মোর্সবির বন্দরে

পাপুয়া নিউ গিনির উপর লিখিতব্য ভ্রমণকাহিনীর সূচনাপর্ব

২০১৯ সালের নভেম্বরে তিন সপ্তাহের জন্য বেরিয়েছিলাম দু’টো বড় ও বৈচিত্রময় দেশ দেখার জন্য। নানা কারনে এ সফরটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারন ২০০১ সাল থেকে পঞ্চপর্যটকের যে দল নয়বারে আঠারোটার মতো দেশ দেখে ঘরে ফিরে এসে যে গৃহস্থালীকলহের মুখোমুখি হতো, এবার তার সুযোগ নাই। এবার সবার ডাবল ব্যাগেজ। সবাই বৌ নিয়ে বেরিয়েছে আস্ত মহাদেশ দেখতে।

১৪ নভেম্বর ২০১৯। ঢাকা বিমানবন্দরে সস্ত্রীক পঞ্চপর্যটকের দল সিঙ্গাপুরগামি উড়ালের অপেক্ষায়

দীর্ঘদিন নানা দেশ ঘুরে আমি এটুকু বুঝেছি যে, কোন জায়গাটা দেখা হছে বা কোথায় বসে খাওয়া হচ্ছে এর চেয়েও বড় বিষয় হচ্ছে – তুমি কার সাথে দেখছো, আর কাকে নিয়ে দেখছো। এবার নতুন ভাবে দেখার সুযোগ।

একসাথে ঘুরে বেড়ানোর আরো অনেক সুবিধা অসুবিধা আছে। তিন দিন পর থেকেই এক জনের আসল চেহারা বেরিয়ে আসতে শুরু হয়। মোটামুটি সাত দিন পুরোটা সময় একসাথে কাটালে তাঁর সম্পর্কে আর কোন প্রশ্নই করা লাগবে না, তাঁর স্বভাব এবং চরিত্রের সবটুকু প্রকাশ হয়ে যাবেই। আর এই ব্রত পালন করতেই বোধহয় পঞ্চাশোর্দ্ধ ৫ তরুনীকে নিয়ে মধ্যে পঞ্চাশের ৫ প্রৌঢ়র সফর ছিলো এই অস্ট্রেলিয়া-পিএনজি ঘোরা।

অস্ট্রেলিয়া তো আর দেশ না, মহাদেশ। এক এক করে গোটা পঞ্চাশেক বাংলাদেশ যোগ করলে হয়তো একটা অস্ট্রেলিয়া পাওয়া যাবে। আর বাংলাদেশের চেয়ে মাত্র তিনগুণ বড় দ্বীপরাজ্য পাপুয়া নিউ গিনি- যেখানে প্রতি বর্গমাইলে যে লোকেরা বাস করে তা বাংলাদেশের প্রায় ষাট ভাগের এক ভাগ।

অস্ট্রেলিয়ার ব্রিজবেন থেকে শুরু হয়েছিলা আমাদের সফর, শেষও হয় অস্ট্রেলিয়ার সিডনি দিয়ে। মাঝখানে চার রাতের জন্য আমরা ভিড়েছিলাম বিস্ময়কর এক দ্বীপরাজ্য পাপুয়া নিউ গিনির রাজধানী পোর্ট মর্সবিতে।

১৬ নভেম্বর, ২০১৯। বিমানে উঠে আমার ডায়েরিতে লিখি – “কাল মাত্র এসেছি ব্রিজবেনে। রাতটা ভালো করে ঘুমানোর ফুরসত পেলাম না। শরীরের ঘড়ি আর অস্ট্রেলিয় ঘড়ি অনেক তফাতের। দেশ ছেড়ে যখনই পূবের দিকে গিয়েছি, সময় হারিয়েছি শুধু। পশ্চিমে গেলে সময় পাওয়া যায় বেশি। এই যেমন ঢাকা ছেড়ে সিঙ্গাপুর এসেই হারিয়ে ফেললাম দুই ঘণ্টা সময় আবার সিঙ্গাপুর থেকে ব্রিজবেন এসে হারালাম আরো দুই ঘণ্টা। এখন রাত সাড়ে আটটায় যখন ব্রিজবেনে বসে ডিনারের জন্য পেট আকুপাকু করে, তখন বুঝতে পারি না, আসলে এটা ছিলো আমাদের বিকেল সাড়ে চারটায় লেট লাঞ্চের জন্য। এর মধ্যে ব্রেকফাস্টের খানা যে কখন লাঞ্চের মধ্যে এসে মিলেমিশে এক হয়ে গেছে টের পেলাম না। রাত দু’টোয় যখন ঘুমাতে গেলাম, চোখ খুব বুঝে আসে না। কারণ শরীরে তখনো ঢাকার ঘড়িতে রাত ১০টা এতো তাড়াতাড়ি ঘুম কি সে নেবে?

