আমার ভ্রমণকথা

২০১২ সালের 'হে সম্মেলন'-এ উপস্থাপিত বক্তৃতার বাংলা অনুবাদ

 

আমার বাবা ছিলেন নাবিক। ১৯৮৫ সালে, ৪৮ বছর বয়সে তিনি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। তখন আমার বয়স কুড়ি।

আমার কৈশোরে জাহাজ ফেরত বাবার কাছ থেকে নানা দেশের, নানা জাতের মানুষের অনেক রোমাঞ্চকর গল্প শুনে আমারও সেসব দেশে যাওয়ার ইচ্ছা হয়েছিল। ১৯৮৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিক শেষে আমার নাবিক হওয়ার সুযোগ আসে, কিন্তু বাবা বাধ সাধলেন, আমার নাবিক হওয়ার আশা আকাক্ষা ধুলিস্বাত হয়ে গেলো।

 

আমি যখন ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের একাদশ বর্ষের ছাত্র তখন একবার শিক্ষা সফরে ৫দিনের জন্য সিলেট এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়, এ নিয়ে কলেজের বাংলা সাহিত্য সাময়িকী প্রবাহ-তে একটা লেখা জমা দেই। এটাই ছিলো আমার লেখা প্রথম কোনো ভ্রমণকাহিনী।

 

১৯৮৬ সালে আমি বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগে ভর্তি হলাম এবং বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লেখা শুরু করলাম। পত্রিকার লেখার সাথে ছবি দেয়ার কারনে এ সময়টাতেই আলোকচিত্রের প্রতি আমার ভালোবাসা জন্মে। আমি ফটোগ্রাফি শেখার চেষ্টা করি। ছবি তুলে কিছু পুরষ্কারও পেয়ে যাই।

১৯৯০ সালে কলকাতার তিনশো বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক স্থাপত্য সম্মেলনে যোগ দিতে প্রথম দেশের বাইরে যাই। সেটাই ছিল আমার প্রথম বিদেশ সফর। এ নিয়ে আনন্দবাজারে ৪৫ মিনিট শিরোনামে একটা ভ্রমণগদ্য লিখি। ছাপা হয় ১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, পাক্ষিক অনন্যায়। এটাই ছিলো প্ত্রিকায় প্রকাশিত আমার প্রথম কোন ভ্রমণ বিষয়ক লেখা।

 

১৯৯৩ সালে আমি স্থাপত্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করলাম কিন্তু আমার ফটোগ্রাফি এবং লেখালেখির অভ্যেসটা রয়েই গেলো। জীবণের বাস্তবতা উপলদ্ধি করে একজন প্রফেশনাল স্থপতি হিসেবে একটি  স্থাপত্য বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললাম এবং নিজেকে সেখানে ব্যস্ত রাখলাম।

আমার অর্থনৈতিক অবস্থা কিছুটা থিতু হলে অনেকদিন আগে নিজের মধ্যে প্রোথিত বীজটা মহিরুহ হয়ে উঠলো। আমি বেরিয়ে পড়লাম পৃথিবীর পথে।

১৯৯৫ সালে, আমার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীকে নিয়ে ভারতের পথে বেরুলাম। দিল্লী, আগ্রা, ফতেপুর সিক্রি এবং জয়পুরে মুঘল শাষকদের যে সব অনবদ্য ঐতিহাসিক নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সে ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখার মাধ্যমে আমার বড় ধরনের ভ্রমনের অভিষেক ঘটে।

এ বছরই ভারতের চন্ডিগড়ে আর্কিটেকচারাল কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হলে আরেকটা সুযোগ ঘটে শিমলা, কুলু আর মানালির অপরুপ ভুমিরুপ আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দর্শনের। দিল্লী যাবার পথে নেপালটাও দেখে যাই ২ দিনের জন্য।

১৯৯৮ সালে সুযোগ আসে ২ সপ্তাহের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের আরব আমিরাতের মরুরাজ্যগুলো দেখায় ।

