দাঁড়াও, শোন

আমার এই মধ্য পঞ্চাশের জীবনে এসে প্রায়ই ভাবি, আমি হচ্ছি খুব ভাগ্যবান প্রজন্মের মানুষ।
পৃথিবীর সৃষ্টির বয়স কত আমার ভালো ধারণা নাই। মানুষ সভ্য হয়েছে, অর্থাৎ কাপড় চোপড় পরা শিখেছে এই মাত্র ১০ হাজার বছর আগে। এই যদি সত্য হয়, তবে পৃথিবীতে মানব জন্মের পর থেকে মানুষের সভ্য হবার সময় অতি ক্ষুদ্র। এই দশ হাজার বছরেই মানুষ বিচার শিখেছে, আইন এনেছে, মানুষের মধ্যে শিল্পবোধ জেগেছে, মানুষ একটা নিয়মের ভেতর দিয়ে জীবন যাপন করা শিখছে। মাত্র আড়াই হাজার বছর আগে প্রথাগত পড়াশুনা করার ঘর বানিয়েছে মানুষ। এটা কালের বিচারে অতি ক্ষুদ্র সময়।
আবার সক্রেটিস-এরিস্টোটলকে দিয়ে শুরু করলে এর পর থেকে একেবারে এই মধ্যযুগ পর্যন্ত মানুষের জীবন যাপন প্রায় একই রকমের ছিলো। মধ্যযুগের পর থেকে একে একে বিজ্ঞানের অভিযাত্রা শুরু হলো বিদ্যুৎ আর স্টিম ইঞ্জিন মানুষের নাগালে চলে আসার পর থেকে পৃথিবীর রূপ বদলে যেতে শুরু করলো। এসব আবিষ্কারের আগের ৭-৮ হাজার বছর সময় পর্যন্ত মানুষের জীবন যাত্রা এবং তার প্রণালী প্রায় এক রকমের ছিল। এই দু’শো বছরে যে পরিবর্তন এলো এর আগের দু হাজার বছরেও তা হয়নি। যন্ত্র আবিষ্কারের পর থেকে মানুষের প্রকৃতি বদল হতে থাকে। মানুষে মানুষে দূরত্ব সমূহ কমিয়ে ফেলতে শুরু করে। মহাকাশ জয় যেমন মানুষের হস্তগত হয়ে যায়, মানুষ থেকে মানুষের দূরত্ব সমূহ ক্রমশ: কাছে আসতে শুরু করে।
কিন্তু এটুকু পর্যন্ত যখন চলতে থাকে, তখনও কম্পিউটার আসেনি মানুষের কাছে। এই যন্ত্র মানুষ যখন বের করে তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করলো এবং ক্রমশ: নানা মাধ্যমে তার প্রকোপ ফেলতে শুরু করলো, তখন জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে শুরু করলো। আমি এই পরিবর্তনের এক বড় সাক্ষী।
পঁচিশ বছরকে যদি একটা প্রজন্মের বয়স ধরা হয়, তবে আমি দুই প্রজন্ম পার করে তৃতীয় প্রজন্মের সূচনা লগ্নে অবস্থান করছি। এর মধ্যে আমার প্রথম পঁচিশের যে জীবন ছিল, দ্বিতীয় পঁচিশে তার অনেকটাই বদলে যায়, আর তৃতীয় পঁচিশের সূচনা লগ্নে এসে আমি আমার প্রথম পঁচিশকে খুঁজে পাই না।
আমার সন্তানেরা, যারা প্রথম প্রজন্মের জীবনকাল পার হচ্ছে, আমি তাদের চেয়ে অনেক ভাগ্যবান। ভাগ্যবান এ অর্থে যে, তারা প্রযুক্তির যে জায়গাটিতে জন্মের পর থেকে পরিচিত হয়ে উঠছে, আমাদের আমি তাদের সাথে সাথে সে জায়গাটিতেই বসবাস করছি। কিন্তু আমি তাদের আগের আরো এক প্রজন্মের অভিজ্ঞতা নিয়ে বড় হয়েছি, এটাই আমার ভাগ্য। যে যুগটাকে আমরা ‘এনালগ’ যুগ বলতাম, সে যুগটা ছিল সনাতনী অনেক কিছুর চেয়ে অনেক আধুনিক। আমরা টাইপ রাইটারে লিখতে পারতাম, টরেটক্কা দিয়ে টেলিগ্রাফ করতে পারতাম, দিন আর রাত ছিল আলাদ আলাদা। আমাদের শহর ছিল, গঞ্জ ছিল, গ্রাম ছিলÑ সব আলাদা আলাদা। কিন্তু এখন সবকিছু মিলেমিশে ‘ডিজিটাল’ যুগে লুটোপুটো খাই।
এই ডিজিটাল যুগে এসে মানুষে মানুষে ভাব আদান প্রদানের ভাষা পরিবর্তন হয়ে গেছে। মানুষ প্রকৃতিকে বোঝার জন্য প্রকৃতির কাছে না গিয়ে তাকে ঘরের ভেতর নিয়ে আসতে চাইছে এবং কোথাও কোথাও পারছে।
