ওশেনিয়া ট্যুর ২০১৯

আলোকচিত্রে ভ্রমণগল্প

২০১৯ সালের ১৪ নভেম্বর রাত থেকে ৫ ডিসেম্বর ভোর পর্যন্ত পঞ্চপর্যটক সস্ত্রীক তিনটি দেশের ৮ টি শহর সফর করে। তার আলোকচিত্রগল্প এখানে প্রকাশ হলো। আশা করি ছবি দেখিয়েই ভ্রমনের গল্প বলা হয়ে যাবে, তাহলে আর বই লেখা লাগবে না ।

২০১৯ সালের নভেম্বরে তিন সপ্তাহের জন্য বেরিয়েছিলাম দু’টো বড় ও বৈচিত্রময় দেশ দেখার জন্য। নানা কারনে এ সফরটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারন ২০০১ সাল থেকে পঞ্চপর্যটকের যে দল নয়বারে আঠারোটার মতো দেশ দেখে ঘরে ফিরে এসে যে গৃহস্থালীকলহের মুখোমুখি হতো, এবার তার সুযোগ নাই। এবার সবার ডাবল ব্যাগেজ। সবাই বৌ নিয়ে বেরিয়েছে আস্ত মহাদেশ দেখতে।

দীর্ঘদিন নানা দেশ ঘুরে আমি এটুকু বুঝেছি যে, কোন জায়গাটা দেখা হছে বা কোথায় বসে খাওয়া হচ্ছে এর চেয়েও বড় বিষয় হচ্ছে – তুমি কার সাথে দেখছো, আর কাকে নিয়ে দেখছো।

১৪ নভেম্বর ২০১৯। ঢাকা বিমানবন্দরে সস্ত্রীক পঞ্চপর্যটকের দল সিঙ্গাপুরগামি উড়ালের অপেক্ষায়

একসাথে ঘুরে বেড়ানোর আরো অনেক সুবিধা অসুবিধা আছে। তিন দিন পর থেকেই এক জনের আসল চেহারা বেরিয়ে আসতে শুরু হয়। মোটামুটি সাত দিন পুরোটা সময় একসাথে কাটালে তাঁর সম্পর্কে আর কোন প্রশ্নই করা লাগবে না, তাঁর স্বভাব এবং চরিত্রের সবটুকু প্রকাশ হয়ে যাবেই। আর এই ব্রত পালন করতেই বোধ হয় পঞ্চাশোর্দ্ধ ৫ তরুনীকে নিয়ে মধ্যে পঞ্চাশের ৫ প্রৌঢ়র সফর ছিলো এই অস্ট্রেলিয়া-পিএনজি ঘোরা।

সিঙ্গাপুর বিমানবন্দরের ট্রাঞ্জিট লাউঞ্জে

অস্ট্রেলিয়া তো আর দেশ না, মহাদেশ। এক  এক করে গোটা পঞ্চাশেক বাংলাদেশ যোগ করলে হয়তো একটা অস্ট্রেলিয়া পাওয়া যাবে। আর বাংলাদেশের চেয়ে মাত্র তিনগুণ বড় দ্বীপরাজ্য পাপুয়া নিউ গিনি- যেখানে প্রতি বর্গমাইলে যে লোকেরা বাস করে তা বাংলাদেশের প্রায় ষাট ভাগের এক ভাগ।

অস্ট্রেলিয়ার ব্রিজবেন  থেকে শুরু হয়েছিলা আমাদের সফর, শেষও হয় অস্ট্রেলিয়ার সিডনি দিয়ে। মাঝখানে চার রাতের জন্য আমরা ভিড়েছিলাম বিস্ময়কর এক দ্বীপরাজ্য পাপুয়া নিউ গিনির রাজধানী পোর্ট মর্সবিতে।

ব্রিজবেন নেমেই ৪ খানা গাড়ি নিয়ে হাজির হয়ে যায় ৪ ক্যাডেট ভাই। এঁদের সাথে যোগাযোগ ফেইসবুকে । কেউই ব্যক্তিগত ভাবে চেনা নয় । কিন্তু সমস্যা হয় না। তাঁদের আন্তরিক আতিথেয়তায় একরাত কাটাই আমরা ব্রিজবেনে।

১৬ নভেম্বর, ২০১৯। বিমানে উঠে আমার ডায়েরিতে লিখি –

কাল মাত্র এসেছি ব্রিজবেনে। রাতটা ভালো করে ঘুমানোর ফুরসত পেলাম না। শরীরের ঘড়ি আর অস্ট্রেলিয় ঘড়ি অনেক তফাতের। দেশ ছেড়ে যখনই পূবের দিকে গিয়েছি, সময় হারিয়েছি শুধু। পশ্চিমে গেলে সময় পাওয়া যায় বেশি। এই যেমন ঢাকা ছেড়ে সিঙ্গাপুর এসেই হারিয়ে ফেললাম দুই ঘণ্টা সময় আবার সিঙ্গাপুর থেকে ব্রিজবেন এসে হারালাম আরো দুই ঘণ্টা। এখন রাত সাড়ে আটটায় যখন ব্রিজবেনে বসে ডিনারের জন্য পেট আকুপাকু করে, তখন বুঝতে পারি না, আসলে এটা ছিলো আমাদের বিকেল সাড়ে চারটায় লেট লাঞ্চের জন্য। এর মধ্যে ব্রেকফাস্টের খানা যে কখন লাঞ্চের মধ্যে এসে মিলেমিশে এক হয়ে গেছে টের পেলাম না। রাত দু’টোয় যখন ঘুমাতে গেলাম, চোখ খুব বুঝে আসে না। কারণ শরীরে তখনো ঢাকার ঘড়িতে রাত ১০টা এতো তাড়াতাড়ি ঘুম কি সে নেবে?

