চেরাগ- আবুল হায়াত

ইমোশনাল বাঙালি

আবুল হায়াত

দৃশ্য পল্লী শুটিংস্পট। ঢাকা থেকে মাত্র পঞ্চান্ন কিলোমিটার দূরত্বে এর অবস্থান। গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর থানার পুরনো জমিদারবাড়ির বেশ কিছু অংশ নিয়ে ‘দৃশ্য পল্লী’ গঠিত। থিয়েটারকর্মী সাখাওয়াত স্থানীয় অন্য দুই যুবকের সঙ্গে মিলে গড়ে তুলেছে এই শুটিংস্পট।

প্রায় প্রতি সপ্তাহেই ঢাকা থেকে বিভিন্ন ইউনিট গিয়ে শুটিং করে। একুশে টিভি বন্ধ হওয়ার পর অবশ্য ওদের খরা চলছে। সাখাওয়াত ভীত কণ্ঠে জানাল, বন্ধই করে দিতে হয় কিনা!

এ মাসের ১৬ থেকে তিন দিন টানা শুটিং করে এলাম শ্রীফলতলী জমিদারবাড়িতে অবস্থিত এই শুটিংস্পটের আশপাশের এলাকায়। আবহাওয়া ছিল বেশ চমৎকার। অন্তত বৃষ্টি করেনি উৎপাত। গরমে ক্লান্ত হলেও শুটিংয়ের আনন্দ তা ভোলাতে সক্ষম হয়েছে। এই আনন্দ দেওয়ার প্রধান হচ্ছে দুটি ব্যক্তি শাকুর মজিদ আর কায়েস চৌধুরী।

শাকুর মজিদের নাটক। শাকুর এখন নাট্যকার হিসেবে বেশ আলোচিত। তৌকিরের পরিচালনায় ওর দুটো নাটক ‘লন্ডনী কইন্যা’ এবং ‘নাইওরী’ রীতিমতো সাড়া জাগিয়েছে দর্শকদের মাঝে। এবারের নাটক ‘চেরাগ’। পরিচালনা করল কায়েস চৌধুরী। নাট্যকার-নির্দেশক হিসেবে নতুন জুটি। সারাক্ষণ শাকুর শুটিংয়ের সঙ্গে থেকে ছবি তুলল। ও তো আবার ফটোগ্রাফার হিসেবেও দেশে এবং দেশের বাইরে বেশ পরিচিত। আর কায়েস চৌধুরী ফরাসি দেশ থেকে ছায়াছবি নির্মাণে শিক্ষা নিয়ে এসে দেশে বেশ কাজ করছে নাটক নিয়ে। ওর সঙ্গে আমার প্রথম কাজ শিল্পী হিসেবে। ও আমার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ঢংয়ে কাজ করে। জমিয়ে রাখে ইউনিটটাকে। এক কথায় চমৎকার একটি আবহ বিরাজ করে শুটিং চলাকালীন।

চেরাগ নাটকে আবুল হায়াত ও চাদনী

চেরাগের গল্পটি এক স্বশিক্ষিত গৃহশিক্ষকের জীবনকথা। বাবার আসামের চা বাগানে চাকরি সূত্রে মেম সাহেবের প্রিয় পাত্র হিসেবে তার কাছে ইংরেজি এবং দেশী বাবুর কাছ থেকে অঙ্ক এবং বাংলা শিখেছিলেন একরাম মাস্টার। বাবা-মার মৃত্যুর পর নিজ গ্রামে ফিরে এসে চলি­শ বছর ধরে বাড়ি বাড়ি শিক্ষকতা করে সংসার চালান একরাম। দারিদ্র্যের কষাঘাতে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। কন্যাকে নিয়ে কোনোমতে সংসার চলে।

এলাকায় কোনো স্কুল ছিল না বলে লেগে পড়লেন সেই কাজে। এক সময় স্কুল হলো। তার সারা জীবনের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলো, কিন্তু মাস্টার বঞ্চিতই রইলেন তার ফল ভোগ হতে। এ হলো মোটামুটি কাহিনী।

আসলে এ কথা বলার জন্য তো আজকের কথকতার অবতারণা নয়। বলছিলাম অন্য কিছু। তাহলে চলুন যাই আর একটু দূরে। গ্রামটার নাম দিঘীবাড়ী। শ্রীফলের ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের জোড়া ব্রিজের তলা থেকে ট্রলারে প্রায় ঘন্টা খানেকের যাত্রা। পুরো ইউনিট পুরো দিন সেই গ্রামে অবস্থান করে নাটকের বেশ কিছু দৃশ্য ধারণ করা হলো।

বিশেষ করে একটি দৃশ্যের কথা মনে পড়ছে। একরাম মাস্টার মাতবর বাড়িতে ছাত্র পড়িয়ে ঘরে ফিরছেন। খালের ধারে খেয়াল করলেন তার এক দুষ্ট ছাত্র বসে আছে

‘কি রে কী করছিস? বাড়ি যাবি না?’

