মিরিকিনে

২০১৫ ও ২০১৬ সালের আমেরিকা ভ্রমণ নিয়ে এ পর্যন্ত যা লেখা ছিলো

আমেরিকা প্রথম সফর (২০০১ সালে) করে আমেরিকাঃ কাছের মানুষ দূরের মানুষ’   নামে আমার দ্বিতীয় ভ্রমণকাহিনী প্রকাশ করেছিলাম ২০০৮ সালে । এর পর আরো দুইবার আমেরিকা যাওয়া হয়েছে, ২০১৫ ও ২০১৬ সালে। এ নিয়ে আর কোন বই হয় নি। কিছু কিছু লেখা কিছু অন-লাইন পোর্টালে আর প্রথম আলো, সমকাল, অন্যদিন এ ছাপা হয়েছিল। পুরো সফরের লেখা গুছানো হয় নাই, লেখাও হয় নাই। তবে খন্ড খন্ড লেখাগুলো এক জায়গায় করে এই পোর্টালে তুলে রাখলাম, হারিয়ে ফেলার ভয়ে। পরে গুছিয়ে বই করা যাবে।

২০১৫

২০১৫ সালে পরিবার নিয়ে বড় একটা ট্যুরে বেরিয়েছিলাম । এশিয়ার বাইরে লন্ডন আর আমেরিকা দেখানোই ছিলো উদ্দেশ্য। ৬ রাত লন্ডন থেকে ( এ গল্প আলাদা লিখবো) বড় ছেলেকে দেশে পাঠিয়ে আমরা তিনজন চলে গেলাম আমেরিকা। ইশমামের সামনে সেমিস্টার পরীক্ষা। তাঁকে নিয়ে গেলে সেমিস্টার ড্রপ হয়ে যাবে। আর বাকীদের এই সময় ছাড়া সময় নেই। তাই হিথ্রো থেকে এক বিমানে বড় ছেলেকে ঢাকা পাঠিয়ে আমরা তিনজন রওয়ানা দিলাম আমেরিকার পথে । আমাদের প্রাথমিক স্টেশন হবে মিশিগানের স্টার্লিং হাইটস। সেখানে আমার ছোট বোন থাকে । সেখান থেকে নানা জায়গায় যাওয়া হবে। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ আমরা হিথ্রো থেকে উড়াল দেই।

ইশমামকে ঢাকার প্লেনে তুলে দিয়ে আমরা উঠে গেলাম শিকাগোর প্লেনে

আমেরিকা: ফেল কড়ি মাখ তেল

শিকাগোর ও’হারে বিমানবন্দরে ল্যান্ড করার কয়েক ঘণ্টা আগেই আমেরিকান এয়ারের পৌঢ়া এয়ার হোস্টেজ একটা ফর্দ হাতে ধরিয়ে দিলেন। এটা কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের জন্য প্রয়োজন হবে। এর আগে ২০০১ সালে যখন আমি প্রথমবার আমেরিকা আসি তখন এটা ছিল না। ইমিগ্রেশন পার হবার জন্য পৃথিবীর একেক দেশে একেক নিয়ম। ভারতে যেতে যেমন কোথায় থাকবো, কার কাছে থাকবো, যেখানে থাকবো তার ফোন নাম্বার  কত -এসব লিখে ইমিগ্রেশন পার হতে হয়। লন্ডনের ইমিগ্রেশনের জন্য সেরকম কিছুর প্রয়োজন হয় না। কিন্তু এখানে এটা লাগবে।

কাস্টমস-এর ডিক্লারেশন ফর্মে লেখা আছে ফলমূল, বীজ, চারা, খাবার, পোকামাকড়, মাংস, প্রাণী, প্রাণীর খাবার, মাটি, সার এসব নিয়ে এসেছো কিনা উল্লেখ করতে হবে। আমি ঘরপোড়া গরু, সিঁদুর রাঙা মেঘ দেখলেই ডরাই। ১৪ বছর আগে হিউস্টন বিমানবন্দরে এক ছোকরি ৪টা সাতকরার জন্য আমাকে যে পরিমাণ নাকানি-চুবানী খাইয়েছিল, আমার মনে আছে। পঞ্চাশ ডলার জরিমানার কথা সারা জীবনেও ভুলব না। সুতরাং এসবে আমি নেই। আমি ঢাকা থেকে শুঁটকি, শুকনো সাতকরার ফুটি এসব অনেক নিয়ে এসেছিলাম। হিথরো দিয়ে নির্বিঘ্নে পার হয়ে লন্ডনে সব উপহার দিয়ে এসেছি। আমেরিকার জন্য কিছু নাই। সুতরাং আমার ডিক্লারেশন ফর্ম ‘নো’ তে ভরা। আমি আছি ফুরফুরা। কিন্তু এই নিয়ে বিপদে পড়েন আমার এক সহযাত্রী কাস্টমসের আগেই, ইমিগ্রেশনের লাইনে। তিনি সম্ভবত স্প্যানিশ। প্রথমবার এসেছেন আমেরিকা।

ইমিগ্রেশনে এসে দেখি নতুন নিয়ম হয়েছে আমেরিকায়। আমেরিকান, ক্যানাডিয়ান আর ব্রিটিশ পাসপোর্টধারীদের জন্য আলাদা কাউন্টার, আলাদা সারি। বাদবাকি দেশের জন্য আলাদা। এই দ্বিতীয় সারির জন্য নিয়মকানুন বেশ কড়া। এখানে লাইনও বেশ লম্বা। এই লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এমন সময় বড় খরগোশের আকারে একটা কুকুর মহাশয়কে নিয়ে কালো কোর্ট পরা এক মহিলা হেঁটে এলেন। সব যাত্রীকে বললেন, হাত ব্যাগ ফ্লোরে নামিয়ে রেখে এক পায়ে দাঁড়াতে। বলেই তিনি সারমেয় শাবককে নিয়ে হেঁটে চললেন। সেই শাবক হেলেদুলে হেঁটে যেতে যেতে আমাকে অতিক্রম করার পরেই আমার পাশের স্প্যানিশ মহিলার হাতব্যাগ ধরে বসে পড়লো। সে আর নড়ে না।

কালো কোটওয়ালি সেই ব্যাগ তুলে যাত্রীকে বললেন, আপনার ব্যাগ খুলে দেখান কী আছে?
স্প্যানিশ মহিলা ব্যাগ খুলে দেখালেন। দেখা গেল সেখানে দুটি আপেল আছে। কোটওয়ালি বললেন, আপনার কাস্টমার ডিক্লারেশন ফর্ম দেখান।
তাকে ফর্মটি দেখানো হলো। সেখানে ‘ফুড’-এর ঘরে ‘নো’ তে টিক মার্ক দেয়া। এটা দেখে ক্ষেপে গেলেন কোটওয়ালি। বললেন, তুমি এখানে ভুল ডিক্লারেশন দিয়েছ। এটা বলে ফর্মের ওপর লাল কালিতে কী একটা সংখ্যা লিখে তাকে অন্য একটা কাউন্টারে রিপার্ট করতে বললেন।
অন্য মানুষের দুর্দশা দেখার মধ্যে এক ধরনের পৈশাচিক আনন্দ আছে। ১৪ বছর আগে আমার দুর্দশা দেখে কিছু লোক নিশ্চয়ই আনন্দ পেয়েছিল। এবার আমি পেলাম।

সেই মহিলা কীভাবে পার পেলেন আমার দেখার সুযোগ ঘটেনি। আমার ডিক্লারেশনে সব জায়গায় ‘নো’ লেখা থাকার পরও ইমিগ্রেশন অফিসার আমাকে জেরা করতে লাগলেন। কত বোতল এলকোহল আছে কিংবা কত কার্টুন সিগারেট নিচ্ছি, কী পরিমাণ ডলার আমার সঙ্গে আছে জানতে চাইলেন। আমি বললাম। এরপর আমাকে সীল মেরে, দুই বুড়ো আঙুল আর ডান-বাঁ হাতের চার আঙুলের ছাপ নিয়ে আমাদের তিনজনকে ছেড়ে দেয়া হল।

মালপত্তর বুঝিয়ে পেতে ঢাকা বিমানবন্দর ছাড়া আর কোথাও কোনো অভিযোগ আমার নাই। তারপরও মালামাল নিয়ে বেরিয়ে যাবার পরেই আরেকটা ঝামেলায় পড়ে যাই। আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্য মিশিগানের ডেট্রোয়েট। সেটা আমেরিকান এয়ারের সঙ্গে কানেকটেড ডমেস্টিক ফ্লাইট। কথা ছিল ভেতরে থেকেই লাগেজপত্র ট্রান্সফার লাউঞ্জে গছিয়ে দেবো। ভেতরে ট্রান্সফার লাউঞ্জ না পেয়ে বাইরে এসে খবর পাই, ওটা ভেতরেই ছিল। আমরা আবার ভেতরে যেতে চাই। কিন্তু দরোজার সামনে দাঁড়ানো কৃষ্ণাঙ্গ তরুণী আমাদের বলল, এই দরজা দিয়ে কেবল বেরুনো যায়, এখানে ঢোকার সুযোগ নেই।
আমি বলি, দরোজা তো খোলাই আছে। আমরা তো এই মাত্র বেরুলাম। ভেতরে ঢুকে জিনিসগুলো দিয়ে আবার বেরিয়ে আসব।
হবে না।
তাদের ‘না’ মানে না-ই। কোনো কিছু দিয়ে ‘হ্যাঁ’ করানো যাবে না। ঢাকা হলে করিয়ে ফেলতাম। এখানে পারবো না। এখন যা করতে হবে, ট্রেন ধরে ৫ নাম্বার টার্মিনাল থেকে এই ৫টা চেক-ইন করা লাগেজ নিয়ে ৩ নাম্বার টার্মিনালে যেতেই হবে। এবং সেখানে গিয়ে আমেরিকান এয়ার-এর চেক ইন কাউন্টারে গছাতে হবে এইসব জিনিসপত্র।

সমস্যা নাই। আমাদের হাতে অফুরন্ত সময়। আরো সাড়ে চার ঘণ্টা পরে আমাদের লোকাল ফ্লাইট। আমরা ৩ নাম্বার টার্মিনালে এসে ৫টা বোচকা বুঝিয়ে দিয়ে বসে থাকি। চার ঘণ্টা সময় কাটানোর জন্য আমার কাছে একমাত্র উপভোগের কাজ ইন্টারনেট ব্রাউজিং। কিন্তু  এখানে সেরকম কিছু দেখছি না। লন্ডনে বিমানবন্দরে নামতেই ১২ জিবি ইন্টারনেটসহ একটা সিমকার্ড ধরিয়ে দিয়েছিল আমার ছোট ভাই রাসেল। এখানে কে দেবে? যার কাছে যাচ্ছি আমার ছোটবোন নুরু, তার সঙ্গে দেখা হবে ডেট্রয়েট বিমানবন্দরে।

ইবন, আমার পনেরো বছর বয়েসী পুত্র আমার চেয়ে ভালো ইংরেজি বলে। তাকে বলি, ঐ কাউন্টারে গিয়ে জেনে আয়, ওদের ওয়াইফাই পাসওয়ার্ড আমাদের দেবে কিনা।
আমি যাবো না। কারণ ওরা আমাকে পাসওয়ার্ড দেবে না।
কেন?
ওরা মনে করেছে আমি আন্ডার টুয়েলভ!
কেমনে?
দেখো নাই, চেক ইনের সময় সিকিউরিটি চেকিংএ তোমরা সবাই জুতা খুলছো, আমাকে জুতা খুলতে বলেনি।
কেন বলেনি?
ওখানে লেখা ছিল, বারো বছরের নিচের বাচ্চাদের জুতা খুলতে হবে না। আমাকে ভেবেছে বারো বছরের  কম। এখন আমাকে ওরা ওয়াইফাই পাসওয়ার্ড দেবে না।

এবার আমি উঠে গিয়ে কথা বলি। ঘটনা প্রায় সত্য। নো ফ্রি ওয়াইফাই। প্রতি পনেরো মিনিটের জন্য পনেরো ডলার দিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করা যাবে। এমন সময় ইবন এসে বলল, ঐ বুথে ইন্টারনেট সিম পাওয়া যায়। তুমি চাইলে কিনতে পারো। ২০ ডলার দাম।
আমি বুথের কাছে যাই। কিন্তু বিশ ডলারের নোট পাই কোথায়? পাশে একটা স্যুভেনির শপ। ওখানে এক বৃদ্ধা দোকানদারী করছেন। তাকে অনুনয় করে বলি, আপনি কি আমার একশ ডলারের নোটটা ভাঙিয়ে দিতে পারবেন? আমার বিশ ডলারের একটা নোট লাগবে।
বৃদ্ধা মুখের মধ্যে মুচকি হাসি চেপে বললেন, আমি অত্যন্ত দুঃখিত, আমার দোকান থেকে কিছু না কিনলে আমি কখনো ভাংতি দিতে পারি না।
বৃদ্ধাকে বললাম, আমি ঐ বুথের ভেতরে ২০ ডলার ঢুকিয়ে সিমকার্ড নেবো। আমি ১০০ ডলার ঢুকালে বাকিটা কি ফেরত আসবে?
বৃদ্ধা বলল, আমি এটা জানি না।

বিরক্ত হই মহিলার ওপর। এই বুথের পাশে চাকরি করতে করতে এই মহিলা বুড়ি হয়েছেন সে কি এটা জানবে না? কেনো জানবে না? আমার কমন সেন্স বলছে, বাকি টাকা ফেরত আসবে। কিন্তু যদি না আসে।
আমার বিরক্তির বিষয়টা মহিলা টের পেলেন। তিনি আমাকে পরামর্শ দিলেন, পাশে একটা ব্যাংক আছে। সেই ব্যাংক আমার নোট ভাঙিয়ে দিতে পারবে।

পরের দেশে এসে মেজাজ দেখানো যাবে না। আমি লক্ষ্মীছেলের মতো কথা শুনি। সেই ব্যাংকে গিয়ে নোট ভাঙাই এবং ২০ ডলার ঢুকিয়ে দিতেই একটা কার্ড বেরিয়ে আসে। সেখানে ৩ রকমের সিমকার্ড। আমার ফোনের জন্য প্রয়োজনীয় ‘নেনো’ সাইজের সিমও আছে। এবং এটা ঢুকিয়ে মিনিট পাঁচেকের মাথায় আমার ফোনটা ইন্টারনেট যুক্ত হয়ে যায়। কিন্তু কপাল ভালো না। মাত্র ১৫ মিনিট ব্রাউজিংয়ের পর দেখি ২০ ডলারের ব্যালেন্স শেষ। এটা একটা আন্তর্জাতিক সিমকার্ড। এটা পৃথিবীর সব দেশে চলে কিন্তু গলাকাটা রেট। সব কিছু বুঝে ওঠার আগেই ২০ ডলার শেষ!

এবার দিনের সর্বশেষ ধাক্কা ডেট্রয়েট বিমানবন্দরে। এখানে নামতেই ফূর্তি ফূর্তি ভাব। প্রথমত কোনো ইমিগ্রেশনের ঝামেলা নাই। শিকাগো থেকে ১ ঘণ্টা ১০ মিনিটের ফ্লাইটে ডেট্রয়েট নেমে আমরা ব্যাগ খুঁজে হাতে নেই। আমাদের নামার আগেই ব্যাগ এসে হাজির। ইবন সাহেব নাচতে নাচতে ট্রলি আনতে যান। আমাদের লাগে তিনটা ট্রলি এবং এই ট্রলি ঠেলার কাজে তার আনন্দ অনেক বেশি। এর আগে হিথরো বা শিকাগোতে টান দিয়ে খুলে এনেছেন একসঙ্গে তিন ট্রলি। কিন্তু এখানে তিনি সুবিধা করতে পারছেন না। মুখ পানসে করে বলছেন, বাবা ট্রলি তো লক।
আমি জানি কেন লক।
এর আগেও এমন হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল এরাইভাল ছেড়ে ডমেস্ট্রিক ব্যাগেজ ক্লেইমে এসে এমন ঝঞ্জাটে পড়েছিলাম আগেও। তখন ছিল এক ডলার ভাড়া। এবার গিয়ে দেখি ১৪ বছরে এটা বেড়েছে ৪ গুণ, ৪ ডলার হয়েছে।

বলি, একটা ট্রলি নেই। ভারিগুলো গাদাগাদি করে একটায় রাখি। বাকিগুলো হাতে টানবো। আমি পাঁচ ডলারের নোট ফেলি। সঙ্গে সঙ্গে এক ডলার ফেরত আসে। এবার ইবন টান দিতেই তার হাতে চলে আসে একটা ট্রলি।
ইবন ভাবে, সব ট্রলিই এমন হবে। সে আরেকটা ট্রলিতে টান দেয়। আর কোনো ট্রলি নড়ে না। আবার কড়ি ফেললে আবার মাখার তেল আসবে। নো কড়ি, নো তেল- এই হচ্ছে আমেরিকা।

১৫ বছর পর আবার স্বপরিবারে আমেরিকা। ডেট্রয়েট বিমানবন্দরের এরাইভাল লাউঞ্জে । অক্টোবর ২০১৫।

ডেট্রয়েট বিমানবন্দরের এরাইভাল লেখা দরোজা দিয়ে বেরোতেই দেখি দুটো বড় গাড়ি নিয়ে এসেছে নুরু, সঙ্গে তার স্বামী মহিবুব, কন্যা শাপলা, সাদিয়া, পুত্র শাহরিয়ার দেবর বাবলু আর আত্মীয় সুলেমান। ১৪ বছর আগে একা একা আমেরিকা ঘুরে দেখেছিলাম এবার স্ত্রী-পুত্র নিয়ে এসেছি। দেখি না এ ক’বছরে আমেরিকার কী পরিবর্তন হয়েছে।

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৫, ডেট্রয়েট, মিশিগান

স্টারলিং হাইটস-এর কিলবোর্ন ড্রাইভ

ডেট্রয়েটের স্টারলিং হাইটস গ্রামটা চমৎকার। এই গ্রামের কিলবোর্ন ড্রাইভ নামে যে ছোট গলিটা আছে তার দু’পাশে কতগুলো একতালা চার চালা বাড়ি। বাড়িগুলোর দেয়াল নাই, নাই কোনো সীমানা প্রাচীর। এমনকি কখনো কখনো ঝোপঝাড় দিয়ে যেভাবে আলাদা করা হয়, সে রকম কিছুও না। প্রতিটি বাড়ি প্রায় একই রকমের ডিজাইন। বাইরে থেকে একই হলেও ভেতরে সবার আলাদা কিনা বোঝা যায় না।

এই গ্রামের একটি বাড়িতে এসে উঠেছি আমরা। আমার ছোট বোন নুরুরা থাকে এখানে। ২০০১ সালে যখন এসেছিলাম তখন ছিলাম হ্যা¤পট্রামক নামক একটা লোকালয়ে। সে এলাকাটিতে প্রচুর বাংলাদেশী ছিলেন। ১৪ বছরের ব্যবধানে আমেরিকার পরিবর্তনের মতো তাদেরও পরিবর্তন হয়েছে। এর মধ্যে দুই দফা ঘর বদল করেছে তারা। বছর খানেক আগে এসেছে এই গ্রামে।

সকাল বেলা ঘুম ভেঙে যায় অনক ভোরে। জেট লেগ কেটে যাবার কথা নয় আমার। সকাল ৭টায় ঘুম ভেঙে যাবার পর মনে হলো, এখন তো ঢাকায় বিকেল ৫টা! এতো বেলা পর্যন্ত ঘুমাই কী করে!