সকাল সোয়া নয় টায় আমাদের প্লেন ছাড়ার কথা ব্রিজবেন থেকে। সে হিসাবে দু’ ঘণ্টা আগেও যদি বিমানবন্দরে পৌঁছাতে হয় আমাদের হোটেল ছাড়তে হবে সকাল সাড়ে ছ’টায়, নাস্তাপানি খেয়ে হাত মুখ ধোঁয়ে ফ্রেস হলে ঘুম থেকে উঠতে হবে সকাল সাড়ে পাঁচটায়।

 

ব্রিজবেনে একরাত কাটিয়ে ভোরবেলা পাপুয়া নিউ গিনির পথে রওয়ানা হবার সময়

অস্ট্রেলিয়ার ব্রিজবেন থেকে কান্তাস এয়ার যোগে ছুটছি তার পাশের এক রহস্যজনক দ্বীপরাজ্য পাউয়া নিউ গিনির দিকে। সাড়ে তিন ঘন্টার এ যাত্রার পুরোটাই কাটবে আমাদের প্রশান্ত মহাসাগরের উপর দিয়ে। একটা মহাদেশের মতো দ্বীপ থেকে আরেকটা দ্বীপে আমাদের যাওয়া। কিন্তু যেখানে যাব, সে দেশ সম্পর্কে আমার বিশেষ কোন ধারনা নাই। ধারনা যে আমার একার নাই তা কিন্তু না, আমাদের দলের অপর নয়জনকে এক এক করে জিজ্ঞেস করলাম, বলুন তো- পাউয়া নিউ গিনি কোন মহাদেশে ?

তাঁদের প্রথম চারজনই বল্লেন- আফ্রিকা হতে পারে।

এর পর আর কাউকে জিজ্ঞাস করলাম না।

এই প্লেনে ওয়াই-ফাই আছে বটে, অনেক ডলার দিয়ে কিনতে হয় দেখে কিনলাম না। নেটে সার্চ দিলে নিশ্চয় একটা ভালো জবাব পাওয়া যেতো। কিন্তু আমার মনে হলো, জবাবটা বরং না-ই নেই।

প্রায় তিরিশ বছর ধরে নানা দেশ ঘুরে বেড়াচ্ছি। সময় পেলেই বেরুই। এবারের অস্ট্রেলিয়া সফর নিয়ে ছোয়া হয়ে গেলো এন্টারক্টিকা ছাড়া পৃথিবীর সব মহাদেশ। আগে কোন দেশে বেড়াতে যাওয়ার আগেই অনেক পড়ে যেতাম। তাতে অসুবিধা হতো এই যে, নতুন কিছু দেখে বা শুনে চমক লাগতো না। এখন মনে হয়, না জেনে যাওয়ার মধ্যে পুলকিত হবার সম্ভাবনাটা বেশি থাকে। অল্প জানা বা না জানার মধ্যে রোমাঞ্চটা অনেক বেশি। আগের দিনের এরেঞ্জড ম্যারেজের মতো। বিবাহ বাসরে আয়নায় মুখ দেখবে বর আর কনে। পাশে থেকে কেউ একজন হয়তো জিগ্যেস করবে- বৌকে কেমন লাগলো?

সবাইকে খুশি করার জন্য হলেও সে বলবে সুবহান আল্লাহ! কেউ বলবে- বৌ তো না, যেন সাক্ষাৎ পরি।

থাক, এরেঞ্জড ম্যারেজের গল্প। পাপুয়া নিউগিনির কথা বলি।

এই দেশটার কী কী আছে খুব ভালো জানি না। ইন্টারনেটে কিছু আফ্রিকান কালো চামড়ার মতো মানুষের ছবি দেখেছি খুব উৎসাহ মুখর পোষাকে। আর দেখেছি গা শিউওে ওঠার মতো বিপজ্জনক কিছু ছবি। খুন, ধর্ষন, রাহাজানি, ছিনতাই, এসবের জন্য এই দেশ চ্যাম্পিয়ান। শুধু তাই না, বসবাস যোগ্যতায় পৃথিবীর অনিরাপদ শহরের তালিকায় ঢাকার খুব কাছাকাছি তার অবস্থান। ঢাকা দ্বিতীয় অবস্থানে আছে, আর পোর্ট মোসবি, যে শহরে তিন রাত থাকার জন্য যাবো তার অবস্থান চতুর্থ। গরিবে-গরিবে যেমন, অনিরাপদ-অনিরাপদও ভাই ভাই। সুতরাং খারাপ লাগার কারন নাই। খারাপ শহরও কেমন হয় তা না দেখলে ভালো শহর বুঝবো কী করে !

ব্রিজবেন থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের উপর দিয়ে মাত্র দু হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিতে পারলেই পোর্র্ট মর্সবি। পাপুয়া নিউগিনির রাজধানী। পাপুয়া নিউগিনিকে কেউ তার পুরো নামে ডাকে না। ডাকে পিএনজি নামে, আর তার রাজধানীকে বলে পোম।

আর লেখা হয় নি । নেমে যাই পোর্ট মর্সবি।

পোর্ট মর্সবি বিমান বন্দরের ডিপার্চার গেটে দেখা হয়ে যায় পাপুয়া নিউ গিনির আদিবাসিদের সাথে ।

সমুদ্র দিয়ে ঘেরা এই সোনার দেশটা এখনো নাকি খুব বিখ্যাত সোনার খনির জন্য। কিন্তু বিশ্ব পর্যটকের মুখ ঘুরিয়ে রাখার জন্য আর খুব অল্প সংখ্যক মানুষের সুবিধা দেয়ার জন্য অতি বৃহৎ জনগোস্টিকে অবহেলায় রেখে দেয়া হয়েছে। পশ্চিমা প্রচার মাধ্যমে ছড়ানো আছে এমন খবর যে, বিদেশিদের জন্য এই রাজধানী শহটি নাকি মোটাও নিরাপরদ নয়। ছিনতাই করা এখনকার ছেলেদের প্রধান হবি। এরা কেউ কাজ করতে চায় না। ছিনতাই করে খেতে যায়। কিন্তু তিন দিন নানা রকমের মানুষদের সাথে মিসে দেখেছি- মানুষগুলো সরলপ্রাণ, পরোপকারী, কিছুটা অলস কিন্তু খুবই প্রাণোচ্ছ্বল। স্বভাবের মধ্যে কিঞ্চিত দাসবৃত্তি আছে বলে সাদা চামড়ার, এমনকি আমাদের মতো বাদামি চামড়ার মানুষদের খুব সমীহ করে।

অপরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশ এই দেশের

আমরা যাঁর আতিথেয়তায় পিএনজি গিয়েছি, তিনি ডাক্তার মুনির।

ডাক্তার মুনির দম্পতি আমাদের পাপুয়া নিউ গিনি সফরটাকে রাঙিয়ে তোলেন

একসময়  জাতিসংঘের হয়ে ঢাকা ও কানাডায় স্বাস্থ্যরক্ষা বিষয়ক নানা গ্ররুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। এখন ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে রোটারিয়ানের হয়ে কাজ করছেন এখানে। তিনি বড় কর্তা। তাঁর বিভাগ ম্যালেরিয়া অসুখ। জংগলবাসি এ মানুষগুলোকে হামেশা মশায় কামড়ায়, এঁদের মৃত্যুহার অনেক বেশি। এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যাও এখানে মাত্রাতিরিক্ত। খুব অল্প বয়স থেকেই ছেলেমেয়েরা মেলামেশা শুরু করে। এ নিয়ে তাঁদের খুব কঠিন সংস্কারও নাই।

প্রশান্ত মহাসাগরের চন্দ্রহারাকারের উপকূল ঘেঁষে বেড়ে উঠেছে এর রাজধানী পোর্ট মরসবি। ছবি তুলছেন লাভ্লু ভাই।

দেশের আইন শৃংখলা নিজেদের হাতে। সীমিত পরিসরে পুলিশ ও মিলিটারি ফোর্স এদের আছে, তাও অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা বাহিনী এদের চালায়। বড় বড় লোকেরা প্রাইভেট সিকিউরিটি ফোর্স পালেন। এ রকম প্রায় ৭০ টি এজেন্সি আছে, এরাই লাঠি হাতে, বন্দুক হাতে নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। সারা দেশের পাহাড় জংগল ঘিরেই তারা বাস করছে, কতোগুলো গোত্রে বিভক্ত তারা। সাড়ে আটশো গোত্র আছে এই দেশে এবং প্রায় একই সংখ্যার ভাষা এবং সবই চলমান। কোন একটা দেশে পাড়ায় পাড়ায় মানুষের নিজস্ব ভাষা থাকার মতো ঘটনা এর আগে শুনিনি কোথাও। খোজ নিয়ে জেনেছি, এই দেশে কোন শিল্পকলা একাডেমি নাই, চলচ্চিত্র নির্মাতা নাই, বই মেলা নাই, বইয়ের প্রকাশনা নাই। আছে নিজেদের মতো নাচাগানা। এঁদের স্বাধীনতা দিবসে জঙ্গল থেকে ডেকে আনা হয় শিল্পী। এরা উদোম গায়ে সমুদ্রপাড়ে নাচানাচি করে। গাছের লতাপাতা, শেকড়বাকড় দিয়ে শরীর ঢাকা থাকে। শরীরের কোন অংশ দেখানো নিয়ে তাঁদের কোন সংস্কার কাজ করে না । কেউ জিজ্ঞেস করলে বলে এসব তো প্রকৃতির দান। প্রকৃতি যখন দিয়েছে কেউ দেখলে সমস্যা কী ? নারী পুরুষ সবারইতো আছে ।

কাচা সুপারি নেশাদ্রব্য হিসাবে ব্যবহার হয়

মাত্র তিন দিন থেকে টের পেলাম, এঁদের গ্রামীন মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ঠ আমাদের প্রাচীন গ্রামাঞ্চলএর জীবনযাপন ও রীতিনীতির সাথে খুব মিল আছে। আরো মজার খবর হচ্ছে,  রাজধানীর সবচেয়ে বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর এর মালিক ঢাকা থেকে গিয়েছিলেন ১৯৯০ সালে। সোনা, রূপা আর কাঠ বাদ দিলে গ্রোসারি বাণিজ্যে শীর্ষ ব্যবসায়ীরাই কিন্তু বাঙ্গালী।

পঞ্চপর্যটক ও তাঁদের সঙ্গীদের এমন সমন্বয় খুব কমই হয়েছে

৫ হাজার কিলোমিটারের উপকূলীয় পথ যাঁদের আছে সেখানে দীর্ঘতম সড়কটির দৈর্ঘ ১৮৫ কিলোমিটার মাত্র। এর প্রায় অর্ধেকই কাচা রাস্থা। সুতরাং পাহাড় পাহাড় মাড়িয়ে পায়ে হেঁটে আর নৌকা বা ইঞ্জিন নৌকা ছাড়া এঁদের চলাচলের কোন পথ নাই। মজার ব্যাপার, এই দেশে ৫৫০ টি বিমানবন্দর আছে এবং সেই সব সুবিধাভোগিদের প্রত্যেকের একাধিক নিজস্ব বিমানও আছে। এটা দিয়েই তারা চলাচল করে।

পাপুয়া নিউ গিনির মানুষদের দেখে অবাক হয়েছি, সবাই একই গড়নের। আমার বার বার মনে হয়েছে ডারউইন সাহেব হয়তো এই মানুষদের দেখে প্রথম ধারনা করেছিলেন যে বানর থেকে মানুষের রূপান্তর। পোমের মানুষের সাথে ভয়ে ভয়ে কথা বলেছি এবং টের পেয়েছি যে পুস্তকে লেখা সাবধানী বানীর সব সত্য নয়। বিদেশীরা আমাদের ঢাকার বারিধারায় এসে থাকলে গুলিস্থানে যেমন ভয় পায় বা গুলিস্থান সম্পর্কে যা বলা হয় এটা যেমন সবসময় সত্য নয় আমাদের ক্ষেত্রেও না।