সকাল সোয়া নয় টায় আমাদের প্লেন ছাড়ার কথা ব্রিজবেন থেকে। সে হিসাবে দু’ ঘণ্টা আগেও যদি বিমানবন্দরে পৌঁছাতে হয় আমাদের হোটেল ছাড়তে হবে সকাল সাড়ে ছ’টায়, নাস্তাপানি খেয়ে হাত মুখ ধোঁয়ে ফ্রেস হলে ঘুম থেকে উঠতে হবে সকাল সাড়ে পাঁচটায়।

অস্ট্রেলিয়ার ব্রিজবেন থেকে কান্তাস এয়ার যোগে ছুটছি তার পাশের এক রহস্যজনক দ্বীপরাজ্য পাউয়া নিউ গিনির দিকে। সাড়ে তিন ঘন্টার এ যাত্রার পুরোটাই কাটবে আমাদের প্রশান্ত মহাসাগরের উপর দিয়ে। একটা মহাদেশের মতো দ্বীপ থেকে আরেকটা দ্বীপে আমাদের যাওয়া। কিন্তু যেখানে যাব, সে দেশ সম্পর্কে আমার বিশেষ কোন ধারনা নাই। ধারনা যে আমার একার নাই তা কিন্তু না, আমাদের দলের অপর নয়জনকে এক এক করে জিজ্ঞেস করলাম, বলুন তো- পাউয়া নিউ গিনি কোন মহাদেশে ?

তাঁদের প্রথম চারজনই বল্লেন- আফ্রিকা হতে পারে।

এর পর আর কাউকে জিজ্ঞাস করলাম না।

এই প্লেনে ওয়াই-ফাই আছে বটে, অনেক ডলার দিয়ে কিনতে হয় দেখে কিনলাম না। নেটে সার্চ দিলে নিশ্চয় একটা ভালো জবাব পাওয়া যেতো। কিন্তু আমার মনে হলো, জবাবটা বরং না-ই নেই।“

এরপর আর কিছু লেখা নাই। সফরে নোট লেখা আমার ছোটবেলার অভ্যাস, সেই ক্যাডেট কলেজের পিকনিক বা স্টাডি ট্যুর থেকেই। নোট বুকের সাথে পরে যুক্ত হলো স্টিল ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলা। এরপর ২০০১ সাল থেকে যুক্ত হলো ভিডিও ক্যামেরা। মজার ব্যাপার হচ্ছে একটার যুক্ত হবার সাথে আরেকটা বাদ যাচ্ছে না। এখন তিনটা এক সাথে আছে, তার সাথে থাকে বুক পকেটে ভয়েস রেকর্ডার ।  চোখ দিয়ে দেখা, ক্যামেরা দিয়ে দেখা, কান দিয়ে শোনা, রেকর্ডারের দিকে খেয়াল রাখা। এসব নিয়ে আমার অনেক কাজ। এক একবার বিদেশে বেড়াতে যাওয়া মানে এইসব কাজ করতে যাওয়া। এর মধ্যেই আমার আনন্দ। নতুন মাটি, নতুন মানুষ, নতুন ভাষা। অথচ একই আকাশ দেখি, চাঁদও একই, তারপর গাছপালা আলাদা, নদী ও নৌকা আলাদা, মানুষ হাসে আর কাঁদে এক রকম , কিন্তু কথা বলে নানান ঢঙে, খায় নানান জাতের খাবার। শুধু পানিটা দেখি সবাই খায়, আর সব খাবারে আলাদা সবাই। প্রায় তিরিশ বছর ধরে নানা দেশ ঘুরে বেড়াচ্ছি। সময় পেলেই বেরুই। এবারের অস্ট্রেলিয়া সফর নিয়ে ছোয়া হয়ে গেলো এন্টারক্টিকা ছাড়া পৃথিবীর সব মহাদেশ। আগে কোন দেশে বেড়াতে যাওয়ার আগেই অনেক পড়ে যেতাম। তাতে অসুবিধা হতো এই যে, নতুন কিছু দেখে বা শুনে চমক লাগতো না। এখন মনে হয়, না জেনে যাওয়ার মধ্যে পুলকিত হবার সম্ভাবনাটা বেশি থাকে। অল্প জানা বা না জানার মধ্যে রোমাঞ্চটা অনেক বেশি। আগের দিনের এরেঞ্জড ম্যারেজের মতো।

থাক, এরেঞ্জড ম্যারেজের গল্প। পাপুয়া নিউগিনির কথা বলি।

এই দেশটার কী কী আছে খুব ভালো জানি না। ইন্টারনেটে কিছু আফ্রিকান কালো চামড়ার মতো মানুষের ছবি দেখেছি খুব উৎসাহমুখর পোষাকে। আর দেখেছি গা শিউরে ওঠার মতো বিপজ্জনক কিছু ছবি। খুন, ধর্ষন, রাহাজানি, ছিনতাই, এসবের জন্য এই দেশ চ্যাম্পিয়ান। শুধু তাই না, বসবাস যোগ্যতায় পৃথিবীর অনিরাপদ শহরের তালিকায় ঢাকার খুব কাছাকাছি তার অবস্থান। ঢাকা দ্বিতীয় অবস্থানে আছে, আর পোর্ট মোসবি, যে শহরে তিন রাত থাকার জন্য যাবো তার অবস্থান চতুর্থ। গরিবে-গরিবে যেমন, অনিরাপদ-অনিরাপদও ভাই ভাই। সুতরাং খারাপ লাগার কারন নাই। খারাপ শহরও কেমন হয় তা না দেখলে ভালো শহর বুঝবো কী করে !