সকাল বেলা আমি একা দরোজা খুলে বাইরে আসি। কোথাও কোনো কোলাহল নেই। এমনকি পাখির কোনো ডাকও কানে আসে না। অক্টোবরের প্রথম দিনে ভোর বেলা বেশ শীত। ৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস।

শীতের তীব্রতা মিশিগানে কাবু করে ডিসেম্বর থেকে। এখন তার আগমনী শুরু হয়ে গেছে। মাঝ দুপুরে অবশ্য ঝকঝকে রোদে তেমন শীত শীত বোধ হয় না। কিন্তু সকালটা বেশ গুমোট।

আমি বাইরে দাঁড়িয়ে দেখি, এক মা তার সন্তান নিয়ে ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। সেকেন্ড কয়েক দাঁড়ানোর পর দেখা গেলো একটা স্কুলবাস এসে বাচ্চাটাকে বাসে উঠিয়ে নিয়ে গেলো, মা তার ঘরে ফিরে গেলেন। একটু দূরের আরেক বাড়ি থেকে এক চৈনিক তরুণী বেরিয়েছে। তার কাঁধে ঝোলানো হ্যাভার সেক। মেয়েটি ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তার কাছে আসার আগেই একটা জীপ এসে তাকে তুলে নিল। কোথাও কেনো কথাবার্তা, গাড়ির হর্ন, কোনো কিছু নাই।

এসব বাড়ি আমার অনেক দেখা হয়েছে। মাঝখানে একটা সরু রাস্তা, দু’টো গাড়ি যাওয়া-আসা করতে পারে এমন; তারপর ঘেষো পথ। সেটুকু পেরিয়ে দু’পাশে পায়ে হাঁটা পথ। তারপর একটা ছোট্ট লন এবং এরপর একটা চারচালা ঘর। একটি বাড়ি থেকে আরেকটির দূরত্ব প্রায় দেড়শ ফুটের মতো হবে। বাড়িগুলো পাশাপাশি, কারো কোনো সীমানা প্রাচীর নাই। বাড়ির সামনে যেমন খোলা উঠান, পেছনেও একটা নিজস্ব আঙিনা। এই আঙিনাগুলো একেকটা ছোট্ট খামার।

নুরুর ব্যাক-ইয়ার্ডটা বাংরিকান। এখানে তাবু টাঙিয়ে সোফা বিছিয়ে বসার জায়গার পরেও আছে একটা সবজি ও ফলের বাগান। আপেলের গাছ আছে দু’টো, সেখানে ঠশ ঠশে আপেল ধরে আছে, পাড়া হচ্ছে না। ভাইয়া এলে নিজ হাতে পাড়বেন। আছে রোজ-ভেরি ফলের গাছ। গোলাপী রঙের লিচুর মতো একটা ফল হয় এখানে। এরপর আছে বাংলাদেশী কদু ও সীমের বাগান। এই বাগানের প্রতি নুরুর যতœ অনেক বেশী। কারণ, ২০১২ সালে দেশ থেকে আসার সময় সে আমাদের গ্রামের বাড়ির কদু ও সীমের যে বীজ নয়ে এসেছিল, ঠিক সেই বীজ থেকেই ফলিয়েছে এই সবজি। কিন্তু দুঃখ একটাই যে, স্বাদটা একেবারে খাঁটি সিলেটী নয়। একটু অন্য রকম। আমেরিকায় এসে কদু আর সীমের আকারটা বড় হয়ে গেছে। এটা সম্ভবত এই মাটির জন্য। বললো- বীজের সঙ্গে যদি মাটিটাও নিয়ে আসা যেতো!

আমরা ভাইবোন মিলে বাগান দেখি। ঘরের পাশের দিকে লাগিয়েছে নাগা মরিচের গাছ। এটারও একই অবস্থা! দেশের মরিচের চেয়ে ঝাঁজ এখানেও বেশী। এর পাশে কয়েকটা টমেটো গাছ। এই টমেটো বাগান নিয়ে তার অনেক দুঃশ্চিন্তা। বাগানের গাছগুলো প্রথমে ছিলো তার সীমানার মধ্যে। ওগুলো বেড়ে গেছে এবং তার প্রায় অর্ধেক অংশ প্রতিবেশীর সীমানায় ঝুলে আছে। প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা হয়েছে এ নিয়ে। তাদেরকে সে বলেছে- তোমাদের আপত্তি হলে আমি গাছ কেটে ফেলবো। প্রতিবেশী বলেছে, আপত্তি নাই।

নুরু বলেছে, তাহলে তোমাদের অংশে ঝুলে থাকা সমস্ত টমেটো তোমাদের।

প্রতিবেশী বলেছে, তোমার কথা রাখবো। আমরা তোমার বাগান থেকে একটা টমেটো নেবো। বাকীগুলো সব তোমার।

প্রতিবেশীর গল্প শুনে মজা পেলাম। নুরু বলে- তোমার আসার কথা তাদের বলেছি। ওরা বলেছে, তোমাকে দেখতে আসবে।

আমি বলি, ওরা কোন দেশের?

নুরু বলে, আমেরিকান, বাট কিউবান অরিজিন।

 

কিউবান নেইবার

দুপুর বেলা আমি ঘরের ফ্লোরের মধ্যে বসে ল্যাপটপে ছবি বাছাই করছি, এমন সময় নুরু এসে বলে- ভাইয়া, আমার নেইবার আইছে, তুমার লগে দেখা করতো।

আমি অবাক! বলি- নিয়ে আয়।

নুরু এসেছে, ওর হাতে একটা বোতল। আমার দিকে তাকায় আর হাসতে হাসতে বলে- দেখো, এ তখটা লইয়া আইছে।

তাকিয়ে দেখি ওয়াইনের বোতল!

খালি হাতে পড়শির বাড়ি কী করে আসে! এর জন্যই কি এই আয়োজন।

এই ঘরে দুইটা বৈঠকখানা। মূল বৈঠকখানার পেছনে অন্দর মহলের ব্রেকফাস্ট কর্নারের সঙ্গে লাগোয়া অপর ঘরের ছোট্ট পারিবারিক আড্ডাখানার যে জায়গাটিতে আমি কাঠের ফ্লোরের ওপর বসে ছিলাম, তার পাশের দু’টো সোফায় এসে তারা বসেন। এদের মধ্যে যিনি স্বামী তার নাম রুয়ান আর স্ত্রীর নাম লিলিয়া। রুয়ানের বয়স ৮৪, লিলিয়ার ৭২। ৫৫ বছর ধরে তারা আমেরিকায় আছেন। রুয়ানের কেউ এখন আর কিউবায় থাকেন না। লিলিয়ার আছে। তাদের দুই পুত্র। বড়টির বয়স ৫২, ছোটটি ৪২।

তারা দু’জনই আমেরিকার মিশিগানে দু’টো আলাদা বাড়ি নিয়ে থাকেন। বুড়োবুড়ি পেনশনে আছেন। তারা একা থাকেন এই বাড়িতে। আর কোনো তৃতীয় সঙ্গী, এমনকি কোনো কুকুরও তাদের সঙ্গে থাকেন না।

রুয়ান বলেন, সন্তানদের সঙ্গে আমার মাঝে মাঝে দেখা হয়, আমরা একসঙ্গে খাই। বাড়িতে কেউ তেমন আসে না। তবে যোগাযোগ আছে। একসময় এই দ¤পতি একটা অফিসে কাজ করতেন। এখন আর কেউ কিছু করেন না।

আমরা সবাই মিলে তাদের সঙ্গে গল্প করতে বসে পড়ি। গল্প করার মতো তেমন কিছু পাই না।

আমি বলি, তোমাদের কিউবা স¤পর্কে আমি তেমন কিছু জানি না। শুধু ফিদেল কাস্ট্রের নাম জানি। ম্যারাডোনাকে তিনি খুব পছন্দ করতেন, এটাও জানি, এর বেশি কিছু না।

রুয়ান বলেন, ফিদেল একটা খারাপ শাসক। কেউ তাকে পছন্দ করে না। সবাই দেশ ছেড়ে আমেরিকা চলে আসছে শুধু কাস্ট্রর অত্যাচারে!

বলি- কিসের অত্যাচার?

রুয়ান বলেন, কিউবায় জিনিসপত্র আকাড়া। পয়সা থাকলেও জিনিস কেনা যায় না। প্রতি সপ্তাহে কী পরিমাণ কী জিনিস কেনা হবে তার একটা ফর্দ যদি আগে থেকে পাস বুকে লেখা থাকে দোকানে গিয়ে কেবল সে সব জিনিসই কেনা যাবে। ট্যুরিস্টরা অবশ্য টাকা দিয়ে যা ইচ্ছা কিনতে পারে, কিন্তু

কিউবার কেউ পারবে না। পাস বুকে যে পরিমাণ জিনিসের কথা লেখা থাকবে, শুধু সেই পরিমাণই পারবে। আমেরিকা এতো কাছের একটা দেশ, অথচ রাজনৈতিক কারণে দেশটাকে দরিদ্র করে রেখেছে, মানুষের মধ্যে আনন্দ নাই। দারির্দ্য বেশি। এ কারণে অপরাধ বাড়ছে।

আমি বলি, বাংলাদেশ স¤পর্কে কী ধারণা তোমার?

রুয়ান বলেন, বাংলাদেশও অনেক দরিদ্র, কিন্তু এ দেশের মানুষগুলোর নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ অনেক বেশি। আমরা যেমন কিউবা ছেড়ে এসে আর কিউবার কথা মনে রাখি না, তোমাদের দেশের মানুষের মধ্যে এখনো সেটা হয়নি। তোমাদের এই বাড়িতে এসেও দেখি- পারলে পুরো বাংলাদেশকে তোমরা এখানে এনে রেখে দিতে।

রুয়ানকে নিয়ে আমরা সবাই ঘরের পেছন দিকের বাগান দেখাই। বাংলাদেশী মরিচ, লাউ, সীম-এর বীজ থেকে আমেরিকার মাটিতে গজিয়ে ওঠা সবজি দেখাই, তাদের বাংলা নাম শেখাই। রুয়ান একটা কাগজ বের করে ইংরেজীতে লিখে কঙউট/ধিঃবৎ ঢ়ঁসঢ়শরহ, গঙজওঈঐ/মৎববহ পযরষষর, খঙএও টজও/ এৎববহ ইবধহং,  আমেরিকান রোজ-ভেরী আর আপেলের সঙ্গে বাংলাদেশী লাউ মরিচের বাগানে আমরা অনেকক্ষণ সময় এক সাথে আড্ডা মারি।

এক পর্যায়ে নুরু নিয়ে এক কোনায়। ঘরের ভিটার সঙ্গে লাগানো মরিচ বাগানের কাছে যায়। রুয়ানকে বলে, হ্যাভ এ লুক।

রুয়ান তাকায় মরিচ গাছের দিকে। কিছু বলে না।

নুরু বলে- সি, দিস ইজ রেড এন্ড গ্রিন।

এবার মুচকি হাসেন রুয়ান। বলেন, দিস ইজ ইয়োর ফ্লাগ কালার, আই থিঙ্ক।

নুরু এবার খুশী। বলে, থ্যাঙ্ক ইউ ।

আমেরিকার মিশিগান অঙ্গরাজ্যের স্টার্লিং হাইটসের কিলবর্ন পাড়ার এক বাড়ির বাগিচ্রা মরিচ বাগানেও লাল-সবুজের জয়জয়কার।

 

আপেল বাগিছা

নুরুর বিছরায় (সিলেটী শব্দ, ছোট শবজি ক্ষেত/ বাগান) সুপারী গাছের আকারে একটা আপেল গাছও আছে এবং এই গাছে কয়েকটা আপেল লাল হয়ে পড়ে আছে কয়েকদিন ধরে। আপেলগুলো অপেক্ষা করছে বাংলাদেশ থেকে আসা অতিথিদের। তাদের হাতের স্পর্শে আপেলগুলোর জীবনাবসান হবে, এমনটি ছিলো পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের এক পর্যায় যখন ঘটছে তখন আমি ঘরের ভেতর থেকে দেখি এক কিশোর ক্যামেরা নিয়ে তাক করে আছে আর তার মধ্যবয়েসী জননী আপেলের গায়ে হাত দিয়ে রেখেছেন। ছবিটা তোলার জন্য হাত ফ্রিজ করে রাখা। ফটোগ্রাফার যখন নিশ্চিত করলেন যে ছবিটা তোলা হয়ে গেছে, তখন নিজ হাতে পাড়া আপেলটি মধ্যবয়স্কার দন্তগহŸরে নিষ্পেষিত হতে শুরু করে। তার মুখাবয়বের মধ্যে বিবি হাওয়ার মতো ফ‚র্তির ভাব। হাওয়া বিবিও তো এই আপেল খেয়েছিলেন! নাকি অন্য কিছু?

আমেরিকানরা আপেল প্রিয়। বাইবেলে মাদাম ইভ তো এই আপেলই খেয়েছিলেন! আমেরিকানদের কাছে আপেল একটা প্রধান খাবারও। সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে রাতের ডিনারে পর্যন্ত আপেলের রস, সরবত, পাই, এসবের কিছু তাদের চাইই। পৃথিবীতে বছরে ৮শ কোটি টন আপেল উৎপন্ন হয়। চীনের পরে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম আপেল উৎপাদক হচ্ছে আমেরিকা।

গাছ থেকে এই আপেল মাটিতে পড়তে দেখেই কিন্তু আইজ্যাক নিউটন ভেবেছিলেন এটা উপরে না উড়ে, নিচে পড়তে গেলো কেনো?  তারপর তিনি জানান দিলেন মহাকর্ষ তত্ত¡, বল বিদ্যা, কত কিছু। শুধু নিউটনই নন, পৃথিবীর আকার বুঝাতে আপেলের কথা বলা হয়ে থাকে। আর স্ট্রিভ জবস যে প্রডাক্ট উদ্ভাবন করে পৃথিবীকে একটি ছোট্ট গোলকের মধ্যে আটকে দিলেন, তার নামও দিলেন আপেল। আইফোন, আইপ্যাড, আইপড ম্যাকিন্টস এসবইতো এইআপেলের লগোটি বহন করে।

আপেল নিয়ে অতো কথাবার্তা শুনছি গত দু’দিন ধরে। এসব শুনে নুরু বলে, আজ বিকেলে তোমাদেরকে নিয়ে যাবো এক জায়গায়, দেখবোনে কত আপেল পাড়তে পারো।

আমেরিকার এই শহরে কেউ নিজের গাড়ি ছাড়া চড়ে বলে মনে হয় না। পাবলিক বাস চোখে পড়ে না, শহরের মধ্যে ট্রেন নাই। ঘরে ঘরে জনে জনে গাড়ি লাগে। আমি যাদের মেহমান হয়েছি, এই বাড়িতে চারজন থাকে, তিনজন প্রাপ্ত বয়স্ক, তিনজনই গাড়ির চালক, তাদের দুইখানা গাড়ি। তারপরও একজনকে নিয়ে আসা হয়েছে বাফেলো থেকে। আমাদের হায়ারি সোফার বাবলু ভাই।

ডেট্টয়েট বিমানবন্দরেই দেখা হয়েছে বাবলু ভাইকে। আমার ছোট বোন নুরুর ছোট দেবর তিনি। ১৯৯০ সালে নুরুর যখন বিয়ে হয়, তখন তার স্বামীর অন্যতম প্রধান পরিচয় ছিলোÑ তিনি বাবলু গোলকির বড় ভাই। বাবলুর পরিচয় তিনি ফুটবলের গোলকিপার। আমার শৈশবে তাকে বিভিন্ন টিমের হায়ারি প্লেয়ার হিসেবে দেখেছি। এখানে যখন জানলাম আমাদের জন্য তাকে বিশেষ ব্যবস্থায় তার কর্মস্থলের শহর বাফেলো থেকে নিয়ে আসা হয়েছে, শুধুমাত্র অপর একটি গাড়িতে কওে আমাদের নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর জন্য। এই হায়ারি প্লেয়ারকে দেখেই আমার ফূর্তি দ্বিগুণ বেড়ে যায়। আপাদমস্তক এক বাউল এই মানুষটার অনেক বদনাম পরিবারে। প্রায়ই নাকি তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। তার যখন খোঁজ পাওয়া যায়, তখন তিনি হয়তো হন্দুরাস বা মেক্সিকো। বিয়ে করেছেন নর্থ ক্যারোলিনার এক আমেরিকান তরুণীকে, কিন্তু মন পড়ে থাকে বাউলিয়ানায়। গানের আসর তার প্রিয় জায়গা। সেটা হোক আমেরিকান বøুজ কিংবা ভাটি বাংলায় কোন হাওড়।

সেই বাবলু ভাই এ ক’দিন আমাদের সঙ্গ দিবেন এবং আমেরিকার কিছু এক্সলুসিভ জায়গা দেখাবেন। এখন আমরা ছুটে চলি আপেল অর্চাড এর দিকে। এটি শহর থেকে ৩৭ মাইল দূরে। আমাদের জিপিএস নেভিনেশনে বলেছে ৪১ মিনিট পর আমরা ওখানে গিয়ে পৌঁছাবো।

আমেরিকার জিপিএস সিস্টেম এখন আরো উন্নত হয়েছে। জিপিএস ডিভাইস ছাড়াও এখন অনেক সাধারণ ফোনেও এই এপ্লিকেশন পাওয়া যাচ্ছে। ২০০১ সালে ইন্টারনেট থেকে ম্যাপ প্রিন্ট আউট নিয়ে বেরিয়েছিলাম নিউইয়র্ক থেকে বোস্টনে। এখন  আমাদের মোবাইল ফোনেই সেই সুবিধা এসে গেছে। এসব নিয়েই ঠিক ৪১ মিনিটের মাথায় আমরা যেখানে এসে পৌঁছি সেখানেই এই সাইন বোর্ডErwin’s Orchard and Ceder Mill.

আমাদের দুই গাড়ি এসে থামে একটা পার্কিং লটে, তার পাশে ছাদখোলা ট্রেনের বগির মতো লম্বা কতগুলো লরি দাঁড়ানো। খানিক পরে মুহিবুব (নুরুর স্বামী) একটা ব্যাগ নিয়ে চলে আসে। গাড়িতে গিয়ে বসি। এবং এক সময় তিন ডাব্বার লরিমার্কা গাড়িটি ছুটে চলে একটা ক্ষেতের মধ্য দিয়ে।

শ’দুই গজ যাবার পর গাড়ি থেমে যায়। গাড়ির ড্রাইভার নেমে ঘোষণা দেন এটা হচ্ছে এঙখউঊঘ উঊখওঈওঙটঝ আপেল বিভাগ। এখানে নেমে পড়, আর যত ইচ্ছা আপেল খাও।

নুরুর বিছরার পর এই আমার দ্বিতীয় আপেল বাগান দেখা। এ রকম আঙ্গুরের ক্ষেত দেখেছিলাম চিলিতে। আমোদিত হয়েছিলাম। এবার দেখি আপেল ক্ষেত। গাছগুলো ছোট সাইজের পেয়ারা গাছের মতো। ৯-১০ ফুট উঁচুতেই তার উচ্চতা সীমিত। সবুজ পাতার ফাঁক দিয়ে ঝুলে আছে কিছু সবুজ, কিছু সোনালী আর কিছু লাল রং এর আপেল। গাছে যে পরিমাণ ঝুলে আছে, তার অনেকগুণ বেশি পড়ে আছে মাটিতে। মাটিতে পড়াগুলো লাল। কিছু পঁচে যাচ্ছে। কিছু ঠিক। বাবলু ভাই বলেন, ওগুলো আরেকটু পচলেই তুলে নেয়া হবে। ওয়াইন বা বিয়ার বানানোর কাজে লেগে যাবে এই আপেল।

আপেল বাগানে এসে আমাদের দলের বিশেষ করে নারী ও শিশু সদস্যরা অতিমাত্রায় উল্লসিত হয়েই পড়েন। হাত বাড়ালেই যেহেতু আপেলের নাগাল পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে শান্তি নাই। কষ্ট করে গাছ বাইতেই হবে। গাছগুলোও বামুনের মতো। দুই ফুট উপরে উঠলেই গাছের মাঝডালে পৌঁছা যায়। এমন উচ্চতার গাছের ডালে উঠে আনন্দে নয় খানা হচ্ছেন তারা। গাছের উপরে বসেই আপেল নিয়ে কামড়াকামড়ি শুরু করে দিয়েছেন। এসবে এখন নির্দেশনা দিচ্ছেন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পর্যটক নুরজাহান। তিনি বলছেন, চাবিয়ে চাবিয়ে রস খেয়ে চাবা ফেলে দিতে হবে, তা না হলে বেশি খাওয়া যাবে না। আর আপেলের শাঁস খেয়ে পেট ভরানোর কোন প্রয়োজন নাই। সবার উদরের যা অবস্থা, তাতে ফর্মালিনমুক্ত এই আপেলও আপাততঃ দুটোর বেশি চাবানোর সুযোগ নেই। ব্যাগ আছে একটা এটা ভরা যাবে। এই ব্যাগটা নেয়া হয়েছে ১৭ ডলার দিয়ে। পুরো পরিবারের জন্য এই কী। আমরা দেখে দেখে গোল্ডেন আপেল দিয়ে ব্যাগ ভরে ফেলি। এক দুটো প্যান্টের, জ্যাকেটের পকেটে, এক দু’টো হাতে। আমি চিন্তায় পড়ে যাই। এখানে ওদের লাভ কোথায়? লাভ ছাড়া আমেরিকায় কোথাও কোনো সার্ভিস নাই।

লন্ডনে দেখেছি রাজ পরিবারের দান-খয়রাত (চ্যারিটি)-এ কিছু জাদুঘর ফ্রী দেখা যায়, আমেরিকাতে ফলের খামার দেখিয়ে ফ্রী খাইয়ে দেবে, এটা আমার বিশ্বাস হয় না। ১৭ ডলার দিয়ে আমরা ৯ জন এসেছি। জন প্রতি দুই ডলারের কম খরচ। এ দিয়ে গাড়ি চড়িয়েছে ফ্রী। এখন আবার ওদের দেয়া ব্যাগ ভর্তি করে নিচ্ছি। ওজন প্রায় ৩০ পাউন্ড। দোকান থেকে কিনলে প্রতি পাউন্ড ৩ ডলারে কিনতে হবে। একশো ডলারে আপেল ১৭ ডলারে কেনো দেবে বুঝতে পারি না।

আমার সঙ্গী আমেরিকান বাঙালিরা বলেন অন্য কথা। বলেন, চাষবাসের জন্য আমেরিকা খুব উদার। নানা রকমের সুযোগ সুবিধা দেয়া থাকে। খাবার খেয়ে মানুষ যাতে তুষ্ট থাকে, আমেরিকা তার জন্য সব করে। এটা দেখানো এর অন্যতম উদ্দেশ্য। এটা ছাড়াও গেটের কাছে ওদের দোকান আছে। সেই দোকানে এই বাগানের আপেল দিয়ে বানানো নানা রকমের উপাচার আছে। এসবের মধ্যে আছে বিয়ার, ওয়াইন, পাই, টেট্রি, কেক, জ্যাম, জেলি এমনকি চাকসহ মধুও।

আমরা ঘণ্টা দুই সময় এখানে থাকি। শেষ বিকেলে শরৎকালের আমেরিকান আকাশে ফকফকা রোদে সাদা মেঘ আর নীর আকাশ এক ব্যঞ্জনাময় পরিবেশের সৃষ্টি করে। আমরা ফটোসেশনে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। লন্ডন থেকে রাসেলের কাছ থেকে নিয়ে এসেছি একটা সেলফি স্টিক। এটা আমার প্রধান বিনোদন। ছবি তোলা এখন অনেক সহজ। নিজেকে আর আড়াল করার সুযোগ নাই। আমি নিজের ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট দেই। একটা ছবি দেখে আমার বন্ধু ফজলে রাব্বী চট্টগ্রাম থেকে মন্তব্য করে। সে লিখেছিল দোস্ত, তুই গাছের নিচে গিয়ে বসে থাক। মাথার উপর যদি বাইচান্স একটা আপেল পড়েই যায় তখন স্যার আইজ্যাক শাকুরের তিন সুত্র স্কুল সিলেবাসে যুক্ত হয়ে যাবে। রাব্বিকে তাঁর মন্তব্যেও কোন জবাব দেই না। আমি বরং সেলফি তোলা কমিয়ে দিয়ে দলের সঙ্গে স্টার্লিং হাইটস-এর দিকে ছুটে চলি।

ডালকাটা ৪০ হাজার

নুরুর বাগানে একটা গাছ ছিলো। গাছে এখন আর ডালপালা নাই। গুড়ি থেকে উপরটুকু কেটে ফেলা হয়েছে। বললো, ওটা কাটাতে আটশ ডলার খরচ পড়েছে।

বলে কি!

