আমার ভ্রমণ কথা : এক নদীতে কী দুইবার স্নান হয়!

বিদেশ ঘুরে বেড়ানোর খায়েসটা আমার জন্মেছিল মূলত; আমার নাবিক বাবার কাছ থেকে বিদেশের গল্প শুনে। প্রথম বিদেশ যাওয়ার সুযোগ হয় ১৯৯০ তে, তখন আমি বুয়েটে পড়ি, থার্ড ইয়ারে। ৫০ মার্কিন ডলার আর পাঁচশো টাকার ৪ খানা নোট নিয়ে ৮ দিনের জন্য রওয়ানা হয়েছিলাম। দলের সঙ্গে যাত্রা। ভ্রমণের ধকল কিছুই বুঝিনি।

প্রথম বিদেশ যাওয়ার সুযোগ হয় ১৯৯০ তে, তখন আমি বুয়েটে পড়ি, থার্ড ইয়ারে।

এর ৭ বছর পর যাই সংযুক্ত আরব আমিরাতে। তখন মনে হলো বিদেশ সফরে এসেছি। ভিন্ন লোকালয়, ভিন্ন মানুষ, ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন তার প্রকৃতি। এরপর থেকে ধীরে ধীরে শুরু হয়ে যায়। এরপর যেকোনো ছুঁতো পেলেই আমি পাসপোর্ট গোছাই। বিগত ২৫ বছর ধরে বিদেশ ঘুরছি। ঘোরাঘুরি নেশার মতো হয়ে গেছে। এশিয়া-ইউরোপ-উত্তর-দক্ষিন আমেরিকা-আফ্রিকা মিলে প্রায় তিরিশটি দেশ আমার দেখা হয়ে গেছে। এসব দেখা-দেখির বিষয় আমি একার মধ্যে রাখিনি। ভ্রমণকাহিনী হয়েছে ১৯টি, ভ্রমণচিত্র বানিয়েছি প্রায় তিনশো। আমার দেখাদেখি – লেখালেখি আর ভ্রমণচিত্র বানানোর মাধ্যমে শেষ হয়। আবার নতুন নতুন জায়গার প্রতি তৈরি হই।
বিদেশ ঘুরতে গিয়ে ছবি তুলতে বিড়ম্বনার শিকার হয়েছিলাম দুবার। একবার আল-আইন আর আরেকবার লন্ডন শহরে। আল-আইনের এক পার্কে এক বোরখাপরা আরব মহিলা তার শিশুটিকে স্ট্রেচারে বসিয়ে পাশে বসে সিগারেট খাচ্ছেন। কালো বোরখা, সাদা সিগারেট, ফর্সা চেহারা। আমি একটা স্টিল ছবি তুলি খানিক দূরে থেকে। এর মিনিট পনেরো পরে এক আরব যুবক এসে আমাকে শাসায়। কেনো তার স্ত্রীর ছবি তুলেছি। এক্ষুণি ফিল্ম খুলে তাকে দিয়ে দিতে হবে। আমার সঙ্গী যে বাংলাদেশি ছিলো, সে আমাকে বললো- দিয়ে দাও। আমি ক্যামেরা থেকে খুলে ফিল্মটা দিয়ে দিলাম।
আরেকটা ঘটনা ঘটে ২০০৬ সালে লন্ডনে। লন্ডনের প্রাপ্ত বয়স্কদের পছন্দের একটা গলি আছে, সহো। লেচটার স্কোয়ার-এর পাশে। সেখানে ছবি তুলছি ভিডিও ক্যামেরাতে। খানিক পর দুই তরুণ পুলিশ আমাকে আটকায়। পুরো শরীর সার্চ করে। মোবাইল ফোন নিয়ে কলগুলো দেখে। মোবাইল ফোনে কী কী ছবি আছে তাও দেখে। আমাকে দুই হাত উপরে উঠিয়ে রাখতে বলে। আমি হাত উঁচিয়ে রাখি। তারা গøাভস পরা হাত আমার প্যান্টের, জ্যাকেটের পকেটে ঢুকিয়ে মানিব্যাগ, কাগজপত্র, লিফলেট বের করে আনে। জেরা করে প্রায় তিরিশ মিনিট। ভিডিও ক্যামেরা রিওয়ান্ড করে সব ফুটেজ দেখে। এসব কেনো তুলছি তার কারণ জানতে চায়। খানিক পরে ওয়ারলেসে তারা কথা বলে কারো সঙ্গে এবং আমাকে এই এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বলে। আমি এরপর আরো প্রায় ৬-৭ বার লন্ডনে গিয়েছি। কিন্তু সহো এলাকায় আর কখনো যাইনি।