ব্রিজবেন থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের উপর দিয়ে মাত্র দু হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিতে পারলেই পোর্ট  মোর্সবি। পাপুয়া নিউগিনির রাজধানী। পাপুয়া নিউগিনিকে কেউ তার পুরো নামে ডাকে না। ডাকে পিএনজি নামে, আর তার রাজধানীকে বলে পোম।

সাড়ে তিন ঘন্টার উড়াল শেষে এক সময় আমাদের বিমানটি পোর্ট মোর্সবির জ্যাকসন আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে নামে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় যে রানওয়ে বানানো হয়েছিলো সেখানেই ১৯৬৩ সালে এই  আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি চালু হয়। নাম শুনে বোঝা যায়, এটাও ইংরেজ কারো নামে। পাহাড়িদের নাম এমন হবার কথা নয়।

প্লেনের জানালা দিয়ে প্রথম দেখা পোর্ট মর্সবি

রানওয়ে ছুঁয়ে ফেলার আগে থেকেই আমরা দুইজন, আমি আর লাভলু ভাই, দুই জানালা দিয়ে তাক করে আছি দুই ক্যামেরা বন্দুক। লাভলু ভাইর হাতে সেলফোন, আমার হাতে অজমো পকেট। দুটোই ছোট ছোট ক্যামেরা। জায়গা দেখে যা বুঝলাম, তা হচ্ছে, এটা একটা মালভূমির মতো জায়গা হবে। দূরে কিছু পাহাড়, ধান ক্ষেতও আছে। সাদা মাটা অঞ্চল। বড় শহরগুলোতে নামার আগে যেমন গ্রিড আয়রনের প্যাটার্নে সারি সারি লোকালয় দেখা যায়, এটা তেমন কিছু নয়। টালির ছাদ দেয়া কিছু ঘর আছে।

প্লেনের জানালা দিয় পিএনজির ভূমিরূপ দেখি

প্লেনের জানালা দিয় পিএনজির ভূমিরূপ দেখি। পাহাড়ি জনপদ। অনেকটা নেপালের পোখরা থেকে যেমনটি দেখেছিলাম। পাহাড়গুলোর মাঝ বরাবর কখনোবা সর্পিলাকারে এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে নদী। এসব পাহাড়ি নদী খুব খরস্রোতা হয়। নামতে ভয় লাগে। আমাদের সাংগু নদীর মতো। সবুজে ছেয়ে যাওয়া গাছপালার ফাঁক দিয়ে বয়ে যাওয়া এই নদীপথ নিশ্চয়ই প্রশান্ত মহাসাগরের কোন কূলে গিয়ে ভিড়েছে।

রানওয়েতে ছোবার আগে দূরত্ব অনেক কমে আসে এসব জনপদের সাথে। তখনই বোঝা গেলো, দোচালা টিনের ঘরের অগোছালো পাহাড়ি বিন্যাসেই এর লোকালয়। দেশ যেহেতু বড়, পাহাড়ি অবারিত জমি, লোকসংখ্যা কম, সেকারণে এমন আবাসনইতো যৌক্তিক এখানে। এয়ার হোস্টেসের বার্তা ভেসে আসে। সব বিমান নামার সময় যা যা বলা হয় তা-ই। সাবধানী বাণী, ধূমপান এমবারকেশন পর্যন্ত করা যাবে না। সবাই নিজ নিজ হাতব্যাগ নিয়ে যাতে দেখেশুনে নামেন এই কথা।

আমরা সরু করিডোর দিয়ে ধীর পায়ে বেরিয়ে আসি। মনের মধ্যে এক অজানা আতঙ্ক। যে দেশটিতে এসেছি তা সম্পর্কে ভালো ধারণা তো নাই-ই, যা আছে তাও ভালো না।

সামনে এসে উপর তলার করিডোরের ফাঁক দিয়ে এর নাগরিক অবয়ব দেখা হলো। বেশ শান্ত এক রাজধানী শহরের পরিবেশ। গাছপালায় ভরা রাস্তাঘাট। অল্প কিছু গাড়ির চলাচল আছে মাত্র। লাভলু ভাই ব্যস্ত হয়ে যান তাঁর সেলফোন নিয়ে। বুঝি, এ এক ভিন্ন লোকালয়ের চেহারা তার কাছেও ধরা পড়েছে। বিমান বন্দরের রানওয়ের দিকে আরেকবার চোখ ফিরাই। খালি মাঠ। সামান্য ক’টা ছোট ছোট বিমান। দূরে পাহাড়ের সারি। দেখে শান্তি শঅন্তি লাগে।

বিমান থেকে নেমে করিডোর দিয়ে এরাইভ্যাল লাউঞ্জে যেতে হাফপ্যান্ট পরা দারোয়ানের মতো লোকের দেখা পেলাম। ট্রাফিক পুলিশের মতো হলুদ আর লাল ক’টি পরা কতগুলো লোক করিডোরে দাঁড়িয়ে। তাঁদের কেউ হাফপ্যান্ট, কেউ ফুল প্যান্টের। এঁদের সবার চেহারা দেখতে একই রকম মনে হয়। মনে হয় সবাই যমজ ভাই। সবার নাক মোটা। চতুস্কোনাকার মুখাবয়ব। থুতনিটা নিচের দিকে বেশি বাড়ানো।