দেশ তিনটি ভ্রমন শেষে বেশ কিছু জিনিস আমার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। এই তিন দেশের জলবায়ু এবং সংস্কৃতিগত পার্থক্যের কারনে মানুষের পোশাক পরিচ্ছদ এবং দালানকোঠা আলাদা। আমি যে জিনিসগুলো দেখলাম এবং খুজে পেলাম তা অন্যদের সাথে ভাগাভাগি করতে চাইলাম, সে কারনে ১৯৯৯ সালে আমার তোলা ছবিগুলো দিয়ে একটি প্রদর্শনী করলাম এবং নাম দিলাম  ট্রাভেলার্স ক্লিকস। এটা ছিলো আমার দ্বিতীয় একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী যেটাতে আমি ভুমিরুপ, ধর্ম এবং জলবায়ুগত কারনে মানুষের জীবনাচার এবং স্থাপত্যকর্মের মধ্যে যে ভিন্নতাটুকু হয়ে থাকে, তা-ই তুলে ধরেতে চেয়েছি।

এর সাথেই আমি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় আমিরাতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লিখা শুরু করি। ২০০৩ সালে ‘আমিরাতে তেরো রাত’  নামে সংযুক্ত আরব আমিরাত ভ্রমনের উপরে একটি বইও লিখে ফেললাম। সেটাই ছিলো আমার প্রথম প্রকাশিত ভ্রমণ কাহিনী।

২০০১ সালের জানুয়ারী মাসে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমন করি। এই ভ্রমনটা আমার ভ্রমন কাহিনি লেখা ও ভ্রমনচিত্র তৈরীতে গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা পালন করে। আমেরিকা যাবার আগের দিন আমি একটি ভিডিও ক্যামেরা ভাড়া করেছিলাম। যাত্রা পথেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমি যা দেখবো তা এই ভিডিও ক্যামেরায় ধারণ করবো। যে সব বাংলাদেশী অভিবাসি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছে তারা কেনো ওখানে আছে, তারা কেমন আছে, কি করছে এটা গভীর ভাবে জানতে বুঝতে এবং দেখতে আমি উদগ্রিব ছিলাম।

যুক্তরাষ্ট্রের ৮ টা প্রদেশে ৩৫ দিন ভ্রমন শেষে আমি দেশে ফিরে আসি। আমি যখন ফিরে আসি তখন আমার হাতে ২১ ঘন্টার ভিডিও ফুটেজ এবং একটি নোট বই, যেটাতে আমি আমেরিকাতে যে সব মানুষের সাথে কথা বলেছি সে সব কথা বার্তার ফিরিসি- লেখা। পরবর্র্তীতে আমি এইসব কাহিনি বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় নিয়মিত লিখতে থাকি এবং পরবর্তীতে আমার দ্বিতীয় ভ্রমন কাহিনি ‘আমেরিকা কাছের মানুষ দূরের মানুষ’নামক ভ্রমণ কাহিনীতে তা সংকলিত হয়।২০০৮ সালে এই বইটিও প্রকাশ করে উৎস প্রকাশনী।

দুই বছর পরে ২০০৩ সালে আমি চিলিতে একটা আন্তর্জাতিক স্থাপত্য সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলাম। সেবার চিলির যাত্রাপথেই আমি ও আমার সঙ্গীরা স্থাপত্য এবং ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপুর্ন ইউরোপের তিনটি দেশ ও ভ্রমণ করেছিলাম। শহর তিনটি হলো গ্রিসের এথেন্স, ফ্রান্সের প্যারিস আর জার্মানির বার্লিন। এই শহরগুলো ঘুরতে ঘুরতেই মনে হলো আমরা যেনো সেই যাযাবর পর্যটকে পরিণত হয়ে গেছি। এ যাত্রায় আমি দুটো ভ্রমন কাহিনি লিখি। ইউরোপের তিনটি শহর নিয়ে, সক্রেটিসের বাড়ি এবং দক্ষীন আমেরিকার চিলি নিয়ে পাবলো নেরুদার দেশে’।

আদিকালের জ্ঞানীগুনী দার্শনিকের জন্মভিটা এথেন্স, শিল্প এবং যাদুঘরের শহর প্যারিস, বার্লিনের প্রাচীন এবং আধুনিক স্থাপত্যের সংমিশ্রন ‘সক্রেটিসের বাড়ি’ বইটিতে বর্ণিত হয়েছে। অন্যদিকে প্রকৃতি, জনগন, স্থাপত্য এবং নোবেল বিজয়ী বিশ্বনন্দিত কুটনৈতিক-রাজনীতিবিদ এবং প্রেম ও বিপ্লবের কবি পাবলো নেরুদার বাড়িঘরই ‘পাবলো নেরুদার দেশে’ বইটির প্রতিপাদ্য বিষয়।