আমার ভিডিও ক্যামেরার ফুটেজ আরেকবার আমাকে বড়সড় একটা ঝামেলা থেকে বাঁচিয়েছিল। সেটা ২০০৩ সালের গল্প জার্মানির বার্লিন শহরে।
ইউরোপে আমাদের প্রথম দিন। ইউরো বাঁচানোর জন্য আমরা ৫ জন কোনো হোটেলে না থেকে একটা আবাসিক এলাকার ভেতর একটা ৪ বেডরুমের বাড়িতে উঠে পড়ি, খুব সস্তায়। জনপ্রতি পনেরো ইউরো ভাড়া, সার্ভিস্ড এপার্টমেন্ট। পরদিন সকালবেলা হেঁটে হেঁটে সিকি কিলোমিটার পেরিয়ে একটা রেলস্টেশনে যাই। সেই রেল আমাদের নিয়ে যায় সনি সেন্টারে। সেই সনি সেন্টার থেকে হাঁটা দূরন্তে সব ঐতিহাসিক দ্রষ্টব্য। আমার সঙ্গিরা ঘুরে বেড়ায়, আমিও। আমার কাঁধে ভিডিও ক্যামেরা, হাতে স্টিল। দুই ক্যামেরায় ছবি তুলতে তুলতে টেরপাই আমার বন্ধুরা কেউ আমার সামনে নেই।
এই শহরে ইংরেজী সাইনবোর্ড নাই। ইংরেজী কথা বুঝে এমন মানুষ পাওয়া কঠিন। প্রায় ৭ ঘণ্টার কঠিন সংগ্রাম শেষে আমি গভীর রাতে ফেরত চলে আসি আমাদের সেই বাড়িতে। আমার ভিডিও ক্যামেরার ফুটেজই কেবল আমাকে সেই কঠিন হারিয়ে যাওয়ার সংকট থেকে উদ্ধার করেছিল।
বিদেশ সফর করতে করতে একটা জিনিস আমার মনে হয়েছে যে, নিজের দেশের চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে উন্নত কোনো দেশে সফর করলে নিজেকে বেশ ছোট-ছোট মনে হয়। বড়লোকের অট্টলিকার সামনে দাঁড়ালেই নিজের কুঁড়ে ঘরের কথা মনে পড়ে যায়। সেসব কারণে আমাদের আকৃতি ও গায়ের রং-এর কারণে কোথাও সু² বর্ণবিদ্বেষের শিকারও হয়েছি। কিন্তু প্রকাশ্যে কিছু ঘটেনি। তবে বাংলাদেশি সবুজ পাসপোর্টটা নিয়ে চরম বিড়ম্বনা ও অবহেলার শিকার হয়েছিলাম ২০০৩ সালের নভেম্বর মাসে চিলির সাওপাওলো বিমান বন্দরে।
আমস্টার্ডাম থেকে চিলির সান্তিয়াগো যাবার পথে সাওপাওলো বিমানবন্দরে আমাদের ১৪ ঘণ্টার বিরতী। একই বিমান থেকে ১২ জন যাত্রী এ পথে যাবেন সান্তিয়াগো । সবাইকে বলা হলোÑ এয়ারপোর্টের বাইরে গাড়ি আছে, আমরা হিলটন হোটেলে রাত কাটাবো। পরদিন সকাল ১০টায় ফ্লাইট। ইমিগ্রেশন নিয়ে বেরোবার পথে আমাদের ৫ জনকেই আটকালো। বললো যে সমস্ত দেশের যাত্রীরা এই সুযোগ পাবেন সেই তালিকায় বাংলাদেশ নাই। তাই এয়ারপোর্টের একটা ডিপার্চার লাউঞ্জে পুলিশ বেষ্টিত অবস্থায় সারারাত কঠিন চেয়ারে বসে এবং শেষ রাতে ব্যাগ মাথায় দিয়ে মেঝের উপর শুয়ে আমাদের রাত কাটাতে হয়েছিল।