এমিলি আপা বলে বসেন, এঁদের দেখেই মনে হচ্ছে ডারউইন সম্ভবত: আন্দাজ করেছিলেন যে বানরের থেকে মানুষের বিবর্তন হয়েছে। আসলেই ছবিতে বানর আর মানুষের মুখাবয়বের মাঝখানে যে রকম চেহারা আসে এদেরটা অনেকটা সেরকম।

আমরা এঁদের পাশ কাটিয়ে হেঁটে যাই, আমাদের কোন কথা হয় না। নিট সিমেন্টের প্রলেপ দেয়া করডোর দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে মনে হলো, দেশটা যথেষ্ট গরীবই হবে। একটা লিফট বা এসকেলেটার তার প্রধান বিমানবন্দরে নাই।

যেকোন বিমান বন্দরে নেমেই সচরাচর আমি একটা দেশের ধারনা পেয়ে যাই। একটা বাড়ির গেট দেখলে যেমন বা একটা বইয়ের কভার বা তার ভূমিকা পড়লে যেমন ধারনা হয়, অনেকটা সে রকম।

ছবি তুলতে আপত্তি জানান নিরাপত্তাকর্মী

আমরা একসময় একটা প্যাঁচানো র‌্যাম্প দিয়ে নামি। এবং নামতে নামতে দেয়ালে টাঙানো কতগুলো ছবি দেখি। হাতে, বুকে, পেটে, মুখে মাথায় নানা রকমের ঝালর দিয়ে সাজিয়েছে তাদের শরীর। কেউ দাঁড়িয়ে আছে, কেউ নাচের ভঙ্গিতে। কোমরের নিচে প্যাঁচানো দড়ির মতো কতগুলো ঝালর। শরীরের কোথায় সেই অর্থে কোন কাপড় নেই কারো। এক লোকের মুখে হলুদ রং দেয়া, যেনো কোনো চিত্রকর এক মানবমুখকে পট মনে করে এঁকে গেছে, নাক, চোখ, গ্রীবা, ঠোট আলাদা করে দেখিয়েছে এবং তাঁর নিচেই ইংরেজিতে লেখা- ‘ওয়েলকাম টু পাপুয়া নিউ গিনি’।

আরেকবার বুঝলাম, মজার একটা দেশে ঢুকে পড়েছি। এখন দেশটাকে বোঝার পালা। ছোট্ট একটা বিমান বন্দর। আমাদের সিলেটের চেয়েও ছোট। এটাই এই দেশের সবচেয়ে বড় বিমানবন্দর। যদিও, শুনেছি পাঁচ শতাধিক বিমানবন্দর আছে এই দেশে। রাস্তাঘাট নাই। ফলে ওড়াওড়ি করে চলতে হয় তাদের মুষ্টিমেয় যে ক’জন ধনী আছে, তাদের।

ইমিগ্রেশন ক্লিয়ার করে বেরিয়ে যেতে কোথাও কোন সমস্যা নাই- প্রশ্ন নাই, জিজ্ঞাসাও নাই। এনায়েত ভাই আর সাঈদ হাসান ভাই আগে আগে বেরিয়ে গেলেন। তাঁদের দুইজনের পরনে হাফ প্যান্ট, একেবারের পমবাসীদের মতো। তাঁদের পিছু পিছু বেরিয়ে আসতেই মনে হলো সত্তরের দশকে সিলেট বিমানবন্দরে লন্ডনীদের এগিয়ে নেয়ার জন্য গ্রাম থেকে যেসকল লোক বিমানবন্দরে এসে ভিড় করতেন, এই ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসের এই সময়ে পৃথিবীর রহস্যময় এক দেশের সেসব নাগরিকেরা এসে ভিড় করেছেন। এই দলে আছেন শিশু, কিশোর, যুবা ও প্রৌঢ়রা। এঁদের সবার গায়ের রং একই, কৃষ্ণবর্ণ। ছেলেরা বেশিরভাগ হাফপ্যান্ট পরা, আমাদের চা-বাগানের শ্রমিকশ্রেণির মতো। ফুলপ্যান্ট আছে যদিও কারো, তা সবই মেটো রং এর। কিন্তু শার্ট বা টি-শার্ট যা তাঁরা পরেছেন, সবই খুব উজ্জ্বল রঙের। হলুদ আর লালের আধিক্য বেশি। মানুষগুলোর অবয়বের মধ্যে এক ধরনের দারিদ্রের ছাপ আছে, কিন্তু সবাই খুব উৎফুল্ল, সবার মুখে হাসি। মেয়েদের পোশাক একটু আলাদা। তাঁরাও হাফপ্যান্ট-ফুলপ্যান্টে আছেন। উপরে কামিজের মতো পোশাক, হাতের কাছে ঝালর দেয়া। এবং খুব সচেতনভাবে তাঁদের মুখের দিকে চেয়ে দেখলাম যে, একটি নারীও মুখে কোন ধরনের প্রসাধন ব্যবহার করেননি। প্রকৃতি তাঁর রূপ যা দিয়েছেন, তাতেই তিনি সন্তুষ্টির সাথে আছেন।