গাছ কাটার খরচ চলি­শ হাজার টাকা!

এখানে এমনই। গাছ লাগাতে হলে চারা কিনে আনতে হয়। ভালো চারা ১০-১৫ ডলার। কিনে এনে নিজের অংশে নিজে লাগাবে। আবার এই গাছ বড় হয়ে গেলে এটা ডিস্টার্ব। যে কোনো সময় ডাল ভেঙে পড়া, কিংবা গাছের পাতার ছায়া থেকে সবজি বাগানকে ঢেকে দেয়া, সব কিছুতে ঝামেলা তৈরি করে। সেজন্য গাছ কাটার গাড়ি ডাকতে হয়। সে যে কো¤পানি ডেকেছে, তারা গাছের সাইজ দেখে বলে দিয়েছে, আটশ ডলারের কমে পুরোটা কেটে দেবে না।

দাম দর শুরু হলো। বলা হলো পাঁচশ ডলারে কী পরিমাণ কাটবে?

তারা গুড়ি থেকে ১২ ফুট উঁচুতে চারটা ডাল কেটে দিয়ে যাবে এই পাঁচশ ডলারে। কাটা শেষ হরে গাছকাটরাকে বলা হলো, এবার গুড়িটা কেটে দাও, আরো দুইশ ডলার দেবো।তারা রাজি না। আরো তিনশ ডলার দিলেই কেবল গাছ কেটে দেবে।

এই গাছ কাটার পর কাটা গাছ তারা গাড়িতে উঠাবে। সেই গাড়ি চলতে চলতে এই গাছের প্রত্যেকটা

অংশ গুঁড়া হযে যাবে। এই গুঁড়া থেকে তৈরি হবে নানা রকমের বোর্ড। গাছের মালিক তার কিছুই পাবে না। যারা গাছ কেটে নিলো গুঁড়ার মালিক তারাই। গাছ লাগানোতে টাকা, গাছ কাটাতেও টাকা।

এক রাতে ৬ ডলার

শাপলার বাবা মহিবুর রহমান একটা ফার্নিচার কিনেছেন বাসার জন্য। গাড়িতে ওঠানোর সময় দেখা গেলো পেছনের বুটে এটা ধরছে না। তাদের আরেকটা বড় গাড়ি আছে, সেই গাড়িতে করে পরের দিন এটা নিয়ে যাবেন এমনটি বলে দোকানে রেখে এলেন জিনিসটা।

পরদিন এই কিচেন কাউন্টার ডেলিভারির সময় ৬ ডলার অতিরিক্ত চার্জ করা হলো। কারণ, ওটা গতকাল ডেলিভারির কথা ছিলো, হয়নি। তাদের স্টোরে এটা অতিরিক্ত কয়েক ঘণ্টা রেখে দেয়া হয়েছিল। স্টোরেজ চার্জ ১৪৫ ডলারের সঙ্গে আরো ৬ ডলার। এটা দিয়েই তাকে ফেরত আনতে হয়েছে ফার্নিচার।

শাপলার গাড়িতে তার জিপিএস মাঝে মাঝে কাজ করে না। ভুল তথ্য দিয়ে বলে আমাদেরকে গাড়িতে বসিয়ে একটা নতুন জিপিএস কিনে আনলো- দাম একশো পঞ্চাশ ডলার।

এটা শুনে তার মা’র মন খারাপ। এখন সবার ফোনে জিপিএস আছে, আবার নতুন জিপিএসের দরকার কী?

শাপলা বলে, মামারা দেশে চলে গেলে এটা ফেরত দিয়ে দেবে। দোকানে বলেই এনেছে- ১৫ দিন পর ফেরত দিলে টাকা ফেরত দিয়ে দেবে।

নুরু বললো, এখানে যেকোনো দোকান থেকে ১৫ দিন বা ৩০ দিনের মধ্যে ফেরত দিলে কোনো প্রশ্ন না

করেই টাকা দিয়ে দেয় শুধু ট্যাগটা লাগানো থাকলেই হয়, আর কিছু না। মেশিনারিজ জিনিস ১৫ দিন, অন্য যে কোনো কিছু ৩০ দিনের মধ্যে ফুল রিফান্ড। কেউ প্রশ্ন করবে না, কী কারণে ফেরত এলো।

গার্বেজ ডে

মিশিগানের এই পাড়ার নাম কিলবোর্ন ড্রাইভ। এখানে সোমবার হচ্ছে গার্বেজ ডে।  রোববার রাতে সবাই তাদের বাসার সামনে ঝাপি ঝাপি ময়লা স্তুপ করে রাখবেন এবং সোমবার সকাল বেলা ময়লা ফেলার গাড়ি এসে সব ঝাপি গাড়িতে তুলে নিয়ে যাবে। তবে কোনো ময়লাই খোলা থাকবে না, সবকিছু প্যাকেট বন্দি।

এই ময়লা ফেলার জন্য আলাদা কোনো চার্জ নাই। মাসে মাসে মিউনিসিপ্যালিটি যে ট্যাক্স নিয়ে থাকে,

সেখানে এটার উলে­খ থাকে। এটা বাধ্যতামূলক। এই ট্যাক্স দিতেই হবে এবং এর বিনিময়ে সপ্তাহবারে

তাদের অঙ্গন পরিষ্কার হয়ে যাবে।

শুধু ময়লা পরিষ্কার নয়, বাচ্চাদের স্কুল বাসের মাইনেও ট্যাক্সের সঙ্গে যুক্ত। প্রতিদিন ঘড়ি ধরে একই

সময়ে বাস এসে নিয়ে যাবে, দিয়ে যাবে স্কুলের বাস। এর জন্য আলাদা কোনো চার্জ নাই।

মিউনিসিপ্যালিটির ট্যাক্সই যথেষ্ট।

কুকুর যখন প্রাণের বন্ধু

আমার পুত্র ইবন সাহেব খুব মনোযোগ দিয়ে কুকুরের ছবি তুলেন। কুকুর নিয়ে রাস্তায় মানুষজন হেঁটে যাবেই, দোকানে কুকুরের বাচ্চা বিক্রি হচ্ছে- এসব তার খুব প্রিয় বিষয়।

পশ্চিমাদের কুকুর প্রীতির বিষয়টা আমার কাছে পুরনো। স্ক্যান্ডানিভিয়ান দেশগুলোতে কুকুর প্রীতি সবচেয়ে বেশি দেখেছি। ¯প্যানিশ, ইতালীয়রা আমেরিকায় এসেছে, সঙ্গে তাদের কুকুরও নিয়ে এসেছে। কুকুরপ্রীতি ইউরোপীয়দের পুরনো সংস্কৃতি। জীবনে একপর্যায়ে এসে তারা আÍীয় ও বান্ধবহীন হয়ে কুকুরের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। মূলত মাঝ বয়সের পর থেকে তারা এই সঙ্গ গ্রহণ করে।

আমাদের এই মিশিগানের বাসার বাফেলোর হায়ারি প্লেয়ার বাবলু ভাই আমেরিকা বিশেষজ্ঞ।  সর্বজান্তা। আমেরিকার এমন কোনো বিষয় নাই, যে ব্যাপারে তিনি জ্ঞান না রাখেন। কথা বলার সময় বলবেন, আপনি শুধু ইন্টারনেটে ফিগারটা মিলাই নেবেন। স্ট্যাটিসটিক্স আমার মুখস্ত নাই এটা ছাড়া- আমি যা বলবো, সব কারেক্ট।

তিনি বলেন, আমেরিকায় ৩ জাতের কুকুর আছে। এদের মধ্যে খান্দান কুকুরের নাম জার্মান শেফার্ড। একেকটা বাচ্চার দাম ৬-৮ হাজার ডলার। এরা যে কোনো মানুষের চেয়ে বেশি উপকারী। এরা কেউ সেনাবাহিনী, কেউ পুলিশ, কেউ গোয়েন্দা, কেউ সিকিউরিটি গার্ডের কাজ করে। এরা ৫১টা শব্দ মনে রাখতে পারে। ছোটবেলায় তাদেরকে ল্যংগুয়েজ কোর্স করানো হয়। যে ভাষায় শেখানো হবে, সেই ভাষাই শিখবে। তাদেরকে ¯স্প্যানিস শেখালে ইংরেজি বুঝবে না। পুলিশী অপারেশনে এরা কাজে লাগে বেশি। দরোজার সামনে এসে পুলিশ তার কানের কাচে গিয়ে বলবে- সার্চ ড্রাগ। শুধু এই দুই শব্দ শুনে তারা ঘরের ভেতর ঢুকবে। এরা ১০ রকমের ঘ্রাণ ধরতে পারে। গাড়ির টায়ারের ভেতরও যদি কেউ

গাঁজা লুকিয়ে রাখে, তারা গন্ধ শুকে বের করে ফেলবে। ড্রাগ ডিকেক্ট করার পর তারা ওখানে দাঁড়িয়ে থাকবে, সরবে না।

এসব কুকুর ঘরের সামনে বা দরোজার সামনে বসিয়ে রেখে বেরিয়ে যেতে পারেন নিঃশঙ্কোচে। সে পাহাড়ায় থাকবে। তার জীবন থাকা অবস্থায় অন্য কেউ এ বাড়িতে যেতে পারবে না।

ওদের মধ্যে র্যা ট হুয়েলার দ্বিতীয় স্তরের। এদের বাচ্চাগুলো দেড়-দু’ডলারে। জন্মের পর প্রথম ৬ মাসের মধ্যে তাদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়ে যায়। এরা অনেক বেশি প্রভুভক্ত। কিন্তু জার্মান শেফার্ডের মতো ওতো বিচক্ষণ নয়। কিন্তু ভালোবাসা পায় অনেক বেশি। প্রভুর জন্য জান বাজি রেখে তারা প্রভুর সঙ্গে বিচরণ করে। তাদের সঙ্গ দেয়।

কুকুরের মধ্যে আলাস্কান হাসকিও প্রভুভক্ত। এরা শ্রমিক শ্রেণির। বরফের অঞ্চল যেখানে গরু বা ঘোড়াও পা চালিয়ে চড়তে গিয়ে পিছলা খায়, তারা তখন ১০/১২ জনের একটা দল তার প্রভুকে এবং তাদের মালামাল নিয়ে দৌড়ে চলে। বরফের মধ্যে তার কোনো মনিব যদি বিপদে পড়ে সে তাদের স্বজাতিদের নিয়ে এসে তাকে উদ্ধার না করে জায়গা ছাড়ে না।

কুকুরের জন্য এখানে আলাদা খাবার, আলাদা ঘর,আলাদা বাথরুম থাকে। তাদের ডাক্তারও আছে, ক্লাবও আছে। তারাও খেলাধুলা এবং শরীরচর্চা করে। যাদের ঘরের ভেতর আলাদা বাথরুম নাই, তারা মনিবের জন্য অপেক্ষা করে। দরোজা খুলে দিলে বাইরে গিয়ে কাজ শেষ করে আসবে, কখনোই ঘরের ভেতর নোংরা করবে না।

ছোট কাজ পা উঁচিয়ে গাছের তলায় সেরে ফেলে। বড় কাজ করে নির্জনে সেটা পরিষ্কার করার জন্য তার প্রভু পরে তৈরি থাকেন। কুকুরে ফেলে দেয়া জিনিস নিজ হাতে গ্লাভস উল্টিয়ে তিনি গাড়িতে ভরে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলবেন মনের আনন্দে। তার পোষা কুকুর এটুকুর প্রতিদান দেবার জন্য তার জীবনটা এই মনিবের জন্য রেখে দেন। দুই পক্ষের এই ভালোবাসার টান দু’দলকেই পর¯পরের প্রতি নির্ভরশীল করে রাখে। আর এ কারণেই বোধহয় মানুষের চেয়ে কুকুরের প্রতি এঁদের এই নির্ভরশীলতা।

 

পাথরে আঁকা লাল-সবুজের পতাকা

মিশিগানের স্টারলিং হাইটস শহরতলির বাড়িগুলো একটু অন্যরকম। আপাত দেখতে সবগুলো বাড়ি এক তলা। ভেতরে ঢুকে এখানেও দেখা যায় মাটির নিচে আরও এক তলা সবার আছে।

এই গ্রামটি বেশ সুন্দর। মাঝখানে একটি গাড়ি চলার পথ, তারপর সবুজ ঘাস, তারপর পায়ে হাঁটা পথ, এরপর সবুজ লন, তারপর বাড়ি, বাড়ির পেছনে সবার জন্য আরেকটা লন।

রাস্তার পাশের যে সবুজ চত্বর তার পাশে পায়ে হাঁটা পথের কিনারে কিনারে নানা রকমের গাছ। আমি গাছের তলায় দাঁড়িয়ে দেখি ঝিরিঝিরি করে হলুদ পাতা, লালচে পাতারা ঝরে পড়ছে। উল্টো দিকের বাড়িতে একটা আমেরিকান পতাকা পতপত করে উড়ছে।

আমি আমার বোন নুরুকে বলি, তোর বাড়ির সামনে একটা বাংলাদেশি পতাকা লাগিয়ে দেই।

নুরু বলে, এটা কী করে সম্ভব, আমরাও তো এখন আমেরিকান।

তাইলে আমেরিকান পতাকা লাগাস না কেন?

নুরু হাসে। বলে, আমার ব্যাকইয়ার্ডের মরিচ গাছে বাংলাদেশের ফ্ল্যাগ আছে। সবুজ পাতা, লাল মরিচ। ঐটাই আমার পতাকা। কিন্তু মরিচ গাছের পতাকা উচ্চমার্গীয় প্রতীকী। এটা দিয়ে বোঝানো যাবে না, আবার বাংলাদেশের পতাকাও লাগানো যাবে না।

এমন সময় আমাদের চোখে পড়ে একখণ্ড বিশাল পাথর। গোলাকারের এই পাথরখণ্ড কী কারণে এখানে রাখা ঠিক বোঝা গেল না।

আমি বলি, এই পাথরে বাংলাদেশের ফ্ল্যাগ হবে। আমার জন্য দু’টো ছোট ছোট রঙের কৌটা নিয়ে আয়। এনামেল পেইন্ট। আর কিছু চক।

পরদিন দোকান থেকে দু’টো ¯েপ্র করার রঙের কৌটা নিয়ে আসা হয়। একটা লাল একটা সবুজ। সেভিং ফোমের মতো এর আকার ও ব্যবস্থা। টিপ দিলেই রঙ বেরোয়।

নুরু বলে, আমি রঙ করতে জানি। আমাদের বাড়ির আন্ডারগ্রাউন্ডের পুরো রঙ আমি নিজে করেছি। ৪০০ ডলার লেবার চার্জ সেভ করেছি এটা নিজে করে। আমি জানি কীভাবে করতে হয়।

প্রথমে পাথরটি ঘষা হবে। তারপর সাদা লাইম পাউডার মাখানো হবে। এটা শুকালে আবার ঘষা হবে এবং তারপর রঙ ¯েপ্র করতে হবে। গোলাকারের এই পাথরখণ্ডকে বাংলাদেশি পতাকায় সাজানোর কাজে উৎসাহীর সংখ্যা বেড়ে গেল। সবচেয়ে সক্রিয় দেখা গেল আমার পঞ্চদশ বর্ষীয় পুত্র ইবনকে।

আজ ১৬ অক্টোবর, তার জন্মদিন। আজ তার পনের শেষ হবে, কাল থেকে ষোল শুরু হবে। এই দিনটাকে স্মরণীয় করে রাখতে সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে রঙ করার কাজে কাউকে হাত লাগাতে দেবে না।

পাথরখণ্ডের মাঝখানে আঁকতে হবে লাল রঙের বৃত্ত। এই বৃত্ত চিহ্নিত করার জন্য রান্নাঘর থেকে ডিসপোজেবল একটা কোয়ার্টার প্লেট নিয়ে আসা হলো। তাকে টেপ দিয়ে আটকানো হলো মাঝখানে। এবার সবুজ রঙ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় পুরো পাথর।

রঙ শুকানোর পর তুলে ফেলা হয় কাগজের প্লেট। এবার স্কচটেপ দিয়ে ঢেকে ফাঁকা জায়গাটিতে লাল রঙ করার পালা। পুরো কাজটি শেষ হতে মিনিট পনের সময় লাগলো। পরদিন সকালবেলা চিক চিক করছে মিশিগানের আকাশ। নীল আকাশ আর সাদা মেঘের পটভ‚মিতে দেখি নাম না জানা গাছগুলোর নানা বর্ণিল পাতার মাঝে এই পাথরখণ্ডটি একখণ্ড বাংলাদেশের পতাকা হয়ে পড়ে আছে।

এর দু’দিন পরই আমরা মিশিগান ছেড়ে বাংলাদেশে ফেরত আসি। মাঝে মাঝে আমার বোনের সঙ্গে কথা হয়। সে আমাকে প্রতিদিন আবহাওয়ার খবর জানায়। বলে, আমরা চলে আসার পর থেকে ধীরে ধীরে শীত পড়া শুরু হয়েছে। আগের মতো আকাশ এতো ফকফকা থাকে না। সূর্য ঢেকে থাকে কুয়াশা আর তুষারে।

একদিন বললো আজ খুব বরফ পড়েছে। মৌসুমের প্রথম বরফ। যে গ্রামে আমরা ছিলাম, সে গ্রামের কোনো গাছে আর এখন পাতা নাই। গাছের মধ্যে বরফ ঝুলে আছে। ঘরের চালায়ও বরফ, গাড়ির ওপরও বরফ। যে পথ দিয়ে আমরা হেঁটে যেতাম সেই পথও বরফে সাদা হয়ে গেছে। কিন্তু যে পাথরটিকে আমরা পতাকা বানিয়ে এসেছিলাম, সেই পাথরটি এখনও ঠিক সে রকমই আছে। সাদা বরফ পড়ার পর এখন এটা আরও অনেক উজ্জ্বল। সবচেয়ে উজ্জ্বল হয় সকালবেলা, যখন রোদ এসে পড়ে। মনে হয় পাথরে আঁকা লাল-সবুজের পতাকাটা যেন পশ্চিমের আকাশে পূর্বের কিরণ।