স্থাপনা দেখে মুগ্ধ হয়েছি অনেক জায়গায়। তবে প্রকৃতির কিছু বিষ্ময়কার সৃষ্টি আমাকে মুগ্ধ করেছিল আমেরিকার এরিজোনার গ্রেন্ড ক্যানিয়ান, চীনের স্টোন ফরেস্টে। পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো কিছু স্থাপনা এখনো দাঁড়িয়ে আছে মিশরে। গিজার পিরামিড, লুক্সরের মন্দির, মিশরী যাদুঘরের মমি দেখে অভিভ‚ত হয়েছি। গ্রিসের পার্থেনন কিংবা কর্নক মন্দির আমাকে আড়াই থেকে চার হাজার বছরের পেছনের সময়ের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। তবে সবচেয়ে হতাশা জেগেছিল রাজকীয় স্থাপনাগুলো দেখে। ইস্তাম্বুলের ওসমানি প্রাসাদ কিংবা আগ্রা-দিল্লীর মুঘলীয়ানার চিহ্ন সমূহ দেখতে দেখতে ক্লান্তি এসেছে। অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছিলামÑ সময়ের আবর্তে মানুষের ঐশ্বর্য যখন বিলীন হয়ে যায়, তখন কী করে মানুষেরা মূল্যায়িত হোন। স্থাপনাসমূহ দেখতে গিয়ে দেখেছি, আদিযুগ থেকে শুরু করে মধ্যযুগ পর্যন্ত সময়ে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন সময়ে ধর্ম কী করে তাদের স্থপনা চরিত্রকে নির্ধারণ করে দিতো। বিংশ শতাব্দীর সূচনার সময় থেকে বিশ্বময় এক ধরনের সেকুলার নজির পেলো।
আমাকে প্রায়ই জিগ্যেস করা হয় এতো দেশ ঘুরে আমি কোন দেশের কী দেখে মুগ্ধ হয়েছি। আমি এসব ক্ষেত্রে জবাব দেই বিভিন্ন জায়গার মানুষ। আমাকে সবচেয়ে বিমোহিত করেছিলÑ চিলির মানুষগুলোর আচার ব্যবহার। সম্ভবত; চিলি থেকে সবচেয়ে দূরের দেশ বাংলাদেশ থেকে গিয়েছি বলে এমন তারা আমাদের বিমোহিত করেছিল। চীনের গ্রামাঞ্চলের মানুষদের সারল্য আমাকে আপ্লুত করেছে। নেপালের অর্ধ-বেকার তরুণদের জন্যও আমার মায়া হয়েছে।
অনেক ক্ষেত্রেই একই জায়গায় আমায় একাধিকবার যাওয়া হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয়বারও গিয়ে দেখেছি সু² বেশকিছু পরিবর্তন হয়েছে। যদিও একবার দেখা কোনো শহরেই দ্বিতীয়বার যেতে আগ্রহ জাগে না, কিন্তু পুনরাবৃত্তবার গিয়েও দেখি- সেই নদীটা হয়তো ঠিকই আছে, কিন্তু সেই জলটা আর নেই, যে মানুষটি প্রথমবার সেই নদীতে ¯স্নান’ করেছিল দ্বিতীয়বারের ¯স্নানের নদীটা ঠিক হয়তো থাকে, কিন্তু পানিটার বদল হয়ে যায়, মানুষটারও।

 

মন্তব্য
Loading...