পঞ্চপর্যটকের সবচেয়ে সুবিধাভোগী সদস্য আমি। কারণ বয়স ও শিক্ষাগুণে আমি সবার চেয়ে ছোট। ‘এন্ড ইউজার’ বিশেষণ আমার ক্ষেত্রে বেশি প্রযোজ্য। এইসব দূরযাত্রা বা কাছযাত্রায় আমি শুধু কোনমতে আমাকে আর আমার ক্যামেরাকে (সাথে পাসপোর্ট-টিকেট) বহন করি। বাকীগুলো বাকীরা করে। এবার সঙ্গে স্ত্রী। সুতরাং আমি আরো হালকা। ইমিগ্রেশন করেই আমি বেরিয়ে আসি সবার আগে। আমার অজমো পকেটের ছোট্ট এলসিডি মনিটরে আমি নতুন জনপদের মানুষ দেখি। আমার ফ্রেমে সব কালো কালো সুন্দর নারী-পুরুষ। এর মধ্যে হঠাৎ দেখি দু’হাত উঁচিয়ে একটা ফর্সা হাস্যেজ্জ্বল অবয়ব ট্র্যাক শটের মতো আমার ক্যামেরার দিকে এগিয়ে আসছে। তাঁর দুই হাত উঁচানো। মুখ দিয়ে শব্দ বেরুলো – শাকুর, তুই শেষ মেষ আইসা গেলি!

আপ্যায়ক ডাক্তার মুনীর

এই ‘শেষ মেষ আইসা গেলি’র মধ্যে অনেক কিছু আছে। যেমন এই দল যে অস্ট্রেলিয়াতে মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের গ্লোবাল রি-ইউয়িনে আসবে সেখানে আমার আসার কথা ছিলো না। এঁদের যখন অস্ট্রেলিয়ায় ভিসা হয়, তখন পরিকল্পনা হয়, এর পাশের দ্বীপ এই পিএনজিটা দেখে যাবার। পিএনজির রোমাঞ্চকর গল্প আমরা এই মুনীর ভাইর কাছ থেকে শুনি কয়েক বছর আগে।

মুনীর ভাইর সাথে আমাদের যোগাযোগের প্রধান হেতু- আমরা ক্যাডেট-ক্যাডেট-ভাই-ভাই বলে। তিনি রংপুর ক্যাডেট কলেজের প্রথম ব্যাচের ক্যাডেট। সম্পর্কে আমার তিন বছরের সিনিয়ার। পাশ করে ডাক্তারি পড়ে চাকরী করেন চা বাগানে। এরপরে প্রিভেনটিভ মেজারে চিকিৎসা সেবা দেবার ক্ষেত্রে পেশা বদল করেন।

মুনীর ভাইর দুটো বড়গুণ। এক-গুছিয়ে কথা বলতে পারেন, দুই-গুছিয়ে লিখতে পারেন ভালো ইংরেজিতে। এর বাইরে তাঁর বড় গুণ, তাঁর কানেকটিভিটি খুব ভালো। অনেক বড় বড় হোমরা চোমড়া তার হাঁটুর কাছে পড়ে থাকেন। এসব গুণ কাজে লাগিয়ে তিনি তরতর করে চাকরী বদল করে, দেশী- প্রতিষ্ঠান ডিঙ্গিয়ে বিদেশী এবং জাতিসংঘের স্বাস্থ্য বিষয়ক নানা কাজে যুক্ত হয়ে যান। ইউএনএইডস-এর একটা শাখার প্রধানও ছিলেন দেশ থাকার সময়। তারপর একদিন উড়াল দেন কানাডায়।

দেশে আমাদের পঞ্চপর্যটকীয় আড্ডায় ষষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন তিনি। একসময় সপ্তাহে ৭দিন আমদের দেখা হতো। তিনি আমার টেনিস খেলার গুরু এবং পার্টনারও ছিলেন। দেশে তিনি আমাদেরকে নিয়ে বা তাঁর সাথে আমাদের হয়ে শ্রীমঙ্গলের বালিশিরা চা বাগান, কিংবা ভোররাতে বিক্রমপুরের পদ্মায় ইলিশ ভোজন কিংবা উত্তরাঞ্চল ভ্রমণ এসবই আমরা এই পাঁচজন মিলে করেছি।

২০১৪ সালে পঞ্চগড়ের এক রেস্টহাউজে ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে তিনি প্রায় চিৎকর করে বলে উঠেন- হয়ে গেছে। দে হ্যাভ একসেপ্টেট মাই অফার। সামনের মাসে জয়েনিং। কানাডা যাচ্ছি।

আমাদের বাকী সবার মন খারাপ। ডক (ডাক্তার মুনীরকে আমরা এই নামে ডাকি) বিদেশ চলে যাবে, মানে আমাদের আড্ডা-ঘুরাঘুরি আর ঠেকায় পড়লে ডাক্তার যোগান দেয়ার ভরসাটুকু মাটি হয়ে যাবে, এই চিন্তায় আমরা সবাই মিলে তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করি, বিদেশ না গিয়ে দেশেই ইউনিসেফ, ইউএনএইডস্ – এসবে সবচেয়ে উঁচু পদটা সে নিয়ে নিতে পারে।