একটা পাহাড়ি অঞ্চল আমরা সারাদিন ঘুরে দেখি

আমাদের অপর হোস্ট আরেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা মোজাম্মেল ভাই একদিন সারাদিন নিয়ে ঘুরলেন তাঁদের সাথে। একটা সুপারী আর এক ডাটা পান খাইয়ে তিনি তাঁদের অন্তরে ঢুকে গেলেন নিমেষে।

পাপুয়া নিউ গিনির সব নাগরিক লোকের প্রথম ভাষা ইংরেজি। বস্তির ছেলেও ইংরেজিতে চ্যাচায়। এঁদের পোষাক দেখে বোঝার উপায় নাই কে কোন পেশার। দেশে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের নিরাপত্তা আমাদের জেলা শহরের ডিসি অফিসের মতো। মোজাম্মেল ভাই বললেন, ওদের প্রধানমন্ত্রী আমাদের দেশের ডিসির চেয়ে ছোট অফিসে অফিস করে। আর নিজে যখন বাজার করতে যাবে বোঝার উপয় নাই, কে চাষী আর কে মন্ত্রী।

এই শহরের অনেক তরণ গাড়ি হাইজ্যেকিং এর সাথে যুক্ত। কাজ নাই, চাকরি নাই। কিছু লোক তাঁদের উপার্জনের পথ বন্ধ করে রেখেছে, তাঁদের শিক্ষিত, কর্মক্ষম হতে দিচ্ছে না, এসব ক্ষোভ এবং হতাশা থেকেই তারা এগুলো করে থাকে। আর যৌন নির্যাতনের মত ঘটনা এখানে অনেক বেশি। ইউ এন ডি পির ডাটাতে আছে,  অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ নারীই কোন না কোন সময় নির্যাতনের শিকার হন। পুরুষেরা অনেক বেশি বহুগামী এবং এ কারনে কুমারি মাতাদের  সংখ্যাও বেশি।

পাপুয়া নিউ গিনির ফলের স্বাদ অতুলনীয়

মুনির ভাই বলেন, এই দেশে কিন্তু বাংলাদেশিদের বিনিয়োগের অনেক সুযোগ আছে। অনেক বেশি দামে এরা পাটজাত দ্রব্য, রেডিমেড গার্মেন্টস, চামড়াজাত দ্রব্য এবং অষুধপাতি কেনে। চীন, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর হচ্ছে এদের বড় সাপ্লাইয়ার। এখানে বাংলাদেশিরাও যোগ দিতে পারে। আর গ্রোসারি এবং ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের বাণিজ্যে বাংলাদেশ যেভাবে এদের মেইন স্ট্রিমে ঢুকে গেছে, অন্য খাতগুলোতেও চাইলে ঢুকে যেতে পারবে।

বিস্ময় কাটাতে না কাটাতেই আমাদের ৪ দিনের সফর শেষ হয়ে আসে। আমরা আবার ফেরত আসি অস্ট্রেলিয়ার বন্দর নগরী ব্রিজবেনে। বিমানবন্দর থেকেই আমরা রওয়ানা দেই গোল্ড কোস্ট।

ব্রিজবেনে এসে অন্য রকমের আয়োজনের মধ্যে পড়ে যাই। একই তারিখে আমেরিকা ও ঢাকা থেকে আরো ৩ জন দলে যোগ দেয়। আমরা ৮ আসনের দুইটা গাড়ি ভাড়া করে ফেলি। আমাদের একজন, লাভলু ভাই গাড়ি চালানোতে মহা আনন্দ পান । আরেকটা গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে ডালাস থেকে আসা মঈন। জিপিএস-এ নির্ভর করে আমরা প্রায় আশি কিলোমিটারের মত পথ, ঘন্টা খানেকে পৌছে যাই। গিয়ে উঠি একেবারের প্রশান্ত মহাসাগরের তীর ঘেষে বেড়ে ওঠা ৭৫ তলা এক হোটেল। ৬৭ তলায় জায়গা হয় আমাদের। এই প্রথম আমার এতো উচ্চতায় পা রাখা।

৬৭ তলার উপর থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে সুর্য ওঠার দৃশ্য দেখা
হোটেলের ৬৫ তলার উপর থেকে গোল্ড কোস্টের সকাল বেলা দেখার আয়োজন।

উপর থেকে দেখি আলো ঝলমলে এই শহর। মাত্র ৪০ বছর হয়েছে এই নতুন শহরের । এর আবহাওয়া আর প্রশান্তমহাসাগরীয় পরিবেশ দেখে এক ডেভেলেপার এই সেদিন, ১৯৭৫ সালে অনুমান করেছিলেন, এটা একটা সোনার উপকূল হবে। হয়েছেও তাই। বিশ্বসেরা কতগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে এখানে, আর আছে ট্যুরিস্ট। রাত বারোটার দিকে একবার দলবল নিয়ে সমুদ্রের তীরে যাই। গিয়ে দেখি মহা হুলুস্থুল।

১২ ক্লাস পড়া যাঁদের শেষ হয়েছে বা বয়স যাঁদের ১৮ হলো, তারা সপ্তাহ দিন ধরে মাস্তি উৎসব করবে। সারা অস্ট্রেলিয়া জুড়েই এটা হয়, তবে এক এক অঞ্চলে দিন ভাগ করা থাকে। গতকাল থেকে শুরু হয়েছে গোল্ড কোস্টের এই উৎসব। এখন তারা দোকেন থেকে আইডি দেখিয়ে নিজেরা সিগারেট কিনতে পারবে, মদের বারে যেতে পারবে এবং নিজের ইচ্ছায় হোটেলে রুমও নিতে পারবে। তরুণ-তরুনীদের স্বাধীনতা দিবস। গোল্ড কোস্টের সমুদ্রে পাড় দিয়ে গান বাজছে আর থোকায় থোকায় উল্লাসী চিৎকার ভেসে আসছে। এখানে যারা আছে তারা দুই ভাগের। এক সার্ভিস প্রভাইডার, যারা নানা জিনিস বিক্রি করছে। আরেক দল সদ্য আঠারো পার হওয়া তরুণ-তরুণী । আমরা কোন দলেই পড়ি না। রাতে ডিনার খেয়ে হোটেলে ঢোকার আগে আমরা ঢুঁ মারি এই বীচে। বাচ্ছাদের হৈ হোল্লূড়ে দেখি পুলিশও সংগ দিচ্ছে, হাত থেকে সেল ফোন ছবি তুলে দিচ্ছে। আমার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে এমিলি আপা আর আরিফ ভাই। এমিলি আপাকে ফিস ফিস করে বলতে শুনি – ঠিকই আমরা এখানে এলাম, বাট একটু দেরীতে, ৩০ বছর দেরি করে এলাম।