প্রজন্মের এই পরিবর্তনের সময়টুকুতে আমি অনেক জায়গায় বোবা হয়ে থাকি, কোথাও কালা বা অন্ধ। অনেক কিছু দেখেও কিছু বলতে পারি না, অনেক কথাই না শোনার চেষ্টা করি কিছু কিছু জিনিস দেখেও দেখি না, কিংবা দেখিও না।। এবং একসময় এটুকু যখন বুঝি, আমিও বড় হয়ে গিয়েছি এবং অপর প্রজন্ম থেকে আমার মধ্যে ব্যবধান দেখা দিয়েছে। এই ব্যবধানই কি তবে প্রজন্মের ব্যবধান? আমি আমার পিতামহ দেখেছি, আমার পিতাকে দেখেছি। আমার পিতা এবং তার পিতামহের মধ্যে বাহ্যিক ব্যবধানের তেমন কিছু ছিল না তারা জন্মের থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একই পরিবেশ দেখে বড় হয়েছেন। প্রকৃতি তাদেরকে আলাদা করেনি। কিন্তু বিগত ৩০-৪০ বছর ধরে বিশ^ায়ন ও প্রকৃতি যেভাবে নিজেকে ভেঙ্গেচুরে নতুন করে গড়ছে, সেখানে এসে আমি আমার প্রজন্ম থেকে ক্রমশই আলাদা হয়ে যাচ্ছি।
আশার কথা, যে প্রজন্ম থেকে আমার খানিক দূরত্ব তৈরী হচ্ছিলো বা হতে পারতো, তার বেশি হয় না, এ কারণে যে, প্রযুক্তির বিকাশের সূচনা লগ্নের ক্ষণটুকুতে আমিও পরিচিত হয়ে যাচ্ছি। সুতরাং আমি যদি সন্ধিক্ষণের প্রজন্ম হয়ে থাকি, তবে তা তো আমারই লাভের। আমি এটা উপভোগ করছি। কিন্তু আতংকিত হচ্ছি, আমার পরবর্তী প্রজন্মের জন্য, যাদের সাথে এই বিশ^ায়নের প্রকৃতি আমার একটা দূরত্ব তৈরী করে দিচ্ছে।
আমার কাছে তাই সংকটটি মনে হচ্ছে প্রজন্মের ব্যবধান। কখনো কখনো এই প্রজন্মকেও আমার কাছে অপরিচিত মনে হয়, যেটা আমার আগের দুই প্রজন্মের সাথে আমার ছিল না।
নতুন নতুন কারিগরি দিকগুলো হাতের নাগালের মধ্যে চলে আসার কারণে বয়সের আগে বয়েসী জিনিসপত্রের সাথে কম বয়সে পরিচিত হয়ে যাওয়াটা একটা বড় সংকটের কারণ ছিল। একটা সময় ছিল গুরুমুখী বিদ্যার। কেবল গুরুগৃহে গেলেই মানুষ শিক্ষালাভ করতে পারতো। গুরুর দেযা আদর্শবাণীকে পাথেয় করে মানুষের জীবনাচরণ হতো। গুরুমুখী শিক্ষাটাই পরে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় রূপ লাভ করে। এখানে শিশুকালটাকে মানুষের জ্ঞানার্জনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাল বলে মনে করা হতো। এখনো হয়। একজন শিশু তাঁর জন্মের প্রথম ৬ বছরের মধ্যে জগতের সকল কৌতুহল নিবৃত্ত করতে করতে তাকে শেখানো হয আচার, কানুন, ভাল-মন্দ বিচারের জিনিস।
প্রতিষ্ঠান হিসেবে একটা শিশুর কাছে স্কুল-কলেজের আগে তার পরিবারটি গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে। পরিবার ও পরিবশে থেকে সে শেখে। মানুষের চারপাশে যা কিছু থাকে তা নিয়ে তার পরিবেশ এবং এই পরিবেশের শিক্ষাটা তাকে কেউ তেমন শেখায় না, সে দেখে দেখে, শুনে শুনে শেখে। এই বৈশি^ক জাগরণের যুগে আজকালের শিশুরা তার পরিবেশের প্রধান উপকরণ হিসেবে ডিজিটাল ডিভাইস নিয়ে বড় হচ্ছে। তার তাকে জাত-পাত, ধর্ম-অধর্ম এগুলো থাকে এবং বলতে দ্বিধা নেই, সে যা কিছু হাতের কাছে পাচ্ছে, তার সবই তথাকথিত ‘উন্নত’ বিশে^র যার অনেক কিছুর সাথে আমি যা কিছু ছোটবেলা থেকে দেখে এবং শেখে বড় হয়েছি, তার সাথে সাংঘর্ষিক। আমারয় মনে হয়েছে সংকটের সূচনা সেখান থেকেই।