আমাদের কথা তিনি শুনলেন না, শুনলেন কানাডার সাহেবের কথা। তিনি সপরিবারে চলেই গেলেন।

ক’ বছর পর দেশে এলেন। জাতিসংঘ থেকে তাঁকে পাঠানো হয়েছে পাপুয়া নিউগিনি। তিনি সেখানেই থাকবেন বিভাগীয় প্রধান হিসাবে। এর মধ্যে দুবার দেশে এসেছেন। দেখা হয়েছে, এবং সববারেই তিনি তাঁর নতুন দেশে যাবার জন্য দাওয়াত দিয়ে গেছেন। আমরা যাই যাই করি, কিন্তু যাই না। এবার আমি ছাড়া দলের বাকীদের ভিসার কাগজপত্র তিনি পাঠিয়ে ঠিকঠাক করার পর যখন শেষ মেষ অস্ট্রেলিয়াতে যাবার জন্য আমি কাগজপত্র দিতে গেলাম, সে সময় আবার আলাদা করে আমার জন্য পাপুয়া নিউগিনি প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়। সবার শেষে যার ব্যবস্থা হয়, সে বেরিয়ে এসেছে সবার আগে। সম্ভবত: এ কারণে মুনীর ভাইর এই উল্লাস।

এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে আমরা দুই গাড়িতে উঠে পড়ি। এক গাড়ির ড্রাইভার আমাদের ডক, আরেক গাড়ির ড্রাইভার ডক ভাবী । তাঁর ভালো নাম-  ডাঃ জান্নাতুল ফেরদৌস। আমাদের ফোয়ারা ভাবী। ১৯৮৯ সালে ময়মনসিং মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশ করে ঢাকা, কানাডায় ডাক্তারি করে এখন এখানকার প্যাসিফিক ইন্টারন্যাশনাল হসপিটেলে কাজ করেন । আমাদের জন্য ছুটি নিয়েছেন । আজ নিজেই নিজের গাড়ি চালিয়ে অপর পাঁচ নতুন বান্ধবীকে নিয়ে তাঁর বাসায় উঠবেন।

মুনিরভাই যে গাড়িটা নিয়েছেন সেখানে জাতিসংঘের স্টিকার লাগানো। গাড়িটি জীপ আর ট্রাকের মাঝামাঝি অবয়বের । আমাকে যেহেতু প্রিভিলেজড সীটে বসতে হয়, সামনে আমার এই গাড়িতে চড়তে সমস্যা হয়। মনে হয় ট্রেনের বগিতে পা ডিঙিয়ে বসার চেষ্টা করছি।

আসলে পাহাড়ি এলাকায় চলতে হলে এমন ভারী ইঞ্জিনের গাড়ি ছাড়া চলে না। আমরা যেসব প্লাস্টিক গাড়ি চড়ে ঢাকায় অভ্যস্ত এমন গাড়ি পাপুয়া নিউ গিনিতে নাই। সেখানে আছে আমাদের বান্দরবানের চান্দের গাড়ির একটা মার্সিডিজিও ভার্সন। আমরা সেই গাড়িতে উঠি। আমাদের ড্রাইভার ডাঃ মুনীর আহমেদ । পেছনে পঞ্চপর্যটকের ৪ পর্যটক আর আমাদেরকে স্কট করে নিয়ে যাওয়ার জন্য পট মসবিতে থাকা গুটি কতক বাংলাদেশির তিনজন।

গাড়িতে উঠেই আমার ক্যামেরা অন হয়ে যায়। মুনির ভাইকে জিজ্ঞেস করি – ডক, আপনি এখন কী করেন এখানে ?

মুনির ভাই বলেন – আমি এখানে ম্যালেরিয়া সারাই। ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে রোটারিয়ানের হয়ে কাজ করি।  জংগলবাসি এ মানুষগুলোকে হামেশা মশায় কামড়ায়, এঁদের মৃত্যুহার অনেক বেশি। এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যাও এখানে মাত্রাতিরিক্ত। খুব অল্প বয়স থেকেই ছেলেমেয়েরা মেলামেশা শুরু করে। এ নিয়ে তাঁদের খুব কঠিন সংস্কারও নাই। এসব অসুখবিসুখ নিয়েই তাঁর কারবার।

আমাদের গাড়ি ছুটে চলে পোর্ট মোর্সবির দিকে । যেতে যেতে আমরা শুনি এই দেশ আর শহরের গল্প।

যে শহরকে আমরা পোর্ট মোর্সবি বলি- এর ডাক নাম আসলে পট মসবি। মোর্সবি সাহেবের নাম মসবি হবে এটা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। নিশ্চয়ই মোর্সবি নামক কোন সাহেবের নামে। নিউ ইয়র্ক যেমন নাম হয়েছিল ইয়র্কের নামে, এমনকি তার পাশ দিয়ে বয়ে চলে নদীটির নামও যেমন হয়েছিলো হাডসন নামক  ইংরেজ সাহেবের নামে, নিশ্চয়ই এমন কিছু এখানে হবে। এবং সামান্য খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, এই সেদিন আমাদের রবীন্দ্রনাথ যে কিশোর বয়সে নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ লেখেন, অনেকটা সেই বয়সেই, ১৮৭৩ সালে জন মোর্সবি নামক এক ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন একটি অভিযান সম্পন্ন করেন। তিনি তাঁর বাবা অ্যাডমিরাল স্যার ফেয়ারফ্যাক্স মোর্সবি-র নামে এলাটির  একটি অংশের নাম রেখে ফেলেন – ফেয়ারফ্যাক্স এবং অপর অংশের নাম রাখেন মোর্সবি। মোর্সবি তারও নামের অংশ, তার বাবারও। সুতরাং একসাথে বাপ-বেটার নামে নাম হয়ে যায় একটা বন্দর এলাকার।