আমাদের সাথে এই আড্ডায় যোগ  দিতে ব্রিজবেন থেকে চলে আসে ক্যাডেট ভাইরা। মাঝ রাত বরাবর আমরা আড্ডা দেই প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে।
পঞ্চপর্যটকেরা নারী-পুরুষে ভাগ হয়ে যান ছবি তোলার সময়ে
আহ, কী শান্তি !
বিনে পয়সার মডেলদের দিয়ে যেমন ইচ্ছা সাজিয়ে শ্যুট করার চেষ্টা
গোল্ডকোস্টের দ্বিতীয় ভোরে নাস্তা খেতে চলে যাই ৭৬ তলার উপরের ডেকে। সেখান থেকে শহর আর প্রশান্ত মহাসাগরিয় বেলাভুমি দেখে ব্রিজবেন বিমানবন্দরের দিকে রওয়ানা হই ।
গোল্ডকোস্ট থেকে ব্রিজবেন যাবার পথে কফি বিরতিতে উৎফুল্ল রমনীকূল
ব্রিজবেন ছেড়ে সিডনি  যাবার আগে বাংলাদেশি পর্যটককূল

দু রাত পরে গোল্ডকোস্ট ছেড়ে ব্রিজবেন এসে আমরা উড়ে যাই সিডনি। সেখানে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের গ্লোবাল রিউনিওন।

সিডনি হার্বার দিয়ে সারা দুপুর ঘুরতে ঘুরতে নানা আড্ডা। এ নিয়ে শুরু হয় মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের তিন দিনের গ্লোবাল রিইউনিওন। বামে উল্লসিত মেকার ক্যাডেট, ডানে দুই ফৌজিয়ান

সিডনি অপেরা হাউজের আশ পাশ দিয়ে সিডনি হার্বারে সারাদিন কাটিয়ে পরবর্তি তিন রাতের জন্য আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় সিডনি থেকে ১০০ মাইলের মত দূরে অপর এক উপকূলবর্তি বিশাল রিসোর্টে

রিইউনিওনে আসা ক্যাডেটদের স্ত্রীরা রিসোর্টসংলগ্ন সমুদ্রতীরে জড় হলেন ফটোসেশনের জন্য
রিইউনিওনে অস্ট্রেলিয়ায় বাঙালী মহিলাদের সাজ
সিডনি থেকে ১৫০ মাইল দূরের জাতীয় উদ্যানে দেখা ক্যাঙ্গারুর সাথে সেলফি তোলার পায়তারা
প্যালিকান শো
‘মেকা’র রিইউনিওনে তিন ফৌজিয়ান। চুন্নু ভাই, সাইফুল ও আমি ডানে, বামে আমি আর সাইফুল, সিডনিতে

আমি যদিও মির্জাপুরি নই, কিন্তু এখানে অতিথি হিসাবে আমার রেজিস্ট্রেশন। আমি একা নই ‘মেকা’র রিইউনিওনে তিন ফৌজিয়ান ছিলো। চুন্নু ভাই আর সাইফুল আসে সিডনি থেকে, আমি ঢাকা থেকে । তিনদিন কেটে যায় সেখানে।

পঞ্চাশোর্ধ তরুণতরুণীর উল্লাস

এরপর শুরু হয় আসল পর্যটন। এবার সিডনি বিমানবন্দর থেকে ভাড়া করে নেয়া গাড়ির সাথে নতুন আরেকটা ১২ আসনের গাড়ি ভাড়া করা হয়। আর ওড়াওড়ি না। এবার স্থলপথ দেখা।

সিডনী থেকে মেলবোর্ণ প্রায় ৯ শ কিলোমিটার পথ। টানা গেলে ৯ ঘন্টায় যাবার কথা।

লাভলু ভাইর গাড়ি চালানোতেই আনন্দ।

লাভলু ভাইর গাড়ি চালানোতেই আনন্দ। এই ৯০০ কিলোমিটার পথ কিন্তু একাই টেনে নেন।  পথে দুবার নেমে, চা-কফি-বার্গার-টোস্ট খেয়ে দেয়ে আমরা পৌছি প্রায় বারোঘন্টা পর এবং অনেক বিড়ম্বনা পার হবার পর মেলবোর্ন হারভারের কিনারা ঘেষে এয়ার বিএনবির তিনটি বিল্ডিং এ ৫ টি সার্ভিসড এপার্ট্মেন্ট ২ রাতের জন্য ভাড়া করে থাকা শুরু করি। নভেম্বর মাসেও সিডনির তাপমাত্রা ছিলো বাংলাদেশের মতো, ২২/২৩ ডিগ্রী, ফুরফুরা। মেলবোর্নের এসে টের পাই এখানে ৫-৬ ডিগ্রি কম তাপমাত্রা। এই শীতের রাতে মহা বেরাছেরার মধ্যে পড়ে যাই এই নতুন ধরনের হোটেলে এসে। এখানে নাই কোন রিসেপশন, নাই লবি, নাই ওয়েটার, ম্যানেজার, বেল বয়। লাভলু ভাই একটা গেটে এসে নানা রকম গুতোগুতি করে যোগাড় করলেন পাস ওয়ার্ড। আমাদের ১৪ জনের টিমকে তারা তিন বিল্ডিং এ ৩ বেডের স্যুইট্রুমে দিয়েছে। ক্যাচাল করতে করতে রাত দুইটায় নিজের কামরাই ঠাই হয়।