আমাদের গৃহসংস্কৃতি বদলে যাচ্ছে। আমাদের গুরুমুখী শিক্ষা শেষ হয়ে যাচ্ছে, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মরা সাইবার সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠছে। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সম্মান দেখানোর কায়দাকানুন ধীর ধীরে পরিবর্তীত হয়ে যাচ্ছে। একসময় যা আধুনিক বা অত্যাধুনিক ছিল, আজ তার অনেক কিছুই গতানুগতিক হয়ে গেছে। আগামীর জন্য যা কিছু আধুনিক হবে বা আধুনিক উত্তর হবে, তার কিছুউ এখন আর আঁচ করা যাচ্ছে না।
মানুষ হিসেবে আমাদের বেঁচে থাকার স্বার্থকতাটুকু বঝতে না পারলে জীবনটাই অনেকাংশে বৃথা হয়ে যায়। আজ আমরা জীবন ধারণের যেসকল সুযোগ সুবিধা উপভোগ করছি, তা মানুষ বিগত অন্তত: দশ হাজার বছর ধরে ধীরে ধীরে করে এ অবস্থানে নিয়ে এসেছে। যিনি একসময় একটি পা রেখে জঙ্গলের ভেতর পদরেখা চিহ্নিত করে দিয়েছিলেন, পরের কয়েক প্রজন্ম পরে হযতো সেই পথে মহাসড়ক হয়েছে। এটা ধীরে ধীরে হয়েছে। মানুষ মানুষের কল্যাণের জন্য জীবনের পদরেখা এঁকে গেছেন। আবিষ্কার করেছেন, শিখিয়েছেন। এবং তার সকল কিছুর মূলেই ছিল মানুষের উপকার করা। বেঁচে থাকা একজন মানুষ যখন তার জীবনের সামান্যতম অংশও ব্যবহার করে অপর মানুষের বা পরবর্তীকালের মানুষের উপকারে আসবে এমন কিছু করার সূচনা করতে পারে, তখনই সেও এই বিশ^কে বাসযোগ্য করার কাজে অংশগ্রহণ করে গেলো। আর এটুকু করার জন্য দরকার তার অতীত থেকে শিক্ষা নেয়া, পরিবেশ থেকে শিক্ষা নেয়া।
মানুষ তার জীবনের প্রথমভাগে অনেক বিচারবুদ্ধিহীন হয়ে থাকে। ধীরে ধীরে তার বয়স বাড়ার সাথে সাথে সে ভাল-মন্দ আলাদা করতে পারে। বুদ্ধিমানরা দেখে বা শুনেই শিখে ফেলে। বোকারা ধরা খেয়ে শেখে। এবং একসময় যখন তার এই জ্ঞান হয়, তখন হয়তো তার আর ফেরত যাবার সুযোগ থাকে না, সংশোধনের সুযোগও সে পায় না। সুতরাং জীবনকে অর্থবহ করতে হলে, নিজের কাজ দিয়ে এই বিশ^কে বাসযোগ্য করা। এবং অপর মানুষের জন্য উপকারী কিছু করে যাওয়ার চেষ্টাই আসলে একজন মানুষকে তার স্বার্থক জীবন দেয়।
আমাদের সামনে দিয়ে যে প্রজন্ম বেড়ে উঠছে তাদের প্রত্যেকের কর্ম আয়ূ আগের দিনের মানুষের চেয়ে কয়েকগুণ বেশী। কারন যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্রমশঃ উন্নত হয়ে যাবার পর থেকে মানুষ অল্প সময়ে এখন অনেক বেশি কাজ করতে পারে। প্রযুক্তির এই সুবিধাটুকু কাজে লাগালে তখন জীবন ও জগতের কল্যানের জন্য অনেক বেশি সময় দেয়া যাবে। এবং এসবের সবকিছুর সূচনা করা যাবে যদি মানুষ মানুষকে ভালোবাসতে, আদর করতে, শাসন করতে আর সম্মাণ করতে শেখে। যারাই সম্মান করতে জানে তাঁরাই সম্মান পায়। আর সম্মান করতে পারলেই নিজের ভেতর ভাল মানুষটি বেরিয়ে আসে, মানুষ তখন অনেক মানবিক হয় আর প্রযুক্তি তখন কেবল সৃষ্টির নেশায় উন্মুখ হবে।

র‍্যাব ফোর্সেস-এর ১৬তম বর্ষপূর্তিতে প্রকাশিত । প্রকাশকাল ২৬ মার্চ ২০২০
মন্তব্য
Loading...