 

মিশিগানের মিসির আলী

মিশিগানের মিসির আলী সাহেবের অনেক কদর। যেকোনো অনুষ্ঠানে তাকে ঘিরে নাকি সেলফি তোলার জন্য ভাবীরা হুড়মুখ খেয়ে পড়ে। কেউ কেউ খাতা বাড়িয়ে দেয় অটোগ্রাফ-এর জন্য। অনেকেই মনে করে তিনিই সেই হুমায়ূন আহমেদের মিসির আলী।

এই মিসির আলীর সঙ্গে আজ আমার দেখা হবে। দুপুর একটায় তিনি আসবেন কিলবোর্ণ ড্রাইভের এই বাড়িতে। তারপর আমাকে তুলে নিয়ে যাবেন তার অফিসে। সারা বিকেল তাঁর সঙ্গেই থাকবো, সন্ধ্যা ৬টায় তাঁর অফিস শেষ হলে তিনি আমাকে আবার ফিরিয়ে দেবেন এই বাড়িতে, এমনটিই কথা হয় আমাদের।

ড. মিসের আলীর সঙ্গে আমার এই যোগাযোগটা করিয়ে দেন মিশিগানের ট্রয় শহরের আমার আরেক মামা- ইকবাল ফয়েজ স্বপন। একসময় তাঁর সহকর্মী ছিলেন ড. আলী। তাঁর কাছ থেকেই তিনি খবর পান যে আমি স্টারলিং হাইটস-এর আমার বোনের বাড়িতে আছি। স্বপন মামা বলেন, আলী ভাই আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান । শুনে আমিই রোমাঞ্চিত হয়ে পড়ি। এমন লোকের কথা আমি শুনেছিরাম বেশ আগে, জানতাম তিনি আমেরিকায় থাকেন। কিন্তু একেবারেই যে আমার অস্থায়ী এই পাড়ার পাশেই তাঁর বসবাস, এটা জানতাম না।

দেশে যা-ই থাক, বিদেশ গেলে আমি আতুড় হয়ে যাই। বিশেষ করে হেনরি ফোর্ড-এর এই শহরে। গাড়ি তৈরির এতো কারখানাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই বোধ হয় এই শহরে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট চোখে পড়ে না। ট্রেনতো নাই-ই। শহরতলী থেকে ২৫-৩০ মাইল দূরে একেকটা গ্রাম, সামান্য জিনিস কেনার জন্যও অন্তত: ৫ মাইল দূরে যেতে হয়, কেবল প্রাইভেট কারে। স্বল্প বসতীর এই অঞ্চলে প্রায় জনে জনে গাড়ি। আমি যে বাড়িতে থাকি সেখানেও দুই গাড়ি। কিন্তু আমি তো পথ ঘাট চিনিনা, চালানোর কসরত জানলেও হচ্ছে না, অনুমতি নাই। আমাকে তাই কোথাও যেতে হলে চালকসহ গাড়ি লাগে।

আমেরিকার লোকেরা অত্যন্ত সময়ানুবর্তী, সে যখন বাঙ্গালীও হয়। সময় মতো হাজির হওয়ার জন্য আমরা যেমন বলি ‘ইংলিশ টাইম’  দেখি ওটা হয়েছে এখন আমেরিকান টাইম। একটা বাজার মিনিট পাঁচেক আগে তিনি বাড়ির সামনে গাড়ি পার্ক করে দাঁড়িয়ে থাকেন এবং ঠিক একটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ফোন দিয়ে জানান তার আগমনীর সংবাদ।

মিসির আলীকে নিয়ে আমার সঙ্গে আমেরিকায় বেড়াতে আসা সহপরিভ্রাজকদেরও দেখি অনেক কৌতুহল। ঘরের মধ্যে অন্য যে তিনি-চারজন ছিলেন, সবাই বেরিয়ে এলেন। দেখি, মাথায় টুপি পরা, হালকা দাঁড়ির এক পঞ্চাশের ভদ্রলোক, জীপ নিয়ে এসেছেন। গাড়ি থেকে তিনি নামবেন না, আমাকে উঠিয়ে নেবেন।

তাকে দেখে মহা খটকা লাগে। এই লোক মিসির আলী হয় কি করে?

মিসির আলী হবে আবুল খায়ের বা আবুল হায়াতের মতো লোক। চোখে চশমা, মুখে দাঁড়ি, অবিবাহিত, বুদ্ধিদীপ্ত মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক, যিনি একটা বাড়িতে একা থাকবেন। বিচিত্র রকমের লোক বিচিত্র রকমের সমস্য নিয়ে তার কাছে আসবে আর তিনি বিশুদ্ধ যুক্তি দিয়ে তাদের ধারণা পাল্টাবেন, নতুন যুক্তি দেবেন।

মিসির আলির কাহিনীগুলো ঠিক গোয়েন্দা কাহিনী নয়, কিংবা ‘ক্রাইম ফিকশন’ বা ‘থ্রিলার’-এর মতো খুনি-পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা-ধাওয়া নয়, কিংবা বরং মনস্তাত্তি¡ক, বিজ্ঞাননির্ভর এবং প্রচন্ড যুক্তিনির্ভর কাহিনীর বুনটে বাঁধা। চারিত্রিক দিক দিয়ে মিসির আলি হিমুর বিপরীত। তরুণ হিমু চলে প্রতি-যুক্তির তাড়নায় ; বয়োজ্যেষ্ঠ মিসির আলি অনুসরণ করেন বিশুদ্ধ যুক্তি ।

হুমায়ূন আহমেদ মিসির আলি চরিত্রটির ধারণা প্রথম পেয়ে যান যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটার ফার্গো শহরে, স্ত্রীর সাথে গাড়িতে ভ্রমণের সময়। চরিত্রটির ধারণা মাথায় চলে এলেও তিনি মিসির আলী নিয়ে প্রথম উপন্যাস লিখেন এই ঘটনার অনেকদিন পর। প্রকাশ হয় সাপ্তাহিক বিচিত্রার ঈদ সঙ্খ্যায় ১৯৮৩ সালে। পরে  অবসর প্রকাশনী থেকে প্রকাশ হয় ১৯৮৫ সালে “দেবী” ।

উপন্যাসের কাহিনী অনুসারে মিসির আলি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের “মনোবিজ্ঞান”  বিভাগের একজন সহযোগী অধ্যাপক। বয়স ৪০-৫০ এর মধ্যে। হূমায়ুন যখন এ চরিত্রটি তৈরী করেন তখন তাঁর বয়স এর চেয়ে একটু কম। কিন্তু নিজেকে হয়তো এই বয়েসের কেউ একজন ভেবেছিলেন। মিসির আলি মূলত নিঃসঙ্গ একজন মানুষ, “অন্য ভূবন”  ছাড়া মোটামুটি সব উপন্যাসে তাঁকে অকৃতদার ভাবেই রূপায়িত করা হয়। মিসির আলি নিঃসঙ্গ, হৃদয়বান, তীক্ষè ধীশক্তির অধিকারী।

এই মিসির আলী কি স্বয়ং হুমায়ুণ? একবার বলেছেন – না, মিসির আলিকে আমি দেখিনি। অনেকে মনে করেন লেখক নিজেই হয়তো মিসির আলি। তাঁদেরকে বিনীতভাবে জানাচ্ছি- আমি মিসির আলি নই। আমি যুক্তির প্রাসাদ তৈরি করতে পারি না এবং আমি কখনও মিসির আলির মতো মনে করিনা প্রকৃতিতে কোনো রহস্য নেই। আমার কাছে সব সময় প্রকৃতিকে অসীম রহস্যময় বলে মনে হয়।”

উপন্যাসের মিসির আলীর কথা থাক। আমি এখন আরেক মিসির আলীর সঙ্গে আজ সারাদিন ঘুওে বেড়াবো। দেখি এই মিসির আলী কোন মিসির আলী !

আমাদের গাড়ি ছুটে চলে স্টালিং হাইটস পার হয়ে ডিট্রয়েট ডাউন টাউনের দিকে। সেখানে ফোর্ড গাড়ির প্রণেতা হেনরি ফোর্ডের নামে একটা ডাক্তারী গবেষণাগার আছে, যেখানে ড. মেসের আলী কাজ করেনÑ সেখানেই আমাদের যাত্রা।

আমাদের আলাপ শুরু হয়ে যায় গাড়ি থেকেই। প্রথমে পরিচয় পর্ব। জানি যে, এই মিসির আলীর জন্ম টাঙ্গাইলে, পড়াশুনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নে। পরবর্তীতে জাপান থেকে পলিমার কেমিস্ট্রিতে পিএইচডি। আমেরিকা এসেছিলেন পোস্ট-ডক্টরেট করতে। এরপর এখানে চাকরী পেয়ে যান। প্রায় কুড়ি বছর ধরে আছেন এখানে। কথা বলেন খুব সাধারণ বাংলায় ময়মনসিংহের ভাষার টান আছে তার কন্ঠে।

১৯৮৪ সালে তিনি উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৮৬ সালে, যখন তিনি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র, হুমায়ূন আহমেদ আসেন তাদের ক্লাসে থার্মোডিনামিক্স পড়াতে। ক্লাসে রোল কল করার সময় নাম ধরে ডাকতেন হুমায়ূন আহমেদ। মিসির আলীর নাম ডাকার সঙ্গে সঙ্গে হাসির রোল পড়ে যেতো। কেনো পড়তো?

লজ্জা পান ড. মিসির আলী। বলেন, এই নামটা নিয়ে আমার খুব লজ্জা ছিলো। আমাদের আরেক বন্ধুর নাম ছিলো ‘তুলা মিয়া’। একদিন হুনি সে এফিডেভিড করে নাম বদলেছে-  আ ফ ম সাইদুল হাসান। নামটাতো সুন্দরই। আমিও ভাবলাম একটা স্মার্ট নাম রাখি। মিসির আলী শুনলেই ক্লাসের ছেলেরা হো হো করে হেসে উঠে। বাবার কাছে একদিন গিয়ে বললাম। বাবা বললেন, তোর দাদী রেখেছে এই নাম, তুই বদলাবি? আমি আর বদলালাম না। রয়ে গেলো মিসির আলী নাম। ইংরেজীতে আমি লিখতাম MESER দিয়ে, এ কারণে বিদেশে অনেকে আমাকে মেসের আলীও বলে। আমি মিসির আলী, মেসের আলী এই দুই নামেই পরিচিত।

আমাদের গাড়ি এসে থেমে যায় হেনরিফোড রিসাচ সেন্টারের পার্কি লটে। গাড়ি রেখে আমাকে নিয়ে ঢুকে পড়েন অফিসের মধ্যে। রিসিপশনে নাম লিখিয়ে বুকে একটা ট্যাগ ঝুলিয়ে হাতে একটা স্টিকার পেপার লাগিয়ে নিতে হয় আমার। বুঝতে পারি, জায়গাটা মোটেও সর্ব-সাধারণের জন্য নয়।

রিসার্চ সেন্টারের ভেতর ঢুকে লিফ্ট খোঁজার আগে তিনি নিয়ে যান তাঁদের ছোট্ট একটা কেন্টিনে। সেখানে মেশিনে ডলার ঢুকিয়ে দুই হাতে দুটো কফি ধরে আনেন। একটা আমার হাতে দিয়ে বলেন, চলেন রুমে যাই।

হুমায়ূনের মিসির আলীও একা  ঘরে থাকেন। তার কাছে আসা সমস্যাসংকুল মানুষদের তিনি চা বানিয়ে খাওয়ান। কখনো কখনো  পাড়ার কোনো নির্দিষ্ট চা-ওয়ালা ঘড়ি ধরে দিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে তার জন্য চা বিস্কুট নিয়ে আসতো। আমাদের ‘আলী ভাই’র সে সুযোগ নাই। লিফ্টে উঠতে উঠতে বলেন এখানে সবাইকে নিজের কাজটা করতে হয়। আপনি ওবামার অফিসে গেলেও দেখবেন, নিজের টয়লেটটা নিজেই সাফ করছে। আমাদেরও করতে হয়। আমেরিকায় অফিসে কোনো পিয়ন থাকে না, বেল টিপলে পিয়ন আসে না আমাদের।

আমরা তেতলার একটা ফ্লোরে গিয়ে উঠি। মিসির আলী বলেন এটাই আমার ল্যাবরেটরি। এখানেই আমার কাজ।

দেখি কেমিস্ট্র ল্যাবের মতো একটা জায়গা। সারি সারি কতগুলো র‌্যাক বিছানো। তার সামনে কতগুলো টুল। এখানে প্রায় কুড়িজন গবেষণা করছেন। এদের এখনকার গবেষণা হচ্ছে ক্যান্সার নিয়ে। আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথÑ এই গবেষণার জন্য টাকা দেয়। বছরে ৩৪ বিলিয়ন ডলার তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিলায়। এর একটা অংশ তারাও পায়।

মিসির আলী আমাকে পাশের একটা ঘরে নিয়ে যান। কতগুলো  স্লাইড দেখান। ইঁদুরের মগজের মধ্যে ক্যান্সারের বীজ ঢুকানো হয়েছে এবং একের পর এক বিভিন্ন রকমের রসায়ন তাদের ভেতর ইনজেক্ট করানো হচ্ছে। কোন কেমিক্যালে কী প্রতিক্রিয়া হয় তা প্রতিদিন এক্সরে করে দেখেন। সেসবের ফাইন্ডিংসগুলো বই আকারে প্রকাশ করেন। এটাই তাদের কাজ। গবেষণার জন্য অনেক ইঁদুর কিনতে হয় তাদের। দেড় দু’শো ডলার একেকটা ইঁদুরের দাম। অনেক খরচ।

মিসির আলী তার গবেষণার বিষয় নিয়ে যখন কথা বলেন, তখন খুব দ্রæত কথা বলেন। তাঁর ইংরেজিটিও অনেকটা আমাদের মতো। দীর্ঘ দিন আমেরিকায় থাকার পরও একসেন্টের কোনো পরিবর্তন আসেনি। এসেছে তার সন্তানের মধ্যে।

দিনের ৮ ঘন্টা সময় গবেষণাগারে কাটান। বাকী সময় হয় পড়েন, নয় লিখেন। তার পড়া-লেখার বিষয় কেবলমাত্র ক্যান্সার। ইন্টারনেটে পড়ে থাকেন অবসর সময়েÑ পৃথিবীর কোন জায়গা থেকে কে এই বিষয়ে কি করছে তা জানার জন্য। বলেন, ইঁদুরের উপর আমার এই গবেষণাটা সফল হলে ২০২০ সালে হয়তো এটার ওষুধ বেরোবে, কেবল ব্রেন টিউমারের জন্য।

আমি বলি ক্যান্সারের প্রতিষেধক কবে বেরোবে?

হাসেন মিসির আলী। বলেনÑ এখনো কেউ জানে না। তবে আরো ৫ বছর পর প্রতি চারজনে একজন ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হবে। এসব বাড়ার কারণÑ কেমিক্যাল মাখানো খাবার। এগুলোতো বিষ। বলে হা হা করে ওঠেন।

মিসির আলীর একটা ফেসবুক একাউন্ট আছে। আমি অনেক চেষ্টা করেও তাতে ঢুকতে পারি না। বারবার ভুল নাম বলছেন। কখনো পাসওয়ার্ড বলে দিচ্ছেন, কিন্তু একাউন্টের নামটা মনে করতে পারেন না। বলেন, ফেসবুক খুলছি আমার ছেলেরে ট্র্যাক করার জন্য। ও কখন কোথায় যায়, আমি খবর পেয়ে যাই। বলে আবার হো হো করে হেসে ওঠেন।

হুমায়ূন আহমেদ নিয়ে তাঁর অনেক স্মৃতি। বলেন সেকেন্ড ইয়ারেই শুধুমাত্র আমাদের ক্লাস পেয়েছিলেন। আমার নামটা রোলকলের সময় তার নজরে আসে। এটা নিয়ে তাঁর একটা বইতে লিখেছেনও।

‘দেবী ’ থেকে শুরু করে ‘যখন নামিবে আধার পর্যন্ত মিসির আলী উপখ্যান এসেছে হুমায়ূনের কুড়িটি উপন্যাস আছে। তার ৬ষ্ঠটির নাম ‘ভয়” প্রথম প্রকাশ হয়েছিল। ১৯৯১ তে। ততোদিনে ছাত্র মিসির আলী লেখক হুমায়ূন আহমেদের সাথে আর সংশ্লিষ্ট নন। কিন্তু ‘ভয়’ উপন্যাসের ভ‚মিকা পত্রে হুমায়ূন লিখেনÑ

“ক্লাস নিচ্ছি, পড়াচ্ছি থার্মোডিনামিক্স। একটি ছেলেকে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলাম সে উত্তর দিতে পারল না। বিরক্ত হয়ে বললাম, নাম কি তোমার ? সে উঠে দাঁড়াল কিন্তু নাম বলল না। ক্লাসের সব ছেলেমেয়েরা হাসতে শুরু করল। আমি বিস্মিত। তাদের হাসির কারণ ধরতে পারছি না। আবার বললাম নাম কি তোমার ? ছাত্র-ছাত্রীরা আবারও হেসে উঠল। ছেলেটির পাশে বসা একজন বলল, স্যার সে নাম বলবে না। কারণ তার নাম – মিসির আলি।

ঘটনাটা ক্ষুদ্র কিন্তু এই ক্ষুদ্র ঘটনা আমার মন আনন্দে পূর্ণ করল। মিসির আলি নামের চরিত্রটি আমি তাহলে অনেকের কাছেই পৌঁছে দিতে পেরেছি। একজন লেখকের কাছে এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে?

আমি বিব্রত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটিকে বললাম, তুমি অস্বস্তিবোধ করছো কেন ? মিসির আলি চরিত্রটি কি তুমি পছন্দ কর না?

সে মাথা নিচু করে রইল, অন্য একজন পেছন থেকে বলল, স্যার ওর নামটাই মিসির আলি, বুদ্ধি শুদ্ধি খুব কম।

আবার সবাই হেসে উঠল।

ঐ দিনের ক্লাসের ঘটনাটি আমার জীবনের আনন্দময় ঘটনার একটি।

                                                        হুমায়ুন আহমেদ, শহীদুল্লাহ হল

হুমায়ূন আহমেদ দীর্ঘদিন মনে রেখেছেন তাঁকে। ২০১১ সালে হুমায়ূন যখন চিকিৎসার জন্য আমেরিকায়, তখন মেরিল্যান্ডের এক বাড়িতে গিয়ে খবর পান এই মিসির আলীর। তার সঙ্গে টেলিফোনে কথাও হয়। হুমায়ূন আহমেদের অপর বন্ধু আহসান হাবিবের তাঁদের মধ্যে যোগাযোগ করিয়ে দেন। তাঁর ইচ্ছা ছিলো অপারেশনের পর নিউইয়র্ক গিয়ে তিনি স্যারের সঙ্গে দেখা করবেন। কিন্তু আর হলো না।

আমি বলি হুমায়ূন আহমেদ নিয়ে আপনার আর কোনো স্মৃতি আছে ?

আছে।

কি!

আমরা তখন থার্ড ইয়ারে পড়ি। বিশ্ববিদ্যালয় এরশাদ ভ্যাকেশন। কিন্তু আমার টিউশনী ছিলো, তাই আমি বুয়েটের আহসান উল্লাহ হলে থাকতাম। স্যার তখন শহীদুল্লাহ হলের টিউটর। একদিন দুপুরবেলা স্যারের বাসার সামনে দিয়ে যাচ্ছি আমরা ৩/৪ জন, দেখি বাসার সামনে অনেকগুলো গাড়ি। বুঝে ফেললামÑ দুপুরবেলা এতো গাড়ি, মানে দাওয়াত আছে। এর মধ্যে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। হলের কেন্টিন বন্ধ। বাইরের হোটেলে খাবো, কিন্তু যাবো কি করে ?