এয়ার বি এন বির সারভিসড এপার্ট্মেন্টের তালা চাবি পেতে পেতে মেলবোর্নে গভির রাত

সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে আমাদের মন ফুরফুরা হয়ে যায়।

মেলবোর্ন ডকল্যান্ড পাড়ের এপার্ট্মেন্ট থেকে দেখা প্রথম সকাল
এপার্টমেন্ট কামরা থেকে দেখা মেলবোর্নের ডকল্যান্ড

পরদিন আমাদের ট্যুর ম্যানেজমেন্টে নেতৃত্বের বদল ঘটে। নিজেকে নেতা হিসাবে ঘোষনা দেন ইশরাত ইসলাম। তাঁর নির্দেশনামতে আমরা যাই উপকূল বরাবর ঘুরতে। 

সমুদ্রতীর বরাবর টুয়েল্ভ এপস্টল

এবং তা নিয়েই আমরা প্রশান্ত মহাসগীয় উপকূল ঘেষে সাড়ে চার ঘন্টা কোস্টাল  ড্রাইভ মারি, টুয়েল্ভ এপোস্টোলের দেখা পাই এবং পরদিন পৃথিবীর সবচে বাসযোগ শহরটা ঘুরে দেখি।

উল্লসিত তরুনীকূল
জোড়ায় জোড়ায় হাজিরা দিতে থাকেন আমার ক্যামেরায়
এই আড্ডায় শরিক হতে সুদূর আমেরিকা থেকে চলে আসে মঈন, বায়ে আর ডানে দলনেতার সাথে লেখক

মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমরা এসেছি পৃথিবীর ৩য় নিকৃষ্ঠ শহর ঢাকা থেকে, দেখে এসেছি আরেক নিকৃস্ট শহর পোর্ট মর্সবি। পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ ৬ টা শহরের মধ্যে এ দুটো পড়ে , আবার পৃথিবীর সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরের প্রথম  ৬ টির মধ্যে চতুর্থটি সিডনি, দেখে এসেছি আর দ্বিতীয়টি এই মেলবোর্ণ। এবার দেখছি।

লাভলু ভাই আর সোমা আপা এক বেলা একা একা বেরিয়ে যান মেলবর্ন শহর দেখতে

এর আঝে একগে  মেলবর্ন ছিলো সবচে বাসযোগ্য শহর। কিন্তু একটি মাত্র ঘটনা, যেখানে একটি চৈনিক বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রী এক আদীবাসী অস্ট্রেলিও দ্বারা হেনস্থ হয়েছিল বলে তাদের রেটিং এক ধাপ নীচে নেমে যায়।

মাত্র দুই–তিন যুগে কী শহর কী হয়ে গেলো এটা ভাবতে ভাবতে দিন কাটাই।

বসবাসযোগ্যতায় বিশ্বের সেরা শহরটির কিছু সড়ক, ব্রিজ আর ট্রাম

এই প্রথমবারের মতো একটি শহর পেলাম যেখানে শহর কেন্দ্রের চারপাশ দিয়ে চলমান ট্রামে চড়তে কোন টিকিট লাগে না। উঠে গিয়ে ইচ্ছা মত যেকোন জায়গায় নেমে গেলেই হয়।

পেঙ্গুইন দেখার জন্য উদ্গ্রিব দর্শক্কূল

পরদিন বিকেল বেলা আমরা যাই প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে যেখানে পেঙ্গুইনের বাসা ।

বিকেলের আলোয় পেঙ্গুইনপাড়ার জেটি থেকে দেখা মেলবোর্ন শহর

২৮ নভেম্বর ২০১৯। সকাল ১০টার মধ্যে আমরা হোটেল ছেড়ে দেই। বিদায় দেই মেলবোর্ন। আবারও পাশাপাশি দুই গাড়ি নিয়ে আমরা ছুটি ক্যানবেরা, অস্ট্রেলিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী শহরের দিকে।

ক্যানবেরা যেতে যেতে পথে পথে অস্ট্রেলিয় গরু-ছাগল-ভেড়ার পালের সাথে সেলফি তোলা ছিলো বড় বিনোদন

পথে আরেক বড় ভাই ক্যাডেটের বাড়ি সবাই মিলে পেটপুরে খেয়ে ক্যানবেরায় এক রাতের জন্য নেয়া আরেকটা সার্ভিসড এপার্ট্মেন্টে উঠি। পরদিন ঘুম থেকে উঠে আমরা জার্সি পরে ফেলি।

পিপির জার্সি গায়ে পিপিডব্লিউ

ঢাকা থেকে নিয়ে আনার আমাদের পিপির লগো দিয়ে বানানো টিশার্ট পরে ফেলি সবাই, নারীপুরুষ নির্বিশেষে, শুধু মনি ভাবীর দিকে তাকিয়ে ঠিক বোঝা গেলোনা তিনি এটা পরেছেন কী না।

এই প্রথম বারের মতো সত্রীক বিশ্ব ভ্রমণে পঞ্চপর্যটক
ক্যানবেরা শহরের মাস্টার প্ল্যানের প্রদর্শনী

এ শহরের মাস্টারপ্ল্যান আরবান ডিজাইনের ক্লাসে পড়ানো হয়। ১৯২০ সালের দিকে এক আমেরিকান দম্পতী এটা করেছিলেন। এই শহরের স্থাপত্য অধিদপ্তরে কাজ করে আমাদের বছর পাচেকের বড় হুদা ভাই আর রূপা আপা। সারা দিন তারা আমাদের বোঝালেন এই শহরে কেন সবচে উচূ গাছের চেয়ে কোন দালান হতে পারবে না।

পার্লামেন্ট ভবনের সামনের এই পুলিশের সাথে কথা বলে বুঝে ফেললাম, অস্ট্রেলিয়ায় পুলিশ কেন এতো সম্মানের এক পেশা

ক্যানবেরার পার্লামেন্ট হাউজের সামনে এক সশস্র পুলিশ এসে আমার অজমো পকেট ক্যামেরা আর অজমো স্টিক দেখে আমাকে জিজ্ঞেস করে, এটা কী?