এর প্রায় ১০ বছর পরে ১৮৮৪-৮৫ সালে যুক্তরাজ্য ব্রিটিশ নিউ গিনি উপনিবেশটি সৃষ্টি করে এবং সমগ্র এলাকাটিকে পোর্ট মোর্সবি নাম দিয়ে উপনিবেশের রাজধানী বানায়। কিন্তু দীর্ঘকাল এই ছোট্ট বন্দরটি মানুষের, আরো স্পস্ট করে বললে ঔপনিবেশিক বেনিয়াদের নজরের আড়ালে অবহেলিত পড়ে ছিলো। ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় পোর্ট মোর্সবি দরকারে আসে। বৃটিশরা এখানে একটা ঘাটি বানায়।

যুদ্ধের দুই পক্ষই প্রবাল সাগর ও দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে শহরটিকে দখলে রাখতে চেয়েছিল। ১৯৪২ সালে প্রবাল সাগরের যুদ্ধে জাপানি নৌবাহিনী শহরটিকে নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী তাদের সাথে যুদ্ধ করে ও তাদের পরাজিত করে। এর পরের বছর জাপান স্থলপথে ওয়েন স্ট্যানলি পর্বতশ্রেণী অতিক্রম করে শহরটি আক্রমণ করলে সেটিকেও মিত্রবাহিনী রুখে দেয়।

এই ছোট্ট পাহাড়ি দ্বীপটি নানা কারনে নানা জাতের শাসকদের কোপানলে পড়ে। যেহেতু তাদের শিক্ষা নাই, যন্ত্র নাই, আধুনিক অস্ত্র নাই, কল কারখানা নাই – আছে সমুদ্র  ও পাহাড়তলার সোনার খনি, তার সন্ধান জেনে নানা দেশের অধিকার চলে আসে সে দেশের উপর। ১৯৪৫ সালের পরে এটি অস্ট্রেলীয় বহির্দেশীয় অঞ্চল ‘পাপুয়া’ এবং পরে অস্ট্রেলিয়া-শাসিত জাতিসংঘ ট্রাস্ট অঞ্চল ‘নিউ গিনির’ প্রশাসনিক রাজধানীতে পরিণত হয়।

অস্ট্রেলিয়া নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই বন্দরটিকে আধুনিক সুযোগসুবিধাসম্পন্ন একটি সুপরিকল্পিত শহরে পরিণত করতে শুরু করে। ১৯৭৪ সালে পোর্ট মোর্সবিকে জাতীয় রাজধানী জেলার মর্যাদা দেওয়া হয়। ১৯৭৫ সালে পাপুয়া নিউ গিনি স্বাধীনতা লাভ করলে পোর্ট মোর্সবি এর রাজধানীতে পরিণত হয়।

পান-সুপারী এঁদের প্রধান বিনোদন আহার

বিমান বন্দর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে আমাদের শহর আর সেখানেই প্রশান্ত মহাসাগরের কিনারা বরাবর কতোগুলো পাহাড়ের পেট বরাবর যে আধুনিক আবাসিক এলাকা তৈরী হয়েছে, তার একটির দিকে আমাদের নিশানা। জি পি এস জানিয়েছে ১৮ মিনিটে আমরা সে জায়গায় পৌঁছে যাবো। কিনতি এই আঠারো মিনিটের মধ্যে এক সেকেন্ডের জন্যও আমার ক্যামেরা বন্ধ হবে না , ভয়েস রেকর্ডারও চালু আছে।

ছবির মত সাজানো দেশের এই অঞ্চলটিকে দেখে আমাদের ভালো লেগে যায়। আমাদের গাড়ি যখন পাহাড়ের উপর দিয়ে চলে তখন  দূরের প্রশান্ত মহাসাগরীয় অবয়ব চোখ ভাসে।

আমি বলি, আমরা কী সাগরের পাড়ে থাকবো ?

মুনীর ভাই বলেন – তুই চাইলে সাগরের উপর ঘুমাতে পারিস। ব্যবস্থা করে দেব ।

আমাদের আয়েসী বড় ভাই- কাজী আরিফ। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছেন, সামনের যে তিন দিন আমরা এখানে থাকবো, তিনি কোথাও বেরোবেন না। ডকের বাড়ির বারান্দা থেকে মহাসাগর খুব কাছে। তিনি বারান্দায় সারাদিন বসে থাকবেন ।

খুব ভালো। গাড়িতে যেতে যেতে আমরা শুনি আরো মজার মজার গল্প।

এই দেশের আইন শৃংখলা নাকি মানুষেরা নিজেদের হাতে তুলে রাখে। সীমিত পরিসরে পুলিশ ও মিলিটারি ফোর্স এদের আছে, তাও অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা বাহিনী এদের চালায়। বড় বড় লোকেরা প্রাইভেট সিকিউরিটি ফোর্স পালেন। এ রকম প্রায় ৭০ টি এজেন্সি আছে, এরাই লাঠি হাতে, বন্দুক হাতে নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। সারা দেশের পাহাড় জংগল ঘিরেই তারা বাস করছে, কতোগুলো গোত্রে বিভক্ত তারা। সাড়ে আটশো গোত্র আছে এই দেশে এবং প্রায় একই সংখ্যার ভাষা এবং সবই চলমান। কোন একটা দেশে পাড়ায় পাড়ায় মানুষের নিজস্ব ভাষা থাকার মতো ঘটনা এর আগে শুনিনি কোথাও। খোজ নিয়ে জেনেছি, এই দেশে কোন শিল্পকলা একাডেমি নাই, চলচ্চিত্র নির্মাতা নাই, বই মেলা নাই, বইয়ের প্রকাশনা নাই। আছে নিজেদের মতো নাচাগানা।