আমরা স্যারের বাসায় গিয়ে হাজির হলাম। আমাদের মধ্যে ফাজিল টাইপের যে ছিলো, সে বললো স্যার, বৃষ্টি হচ্ছে তো, হোটেলে যেতে পারছি না, খাবো।

হুমায়ূন আহমেদ তার ঘরে ঢুকে একটা ছাতা নিয়ে আসেন। ছাত্রের হাতে ধরিয়ে বলেন যাও। বৃষ্টি থামলে ফেরত দিয়ে দিও। আমরা নড়ি না।

আমাদের সঙ্গী একজন বলেÑ স্যার, এতো কষ্ট করে যাবো! বৃষ্টির দিনে খিচুড়ী রান্না হয়?

এ কথা শুনে স্যার ছাতা ফেরত নিয়ে নিলেন। তার ঘরের সামনে টানা বারান্দায় আমাদের বসতে বলে চলে যান। কিছুক্ষণ পর কাজের মেয়ে প্লেটে করে আমাদের জন্য খিচুড়ি নিয়ে আসে।

এটুকু বলে আবার হো হো করে হেসে ওঠেন মিসির আলী।

আমাকে পেয়ে আজ মিসির আলীর কাজ বন্ধ। তার কাজ মূলত; অন্য গবেষকদের কাজ তদারকী করা। এর মধ্যেই বেশ কয়েকটা ফোন এটেন্ট করেন তিনি, দু’জন সহকর্মীকে ডেকে এনে পরিচয় করিয়ে দেন আমার সঙ্গে। বেলা বাজে ৫টা। ৬টায় তিনি বেরোবেন। আমি তাকে কিছুটা একান্ত সময় দিতে চাই। বললামÑ আমি বাইরে অপেক্ষা করি, আপনি কাজ সেরে আমাকে নিয়ে যান।

বাইরে বসার জন্য আমাকে রুম ঠিক করে দেয়া হলো। সেখানে সোফা আছে, টিভি আছে, পত্রিকা আছে। আমার বসতে ইচ্ছে হয় না। আমি বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে পার্কিং লটের বাইরে ঘাসের উপর একা একা বসে থাকি। যেখানে আমি বসে থাকি এটা বসার কোনো জায়গা নয়, বেঞ্চিও নাই। কিন্তু দুর্বা ঘাসগুলো বড়োই নরম। আমি সামনের ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়া দু-একজন মানুষ আর ছুটে চলা গাড়ি দেখি।

ছয়টা দশ মিনিটে মিসির আল আমাকে খুঁজে পেয়ে উদ্ধার করেন এখান থেকে। আমি আবার তার গাড়িতে সোয়ার হই।

যেতে যেতে কথা। তিনি বলেন, হুমায়ূন আহমেদের নাটক দেখেছেন অনেক, কিন্তু কোনো বই পড়েননি। গল্প-উপন্যাস তার পড়ার বিষয় না, তিনি পড়েন গবেষণা গ্রন্থ।

এক সময় খুব আস্তে আস্তে বলে আচ্ছা, সবাইতো আমাকে মিসির আলী মিসির আলী বলে আসলে মিসির আলীটা কে ? কি রকম চরিত্র এটা ?

এবার আমার হাসার পালা। আমি হো হো করে হেসে উঠি। তাকে এই প্রশ্নের জবাব দেই না।

কাওবয়ের টুপি ও বড়ো আউয়া

বড় মামা, ‘আউয়া’ ইংলিশে কিতা?

চিন্তায় পড়ে যাই সাদিয়ার এই প্রশ্ন শুনে। এমনিতে এই মেয়েটি কথা বলে কম। সবার মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে। কোনো কাজ দিলে শুধু করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পায়ের কাছে এসে বসে থাকে।

মিশিগানের স্টার্লিং হাইটসের এই বাড়িতে ৫ জনের বাস। এরা সবাই এখন বাংলাদেশী আমেরিকান।এদের মধ্য প্রথম ৩ জনের জন্ম বাংলাদেশে, চতুর্থ জন সাদিয়া-সে এই বাড়ির জন্মসুত্রে প্রথম আমেরিকান। আর সে কারনে তার ইংরেজী উচ্চারন এ বাড়ির অন্যদের চেয়ে আলাদা। স্বভাবও। একবার আমার আইপ্যাড নাড়াচাড়া নিয়ে আমি কঠিন একটা অধ্যাদেশ জারি করলাম। আমার অনুমতি ছাড়া কেউ জেনো এটা স্পর্শ না করে। আমার আদেশ জারির পরের মুহূর্তে সাদিয়া আমার কাছে এসে অত্যন্ত নরোম স্বরে বলে- বড়ো মামা, ক্যান আই ইউজ ইওর আইপ্যাড? আই এম হ্যাফ অব এ গেইম।

তখন তার বয়স ছিলো সাত, এখন এগারো। চার বছরে শুধু বয়সই বেড়েছে তার, উচ্চতাও। কিন্তু তার মার ধারনা, মেয়েটি একেবারে বোকাসোকা। দুনিয়াদারির কিছু বুঝে না, আউয়া। আর এই কারনেই বোধ হয় পুটিন বে’ গামী ফেরির উপর আমার পাশের বেঞ্চিতে বসে আমার কাছে এসে ‘আউয়া’ শব্দটির মানে বুঝতে চাইছে।

ভাষা বলতে সে আমেরিকান ইংলিশটুকুই বুঝে। আর অল্প বুঝে মা-বাবার সিলেটি। প্রমিত বাংলা খুব কম, প্রায় না বোঝার মতই। একবার আমাকে খুশী করার জন্য একটা গান শোনালো- মায়া লাগাইসে, পিরীতি শিখাইসে।

আমি বলি, পিরিতী মানে কি ?

অনেকক্ষণ মাথা চুলকাইয়া বলে, পিরীতি মানে অয়ার্ল্ড (পৃথিবী)।

কিন্তু সিলেটি ভাষার আউয়া শব্দের অর্থ আমি জানি না। একবার মঞ্জুর স্যারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি কঠিন একটা শব্দ বলেছিলেন, আমি মনে রাখতে পারিনি। সাদিয়াকে বলি, ইট ইস সামহোয়্যার ইন বিটুইন স্টুপিড এন্ড ফুল।

সাদিয়া মাথা নাড়ে।

বললাম, বুঝসস?

সাদিয়া আবার মাথা নাড়ে।

বলি- কি বুঝসস?

সাদিয়া মন খারাপ করে বলে- আই এম আ স্টুপিড।

সাদিয়াকে অনেক কষ্টে বোঝানোর চেষ্ঠা করি যে সে স্টুপিড নয়, লক্ষ্মী মেয়ে।

তাকে জিজ্ঞেস করি, আচ্ছা, বলতো, তোর বাবা-মার মধ্যে আউয়া কে?

আব্বা।

আর ভাই-বোনের মধ্যে?

আমি।

পুরো বাড়ির মধ্যে আউয়া কে?

আমি।

আমরা ট্যুরে এসেছি এখানে ১৩ জন। সাদিয়ার চাচাতো ভাই ইকবাল ফয়েজ স্বপন আমাদের নিয়ে এসেছেন ওহাইওর একটা দ্বীপে। দ্বীপের নাম পুট-ইন-বে। ওখানে আমরা ৩-৪ ঘন্টা সময় কাটাবো। এখন আমরা একটা ফেরি পাড়ি দিচ্ছি। মিনিট বিশেকের পথ। শীতল হাওয়া বইছে এরি(Eire Lake) হ্রদের ঠান্ডা পানি থেকে। দলের সবাই আমাদের কথাবার্তা শুনছে। সাদিয়াকে বলি, আচ্ছা, আমাদের দলের মধ্যে সবচেয়ে আউয়া কে?

সাদিয়া সময় না নিয়ে বলে, আমি। আমি সবচেয়ে আউয়া।

আমাদের কথাবার্তা আপাতত আর এগোয় না। ভারি ঠান্ডা বাতাস বইছে। আমি একটা জ্যাকেট গায়ে দেই। এই জ্যাকেটের উপরে হুডি আছে, একেবারে কান থেকে মাথা পর্যন্ত ঢেকে দেয়া যায়। এটা দিয়ে মাথা ঢাকার সময় মনে হলো আমার মাথার হ্যাটটা কোথায় রাখি। আমি সাদিয়ার মাথায় এটা বসিয়ে ক্যামেরা নিয়ে ছবি তূলতে ব্যাস্ত হয়ে যাই।

আমার এই হ্যাটের একটা কাহিনী আছে। হ্যাটটির মূল মালিক ছিলেন আমার কাওবয় মামা শাজাহান আলী। তিনি এটা ২ বছর আগে তিউনিশিয়া থেকে কিনেছিলেন। একসঙ্গে দুইটা হ্যাট কিনেছিলেন তিনি। একটা তার নিজের জন্য, আরেকটা তার প্রিয় ভাগিনা শাকুর মজিদের জন্য। কেনার পরের বছর তিনি তার জন্মভূমি সিলেটে যান।২০১৫ সালের জুলাই মাসে ১৮ বছর পর সিলেট গিয়ে নানা রকমের পাগলামিতে মেতে ওঠেন। তিনি রিকশা চালান, মাঝিকে সরিয়ে নাও বাইয়ে শুরু করেন, গরুর রাখালের মাথা থেকে ছাতা (মাথাল) খুলে এনে নিজে পরেন আর গরুর রাখালদের হাতে বেনসন সিগারেট ধরিয়ে দিয়ে নিজে গরুর পাল সামলাইতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তার মাথায় তিউনিশিয়ান কাওবয় হ্যাট, সঙ্গে আমার জন্য একটা। আমরা মামা-ভাইগনা মিলে তিউনিশিয়ান হ্যাট পরে গ্রামময় ঘুরে বেড়াই, নৌকা চালাই।

এর মাস খানেক পরে তিনিও লন্ডন চলে আসেন আর কয়েকমাস পরে কোরবানী ঈদ মামাদের সঙ্গে করার জন্য আমিও সপরিবারে লন্ডন আসি, কিন্ত সেই কাওবয় হ্যাটটা রেখে আসি দেশে।

মামার ঘরে গেলে আমাকে প্রথমেই একটা হ্যাট উপহার দেয়া হয়। মামা বলেন, ওল্ড বয়, ইউ ডোন্ট লুক স্মার্ট উইদাউট এ কাওবয় হ্যাট। আমরা আবার মামা ভাগিনা দুইটা হ্যাট পরে ছবি তুলি, ফেসবুকে আপলোড দেই। মাঝে মাঝে আমি ভুল করে টুপি ছাড়া বেরই, ফেসবুকে ছবি দেখে মামা বলেন, ওল্ড বয়, হোয়ার ইজ ইউর হ্যাট। আমি সঙ্গে সঙ্গে হ্যাট পরে আবার ছবি তুলে তাঁকে ট্যাগ করে দেই।

২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৫। আমাদের লন্ডন ছেড়ে আসার দিন। মামা আমাকে বিদায় দিতে আসেন। তার খুব মন খারাপ। কথা ছিলো তিনি আমার সঙ্গে আমেরিকা আসবেন, তার আদরের ভাগনীর সঙ্গে কিছুদিন সময় কাটাবেন মিশিগানে। কিন্ত তিনি আসতে পারছেন না, আমাকে হিথরো পোঁছানোর জন্য সন্ধ্যা থেকে আমার সঙ্গে আছেন। ভোর বেলা ফ্লাইট। আমি ব্যাগ গোছাচ্ছি, মামা বলেন- হ্যাট কোথায়?

আমি হ্যাট খুজে পাই না। বলি পুশি খালার ঘরে ফেলে এসেছি। তুমি ওটা নিয়ে নিও।

হঠাত দেখি তার মন খারাপ। তার দেয়া টুপিটা আমি নিয়ে যেতে পারবনা, এটাই মন খারাপের কারন।

এক সময় তিনি তার মাথা থেকে তার তিউনিশিয়ান হ্যাটটা আমার মাথায় পরিয়ে দিয়ে বলেন, অল্ড বয়, টেক দিস। লেট মাই হ্যাট ট্রাভেল উইথ ইউ ইন এমেরিকা।বাট ওয়ান কন্ডিশন, ইউ ক্যাননট লুজ ইট। ইট ট্রাভেলেড উইথ মি থ্রী আদার কন্টিনেন্ট, নাও উইল ট্রাভেল আমেরিকা।

আমি আমেরিকা এসে এই হ্যাট পরে ছবি তুলি আর মামাকে ট্যাগ করি। কোনও ছবিতে হ্যাট না থাকলে কমেন্টে মামা লিখেন- ইউ ডোন্ট লুক স্মার্ট উইদাউট দ্যাট হ্যাট।

বুঝি, মামা তার টুপিটা খুব মিস করছেন। সেই টুপিটা এখন আমি সাদিয়ার মাথায় দিয়ে ফেরির উলটা দিকে এসেছি ছবি তোলার জন্য।

একসময় ফেরি এসে ঘাটে নামে। দেখি আমাদের দলের একটা জটলা পড়েছে যাত্রীদের পেছন দিকে। সবাই হেঁটে আসছেন, সাদিয়া নড়ছে না। তাঁকে ঘিরে আছেন সবাই, আর সাদিয়া মাথা নিচু করে কাঁদছে। তার মাথায় টুপি নাই। বাতাসের চোটে টুপি পড়ে গেছে মিশিগান লেকের শাখা-লেক এরির পানিতে। এখন বড়োমামাকে সে কি জবাব দেবে, এই নিয়ে তার কান্না।

সাদিয়ার বড়ো মামীর অনেক বুদ্ধি। তিনি সাদিয়াকে বোঝালেন, শাকুরের মামা দিয়েছেন ভাগিনাকে এই টুপি যাতে এটা আমেরিকা বেড়ায়, শাকুর দিয়েছে এটা তার ভাগিনীকে, ভাগিনী দিয়ে দিয়েছে মিশিগান লেককে। এবার এই টুপি সারা আমেরিকা ঘুরে বেড়াবে।

এই কথা শুনে সাদিয়া হেসে ওঠে। আমি তাকে নিয়ে হেঁটে হেঁটে ফেরি পাড়ি দিয়ে ওপরে উঠি। আমরা এখন গলফ কার্ট ভাড়া করে ঘুরে বেড়াব এই দ্বীপ। সাদিয়া এবার কথা বলে।

আমাকে বলে, আসলে তুমি সবচেয়ে বড়ো আউয়া।

আমি বলি, কেমনে ?

সাদিয়া বলে, তুমি তো জানো আমি বড়ো আউয়া, তারপরও তুমি আমার কাছে তোমার ফেভরাইট হ্যাট রাখতে দিয়েছ। তুমি বড়ো আউয়া। তুমি আমার চেয়ে আউয়া না হলে কি আমাকে ওটা রাখতে দিতে ?

এর পর থেকে সাদিয়াকে কেউ আর আউয়া বলে না।

 

সেবার মিশিগানের আদিবাসী সংরক্ষিত এলাকা, পুট-ইন-বে, বেল আইল্যান্ড, ডেট্রয়েট হারবার এসব জায়গায় গিয়েছি। এ ছাড়াও ওয়াশিংটন ডি সি, ম্যারিল্যান্ড, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া, ফিলাডেলফিয়া, নিউ ইয়র্ক – এসব জায়গার অনেক কথা লেখার বাকী। 

 

২০১৬

খেচর ভাবনা

১৪ আগষ্ট ২০১৬ সিট নং ২০ বি,  এমিরেটস ইকে ৫৮৫ ।  দুবাইমুখি বিমানে বসে লিখি।

কাল ঢাকা থেকে আমিরাতি বিমানে উঠেছি। যাবো আমেরিকার মিশিগান। কিন্তু ঘাটে ঘাটে নাও বদল। প্রথমে ঢাকা থেকে যেতে হবে দুবাই। দুবাই যেতে ৫ ঘন্টা লাগে। এরপর আরো ৯ ঘন্টার যাত্রা বিরতী। এই বিরতীর সময় থাকবো দুবাইর এক হোটেলে। বিমান কর্তৃপক্ষই এমন আয়োজনাদি করে দিয়েছে। কিন্তু প্লেনে উঠেই আমরা ছোটপুত্র কী একটা আবিস্কারের আনন্দে দেখি হৈচৈ শুরু করে দিয়েছে। জিজ্ঞেস করি- কি হলো?

বলে, তুমি কি ফেসবুক চালাবা?

আমি বলি- কেমনে? এয়ারে তো অনেক এক্সপেন্সিভ নেট।

আমাকে বলে – ১০ এমবি ফ্রি। আর ২৫০ এমবি মাত্র ১ ডলার। আমি ফ্রিটা চালাইছি। তোমার ভিসা কার্ড দাও, আমি ১ ডলার দিয়ে তোমার জন্য ২৫০ মেগাবাইট ডাটা এনে দিচ্ছি। তুমি সারা ট্রিপ এটা চালাতে পারবা।

বিমান থেকে পাইলটেরা গ্রাউন্ডের সাথে যোগাযোগ রাখেন এমন কথা পড়েছি পত্রপত্রিকায় মূলত বিমান দুর্ঘটনার খবর প্রকাশের সঙ্গে। কিন্তু মানুষ কী করে ওয়ারলেস সংযোগে কথা বলতে পারে আমার মাথার কুলায় না। বড় ধরনের বিমান ভ্রমন আমার প্রথম হয়েছিল ১৯৯৭ সালে। সেটাও ছিলো এই দুবাই শহর কেন্দ্রিক। একই ভাড়ায় কুয়েত থেকে ঘুরে দুবাই আসা যায় এটা শুনে আমি তখন এমিরেটস টিকেট না কেটে কুয়েত এয়ার ওয়েজে টিকেট কাটি। ঢাকা থেকে কুয়েত আবার দু ঘন্টা পরে কুয়েত থেকে আরেক ঘন্টায় ফ্লাইট দুবাই। সেবার বিমানে চড়ে আমি নতুন কিছু পাই। বসার সিটের সামনে যে ছোট মনিটর লাগানো আছে সেখানে গান শোনা, সিনেমা দেখা ছাড়াও মনিটরের রিমোটের এক পাশে আছে কতগুলো ডায়াল কী। আর সেই রিমোটের মত যন্ত্রটার সঙ্গেই ব্যবস্থা আছে ক্রেডিট কার্ড স্ক্রাচ করার। তা না পারলে এয়ার হোস্টেজের সাথে যোগাযোগ কথা বলা হয়েছে। প্রতি মিনিটে বিল আসবে ৫ ডলার। পৃথিবীর যে কোন জায়গায় কথা বলা যাবে। বাহ! আমি মুগ্ধ হই দেখে।

কিন্তু ৫ ডলার খরচা করে এক মিনিট কথা কীই বলার আছে কার সঙ্গে। আমি খুব একটা আলোড়িত হইনা। কখনো আমার ফোন করা হয়নি। গত বছর ২০১৫ সালে লন্ডন থেকে আমেরিকা যাওয়ার পথে এমেরিকান এয়ার ওয়েজের ঘোষণায় শুনি এরকম কত ডলার দিয়ে যেনো ওয়াইফাই পাসওয়ার্ড নেওয়া যায়। আমি নেইনি। কিন্তু এবার আমার নেয়া হয়ে যায় এবং সেটা আমার পুত্রেরই কল্যানে। কিছুক্ষন পর ফেসবুকের হোমপেজ অন করে আমার সেলফোন আমার হাতে ধরিয়ে বলে, নাও ইচ্ছা মতো ফেসবুকিং করো। আর তোমার কার্ডটা রাখছি আমরা সবাই নেবো নেট। তোমার

বেশি যাবেনা। এক ডলার করে তিন ডলার।

ফোন হাতে পেয়ে মনে হলো আসমান হাতে পেয়ে গেলাম। ইন্টারনেট একসেস আমার ফোন ডিভাইসে । তার মানে ৩১ হাজার ফুট নীচে পৃথিবী নামক গ্রহের যোগাযোগ মাধ্যমের সঙ্গে আমি সংযুক্ত। কুড়ি বছর আগে যখন সবে মাত্র মোবাইল ফোন এসেছে আমাদের হাতে। তখনো বিমান থেকে অনেক কষ্টে কথা বলা যেতো। আর এখন এই দু হাজার ষোলতে এসে একজন অতি সাধারণ ইকোনমি ক্লাসের যাত্রীও মাত্র এক ডলার খরচ করে পৃথিবীর যে কারো সঙ্গে তথ্য আদান প্রদান করতে পারছে। আমি তড়িৎ একটা ছবি তুলি আমার নিজের এবং আমার সামনের সিটের পেছন দিকে আটকানো মনিটরের যেখানে এই মুহুর্ত উলে­খ করে আমার অবস্থান জানিয়ে দিচ্ছে। ফেসবুকে এ ছবিটার সঙ্গে আমার একটা মনের কথাও জুড়ে দেই। চলি­শ বছর আগে বাড়ির মাঠে থেকে আকাশে চড়–ইপাখির মতো ছুটে চলা বিমান দেখে বিস্ময়ে অভিভ‚ত হতাম……

আচ্ছা আজ হঠাৎ নিজেকে এমন আকবর বাদশার মতো মনে হচ্ছে কেন? আর দূর কিসের আকবার বদাশা আমি তার চেয়ে বড় ভাগ্যবান। তিনি যা কখনো স্বপ্নে ভাবেননি তার চেয়ে অনেক বেশী আমি অবহেলায় করে ফেলি। আকবর বাদশাহ টে¤পুতে চড়ার সুযোগও পাননি। ঘোড়ার উপর সোয়ার হওয়া উট বা মানুষের কাধে চড়ে হাটা এর বাইরে আর কিইবা তার করার ছিলো?