আমি বলি, আমার বন্দুক, এটা দিয়ে আমি দৃশ্য শুট করি, তুমি যেমন তোমার ওটা দিয়ে করো।

হেসে ওঠে পুলিশ। এবার নরোম পেয়ে তাঁকে বলি, চলো, আমরা আমাদের দুই গান নিয়ে ছবি তুলি। রাজি শুধু না, দুইবার পোজও দিয়েছে এই পুলিশ।

সাইফুলই আমাকে বলেছিল- এই অস্ট্রেলিয়ায় সবচেয়ে সম্মানের পেশা হচ্ছে পুলিশের। যেকোন পুলিশ মানেই মানুষের বন্ধু, উপকারি। তাঁদের অভিধানে ঘুষ বলে কোন শব্দ নাই, আর যে শব্দটি তারা শুনতে চায় না, তা হচ্ছে – ‘সরি’। ‘নো সরি’ শিরোনামে ভিডিও দেখেছি। অপরাধ করে ফেলা মানে শাস্তির জন্য তৈরি হয়ে যাওয়া। সাইফুলই আমাকে বলেছিল, অস্ট্রেলিয়াতে সবচে বেশি বেতনের সরকারি চাকুরে হচ্ছেন স্কুল শিক্ষকেরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চেয়েও বেশি বেতন তারা পায়, যেকারনে শিক্ষায় তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে।

 

১৪ জনের দলের সাথে হুদা ভাই বায়ে আর ডানে পঞ্চপর্যটক
সংসদ ভবনের অক্ষ বরাবর চিত হয়ে শুয়ে থাকেন এনায়েত ভাই

সারাদিনের পুরা সফরে ট্যুর গাইডের মতো সাথে থেকে পুরা শহরের গল্প শোনান হুদা ভাই।

ক্যানবেরা ছাড়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের এক ক্যান্টিনে লাঞ্চ করি সবাই, বায়ে আর এই শহরে কর্মরত তিন বাংলাদেশি স্থপতি- হুদা ভাই, রূপা আপা আর শেখ লানার সাথে আমি।

শেষ বিকেলে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসটি ঘুরে ঘুরে দেখে সিডনিতে দ্বিতীয়বারের মতো ফেরত যাবার প্রস্তুতি নেই।

ক্যানবেরা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা

২৯ নভেম্বর রাত ৯ টায় আমরা এসে নামি সিডনীর বাঙ্গালীপাড়া লাকা্মবোতে । মূল উদ্দেশ্য রাতের বাংলা খাবার খাওয়া আর বঙ্গবাজারের রূপ দেখা ।

লাকাম্বার বঙ্গবাজার

এখান থেকেবাকি ৩ দিনের সফর আমাদের দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।

সাইফুল-টুঙ্গির সাথে মাঝরাতে সিডনি হারবার এলাকা

খাবার দাবার শেষে আমি দলছাড়া হয়ে যাই। আমাকে তুলে নিয়ে যায় আমার ৪২ বছরের পুরনো বন্ধু সাইফুল আর তাঁর স্ত্রী টুঙ্গি। সাইফুল আর টুঙ্গি অফিস ছুটি নিয়ে রাখে আমাদের জন্য। লাকাম্বাবা থেকে বাসায় ফেরার আগে সিডনি হারবারের রাতের রূপ দেখানো দিয়ে শুরু হয় আমাদের পঞ্চম স্তরের ভ্রমণ।

সাইফুল আমাদের নিয়ে তাঁর বাড়ির কাছের ‘লিটিল বে’ দেখায়, বৃটিশ ও ফরাসীদের আগমনের জায়গাগুলো দেখায়, আদিবাসীদের গল্প শোনায়, বৃটিসদের আধিপত্তবাদের কাহিনী শোনায়।

সাইফুলের বাড়ির বারান্দা থেকে দেখি প্রশান্ত মহাসাগর
লিটিল বে’র পাথুরে সৈকত

সাইফুল আমাদেরকে পর্যটকের ভিড়ভাট্টা কম অথচ ঐতিহাসিকভাবে  গুরুত্বপূর্ণ এমন অনেক জায়গায় নিয়ে যায়।

ফরাসী জাহাজ এখানে এসে নোঙ্গর করেছিল। এই দ্বীপটাই ছিলো ফরাসি ঘাটি

৩০ নভেম্বর। সাইফুল নিয়ে গিয়েছিল সিডনীর কাছাকাছি নীলগিরি দেখাতে। সঙ্গে ছিলো বৌ আর ক্যামেরা।

ব্লু মাউন্টেইন ইকো পার্কে

অর্ধেক দেখেছি দুই ল্যান্সে, বাকি অর্ধেক অন্য ল্যান্সে। তৃতীয় চোখের জিনিস পত্র পরে দেখেও মজা পাওয়া যায়। এই যেমন ৪৫ ডিগ্রি খাড়া যে ট্রেন দিয়ে উপর থেকে নীচে নেমেছিলাম, সেখান থেকে তৃতীয় ল্যান্সে ধারন করা এই দৃশ্যটি সবাইকে দেখানোর জন্য তুলে রাখি।

সেদিন রাতেই সাইফুলের বাসায় বসে ফৌজিয়ান আড্ডা। 

সিডনীতে বসবাসকারী ৪২ বছরের পুরনো বন্ধু সাইফুল আর সলিমুল্লাহ। ডানে আরো দুই ফৌজিয়ান।

এই ট্যুরটা বড় বেশি ক্যাডেটময় ছিল।

অস্ট্রেলিয়ে গিয়েছি মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের  রিইউনিওনে।

ব্রিজবেনে নেমে পেয়ে গেলাম তিন ক্যাডেট কলেজের চারজনকে। মাঝরাত বরাবর তাঁদের খাতির আপ্যায়ন নিয়ে তাঁদের বাড়িতে বাড়তি লাগেজ রেখে আমরা পি এন জি যাই, সে ও এক ক্যাডেটের আমন্ত্রণে। ফিরে এসে আমার মির্জাপুর আর ফৌজদারহাটের ক্যাডেটকের আপ্যায়ণ আর সঙ্গ নিয়ে কাটিয়ে দিলাম পুরা ট্যুর। ফৌজিয়ানরা তাঁদের অস্ট্রেলিও রিইউনিওন ফেললো যখন আমি আছি সিডনিতে। একদিন পুরা আধাবেলা আমরা কাটালাম ফৌজিয়ান মেলায়।