২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে আমি বিশাল চীনের ভু-ভাগ, মালেয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভারতের আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ, ভিয়েতনাম, ইংল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ড সফর করি।

মালেয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরে আমার পারিবারিক ভ্রমনের উপরে ‘মালয় থেকে সিংহপুরী’ নামে একটি বই লিখি।

ভিয়েতনাম ভ্রমনের উপরে আমার লিখিত ভ্রমনকাহিনি ‘হো চি মিনের দেশে’তে আমি মর্মান্তিক যুদ্ধক্ষেত্র এবং যুদ্ধপরবর্তী সাইগনের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উপরে আলোকপাত করেছি।

আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন আমার ভ্রমণ কাহিনি ‘কালাপানি’তে বর্নিত হয়েছে তেমনি আমি খুজে ফেরার চেষ্টা করেছি সেলুলার জেল, রস আইল্যান্ড আর ভাইপার আইল্যান্ডের ইতিহাস ঐতিহ্য। এই দীপপুঞ্জে এখনও অনেক আদিবাসীরা বসবাস করছেন তাদের উৎস খুজতেও আমি  হেটেছি অনেকটা পথ।

ইংল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ডের কিছু অংশের ভ্রমণবৃত্তানত্ম বর্ণনা করেছি আমার ‘নদীর নাম টে’ ভ্রমনকাহিনীতে। বইটিতে আমি মুলত ঐতিহাসিক শহর ডান্ডি, সেন্ট এন্ড্রোজ, এডিনবার্গ, ওক্সফোর্ড এবং নিউ ক্যাসেল আপন টাইন শহরগুলোকে আলোকপাত করেছি।

২০১১ সালে এ পর্যন- প্রকাশিত ৮টি ভ্রমণ কাহিনীর একটি সংকলন প্রকাশিত হয়। তার নাম অষ্ট ভ্রমণ। তদানিন্তন পর্যটন মন্ত্রী এই বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন। একই অনুষ্ঠানে আমাদের পঞ্চ পর্যটক দলটির আত্মপ্রকাশ ঘটে।

আমি এবং আমার ভ্রমন দলের কাছে ২০০৯ সালটা উল্লেখ করার মতো বছর। এ বছরে আমরা তিনটা মহাদেশের দুইটা দেশ ভ্রমণ করি। ঐতিহাসিক ভাবেই দেশদুটি অনেক বিখ্যাত। মিশর বিশ্ব সভ্যতা এবং স্থাপত্যের ৭০০০ হাজার বছরের ফসিল টেনে বেড়াচ্ছে আর তুরস্কের ইসতা্মবুল মধ্যযুগ থেকে ৬০০ বছরের পুরাতন সুলতানি আমলের ইসলামি স্থাপত্য কর্মগুলো বুকে ধারন করে আছে। ইসত্মাম্বুল শহরটা ইউরোপ এবং এশিয়া মহাদেশকে দুভাগ করে দাড়িয়ে আছে। সুলতানি আমলের সব ঐতিহাসিক স্থান  আর স্থাপনার মধ্যে সুলতানদের বাধানিষেধ ছাড়া ঘুরে বেড়ানো সত্যিই এক অন্যরকম অনুভুতি। আরো অভিভুত হলাম যখন দেখলাম আধুনিক গনতান্ত্রিক ব্যবস্থার আওতায় তুরস্ক কতোটা এগিয়ে গেছে। এসব অভিজ্ঞতাই বর্ণিত হয়েছে আমার ‘সুলতানের শহর’ নামক ভ্রমনকাহিনীটিতে।