আকবর বাদশার কথা থাক। রাজা বাদশা মানেই জুলুমবাজ। নেতা হতে হলে রাজা হতে হলে কাউকে না কাউকে হঠাতে হয়। নিজের কাছে যা যুক্তিযুক্ত মনে হবে অপর পক্ষের কাছে অযুক্তির। নিজের কাছে যা ন্যায়, অন্যের কাছে তা অন্যায়।

থাক রাজার কথা। রাজারা আমার পছন্দের কেউ না। এখন নিজের কথা বলি। ঐ যে লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি – যাকে বলা হয় মধ্যযুগের কীর্তিমান সেই পুরুষ, যে কীনা মানব জাতীকে সব থেকে বেশি কিছু দিয়েছিল , সেই মহাজ্ঞানী মানুষটিও কিন্তু আকাশে চড়ার কথা কেবল মাত্র ভাবতে পেরেছিল তার স্বপ্নে। স্বপ্নের বিষয় ছিলো বলে লিওনার্দোর ছবিতে ফড়িং এর মতো দু পাখা মেলে মানুষকে আকাশে উড়তে দেখিয়েছিল। লিওনার্দোর মুত্যুর অন্তত চারশো বছর পর মানুষ সত্যি সত্যি আকাশে উড়েছিল। আমি জন্ম নিতে একশো বছর এগিয়ে গেলে, ধরে নেই যদি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গেও আমার জন্ম হতো জগতের কী এমন আনন্দলোক দেখেইবা পুলকিত বা হতাম!

বাংলাদেশ সময় এখন রাত ১১ টা। আমাদেরকে বহনকারি বিমান আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে উত্তর আমেরিকা মহাদেশ স্পর্শ করেছে। আরো নাকি ৫ ঘন্টা লাগবে শিকাগো পৌছাতে। প্লেনের খাবার, সুন্দরি আসমানি বুয়া, তাদের খাতিরদারি, সংগের বই, সামনের সিনেমা, কিছুই ভালো লাগছে না। ১০ ঘন্টা ধরে বসে আছি এক জায়গায়। প্রিয় ফেসবুকেও সুখ পাচ্ছি না, মহা ক্লান্তি, কী যে করি!

রবীন্দ্রনাথের নোবেল জয় আর জমিদারী দুই দিকের দুই পাল­া ভারি করার পরও শেষ দিকে বুড়ো বয়সে এসে তিনি অবশ্য বিমান চড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। তার সব ভ্রমন কাহিনীতে জাহাজ আর সমুদ্রের গল্প। বিমান যাত্রার কাহিনী আমার পড়া হয়নি। মুজতবা আলী দুটোই পেয়েছিলেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের মতো দীর্ঘ জাহাজ ভ্রমনের ক্লান্তিকর সময়ে মানুষের সঙ্গে রসালাপ করে করে জাহাজের ডেকের গল্প পেয়েছিলেন। শরৎচন্দ্রের কপালে প্লেন জার্নি জোটেনি। তার ওতো পয়সাও ছিলন না। আর কলকাতা রেক্সগুন মাদ্রাজ করার সময় প্লেন আসেওনি। এখন থেকে একশো বছরের একটু বেশি সময় আগে মাত্র মানুষ আকাশে উড়তে শিখে। পৃথিবীর বয়ষ কত? আমি জানিনা। যে কটি সংখ্যা দিয়ে তার বয়স লেখা হয় আমি পড়তে পারিনা। আর যে লেখক বলেছে এই বয়সের কথা প্রথম, আমার এটা বিশ্বাসই হয়না। আমার বিশ্বাসটা আমার কাছে। বিজ্ঞানীদের হিসাব তাদের খাতায় থাক।

আচ্ছা মানুষের সভ্যতার বয়স কত? বেশি না, মাত্র দশ হাজার বছরের কথা পড়েছি। গুহামানবের কথা পড়েছি, তারা ছিলো কয়েক লক্ষ বছর আগে। মানুষের পাথর ঘসে আগুন জ্বালাবার কাহিনী পড়েছি। পাথর ঘষে আগুন জ্বালিয়ে লোহা পিটিয়ে ধনুক বানিয়ে মানুষ পশু শিকারী যখন হয় তখন থেকে নাকি তারা নানা রকমের উদ্ভাবনীর ভেতর দিয়ে জীবন যাপন করতে থাকে। সেখান থেকে শুরু। তারা যখন ঘরের ছাপ দেয়া লিখে ফেললো তখন গুহার থেকে বেরিয়ে খোলা আকাশের তলায় ঘর বানানো শুরু করলো। তারা লজ্জাস্থান ঢাকার জন্য গাছের পাতা, পশুর চামড়া ব্যবহার করতে শিখলো। এক সময় এই প্রয়োজনগুলোই মানুষকে উদ্ভাবনী ক্ষমতা শেখায়। মানুষ সভ্য হতে শুরু করে।

আচ্ছা আমার বার বার মনে হয় আমি এখন যে রুপের মানুষ আছি আমার আগের মানুষেরা কি এরকম ছিল, নাকি অন্য মানুষ ছিলো? বানর বা হনুমান বা শি¤পাঞ্জী থেকে আমরা এসেছি বিবর্তিত হয়ে এটাও আমার কাছে সত্য মনে হয়না।

থাক মানুষের বিবর্তনের কথা। ওটা ডারউইন বুঝবে আর বিশ্ববাসীরা বুঝবে। আমি ভাবি মানুষের হেকমতের কথা। মিশরীয়দের হেকমতের কথা জানি, এর ইতিহাস বেশিদিন আগের না, মাত্র ৬-৭ হাজার বছর আগের কাহিনী । মানুষ নৌকা আবিস্কার করে মাত্র ৫ হাজার বছর আগে। কিন্তু সাড়ে চার হাজার বছর আগে পিরামিডের মতো জটিল অংকের বিল্ডিং বানাতে পারে মানুষ । মানুষের বা প্রানীর দেহ সতেজ অবস্থায় রেখে দেবার কৌশল তারা বের করে ফেলে। সেখান থেকে শুরু হলেও এর পরের কয়েক শ বছরে উলে­খ করার মত কিছু আমি খুজে পাইনা। মধ্য যুগ পযর্ন্ত যে সকল আবিস্কারের কথা জানি তা আর আরো আগে আবিস্কার অনেক হয়ে গেছে। তাহলে ইঞ্চিনের আবিস্কারের আগে আর ইঞ্জিনের আবিস্কারের পরে এই দুই ভাগেই আমরা সভ্যতাকে মানি। এক ভাগে বাদশাহ আকবর আরেক ভাগে আমি।

বাদশাহ আকবরের কথা বার বার কেন বলছি? মোঘল সাম্রাজ্য সবচেয়ে বেশি সময় ধরে করেছিলেন বলে? শাহজাহানই বা নয় কেন? মরার পর আকবরী জৌলুসের চেয়ে শাহজাহানী মহলের কদরইতো দেখি বেশি। আচ্ছা ধরে নেই আকবার বা শাহজাহান বা তাদের আগের পুরুষ বাবর হুমায়ুন তো আমাদের এই অঞ্চলেরই ভোগবাদিতা করে গেছেন। তারা মানুষ মেরেছে স¤পত্তি দখল করেছে আসলে কীসের জন্য?

চলি­শ বছর আগে বাড়ির মাঠে থেকে আকাশে চড়–ইপাখির মতো ছুটে চলা বিমান দেখে বিস্ময়ে অভিভ‚ত হতাম। একদিন সেরকম বিমানে চড়ে আমিও পাখির মতো ভাসতে পারতাম এমনটি কখনোই ভাবি নাই।

৪০ বছরের মধ্যেই আমি পৃথিবী থেকে ৪০ হাজার ফুট উপরে উঠে বহুবার খেচর হয়েছি। আকবর বাদশার কপালে যা জোটেনি তার চেয়ে শতগুণ বিলাস নিয়ে যাপন করি জীবন। ৪০ বছরের ব্যবধানে আমি ৪০ হাজার ফুট উপরে থেকে পৃথিবী নামক গ্রহের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখতে পারছি। আরো ৪০ বছর যদি বাই চান্স বেঁচে যাই, পৃথিবীকে কোন জায়গায় যে যেতে দেখবো, আন্দাজ করতে পারছি না!

আচ্ছা রবীন্দ্রনাথও তো বাদশা শাহজাহানের চেয়ে ভাগ্যবান ছিলেন। ছিলেন না? আর আমি রবীন্দ্রনাথেরে চেয়েও। তবে তফাত এইটুকুন যে আমি ঢাকা থেকে সাতঘন্টায় ফুড়ুত করে ইউরোপ চলে যাই,রবীন্দ্রনাথের লাগতো দুই মাস। আর তার লাভের মধ্যে লাভ দিনের পর দিন তিনি জাহাজের ডেকে বা নিজের কেবিনে বসে নানা লোকের কাছে পত্র লিখছেন আর মাসের পর মাস শেষে তার জবাব পাচ্ছেন।
আর আমি? আমি ঠুস করে ৩০ হাজার ফুট উপরে থেকেও পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে তাৎক্ষনিক যোগাযোগটা করে ফেলতে পারছি।
আমি অনেক বেগবান,রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অবেগবান। কালের বিচারে তিনি অনেক স্থায়ী, আমি থাকব অস্থায়ী। আমার আবেগ প্রসমিত হবার আগেই উবে যায়। রবীন্দ্রনাথের আবেগ বারংবার প্রসমিত হতেই থাকে হতেই থাকে। (৩১৯৯০ ফুট উপ্রে থেকে শাকুর মজিদ)
ঘুম থেকে উঠলাম। ঘড়িতে দুবাই টাইম দেখাচ্ছ ১ ৪০. মানে আমাদের বিকাল ৩ ৪০. আরো ১০ ঘন্টা আকাশে থাকতে হবে। আটলান্টিক বোধহয় ২৯৯৭০ ফুট নীচে এখন।
আমার এখন সামনে যাওয়া ছাড়া উপায় নাই। তলায় মহা সমুদ্র, উপরে মহা আকাশ। আর আমি যাচ্ছি পূর্ব থেকে পশ্চিমে। প্রতি মুহূর্তে সূর্যদেবকে আমি সামান্য হলেও বিপর্যস্থ করছি। ঘন্টায় ৫৬৬ মাইল বেগে ধাবমান হচ্চি সূর্যের দিকে। যে কারনে সকাল ১০টায়। রওয়ানা দিয়ে সাড়ে ১৪ ঘন্টা উড়ে আমি যেখানে গিয়ে পৌছাব, সেখানে বাজবে বিকাল সাড়ে তিনটা।

রোড ট্রিপ

রোড ট্রিপের সূচনা

এর আগেও আমেরিকায় এমন বাহন দেখেছি, তখন বুঝিনি। মনে হতো মালামাল পরিবহনের জন্য এমন কাভার্ড ভ্যান বুঝি এটা। কিন্তু পরে জেনেছি, এটা এক ধরনের চলন্ত বাড়ি। কেউ যদি একসাথে গাড়ি-বাড়ি চায়, এমন একটা কিনে নিয়ে জীবন কাটিয়ে দিতে পারে।

আমার খুব ইচ্ছা হয় এরকম একটা বাড়ি-গাড়ি কিনে জীবনটা রাস্থায় রাস্থায় কাটিয়ে দিতে। কিন্তু আমি থাকি বাংলাদেশে, মাঝে মাঝে বিদেশ দেখার জন্য দেশ থেকে বেরোই। এই আমেরিকায় এই নিয়ে আমার তিনবার আসা। শুনেছি এখানকার বয়স্ক লোকেরা অনেকেই নাকি শেষ জীবনে  এমন বাড়ি-গাড়ি কিনে ফেলে। তারপর যাযাবরের মতো জীবনটা কাটিয়ে দেয়। আমেরিকা তো আর কেবল এক দেশ না, এ মহাদেশ। তার কতোটুকুইবা এক জীবনে দেখা যায়। এক আমেরিকা ভালো করে পুরোটা দেখার জন্য কয়েক জীবন দরকার।

একসময় মরুচারিরা এমন গাড়ি ব্যবহার করতো। ক্যারাভান বলা হতো তাদের। কখনো উট কখনো না ঘোড়া টেনে নিয়ে যেতো এসব গাড়ি। গাড়ির খোলের ভেতর থাকতো তাদের শোবার বিছানা পর্যন্ত। কয়েক দিনের সফরে বেরোতে হতো তাদের। এমন বাড়ি-গাড়িই ছিল তাদের ভরসা। উনিশ শতকের দিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এমন ঘোড়ার বাড়ি-গাড়ির প্রচলন হয়েছিলো, আমেরিকার এর সুচনা একটু পরে। ইউরোপ থেকে যাওয়া সংস্কৃতির সঙ্গে সবধরনের কারিগরি প্রযুক্তির অভিবাসন যেমন হয়েছিলো, এটাও এলো। গেলো শতকের বিশ থেকে তিরিশের দশকে আমেরিকায় মোটরগাড়ির অভাবিত প্রচলনের সংগে সংগে এমন মোটরায়িত ক্যারাভানেরও চল শুরু হয়ে যায়। ঘোড়ার জায়গা নিয়ে নে গাড়ির ইঞ্জিন, আর তার সংগে যুক্ত হয়া ক্যারাভানটি পরিনত হয় রিক্রেশনাল ভেহিক্যাল-এ। সেই থেকে একে সংক্ষেপে আরভি হিসেবেই ডাকা হয়।

আমেরিকায় সাত দিনের জন্য রোড ট্রিপ দেয়ার বিষয়টা যখন আমরা নিশ্চিত করে ফেলি, এক বিকেলে আমি হাজির হয়ে যাই এই আর ভির দোকানে। বিশাল পার্কিং লট জুড়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে নানা রকমের আর ভি। আমার ইচ্ছা হয় একটা কিনে ফেলে একেবারে যাযাবর হয়ে যাই।

আমেরিকায় গাড়ি পানির দামে বিক্রি হয়। আমি যে ভাঙ্গাচোরা গাড়ি ঢাকায় চালাই, ৭ বছর আগে তা প্রায় মার্কিনী কুড়ি হাজার ডলারে কেনা। এই গাড়ি ওখানে কোন মেথরও চালায় না। এই গাড়ির ১২ বছর পরের মডেলের ব্রান্ড নিউ গাড়ির দাম আমেরিকায় পাঁচ হাজার ডলারের বেশি না।

আমেরিকায় অনেক কিছুই বাংলাদেশের চেয়ে কয়েকগুণ সস্তা। তার মধ্যে গাড়ি একটা। তেলের দামও কম। আমরা যেখানে আমেরিকান সোয়া ডলারে এল লিটার তেল কিনি এই ডলারে তারা কিনে ডাবল তেল। আর নিউ ইয়র্ক ছাড়া আমেরিকার যে কোন জায়গায়ই গাড়ি তাদের স্থানীয় জনগণের প্রধান বাহন। গাড়ি নাই, চলা নাই। আর গাড়ির জন্য আছে আমেরিকান সড়ক। পৃথিবীর সেরা রোড নেটওয়ার্ক। সুতরাং সাধারন এক কারখানা শ্রমিকও সপ্তায় ৪০ ঘন্টা কাজ করে দুইমাসের বেতনের টাকায় চকচকে নতুন গাড়ি কিনে ফেলতে পারে। আমার এক বন্ধু (মুস্তফা কামাল, নিউ ইয়র্ক) কিছুদিন আগে বেশ বিপদে পড়েছিলো তার ল্যান্সার নিয়ে। গাড়িটি আমি চড়েওছি। ৫ বছরের পুরানা হলেও বাংলাদেশে এ গাড়ির দাম ৪০ লাখের কম হবে না। কিছুদিন আগে সে নতুন একটা গাড়ি কিনেছে, এই গাড়ি রাখার জায়গা নাই। ভাবলো একটা সংস্থাকে সে এটা দান করে দেবে। সেই সংস্থা জানালো, সে যদি এই গাড়ির সংগে আরো ৩০০ ডলার তাদেরকে দে, কেবল তখনই তারা এই গাড়ি এসে নিয়ে যাবে, না হলে না। পুরান গাড়ি ফেলে দেয়াও আমেরিকায় বড় সংগ্রাম।

আমি আমেরিকা যাবার আগে ইন্টারন্যাশনাল ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে গিয়েছি। কিন্তু গাড়ি চালানোর ঝক্কির কথা চিন্তা করে আর পুলিশি টহল থেকে এইসব লেফট হ্যান্ড ড্রাইভ গাড়ি চালানোর অনভ্যস্ততার বিবেচনায় আপাতত আমি স্টিয়ারিং ধরা থেকে বিরত আছি। আমার জন্য তৈরি হয়ে আসছেন বাফেলো থেকে আমার তালতো ভাই বাবলু। সুতরাং এক খানা গাড়ি ভাড়া করতে পারলেই সম্ভব আমাদের সাত দিনের রোড ট্রিপ। আমি প্রথমেই খুজি, আর ভি, আমেরিকান রিক্রেশনাল ভেহিক্যাল।

আর ভির দোকানে এসে চোখ ছানাবাড়া। নানা রকমের ক্যারাভান। নানা দামের। সবচেয়ে বেশি দামেরটার দাম দেখি ৩৬ হাজার ডলার। সস্তাও আছে। সস্তারটা ১২ হাজারি। যে লোকটা আমার পাশে এসে দাড়িয়েছে, সে একজন বাঙালি। কাজ করে এই দোকানে। আমার চেহারা আর পাশের জনের সংগে কথা বলার সময়ই বুঝে ফেলেছে, আমরা বাংলাদেশি। সুতরাং এটা কেনা যে বাংগালির কর্ম নয় এটা সে বুঝে ফেলেছে। আমাকে বলে, আপনি কি ভেতর দেখবেন ? চাবি আনবো ?

