যে যেখানে দাঁড়িয়ে

আলোকচিত্র আর চিত্রকলা নিয়ে একটি তুলনামূলক লেখা

ইপ্রেশনিস্ট যুগের (বেশীদিন আগের না, রবীন্দ্রনাথের সাথে সাথে তাঁদের জন্ম) চিত্রকরেরা যখন রাজন্যবর্গের পোর্ট্রেট বা পৌরাণিক চরিত্র আঁকা আঁকি সরিয়ে ফেলে প্রকৃতির ছবি আঁকা শুরু করেন, তার কিছুদিনের মধ্যে ক্যামেরা এসে যায়।

পোস্ট ইম্প্রেশনিস্টদের থেকে আবার বেরিয়ে আসেন এক্সপ্রেশনিস্ট চিত্রকরেরা, তারা তখন প্রকৃতির ছবি হুবহু আঁকা বাদ দিয়ে ছবির মধ্যে প্রকৃতিতে যা নাই, যা যা থাকতে পারতো তা আঁকা শুরু করলেন।

এঞ্জেল এডামসদের হাতে তখন ক্যামেরা। সারা দিন ধরে অপেক্ষা করছেন, পাহাড়ের কিনারা বরাবর সূর্যের আলো গাছপালার উপর কতটুকু হেলে পড়লে তার সাটারে চাপ দেবেন, আর ছবি তুলে রাখবেন । এর আগে ভ্যানগগ বা সেজানেরা কিন্তু মরুভূমির উপর সূর্যমুখি ফলিয়ে বসেছেন।

এঞ্জেল এডামস যখন প্রকৃতির নিখুঁত ছবি উপস্থাপন করা শুরু করেন, পোস্ট ইম্প্রেশনিস্ট চিত্রকরেরা চিন্তায় পড়ে যান। যে প্রকৃতির নিখুঁত রূপ আঁকার জন্য চিত্রকরের এতো তপস্যা, অনায়াসে অনেক সহজে চিত্রগ্রাহক তা দিতে পারছেন। সহজে একাধিক কপিও করছেন। তাহলে তাঁদের ছবির কদর করবে কে ?

এমন আশংকা চিত্রকরদের মনে ছিলো, অন্তত দেড়শো বছর আগেও।

এখনো কী আছে ?

শিমুল সালাহ্উদ্দিনের পোস্টে এম আই মোমিনের তোলা একটা ছবি দেখে সামিয়া রহমান একটি ছবি এঁকেছেন। একটি আলোকচিত্র অপরটি তৈলচিত্র। একটি ডিজিটাল ইমেজ, অনেকগুলো আলোককণিকা জোড়া লাগিয়ে প্রকৃতির একটা চিত্র ভেসে উঠেছে যেখানে, আরেকটি সাদা ক্যানভাসের উপর চিত্রকর তাঁর প্রয়োজন মনে করা কতোগুলো রঙ মাখিয়েছেন। প্রকৃতির মধ্যে থাকা কতোগুলো উপকরনকে তিনি আবার ক্যানভাসে উপস্থাপনা করেছেন।

এটুকু তিনি কেন করতে যাবেন ?

প্রথমে দেখি আলোকচিত্রটি।

একটি পাতাহীন গাছের ডাল লাল রঙের ফুলে ভরা। গাছটি যেখানে দাঁড়িয়ে তা একটি সবুজ ক্ষেত। পাশে বিস্তীর্ণ জলাঞ্চল, একেবারের দিগন্তে গিয়ে মিশেছে। গাছটির একপাশে দৃশ্যমান একটি বড় নৌকা, ডানপাশেও একটি ডিঙি আছে, প্রায় অস্পস্ট। ঘোলা নীল আকাশের পটভূমিতে টকটকে লাল গাছের অবয়ব ফুটে আছে । রোদে পোড়া সবুজ ঘাসেরা রোদের আলোয় তার মূল রঙ হারিয়ে অনেকটা লেমন ইয়েলো  রূপ নিয়েছে। প্রকৃতি দিনের আলোর এই সময়ে যে রূপ দিয়েছে, আলোকচিত্রী তা ই নিখুতভাবে তুলে ধরেছেন।

