আসে ছাদেক, ফয়সল, মাসুম। এদের চোখ ঈদসংখ্যার দিকে। ঢাকা যাবার সময় কোনটা কার জন্য রেখে যাব তার তালিকা হয়ে যায়। আমি বাড়ি গেলে কয়েকজন খবর পেয়ে চলে আসে গান শোনাতে, কখনও আমার মাও ঠিক করে রাখেন গায়ক। ছেলে যে রকম গান পছন্দ করে, সেই গান যে কাজের লোক ভালো গায়, তাকে বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে আগাম নিয়ে আসা হয় বাড়িতে।

এই ঈদেও কি যাব না?
বছর দশেক আগের গল্প। রোজার ঈদে সবাই মিলে বাড়ি গিয়েছি, তাই ঢাকার পরিবারের সিদ্ধান্ত- কোরবানির ঈদে আর যাবো না। সেই হিসাবে ঢাকায় কোরবানির ব্যবস্থা হলো, বাড়িতে তো আছেই। সকাল বেলা ছেলেদের নিয়ে ঈদের জামাত শেষ করে বাসায় এসে ফোন পাই মায়ের। তিনি জানতে পারেন যে, আমি আমার ছেলেদের সাথে নিয়ে ঈদ করছি। আমাকে বলেন, তুমি তোমার বাচ্চাদের নিয়ে ঈদ করছো, তোমার অনেক আনন্দ, কিন্তু আমার বাচ্চাদের সাথে আমি ঈদ করতে পারছি না, এটা আমার বড় কষ্ট।
আমি বলি, আম্মা, আমি আসতেছি।
সকাল ১০টায় রওয়ানা দিয়ে দুপুর ৩টায় মায়ের সাথে বসে কলিজা ভুনা গরম ভাত দিয়ে খেতে বসে যাই।
এই ঘটনার পর থেকে আম্মা আর আমাকে ঈদে বাড়ি যেতে বলেন না। কিন্তু আমি বাড়ি চলে যাই। রোজার ঈদ সবাইকে নিয়ে আর কোরবানি ঈদে সকালে নামাজের পর, একা। আকাশপথে।
এই ঘটনা চলছে প্রায় দশ বছর ধরে। তিনি নিজেকে বিদ্যাসাগরের মায়ের সাথে তুলনা দেন। বলেন, বিদ্যাসাগরের মা নিশ্চিত জানতেন যে, ছেলে নদী সাঁতরিয়ে হলেও মাকে দেখতে বাড়ি আসবে, সে কারণে তিনি কুপি জ্বালিয়ে বারান্দায় অপেক্ষা করতেন। তিনি নিশ্চিত না হলে কী জন্য রাতের বেলা বারান্দায় এসে বসে থাকবেন? তেমনি আমিও জানি, আমার ছেলে তার বাচ্চাদের সাথে সকালের নাশতা খেয়ে দুপুরে আমার সাথে খেতে আসবেই, এ কারণে আমিও এক পট চাল বাড়ন্ত দিয়েই দুপুরের ভাত রাঁধি, প্রতি ঈদে।

গ্রামের বাড়িতে আম্মার একাকী সংসার

আম্মার একটা লন্ডনী আইফোন আছে। ফোন থেকে মাঝে মাঝে ছবি আসে। মেয়ের কাছে আমেরিকা বেড়াতে গিয়ে তিনি ইউটিইউবের ভক্ত হয়ে যান। এখন তার লাগে ফেসবুক। ফেসবুকে তিনি কোনো কিছু পোস্ট করা জানেন না, কিন্তু স্ট্ক্রল করলেই তার আত্মীয়-স্বজনের ছবি আসে। ৫৪ জন বন্ধু আছে তার। এদের সবার ছবি প্রতিদিন তিনি খুঁজে খুঁজে বের করে দেখেন। কিছুদিন আগে তার ‘একান্ত সহকারিণী’কে দিয়ে একটা ছবি তুলে পাঠিয়েছিলেন আমার কাছে। সেটা ছিল আমাদের ঘরে লাগানো ফুলের গাছের পাঁচটি ফুল। ফুলগুলো ছড়ানো-ছিটানো। এক সাথে নাই। এই ছবিটি তুলে তিনি তার পাঁচ সন্তানকে পাঠিয়েছেন- বাংলাদেশের দুই শহর, ইংল্যান্ডের দুই শহর আর আমেরিকার এক শহরে।

এই ছবির কোনো ক্যাপশন দেওয়া নাই, কাজের মেয়েকে বলেছেন লিখে দিতে- ‘এই ৫ ফুল আমার ৫ সন্তান, তারা কেউ আমার কাছে নাই।’ কিন্তু মেয়েটি তা লিখে দেয় নাই। তিনি ফোন করে করে সবাইকে ছবির ক্যাপশন জানিয়ে দেন।

আজ আমার হোয়াটসঅ্যাপে একটা ভিডিও এসেছে। আমার বাড়ির পুকুর পাড়ের। আমাদের বাড়িটা গ্রামের শেষ মাথায়। এর পর নিচু এলাকা। সামান্য বর্ষায়ও পানিতে থৈথৈ করে।

আমাদের নিজেদের কোনো নৌকা নাই। কিন্তু আমি বাড়ি যাবার আগে তার বাপের বাড়ির নৌকা একটা এনে আমাদের ঘাটে লাগিয়ে রাখা হয়, যদি আমি ইচ্ছা করি তখন যেন নৌকা সাথে সাথে পাই।

ঘরের পেছন দিকে পুকুর পাড়ের সাথে লাগানো আমার একটা বসার জায়গা। আমি বাড়ি না থাকলে সেখানে কেউ বসে না, জায়গাটায় ময়লা পড়ে থাকে। আমার যাবার খবর পেলে পরিস্কার করা হয়। যে ভিডিওটা পাঠানো হয়েছে- যেখানে পুকুরের পানি টলমল করছে, পাড় প্রায় ডুবে যাবার মতো। পাড়ের ওপারে পানি আর পানি। আর আমার বসার জন্য কংক্রিটের বেঞ্চিটা ধুয়ে সাফ করে রাখা।
মার ধারণা- ঈদে যদি তার ছেলে চলে আসে!
আমি কি এই ঈদে বাড়ি যেতে পারি?

মূল লেখায় যে তিনটা ছবি ব্যবহার হয়েছিল সমকালে – তা সৈয়দ মুনজের বাবুর তোলা

মন্তব্য
Loading...