বলি, না থাক। আমি তো কিনতে আসিনি। তবে দেশে এই দামে পেলে একটা কিনে নিতাম। ১২ হাজার ডলারের আমার চলন্ত একটা বাড়ি থাকতো। বিষয়টা চিন্তা করতেই ভাল লাগছে।

আমি এই বাড়ি-গাড়ির একটা জানালা দিয়ে উঁকি দেই। ভেতরে একপাশে কিচেন ক্যাবিনেট আছে একটা। বার্নার, বেসিনসহ। তার পাছে ছোট একটা টেবিল, ৪টা ছোট চেয়ার পেতে রাখা একটা টেবিলের পাশে। তার পাশে এক সেট সোফা। সোফার পাশে আরো দুইটা বিছানা বিছানো। আমি নিশ্চিত, ঐ সোফাকেও বেড বানানোর ব্যবস্থা থাকবে। এটা ৪-৫ জনের থাকার জায়গা নিয়ে বানানো গাড়ি-বাড়ি। এর মধ্যে ৭ জনের ঘুমানোর ব্যবস্থার বাড়ি-গাড়িও আছে। এগুলোর ভাড়াও খুব বেশি না। সাত দিনের জন্য ভাড়া পাওয়া যায় ৫ দিনের ভাড়ায়। এমনিতে দিন প্রতি ভাড়া দেড় থেকে আড়াইশো ডলার। ৭ আসনের গাড়ি নিলেও ভাড়া পড়ে একশো ডলারের মতো । আমরা দোনমনায় পড়ে যাই, ৭ আসনের ভ্যান গাড়ি নেব, নাকি একটা বাড়ি-গাড়িই ভাড়া কওে ফেলবো।

অবশেষে আমাদেও ট্যুর ঠিক হয় অন্য ভাবে। বাফেলো থেকে বাবলু ভাই এসেছেন ৭ দিনের জন্য একটা ভ্যান ভাড়া করে। ঠিক করলাম তাঁর গাড়িতেই যাই। তিনি আমাদেও শুধু চালকই নন, দুর্দান্ত একজন গাইডও। আমেরিকা, বাউল তত্ত¡ আর ধর্ম, এই তিন বিষয়ে তিনি এক্সপার্ট। হেন কোন বিষয় নাই, যে বিষয়ে তাঁর সাথে কথা বলে পারা যায়।

আমাদের টিম ঠিক হয়ে যায়। আমি, আমার স্ত্রী আর দুই পুত্র এবং তাদের দুই গীটার, আমাদের গাইড কাম চালক । আমরা মিশিগান থেকে ম্যারিল্যান্ড যাব, প্রায় ৮০০ মাইল পথ। এক সকালে আমরা জিপিএস বিবির দিক নির্দেশনাকে মাথায় রেখে রওয়ানা দিয়ে দেই।

ক্লিভল্যান্ডের রক এন্ড রোল হল অব ফেইম

সেপ্টেম্বরের শুরুতে আমেরিকার গাছপালার পাতায় রং ধরতে শুরু করে। বৈশাখ-জৈষ্ঠ মাসে যেমন আমাদের পুটি মাছেরা সদ্য যৌবন পেয়ে পেটের উপর লাল রংএর পাড় বসায়, মনে হয় আমেরিকার শীত প্রধান অঞ্চলের প্রকৃতিতেও এমন শাড়ি বদলের হিড়িক পড়ে।

আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল কঠিন শীতের রাজ্য মিশিগান থেকে। আমরা এক হাজার মাইল দূরের ম্যারিল্যান্ডের পথে যাত্রা শুরু করেছি গাড়ি নিয়ে। আমেরিকায় এমন শত শত মাইলের যাত্রা পথ এ কারণেই অনেক বেশি আমোদের যে, যেতে যেতে বৈচিত্রময় প্রকৃতির রূপ দেখা যায়। আর কোথাও মাইলের পর মাইল সবুজ ভ‚ট্টা বা ধান ক্ষেত আর তার পাশ দিয়ে গড়ে ওঠা গ্রামীন পরিবেশ এবং সড়কের দু’পাশের গাছপালা দিয়ে আড়াল করার বৃক্ষরাজী, সবই দেখার মতো। আর আমাদের মতো অতিজনবহুল শহরের বাসিন্দারা এমন ফাঁকা সড়ক পথে চলতে পারাটাকেই মনে করে বাড়তি বিনোদন।

এ রকম আন্তরাজ্যিয় সড়কপথগুলোও তাদের আলাদা। প্রশস্থ সড়কের প্রতিদিকে তিনটি সারি নির্ধারণ করা থাকে। তার কোনটিতে ধীর গতির ট্রাক লরি, অপর দু’টিতে প্রাইভেট বাহন। দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাসের জন্য আলাদা সড়ক। তারা অপেক্ষাকৃত বেশি সময় নিয়ে যায়। সুতরাং নিজের গাড়ি চালিয়ে যেতে চাইলে সড়ক পথে উঠে স্টিয়ারিং ধরে চুপচাপ বসে থাকলেই হয়। পথে পথে স্ট্রিট সাইনতো আছেই জিপিএস ডিভাইস একটা গাড়িতে লাগানো থাকলে আর কোনো চিন্তাই নাই। সুকণ্ঠি যন্ত্রবন্ধু কিছুক্ষণ পরপর হালকা করে আওয়াজ দেবে। সামনে কোথায় খাবার দোকান, কোথায় গ্যাস পাওয়া যাবে, কোথায় খাবার আর কোথাও যদি বড় শহরের ভেতর ঢুকেই যায়, তবে ডানে বামে ঘুরে কী করে প্রধান সড়কে উঠে পার হবে, এসবের বৃত্তান্ত থাকে তাদের কথায়।

মিশিগান থেকে ম্যারিল্যান্ডের আটশো মাইল পথ আমরা একবারে যাবো না। তিনবারে যাবো। মাঝখানে দুই রাত থাকবো দুই শহরে, ফেরার পথেও তাই। কিন্তু যাবো এক পথে, ফিরবো আরেক পথে। কিন্তু এসবের জন্য এখন আর কারো পরমর্শ নেবার দরকার হয় না। সেলফোনে ইন্টারনেট সুবিধা থাকা মানেই কিন্তু পুরো দুনিয়ার সব কিছুর খবর মুঠোর মধ্যে।

মিশিগানের সবচেয়ে কাছের রাজ্য ওয়াহিও। এরপর ক্লিভল্যান্ড, ফিলাডেলফিয়া এবং শেষ মাথায় ওয়াশিংটন ডিসি আর ম্যারিল্যান্ড। ওয়াহিওতে দেখার মতো কী আছে, এমন  তালিকা ইন্টারনেটে পেয়েছি। কিন্তু এখান থেকে এক দুপুরে দেখে যাবার মতো কী কী আছে জানার জন্য ফোন করি মোশতাককে।

মোশতাক ওয়াহিওর ডাক্তার। আমার ক্যাডেট কলেজের এক ব্যাচ জুনিয়র। সে আমাকে পরামর্শ দেয় আপনি আমিস পাড়ায় এক রাত থেকে পরের দিন এ অঞ্চলটা দেখতে পারেন।

আমি বলি, ডান। আর কি আছে?

সে বলে, ইরি হ্রদে এক বিকাল কাটাতে পারেন।

ইরি হ্রদ দেখা আছে। তুমি বলো, আইএমপাইর ডিজাইন করা একটা বিল্ডিং আছে ওয়াহিওতে, খুব নাম করা, এই বিল্ডিং কোথায় দেখি?

দালানকোটা দেখার কথা শুনে আমার সঙ্গের দুই পুত্র মন খারাপ করে বলে ওঠে,  ওসব দেখবো না। উচা উচা দালান দেখার মধ্যে কি আছে, অন্য কিছু দেখি।

ইবন সেলফোন অন করে বসেছে। সে বলে, রক এন্ড রোল এর একটা মিউজিয়াম আছে, এটা কোথায় জিগ্যেস করো।

আমি সেলফোনের স্পিকার অন করে কথা বলি। মোশতাক জানায়, শাকুর ভাই, আপনার ছেলেরা কি মিউজিক লাভার?

আমি বলি, ভাই, গানের যন্ত্রনায় অস্থির আছি। পেছনের সিটে বড় ছেলে অবিরাম গীটার বাজাচ্ছে।

তাইলে ঐ রক এন্ড রোল মিউজিয়ামটা ওদেরকে দেখানো আপনার জন্য ফরজ হয়ে গেছে। মজার কথা হচ্ছে, আপনি যে বিল্ডিংটার কথা বলছেন, সেটাই এই মিউজিয়াম। ওখানে চলে যান, বাপ-বেটাদের সবার সব কিছু দেখা হয়ে যাবে।

হিসেব করে দেখি, আমরা ওয়াহিওর সেই জায়গা থেকে ৫৫ মাইল দূরে আছি। যেতে লাগবে এক ঘণ্টা। কিন্তু যাদুঘরের ঢোকার দরোজা বন্ধ হবে চারটায়। আমরা কিছুই করতে পারবো না। ঠিক হলো, এখন ঠিকই ওখানে যাবো। ক্লিভল্যান্ড শহরটা দেখবো এবং এর কোনায় হ্রদের পারের সেই জায়গাটা দেখে চলে যাবো আমিস কাউন্টিতে সন্ধ্যাবেলা। পাঁচদিন পর যখন ফেরত আসবো, তখন আবার এই রক এন্ড রোল হল অব ফেম, দেখেই যাবো। তারা আমার কথায় রাজি হয়ে গেলো।

ফেরার পথে দুপুরবেলা আমরা এসে পৌঁছাই ক্লিভল্যান্ডের এই সঙ্গীত যাদুঘরে। আমাদের চারজনকে গাড়ি থেকে নামিয়ে আমাদের চালক-সঙ্গী বাবলু ভাই চলে যান গাড়ি নিয়ে। এই শহরে তার নিজস্ব কিছু কাজ আছে ঘণ্টা দুইয়ের জন্য। সেই ফাঁকে গাড়ি পার্কি এর ঝামেলা থেকে আমরা বেঁচে য্ইা।

চত্বরটির সামনে দাঁড়িয়েই টের পাই, এমনি এমনি দালানটির এতো নামডাক হয়নি। দু’টো সমকোণী ত্রিভ‚জকে আড়াআড়ি করে এমনভাবে বসিয়ে দেয়া হয়েছে যে এটা দালান বা ভাস্কর্য, এক দৃষ্টিতে ঠিক বোঝা যায় না। দালানটির এক কোনায় তাকিয়েই বোঝা গেছে যে এটা চারদিক থেকে চার রকমের ব্যঞ্জনা তৈরি করা বিষয়। চীনা বংশোদ্ভ‚ত আমেরিকান স্থপতি আই এম পাই এ সময়ের পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্থপতিদের একজন। প্যারিসের লুভ মিউজিয়ামের নতুন সংস্কার কাজটা তিনিই করেছিলেন। সেখানেও কাঁচ দিয়ে পিরামিড বানিয়ে ছিলেন প্রবেশ পথে। এখানেও সেই রকরে কাঁচের কাজ। কিন্তু পিরামিড সরাসরি নয়। একে টুকরা টুকরা করলে যা দাড়ায়, অনেকটা সেরকম।

আর স্থান নির্বাচনও ছিলো যথাযথ। শহরের এক প্রান্তে, যেখান থেকে একটা সমুদ্র সমান হ্রদের সূচনা, তার প্রান্তে। আর এ জায়গাটিও কেন্দ্রীয় বাণিজ্য এলাকার সাথে লাগানো। এবং এই পুরো অঞ্চলটি খেলাধূলা আর নানা রকমের বিনোদনের জন্য ছেড়ে দেয়া। আছে ইনডোর, আউটডোর স্টেডিয়াম, অডিটরিয়াম। তবে এই রক এন্ড রোল হল অব ফেইম চত্বরটি এমনভাবে বানানো যে, এর আশপাশ দিয়ে ছুটে চলা কারো পক্ষেই এ দালানটিকে অবজ্ঞা করা সম্ভব নয়। দালানের সামনে একটা বিশাল আকারের গিটার শুইয়ে রাখা। আর তাকে পেছন রেখে একটা সেলফি তোলা যেনো সব পর্যটকের প্রথম কাজ। এর পাশে রাস্তার উপর একটা ভ্রাম্যমান খাবারের দোকান। দোকানটিকে প্রথমে মনে হবে কোনো কনসার্টের জন্য বানানো। একটা স্টেজ। একটু কাছে গেলে দেখা যাবে ১২ চাকার উপর দাঁড়ানো একটা একটা বড় বাস। এই বাসেই খাবার রান্না হয়, জানালা দিয়ে খাবার সার্ভ করা হয়।

হল অব ফেইম ফাউন্ডেশনটি বেশিদিন আগের নয়। ১৯৮৩ সালে এটি গঠনের তিন বছর পরই এই জায়গাটিকে রক এন্ড রোল এর তীর্থ ভ‚মি করা হবে এমনটা সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ১৯৯৫ সালে যখন এর দরোজা খোলা হয়, সে বছরই প্রায় ১ কোটি লোক এটা দেখতে আসেন। ভবন আর যাদুঘরটি দেখতে আসা লোকের কাছ থেকে টিকিট বিক্রি করে তারা আয় করে প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

আমরা ছবি তোলার পর্ব শেষ করে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকি। যেখানে আমরা প্রবেশ করি। ২৩ ডলারে টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকতে হয় যাদুঘরের ফ্লোর থেকে। তবে কেউ চাইলে যাদুঘরের ভেতরটা না দেখে স্যুভেনির শপগুলোও ঘুরে ঘুরে দেখতে পারেন। যাদুঘরে যেসকল অরিজিনাল জিনিসপত্র আছে, তার প্রায় সবকিছুরই রেপ্লিকা বানিয়ে বিক্রি হচ্ছে নিচে। কোনো গানের তারকা কী কাপড় পড়তেন, তার নকল আছে কাপড়ের দোকানে। আছে তাদের ব্যবহৃত গানের যন্ত্রপাতির ডিজাইনে হুবহু বানানো যন্ত্র। যেমন এলভিস প্রিসলির একটা ছবিতে তিনি যে গিটার হাতে আছেন, সেই গিটার, সেই চশমা, সেই ছেড়া জিন্স বা টি শার্ট বিক্রি হচ্ছে স্যুভেনির শপে।

তার পাশে ছবি তোলার দোকান। ১০ ডলার দিয়ে সবুজ পর্দার পটভ‚মিতে ছবি তোলা হবে। মিউজিয়াম দেখে ফেরত যাবার সময় ফোল্ডারের ভেতর ছবি ঢুকিয়ে দেয়া হবে। সেই ছবিতে দেখা যাবে, পেচনের সবুজ রং-এর বদলে এই মিউজিয়ামের একটা ছবি, মনে হবে, যেন ফার্স্টক্লাস লাইটিং করে এই ছবি তোলা হয়েছে।

এই গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে ২৩ ডলারে টিকিট কাটা দর্শনার্থীরা একটা চলন্ত সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাবে নিচে, যেখান থেকে শুরু হবে মূল প্রদর্শনশালা। ৭ স্তরের এই পুরো দালানের চারটা স্তরই নানা রকমের প্রদর্শন সামগ্রী দিয়ে সাজানো। প্রদর্শনশালার খুপরীগুলো ফটো সেনসেটিভ। আপাত: ভাবে দেখা যায় অন্ধকার। একটু কাছে গেলেই আলো জ¦লে উঠে আর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় বর্ণনা। বর্ণনা শোনা আর প্রদর্শন সামগ্রী দেখা শেষ করে সরে গেলেই বাতিও নিভে যাবে, বর্ণনাও থেমে যাবে। আবার পরের প্রকোষ্টে হাজির হলে একই রকম পরিবেশ পাওয়া যাবে। একে একে দেখা হয় বিট্ল্স দি রোলিং স্টোন, জিমি হেনড্রিক্স, এলভিস প্রিসলি এবং আরো কিছু বিখ্যাত রকস্টারদের ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি। শোনা হয় তাদের কনসার্টের গানও।

হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হবার সুযোগ নাই। কিছুদূর পর পর ছোট ছোট বুথে কিছু হোম থিয়েটার লাগানো। সেখানে বসে বসে দেখা যায় উনিশ শতকের কিছু ঐতিহাসি কনসার্টও। তার পাশের হলে দেখি সেই আমলের পুরনো গিটার, তাদের কাপড়-চোপড়, আর রক এন্ড রোল এর শিকড় গসপেল, বøুজ, রিদম এন্ড বøুজ ফক, কাউন্ডি এন্ড বøুজ গ্রাস এর কিছু পুরনো আলোকচিত্রও।

জন লেনন এখানে সবচেয়ে সম্মানের সাথে আছে। ১৯৯৪ সালে এখানে তার প্রথম অভিষেক হয়। ১৯৬০ সালে ইংল্যান্ডের লিভারপুলে গঠিত হওয়া তার ব্যান্ড, বিট্স্ এর স্টুডিওটাই যেনো এখানে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। তার সঙ্গে আছে পল, হ্যারিসন এবং রিঙ্গোও। মোমের মূর্তিতে মূর্ত হয়ে আছে তারা যেন এখনই কোনো এক কনসার্টের ফাঁকে একটা স্ট্রিল ক্যামেরার ইমেজে ফ্রীজ হয়ে আছেন। এর পাশাপাশি বিট্ল্স এর রক স্টার রিঙ্গোর ড্রাম সেট, গিটার, পিয়ানোর পাশাপাশি তার ব্যবহৃত চশমা, পাসপোর্ট, হাতের লেখা, চিঠি, গান, এসবও এখানে খুব যতœ করে সাজিয়ে রাখা। তবে দর্শনার্থীদের ভিড় এলভিস প্রিসলির কাউন্টারেই বেশি। তার মোম মূর্তির পাশে রাখা তার আইডি, ব্রেসলেট, মটর সাইকেল আর কিছু ব্যবহারী জিনিসপত্র।

আমি যে সকল গান শুনি সে তালিকায় এই মহান শিল্পীরার না থাকার কারণে, আমার পক্ষে খুব বেশি মনোযোগ দেয়া হয়ে ওঠে না এই পরিসরে। কিন্তু আমার পুত্র যুগল মহা আনন্দে এলভিস প্রিসলি কাপড় চোপড়, গহনা আর তার বাদ্যযন্ত্র দেখতে থাকে। আমি ওদের সেখানে রেখে তাদের মাকে নিয়ে নেমে আসি নিচে। তাদের বেরুতে ঘণ্টা খানেক লাগবে। এ সময়টা কী করা যায়।

রক এন্ড রোল মিউজিয়ামের পাশেই সবুজ ঘাস। তার মাঝখানে কতগুলো গাছ আছে। আমি একটা গাছের গুড়িতে বসে পড়ি। সামনে সমুদ্রের মতো বিশাল জলরাসি। বিকেল হয়ে আসছে। মিশিগান ফেরা পথে আমাদের এখন যেতে হবে মোশতাকের বাড়ি। আমার বৌ স্যুভেনির শপে ঢুকেছে, সস্তায় পাওয়া যায় কী না, তা দেখে নিতে। আমি অপেক্ষ করি। পুত্রযুগল রক এন্ড রোল হল অব ফেইম দেখে কখন বেরুবে।

মিলার্সবার্গের আমিস পাড়া

আমিস পাড়ায় পৌছাতে পৌঁছাতে আমাদের রাত হয়ে যায়। মিশিগান থেকে মেরিল্যান্ডমুখী রোডট্রিপের প্রথম রাত আমরা কাটাতে চেয়েছিলাম আমিসদের সঙ্গে। কোথায় থাকবো, ঠিক করি নাই। ভেবেছিলাম, তাদের শহরকেন্দ্রে এসে খুঁজে নেবো কোনো সরাইখানা। কিন্তু সন্ধ্যা ৭ টায় পৌঁছেই মনে হলো এ এক ভিন্ন আমেরিকা। জনমানবহীন লোকালয়, এক-দুইটা চব্বিশ ঘণ্টিয় মুদি দোকান ছাড়া কিছুই নেই। যে ক’টা মোটেলে ঢু মারলাম, তার সবগুলোই ভরা, কোথাও দুটো কামরা খালি নেই। আমার ফোনে ইন্টারনেট ডাটা শেষ । ৬০ ডলার খরচ করে একমাসের জন্য যে ৫ গিগাবাইট মোবাইল ডাটা নিয়েছিলাম, ১০ দিনের মাথায় তা খরচ হয়ে গেছে। এখন এখানে বাড়তি ডাটা ভরি কি করে?