এই ছবি তোলার সময় কিন্তু ৩৬০ ডিগ্রী কোনে তিনি অনেক কিছুই দেখেছেন। কিন্তু তাঁর ল্যান্সটি যখন তাক করেছেন তখন তিনি আর কিছুই দেখাতে পারেন নি, বা দেখাতে তিনি চানই নি। তাঁর কাছে দৃশ্যমান বস্তুসমূহের মধ্যে ঠিক যতটুকু এবং যা যেভাবে দেখতে চেয়েছেন, তা ই উপস্থাপন করেছেন। এটা করতে দিয়ে তিনি ফোর গ্রাউন্ড আর ব্যাক গ্রাউন্ডকে অসম ভাগে ভাগ করেছেন। নদী তীরের দিগন্তরেখাকে মূল ফ্রেমের এক তৃতীয়াংশ জায়গা গিয়ে গাছটিকে পরিপূর্ণ অবয়ব অধিকার করার সুযোগ দিয়েছেন। কেন্দ্র থেকে সরিয়ে এনেছেন গাছের প্রধান অংশকে যাতে বা দিকে দৃশ্যমান আরেকটি বস্তু (বড় নৌকা)টাকেও যথাযথ যায়গা দেয়া যায়। যেটুকু তাঁর ল্যান্স এবং লাইট মিটার করতে দিয়েছে তা তিনি করেছেন। যা করতে পারেন নি, তা করেছেন তৈলচিত্রকর।

তৈলচিত্রে আমরা কী পেলাম ?

মূল আলোকচিত্রে যতগুলো উপাদান ছিলো তার প্রায় সবই আছে। ডান পাশের ছোট্ট নৌকাটি আলোকচিত্রে গুরুত্ব পায় নি, এখানে তিনি সেটা বাদই দিলেন।

গাছের কাঠামো হুবহু ঠিক থাকলো। কিন্তু ডালপালার বিণ্যাসে যে পরিমান এসিমেট্রি ছিলো, এই তৈলচিত্রে তাকে সিমেট্রিতে নিয়ে আসা হলো। এবং এইটুকু করতে গিয়ে ফটোগ্রাফে গাছের অফসেন্ট্রিক পজিশন থেকে এখানে সেন্ট্রিক পজিশনে চলে এলো, এবং একে জায়েজ করতে নৌকার যে অবস্থান ফটোগ্রাফের মধ্যে ছিলো, তৈলচিত্রটিতে সে তার অবস্থান বদলালো।

কিন্তু সেটাও বড় বিষয় নয়।

বড় বিষয় হচ্ছে, ফটোগ্রাফারের হাতে ছিলো ডিজিট্যাল ক্যামেরা, যা দিয়ে কেবন কতগুলো আলোকণিকা একটা প্রসেসিং ইউনিটে দেয়া যায়, এর বেশি কিছু করা যায় না। কিন্তু চিত্রকরের হাতে ছিলো রঙের পোটলা আর তুলি। তিনি সেখানে রঙ মাখিয়েছেন। তিনি সেই প্রকৃতি নিজ চোখে দেখেন নি, ছবিতে দেখেছেন। প্রকৃতির সে রঙ থাকার কথা ছিলো বলে তার মনে হয়েছে, যেগুলো জমায়িত আলোককণিকার সমাবেশে উঠে আসতে পারে নাই, কিংবা এমন হলে হয়তো আরো ভালো হতো কিংবা এমনইতো হতে পারতো বলে মনে করেছেন, তা ই এঁকেছেন। ছবিতে আমাদের কাছে লাল রঙ এসেছে বটে, কিন্তু তা পাতার না ফুলের এমনটি স্পস্ট ছিলো না। তৈলচিত্রে স্পস্টই। এখানে মরা গাছের ডালে পাতা নেই শুধু ফুলই দেখাতে চাইলেন তিনি। এখানেই তিনি শিল্পী।

যেমন একটি সংবাদ, অপরটি সাহিত্য। যা ঘটে গেলো তা সংবাদ হয়ে গেলো। কিন্তু যা ঘটে নাই কিন্তু ঘটে যেতে পারতো (Impossible possibility into possible impossibility) তা দিয়েই তো সাহিত্য হয়।

ঠিক এই জায়গায় এসে আলোকচিত্র আর তৈলচিত্র বিস্তর দূরত্ব নিয়ে যে যায় জায়গায় দাঁড়িয়ে।

মন্তব্য
Loading...