‘যামু।’

‘বইসা রইছস ক্যান?’

‘নাওয়ের লাগি।’

‘আয়, পার কইরা দিই।’

ছাত্রকে কাঁধে নিয়ে অশীতিপর বৃদ্ধ খালে নামেন। মাঝ পানিতে গিয়ে বলেন, ছয়ের নামতা ক। ছাত্র শুরু করে কিন্তু একটু পরে আটকে যায়। মাস্টার ভয় দেখান-

ক, নইলে কিন্তু পানিতে ফালাই দিমু।

ছাত্র ভয়ে নামতা বলে ফেলে। খুশি হয়ে মাস্টার ছাত্রকে অন্য পাড়ে পৌঁছে দেন।

সমস্যা ছিল একটাই। আমি জানি না সাঁতার। পরিচালক কায়েস আমাকে সাহস দেওয়ার জন্য তিন-চারবার নিজে পারাপার করল খাল। কায়েসের গলা পানি। ভয় পেয়ে গেলাম এবং কিছুতেই রাজি হলাম না বাচ্চা কাঁধে নিয়ে পার হতে। অগত্যা কায়েস ভরসা দিল, আপনাকে পার হতে হবে না, শুধু বাচ্চা কাঁধে নিয়ে হাঁটু পানিতে যাবেন, কাট করে আমি নিজে ডামি দেব।

কোনো প্রকারে আল্লা ভরসা করে এটুকুতে রাজি হলাম। কিন্তু পানির কাছে গিয়ে ইতস্তত ভাব গেল বেড়ে। পানির স্রোত বেশ তীব্র। অনেক ভেবে-চিন্তে, মেলা লোকজনকে সজাগ দৃষ্টি রেখে, প্রয়োজনে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য স্ট্যান্ডবাই করে শট দিতে নামলাম। ভুলে গেলাম ছোটবেলা থেকে পানি ব্যাপারটি আমার জন্য নিষিদ্ধ।

ফাইভ, ফোর, ত্রি, টু, ওয়ান, জিরো, এ্যাকশন। শট শুরু হলো। ডায়লগ শেষ। পানিতে নামলাম। কোথা থেকে যেন এক ভাবাবেগের ঢেউ এসে লাগল আমার মনের মধ্যে। আমি হয়ে গেলাম যেন সত্যিকারের একরাম মাস্টার।

এক পা, দু পা করে এগোচ্ছি। সংলাপ দিলাম। গলা পানিতে চলে গেছি। কোন সময় খালও পেরিয়ে গেলাম। পাড়ে জমায়েত হওয়া সবার প্রবল হাততালি শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু আমি যে অন্য জগতে। চোখে পানি এসে গেল। কায়েস-শাকুর দুজনই চমৎকৃত, অভিভূত।

আবুল হায়াত ও ইশমাম, চেরাগ নাটকের সেই দৃশ্যে

ইমোশনের কাছে আমি পরাজিত। ভুলে গেছি এটা নাটক। এ ভাবাবেগ কতক্ষণ আচ্ছন্ন রেখেছিল আমায় ঠিক বলতে পারব নাÑতবে কিছুক্ষণের মধ্যেই গ্রামের বিভিন্ন বয়সের মানুষ নেমে পড়েছিল পানিতে। যেন আমাকে অভিনন্দন জানাতে, সহমর্মিতা জ্ঞাপন করতে। উৎসবে মাতল সবাই।

’৬৬ সালে বুয়েটের ছাত্র হিসেবে মিছিলে অংশগ্রহণ করে শহীদ মিনারের সম্মুখে পুলিশের লাঠির বাড়ি খেয়েছিলাম। তারপর থেকে আজ অব্দি মিছিল নামক জিনিস থেকে নিজেকে সযতে যথেষ্ট দূরে রেখেছি নিষিদ্ধ রেখেছি।

আজ কেন যেন কোনো এক অনুভূতি প্রখর হওয়ার চেষ্টা করছে। না! ইমোশন বড় সাংঘাতিক বস্তু।

ঢাকা, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০০২। প্রকাশ: প্রথম আলো, ১ অক্টোবর ২০০২।
লেখক : বিশিষ্ট অভিনেতা এবং চেরাগ নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনয়ের পুরস্কার লাভ।

 

 

মন্তব্য
Loading...