মুনীর ভাই বলেন, আমাদের বাসার নীচে যে সী-বীচ এখানেই এঁদের সবচে বড় বাৎসরিক উৎসব হয়। স্বাধীনতা দিবসে জঙ্গল থেকে ডেকে আনা হয় শিল্পী। এরা উদোম গায়ে সমুদ্রপাড়ে নাচানাচি করে। গাছের লতাপাতা, শেকড়বাকড় দিয়ে শরীর ঢাকা থাকে। শরীরের কোন অংশ দেখানো নিয়ে তাঁদের কোন সংস্কার কাজ করে না । কেউ জিজ্ঞেস করলে বলে এসব তো প্রকৃতির দান। প্রকৃতি যখন দিয়েছে কেউ দেখলে সমস্যা কী ? নারী পুরুষ সবারইতো আছে ।

মুনির ভাই বলেন, এই দেশে কিন্তু বাংলাদেশিদের বিনিয়োগের অনেক সুযোগ আছে। অনেক বেশি দামে এরা পাটজাত দ্রব্য, রেডিমেড গার্মেন্টস, চামড়াজাত দ্রব্য এবং অষুধপাতি কেনে। চীন, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর হচ্ছে এদের বড় সাপ্লাইয়ার। এখানে বাংলাদেশিরাও যোগ দিতে পারে। আর গ্রোসারি এবং ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের বাণিজ্যে বাংলাদেশ যেভাবে এদের মেইন স্ট্রিমে ঢুকে গেছে, অন্য খাতগুলোতেও চাইলে ঢুকে যেতে পারবে।

বামে বিমানবন্দরে আরিফ ভাই, ডানে মুনীরদম্পতি

সমুদ্র দিয়ে ঘেরা এই সোনার দেশটা এখনো নাকি খুব বিখ্যাত সোনার খনির জন্য। কিন্তু বিশ্ব পর্যটকের মুখ ঘুরিয়ে রাখার জন্য আর খুব অল্প সংখ্যক মানুষের সুবিধা দেয়ার জন্য অতি বৃহৎ জনগোস্টিকে অবহেলায় রেখে দেয়া হয়েছে। পশ্চিমা প্রচার মাধ্যমে ছড়ানো আছে এমন খবর যে, বিদেশিদের জন্য এই রাজধানী শহটি নাকি মোটাও নিরাপরদ নয়। ছিনতাই করা এখনকার ছেলেদের প্রধান হবি। এরা কেউ কাজ করতে চায় না। ছিনতাই করে খেতে যায়। কিন্তু তিন দিন নানা রকমের মানুষদের সাথে মিসে দেখেছি- মানুষগুলো সরলপ্রাণ, পরোপকারী, কিছুটা অলস কিন্তু খুবই প্রাণোচ্ছ্বল। স্বভাবের মধ্যে কিঞ্চিত দাসবৃত্তি আছে বলে সাদা চামড়ার, এমনকি আমাদের মতো বাদামি চামড়ার মানুষদের খুব সমীহ করে।

আমি বলি- মুনীর ভাই, কিছুদিন আগে বিবিসির একটা ডকুমেন্টারি দেখলাম। এখানকার হাইজ্যাকারদের নিয়ে । এসব দেখলে কী বিদেশিরা এখানে আসতে চাইবে ?

-অল আর পলিটিক্স। এগুলো সব অস্ট্রেলিয়ার করানো। তাঁরা চায় না আর কোন বিদেশি এখানে এসে এঁদের সোনার খনির সন্ধান করুক। এঁরা একাই গিলে খেতে চায় এই পি এন জিকে ।

– কিন্তু কেন ?

– তোরা তিন দিন আছিস। পারলে তার কারন খুঁজে বের কর।

একটা পাহাড় মাড়িয়ে দ্বিতীয় পাহাড়ের সারির দিকে আমাকে মার্সিডিজিয়ান চান্দের গাড়ি উপরে উঠতে থাকে । সেখানে বেশ আধুনিক কিছু কন্ডোমিনিয়াম। বুঝলাম, বারিধারা এসে গেছি। এখানেই নেমে যেতে হবে ।

গাড়ি থেকে নেমে দেখি অনেক নীচে শুয়ে আছে প্রশান্ত মহাসাগরের এক বালিমাখা উপকূল। এখানেই তবে ১৮৭৩ সালে মোর্সবির জাহাজ ভিড়েছিল?

মুনির ভাই বলেন, ১৪ তলায় তার এপার্টমেন্ট। আরো উপর থেকে আমরা এই মহাসাগর দেখবো।

আমাদের সব ক্লান্তি মুছে যায় ডকের বারান্দায় বসে।

ওশেনিয়া ট্যুরের সূচনা তাহলে মন্দ না ।

মন্তব্য
Loading...