সিডনিতে ফৌজিয়ান রিইউনিওনে

১ ডিসেম্বর সিডনির বাংলা বাজার লাকাম্বাতে আমার জন্য আড্ডায় আয়োজন করলো আবার আমার দুই ক্যাডেট বন্ধু, কবি ও ডাক্তার অধ্যাপক আবুল হাসনাত মিল্টন আর সাইফুল।  অনেক ক্যাডেটের সাথে দেখা হলো। খবর পেয়ে ৪৫ মিনিট গাড়ি চালিয়ে কাজ থেকে জরুরী ছুটি নিয়ে এলেন সাংবাদিক ফজলুল বারী ভাই।

অস্ট্রেলিয়া লিটারেরি সোসাইটি আয়োজিত আড্ডা।
ট্যুরের শেষ দিকে ঘুরাঘুরি শপিংমল কেন্দ্রিক অব্যাহত থাকে দিনের বেলা আর রাতে দাওয়াত খাওয়া ।

২ ডিসেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় সিডনি ছাড়বো। সেদিন আমাদের শিডিউলে কিছু নাই। আমাদের বড় দলটি যাবে কবিতা চাকমা আপার বাসায়, কিন্তু আমি যেতে পারবো না। আমি আর সাঈদ ভাই আজ চলে যাবো সিঙ্গাপুর, এক রাত থাকবো সেখানে , পরদিন বাকি তিন দম্পতি এসে আমাদের সাথে মিলবে সিঙ্গাপুরের ডিপার্চার লাউঞ্জে।

সিডনি প্রবাসি স্থপতি কবিতা চাকমার বাসায় দলের অপর সদস্যরা, যারা ৩ ডিসেম্বর সিডনি ছেড়ে আসবে ।

২ ডিসেম্বর ২০১৯। আজ আমাদের অস্ট্রেলিয়া সফরের শেষ দিন, আজ আমাদের ফ্রি ডে। কোন শিডিউল নাই। আজ টুংগি আমাদের দিন বুক করে রেখেছে। আজ গাড়ির স্টিয়ারিং টুঙ্গির হাতে। সকাল বেলা নাস্তা খাইয়ে আমাদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। আমাদের বেশ কিছু সুন্দর সুন্দর জায়গায় নিয়ে ঘুরে বেড়ালো বেলা ১ টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত।

টুঙ্গি আমাদের নিয়ে আসে স্পিট বীচে
বেলা দেড়টার সিডনি টাওয়ারের উপর থেকে রিভল্ভিং রেস্টুরেন্টে বসে আমরা আহার করি।
সিডনির শেষ দিনের ঘুরাঘুরি

বিকেল ৫ টায় বেরিয়ে যাই সাইফুলের বাসা থেকে। যাবো এয়ারপোর্ট। এর মধ্যে সাদেকের ফোন। ভাই, আপনার ফ্লাইট কখন ?

আমি বলি, এয়ারপোর্ট  যাচ্ছি। সাইফুল নিয়ে যাচ্ছে। আড়াই ঘন্টা পর ফ্লাইট।

সাদেক বলে , ভাই আমি আসছি।

সিডনি এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন শেষ করে ডিপার্চার দিয়ে বেরোতেই  দেখি সাদেক।

কী আশ্চর্য ! বলি, কী ব্যাপার ?

বলে- জাস্ট বিদায় দিতে এলাম। আসেন, এই ডিপার্চার লেখা সাইনবোর্ডের সামনে একটা সেলফি তুলি।

আমি তার মুখের দিকে চেয়ে রই।

বামের ছবি ১৫ নভেম্বর, সাদিকের সাথে ব্রিজবেন বিমানবন্দরে যখন আমাদের নিতে আসে আর ডানের ছবি ২ ডিসেম্বর সিডনি বিমানবন্দরে যখন বিদায় জানাতে এসেছিল সাদিক

এর পরের ঘটনা অন্য কেউ লিখলে ভালো হতো , কারন প্লেন ছাড়ার ১০ মিনিটের মাথায় আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। প্রায় ৪০ মিনিট পর নাকি আমার জ্ঞান ফিরে, সিঙ্গাপুর পর্যন্ত একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার  নাকে চেপে চলে এলাম।

৩ ডিসেম্বর, ২০১৯। শওকতের সাথে সিঙ্গাপুরে সারাবেলা।

সিঙ্গাপুরে  ভোরবেলা নেমে একটা হোটেলে উঠে পড়ি । খানিক জিরানোর পর খবর দিলাম শওকতকে। খবর পেয়ে হোটেলে চলে এলো আরেক ৪২ বছরি বন্ধু শওকত। সে সিঙ্গাপুর দেখানর জন্য ব্যস্ত হয়ে গেলো।

সিঙ্গাপুর, ৩ ডিসেম্বর

তাঁকে জানানো হলো অসুস্থতার কথা। এই শুনে সেও খানিক নিবৃত্ত হলো, কিন্তু সঙ্গ ছাড়লো না।

বামের ছবিতে খোকনের সাথে তাঁর অফিসে আর ডানে , খোকনের বাসার রাতের খাবারের পর

সন্ধায় দেখা হলো খোকনের সাথে। তাঁর নতুন কেনা পেন্থ হাউজে রাতে খেলাম, আড্ডা দিলাম ।

৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ২০ দিনের সফর শেষে, ২১ তম দিনে , এবার যার যার ঘরে ফেরা।

আর পরদিন ৪ ডিসেম্বর বিকেলে সিঙ্গাপুর ছেড়ে  ৫ ডিসেম্বর ফিরে আসি ঢাকা । 

 

 

মন্তব্য
Loading...