২০১০ সালে আমি ও আমার পঞ্চপর্যটক দল শ্রীলঙ্কায় একটি  স্থাপত্য সম্মেলনে অংশগ্রহন করেছিলাম। সম্মেলনের অংশ হিসেবেই আমরা শ্রীলঙ্কার কিছু প্রাচীন ঐতিহ্যিক জায়গা ভ্রমণ করেছিলাম। যদিও আমাদের ভ্রমণটা ছিলো প্রাচীন ঐতিহ্য আর পরিবেশ বান্ধব স্থাপত্যকর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ তথাপিও আমি সারাক্ষণই অনুভব করেছিলাম আমাদের বিখ্যাত কবি জীবনানন্দ দাশকে। তিনি তার বনলতা সেন কবিতার ভ্রমন শুরু করেছিলেন শ্রীলঙ্কা থেকেই। সে কারনেই আমি আমার এই ভ্রমনকাহিনীটির নাম দিয়েছিলাম ‘সিংহল সমুদ্র থেকে’।

আমার সর্বশেষ ভ্রমনকাহিনী ‘লেস ওয়ালেসার দেশে’ ২০১১ সালের পোল্যন্ড ভ্রমনের ফল এই বইটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ আর সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে দেশটি দারিদ্র ঘুচিয়ে কত তাড়াতাড়ি ধনতান্ত্রিক বিশ্বের দিকে যাচেছ এটাই এই বইটিতে বর্ণিত হয়েছে।

এই হচ্ছে আমার এ পর্যন্ত প্রকাশিত মোট বারোটি ভ্রমণকাহিনী।

এখন আমার লেখার টেবিলে চীন, মিশর, সুইডেন, প্রাগ এবং সালসবার্গ, আশা করছি অদুর ভবিষ্যতেই বইগুলো প্রকাশিত হবে।

এটা আমার বিশ্বাস, স্থাপত্যর ছাত্র হিসেবে আমার শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ আমাকে আমার এইসব ভ্রমণকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে দেখতে এবং বর্ণনা করতে উৎসাহিত করেছে। আমাদের শ্রেণীকক্ষে পঠিত স্যার বেনিস্টার ফ্লেচার এর হিস্ট্রি অব আর্কিটেকচার বইটির কথা মনে পড়ছে। এক সময় পরীক্ষা পাশের জন্য এ বইয়ের যে সকল স’াপনার পুংখানুপুংখু বর্ণনা মুখস- করতে হয়েছিল, এখন সে সব যখন চোখের সামনেই ভেসে ওঠে তখন আমার শিহরণ বোধ অনেক বেড়ে যায়। তার প্রভাব আমার লেখাতেও আসে।

সে কারনেই ইংল্যান্ডের সেই প্রাগৌতিহাসিক বিষ্ময়কর স্থাপনা স্টোনহেঞ্জ, লুক্সরের কার্নাক টেম্পল, মিশরের বিখ্যাত গিজার পিরামিড, এথেন্সের এক্রোপলিস, ইসত্মাম্বুলের হাজিয়া সেফিয়া অথবা যুক্তরাষ্ট্রের এরিজোনার গ্রান্ড ক্যানিয়ন, চীনের প্রাচীর বা কুনমিং এর স্টোনফরেস্ট এসব জায়গাগুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে আমি অনেক বেশী ইতিহাস নির্ভও হয়ে পড়ি। আমার বাহ্যিক চোখ দিয়ে দেখা আর যান্ত্রিক চক্ষু দিয়ে ধারণ করা এই সকল বিষয় আমি লেখা ও প্রামাণ্যচিত্রগুলোর মাধ্যমে প্রকাশ করি। প্রায় দেড় শতাধিক প্রামান্যচিত্র তৈরী হয়েছে এভাবে, লেখা হয়েছে১২টি গ্রন্থ।

আমি বিশ্বাস করি, আমার দেখা ও পর্যবেক্ষনকে আমি আমার ভ্রমণচিত্র অনুষ্ঠানের দর্শক বা ভ্রমণ কাহিনীর পাঠকের সাথে এভাবেই ভাগাভাগি করতে আনন্দ পাই।

 ২০১২ সালের ১৬ নভেম্বর বাংলা একাডেমীতে অনুষ্ঠিত ‘হে সম্মেলন’-এ লেখক কতৃক উপস্সথাপিত গু ঞৎধাবষড়মঁবং শিরোনামের উপস'াপনার বঙ্গানুবাদ। অনুবাদ - রফিকুল ইসলাম পল্টু)
মন্তব্য
Loading...