অনেকগুলো দোকান খুঁজে কোথাও মোবাইল ফোনের রিচার্জ করার ভাউচার খুঁজে পাই না। দোকান আছে, কন্তিু সেল ফোনের কিছু নাই । ছোট ছলেে ইবন বাবলু ভাইয়রে ফোন থেকে ইন্টারনেটে সার্চ করে খুঁজে পেয়েছে, এখান থেকে ৩৫ মাইল দূরে আছে একটা স্টোর, সেখানে এই ফোনের ভাউচার পাওয়া যাবে। সেখানে যাবার সময় এখন নাই। সে আমাদের জন্য সস্তার এক মোটেলে দুই কামরা বুকিং দিয়ে দিল ৫ মিনিটের মধ্যে। আমার ক্রেডিট কার্ড তার কাছে দেয়া আছে, বুকিং দিতে সমস্যা নেই। যেখানে আমরা আছি তার থেকে ২৫ মাইল দূরে মিলার্সবার্গের ‘মোটেল ৬’ই হচ্ছে সবচেয়ে কাছের হোটেল, সস্তায় রুম আছে। রুম প্রতি ৬০ ডলারে বুক করে আমরা ছুটে চলি হোটেলের দিকে। আমাদের যাত্রাপথ দেখিয়ে নিয়ে যান সুকণ্ঠি জিপিআরএস আপা। এই যাত্রাটি ছিল ভিষণ ভয়ানক।

পাহাড়ের পর পাহাড়। দুটো গাড়ি একে অপরকে ঝামেলা না করে ক্রস করতে পারে, এমন প্রস্থ। আমাদের চালক বাফেলো সোলজার বাবলু ভাই। আমি সামনে বসা আমার ক্যামেরা নিয়ে। পেছনে স্ত্রী আর পুত্র ইবন, তার পেছনে গীটার নিয়ে বড় পুত্র ইশমাম আধশোয়া।

বিদেশে, বিশেষ করে আমেরিকায় এসে এমন ভূতুড়ে সড়ক কখনো আমি পাইনি। বাবলু ভাই পেয়েছেন। বলেন, আমিসদের অঞ্চলে এমনই হবে। ওদের বাড়ির সামনে কোনো লাইট পোস্ট থাকবে না। রাস্তায়ও না। তারা ঘোড়ার গাড়িতে চলাচল করে। সন্ধ্যার পর কোথাও বেরোয় না, পরিবারের সবাই মিলে ঘরে বসে আড্ডা দেয়।

বাবলু ভাই পেনসিলভেনিয়ার আরেক আমিস পল্লীতে অনেক আগে একবার গিয়েছিলেন। তিনি বারবার বলছেন, সুযোগ হলে কাল আপনাকে ওদের কারো বাড়ির ভেতর নিয়ে যাবো। দেখবেন- সাত-আট বেড রুমের বাড়ি তাদের। আমেরিকানদের এতো বেডরুমের বাড়ি থাকে না। সন্তানের বয়স আঠারো হয়ে গেলে নিজের বাড়িতে গার্লফ্রেন্ড-বয়ফ্রেন্ড নিয়ে থাকে। এদের এসব নেই। এরা খুব একটা জন্মনিয়ন্ত্রনও করে না। প্রত্যেক পরিবারেই ৬-৭ জন ছেলেমেয়ে থাকে। তারা মনে করে, যত বেশি সন্তান, ততো ঈশ^রের আশির্বাদ। জীবনযাপনে তাদের কাছে পরিবার ও ক্ষতেখামার হচ্ছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, এরপর ‘গড’এর কাছে প্রার্থনা। প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই নিজস্ব উপাসনালয় আছে। তবে রোববারটা তারা রাখে গীর্জার জন্য। এই রোববারে তারা কেউ দোকান খুলে না, ক্ষেতেও যায় না। গীজায় গিয়ে ধর্ম সঙ্গীত গায়। তাদের ধর্ম সঙ্গীত র্জামান ভাষায়। আমিসদের নিজস্ব ভাষা আছে। এর নাম- পেনসিলভেনিয়ান ডাচ। তারা নিজেদের মধ্যেই এই ভাষাতেই কথা বলে। দীর্ঘদিন যাবৎ সনাতনী আমিস সে ভাষাতেই কথা বলতো। এখন তারা ইংরেজিও বলে।

পাহাড়ের উঁচু নিচু পথ নিয়ে ঘণ্টায় ৪০ মাইল বেগের বেশি গাড়ি চালানো ঝুঁকির কাজ। অনেকক্ষণ পরপর হয়তো একটা বাড়ির সন্ধান পাওয়া যায়। রাস্তা থেকে দেখা যায়, নিভু নিভু বাতি জ্বলছে কোনো বাড়ির ভেতর। এটা হয় ‘সোলার এনার্জি’র নভিু নভিু বাল্ব, অথবা নিখাদ হারিকেন। তাদের মনোহরী দোকানে হারিকেন বিক্রি হতে দেখেছি, নিশ্চয়ই এখনো তারা সেগুলো ব্যবহার করে।

পরদিন ভোরবেলা নাস্তা খেয়েই আমরা মোটেল থেকে চেক আউট করে ফেলি। নিজেদের গাট্টি বোচকা আবার গাড়ির ভেতর ভরে ফেলে এই বার্লিনের দিকেই আবারও রওয়ানা হয়ে যাই। এই সকালটি ছিল মনোমুগ্ধকর।

আগস্টে আমেরিকা সতেজ কিশোরীর মতো ফুটে ওঠে। সবুজপাতার গাছ, বাদামী ভূট্টাক্ষেত্র, ক্রমাগত ঢেউ খেলানো উঁচু নিচু পাহাড়ের সারি। সেই পথের ধীর গতির গাড়ি চালানো যদিওবা চালকের জন্য বিড়ম্বনার, কিন্তু গাড়রি ভেতর বসে থাকা যেকেনো আরোহীর জন্য এ এক বিশাল পাওয়া। গাড়ির জানালাকে মনে হবে এক বিশালাকায় হাই ডেফিনেশন টেলিভিশনের পর্দা, আর সামনে যা কিছু তা যেনো কোনো মাস্টার ফটোগ্রাফারের ধারণ করা পৃথিবীর সুন্দরতম ল্যান্ডস্কেপ দৃশ্য।

কিছুদূর আসতেই ঘট ঘট শব্দ করে ঘোড়ার গাড়ি ক্রস করতেই টের পেলাম আমিস পাড়ায় চলে এসেছি। ডানে বামে দেখি বাড়িগুলো সব একতলা দোতলার। একেবারে সাদামাটা আমেরিকান কুঁড়ে ঘর। বেশিরভাগই সাদা রং-এর। সাদা রং তাদের বেশি পছন্দ। পোশাক আশাকের মধ্যে সাদাকে পছন্দ করে। বাড়ির সামনে ঘোড়ার গাড়ি রাখার বড়, উঁচু গ্যারেজ আছে। গুগল গাইডের বাইরে বাবলু ভাই আমাদের অতিরিক্ত গাইড। তিনি বলেন, এরা ফুডস্টাম্প নেয় না। আমাদের দেশ বা আরো গবির দেশ থেকে আসা ইমিগ্রেন্টরা নানা রকমের খয়রাতি তহবিলের খোঁজ করে। আমিসরা আমেরিকান সরকারকে জানিয়ে দিয়েছে, তারা ওসব নেবে না। এটা তাদের ধর্মীয় চেতনার বিরোধী। শুধু এটা না, তাদেরকে দিয়ে কোনো রকমের ইনস্যুরেন্সও করানো যায় না। এসবে তাদের ধর্ম বিশ^াসে আঘাত আসে। তারা মনে করে না যে, অন্য কোনো কোম্পানি তাদের বিপদ আপদে সাহায্য করবে। সেসবের প্রয়োজনও তাদের নাই। এখানে না আছে কল-কারখানা, না আছে উঁচু বাণিজ্যিক দালান। প্রয়োজনও নাই। কারণ যে মানুষগুলো এখানে থাকে, তাদের জীবনাচারের মধ্যে বাণিজ্যিক চিন্তা চেতনা নাই।

গাড়িতে বসেই দেখি- এখানে আমাদের দেশের মতো বাড়ির উঠানে বাশের উপর কাপড় শুঁকাতে দেয়া আছে। বাবলু ভাই বলেন, এগুলো হচ্ছে আমিসদের বাড়ি। এরা কেউ ওয়াশিং মেশিন বা ড্রায়ার ব্যবহার করে না। নিজেদের কাপড় নিজেরা ধুয়ে এভাবে শুঁকাতে দেয়। এটা আমেরিকার জন্য ব্যতিক্রমি দৃশ্য। এই অঞ্চলে কৌতুহলী কিছু পর্যটক আর সরকারি কিছু বিভাগের কর্মকর্তা বা কর্মী ছাড়া কেউ থাকে না। পুলিশ আছে যদিও, ক্রাইম একেবারেই হয় না। আমিস সম্প্রদায়ের কাওকে আপনি মেরেও ফেলতে পারেন, কিন্তু তাকে দিয়ে মিথ্যা কথা বা মিথ্যা সাক্ষী দেয়াতে পারবেন না।

বার্লিনে এসে এক জায়গায় আমাদের গাড়ি রেখে আমরা নিজেদের মতো ঘুরতে থাকি। আমাদের পাঁচ সদস্যের পর্যটক দল চার ভাগে ভাগ হয়ে যাই। আমি ক্যামেরা নিয়ে, আমার স্ত্রী দোকানপাটে স্যুভেনির কেনায়, বাবলু ভাই ক্লান্তি সরান কফির মগে আর আমার দুই পুত্র নিজেদের মিউজিক ভডিওির শুটিং-এ। দেখি একটা খোলা সবুজ চত্বরে ঝাকড়া চুলের ইশমাম গীটার বাজাচ্ছে আর ঠোট নাড়াচ্ছে, ইবন তাকে ধারণ করছে আইফোনে।

স্ত্রীকে খুঁজতে একতলা যে দোকানের মধ্যে গিয়ে ঢুকলাম তা দেখে খানিকটা চমকালাম। এটা কি জাদুঘর না বিক্রয়কেন্দ্র, সহজে বুঝে ওঠা যায় না। কোনো কিছু না কিনেও কয়েক ঘণ্টা সময় কাটিয়ে দেয়া যায় এসব দেখে দেখে। আমিসরা কেউ কোনো ইংলিশের কলকারখানায় চাকরী করে না। এ সম্প্রদায়ের কারো সেসব নেইও। তাই যা কিছু এখানে আছে এসবই তাদের ঘরে বানানো, হাতে বানিয়ে রাখা চেয়ার, টেবিল। কোথাও কোনো কারুকাজ নাই। কতগুলো তক্তা বিছিয়ে রাখা হয়েছে। বসার জন্য চেয়ার যে কাজ করে, এটা তাই করে। লেখার জন্য টেবিলের কাজেও ঐ তক্তা।

গ্রিন হাউজের মতো একটা ছাউনি আছে একপাশে। উপরটুকু ফাইবার গøাসে ঢাকা। তার নিচে নানা রকমের ফুলদানি, ফুলগাছ। আছে তাজা ফুল, আছে কাগজের বা কাপড়ের বানানো ফুলও। পাশেই একটা চার চালের ঘর। এই ঘরে কেউ থাকে না। আগেকার দিনে তাবু বানিয়ে যেমনটি থাকা হতো, প্রথম পর্যায়ে অভিবাসী আমিসরা এমন ঘরেই বসবাস করতো। সেরকম একটা ঘর বানিয়ে রাখা। তার পাশে একটা বায়ু পাখা। এই পাখা থেকেই তাদের যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়, তা দিয়ে সন্ধ্যার পর তাদের ঘর আলোকিত হয়।

এখানকার একটা খোলাবাজারে আমিসদের উৎপাদিত সবজি আর ফসল দেখে আমার ভিরমি খাবার মতো অবস্থা। বড় টমেটো দেখেছি অনেক, কিন্তু বাধাকপির সাইজে টমেটো আমার কখনোই দেখা হয়নি। কাঁচা মরিচ তিন ইঞ্চি লম্বা হলেও অনেক বড় হয়। এখানে দেখি ঢেড়শের আকারে টুকরী টুকরী কাঁচা মরিচ সাজিয়ে রাখা হয়েছে। আমার ভাবতেও অবাক লাগে, কোনো রকম সার ব্যবহার না করেই তাদের মাটি কী এমন উর্বরা পায় যে এতো বিশালাকৃতির সবজির উৎপাদন হয় এখানে!

এখন খাবার পালা। খুঁজে পাওয়া গেলো ১০ মিনিট দূরে আছে পিৎজার দোকান। বাচ্চারা পিৎজার দোকানে ঢুকে গেলে আমি পাশের একটা খোলা মাঠে চলে আসি। সেখানে দেখি, এক তরুণীকে ঘিরে বেশ কিছু শিশু কিশোর গোল হয়ে দাঁড়িয়ে। বুঝতে কষ্ট হলো না, পাশের ঘরটি একটা স্কুল আর এই তরুণী তাদের শিক্ষক। বাচ্চারা এই স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলেও স্কুলে ইউনিফর্ম চলে এসেছে। আমেরিকায় তো কথাই নাই। কিন্তু খটকা লাগলো দেখে যে, এইসব স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীদের ইউনিফর্ম পরানো হয় না। আমি দূর থেকে ছবি তুলি। কাছে যেতেই আমার ক্যামেরা দেখে তাদের সব কর্মকান্ড স্থির হয়ে গেলো। আমি ছবি তুলছি না, এটা দেখে আবার তরুণী তার ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করেন।

তরুণীর কাছে যাই। আমার কৌত‚হলের বিষয়টা জানাই। দু’তিনটা প্রশ্ন করার পর তিনি আমাকে যা জানালেন তার সারাংশ হচ্ছে অষ্টম মান পর্যন্ত আমরা পড়াশুনা করি। জীবনযাপনের জন্য এর চেয়ে বেশি শিক্ষার দরকার নাই- এটা আমাদের সনাতনী আমিসরা মনে করেন। এখানে যে সকল ছাত্র-ছাত্রী আছে, তারা সবাই প্রথম থেকে পঞ্চম মান পর্যন্ত। ঐ ঘরে তাদের ক্লাসরুম। একটা ঘরেই সব ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীরা বিভিন্ন বেঞ্চে বসে বিভিন্ন ক্লাসের পড়াশুনা করে। তারা দুজন শিক্ষক আছেন। শিক্ষকদের অবিবাহিত তরুণী হতে হয়। বিবাহিতদের এখানে চাকরী দেয় না। তাদের বেতন আসে মহল্লার তহবিল থেকে। সরকার থেকে কিছু নেয়া হয় না।

আমি তার কাছে অনুমতি চাই, স্কুল ঘরের ভেতরে গিয়ে ছবি তোলার। মেয়েটি বলে আমি অনুমতি দিতে পারবো না। তুমি ছবি তুললে আমি তোমাকে নিষেধও করবো না।

শুধু ছবি তোলা কেনো এসব যন্ত্রের কিছুই তারা ব্যবহার করে না, আগ্রহও নাই। তাদের বাড়িতে কম্পিউটার নাই, ইন্টারনেট-ফেসবুকের প্রশ্ন করাই বোকামী। তারা রেডিও শোনে না, টেলিভিশন দেখে না, তাদের ঘরে সরকার যে ল্যান্ড লাইনের ফোন দিয়ে রেখেছে, এটা দিয়ে তারা যোগাযোগ করে স্বজাতীয় লোকেদের সঙ্গে। কারো সলেফোন নাই। এমন করেই চলছে ১৮০৮ সাল থেকে, যখন ওহিওর এই হোমস্ কাউন্টিতে ‘ওল্ড অর্ডার’ বা সনাতনী আমিসের বসবাস শুরু হয়।

আমিসরা কি কোনো আলাদা জাতি?

না, বোধ হয়। সুইজারল্যান্ডের জেকব আম্মান ছিলেন ভিন্ন মতবাদের খ্রিস্টান ধর্মযাজক এবং একজন মন্ত্রীও। ১৬৯৩ সালে তিনি ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে তাঁর ভাষায় ‘প্রকৃত বাইবেলিয়’ জীবনধারার একটা মতামত প্রকাশ করেন। এই মতের সঙ্গে মিলে যারা তার অনুসারি হয়েছিলেন- তারাই আমিস নামে পরিচিত হয়ে যান। তাঁদেরই কিছু লোক আমেরিকা, কানাডা, গ্রেট বৃটেনে ছড়িয়ে পড়েন এবং সেই দর্শন নিয়ে সেসব দেশে জীবনযাপন করেন। গত দু’শো বছরে এদের সংখ্যা খুব একটা বাড়েনি। পেনসিলভেনিয়া দিয়ে যদিও আমেরিকাতে তাদের প্রথম অভিবাসন শুরু হয়- পরবর্তীতে ওহিও, ইন্ডিয়ানা, উইসকনসিন, নিউইয়র্ক, মিশিগান, মিসৌরী, কেনটাকিÑ এসব রাজ্যেও তারা বসবাস করে। ১৯২০ সালের জনমিতি জরীপে পুরো আমেরিকায় এদের সংখ্যা ছিলো ৫ হাজারের মতো। ২০১৬ সালে এই সংখ্যা মাত্র ৩ লাখে এসে দাঁড়িয়েছে। নিজেদের উত্তর পুরুষ ছাড়া খ্রিষ্টান ধর্মীয় মাত্র ৭৫ জন আমিস জীবনধারায় সংযুক্ত হয়েছেন ১৯৫০ সালের পরে। তবে এখানেও বিভাজন আছে। পুরো আমেরিকায় ২৫ রকমের আচারিক গীর্জা আছে তাদের। নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন গোত্রে তারা বিভক্ত। প্রত্যেক গোত্রের নিজস্ব কিছু সংস্কার ও বিধিমালা আছে। এর বাইরে কেউ যায় না।

আমিসদের জীবনাচার এখনো কৃষি নির্ভর। তারা কোক-ফান্টা থেকে শুরু করে কোনো প্রকার কারখানাজাত পানীয় পান করে না। দু’শো বছর আগে যখন তারা আমেরিকাতে তাদের তিথু গাঁঢ়ে, সে সময় নেটিভ আমেরিকানদের সঙ্গেই মিলেমিশে তারা চাষাবাদ শুরু করে। যে অঞ্চলটাতে আমরা এখন আছি, দু’শো বছর আগে এটা আমাদের দেশের বান্দরবনের মতোই ছিলো। সেই পাহাড়, সেই উপত্যকা। আমাদের এখানে যেমন জুম চাষ করে, তারাও সেরকম মৌসুমী ফসলের আবাদ করতো। অপেক্ষাকৃত অনেক স্বল্প ঘনত্বের লোকালয়ে এখনো একেক পরিবার একেক টিলা নিয়ে থাকে। সমতল বা পাহাড়ের ঢাল বরাবর তারা নিজেরা ফসল ফলায়, সেগুলো দিয়েই তাদের সারা বছরের আহার চলে।

দুপুরবেলা আমিসদের রান্না করা সবজি দিয়ে আমার আহার করতে ইচ্ছে হলো। ইবনের ফোনে আমাদের সব তথ্য আছে। কিছুক্ষণ টেপাটেপি করে বললো- এখান থেকে ৫ মাইল দূরে চার্ম নামক এক জায়গায় আমিসদের ফ্যামিলি রেস্টুরেন্ট আছে, ওখানে খাবো।

এসে দেখি এটা সেরকম কিছু না। আমিসদের নিজেদের ঘরে বানানো নানা রকমের খাবার দাবার আর তরি তরকারির ডিপার্ট্মেন্টাল স্টোর এটা। আমি আমি ক্যামেরা হাতে বাইরে এসে দাঁড়াই। কিছু লোকের চলাচল দেখি মাত্র। ঘোড়ার গাড়ি আর সাইকেল ছাড়া আর তেমন যানবাহনও চোখে পড়েনা। এই দুই দিনে কোনো আমিস নারী বা পুরুষের কোনো পোর্টেট তুলতে পারিনি। একজন দোকান থেকে বেরোতেই ভাবলাম, শেষ চেষ্টা করেই দেখি।

‘আমি কি আপনার একটা ছবি তুলতে পারি?’

এমন প্রশ্ন করার পর আমি নিজেই ‘না’ উত্তর শোনার জন্য তৈরি হয়ে আছি। আমি জেনেই এসেছি- আমিস সম্প্রদায়ের লোকেরা ক্যামেরা ফ্রেন্ডলিতো নয়ই বরং তাদের না জানিয়ে গোপনে ছবি তুলতে গেলে নাকি তারা ক্যামেরা কেড়ে নিয়ে ছুড়ে মারে।

যে লোকটির সঙ্গে কথা বলছি, তার বয়স ষাটের কাছাকাছি হবে। চেহারাটা ধবধবে ফর্সা, গায়ে হাফহাতা ফতুয়ার মতো শার্ট, ঢোলা প্যান্ট, মাওলানাদের মতো দাঁড়ি, মাথায় হ্যাট। দুই হাতে বাজারের ব্যাগ রাখছেন এক দ্বিচক্রযানে, যার পেছনে দু পাশে চারটা ঝুড়ি।

তিনি আমার কথা শুনলেন। আর স্পষ্ট ইংরেজিতে বললেনÑ আমাদের জাতের লোকেরা ছবি তোলা পছন্দ করে না। তুমি চাইলে আমার ছবি তুলতে পারো, কিন্তু আমরা ক্যামেরার সামনে পোজ দেই না। আমাদের ধর্মে নিষেধ।

কথাগুলো বলেই তিনি তার দ্বিচক্রযানে উঠে পড়লেন । দোকান থেকে এবার বেরোলেন এক বৃদ্ধা। তার পোশাক আরো সাদামাটা। নীল রং-এর একটা গলা থেকে গোড়ালী পর্যন্ত আলখেল্লা, মাথায় টুপীর মতো সাদা রং-এর একটা কাপড়ের আস্তরণ। তার দুই হাতে চারটা বড় ব্যাগ। তিনি দোকান থেকে বেরিয়ে রাস্তা পার হয়ে ওপারে এক টিলার উপর ঘোড়াশালে বেঁধে রাখা তার ঘোড়ার গাড়ির দিকে চলে গেলেন। দড়ি ছোটালেন এক খুঁটি থেকে। তারপর নিজেই উঠে পড়লেন দুই চাকার গাড়িটির উপর। তার ঘোড়া তাকে নিয়ে আমাদের থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়।

আমাদের গাড়ি ছুটে চলে গেটিসবার্গ শহরের দিকে। আব্রাহাম লিংকনের বক্তৃতা চত্বর আর আমেরিকান গৃহযুদ্ধের জায়গাটা দেখবো কাল।

গেটিসবার্গ, ডিসি, ফোবানা, ফিলাডেলফিয়া, ম্যারিল্যান্ড , ওহিও – এসবের কথা তো কিছুই লিখিনি এখনো।
আর যে উপলক্ষে যাওয়া, শাপলার বিয়ে, এটা তো বিশাল কাহিনী……।।

 

 

মন্তব্য
Loading...